অড়হর ডালের ব্যবহার, উপকার ও পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া | Pigeon Peas (Arhar Dal) Benefits, Uses and Side Effects in Bengali

by

খাবারের পাতে ডাল না থাকলে সেই খাবার একেবারেই যেন অসম্পূর্ণ লাগে। ভারতীয়, বিশেষ করে অধিকাংশ বাঙালির কাছে তো অন্তত ব্যাপারটা এরকমই। তাদের কাছে ভাত-রুটির সঙ্গে অন্যতম সঙ্গীই হল ডাল। ডালে থাকে বিভিন্ন ধরনের পুষ্টি। তাই ডাল যে খাবার হিসেবে শুধু পেটই ভরায়, এমন নয়, বরং পাশাপাশি আমাদের শরীরকে সুস্থ রাখতেও ডাল ভীষণ সাহায্য করে। এরকমই একটি ডাল হল অড়হর ডাল। অবাঙালিদের কাছে এটি তুর ডাল নামে পরিচিত এবং ইংরেজিতে এই ডালকে বলে পিজিয়ন পি। অনেকেই বলে থাকেন এবং মনে করেন যে, অড়হর ডাল বেশ কিছু রোগের হাত থেকে আমাদের দূরে রাখতে এবং কিছু রোগের উপসর্গ কমাতেও সাহায্য করে। স্টাইলক্রেজের এই প্রতিবেদনে আমরা আপনাদের জানাব আমাদের শরীরের জন্য অড়হর ডালের উপকারিতা এবং তার বিভিন্ন ব্যবহারিক উপায়। এর পাশাপাশি এই প্রতিবেদনে আমরা উল্লেখ করব অড়হর ডালের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়াও। তবে পাঠকরা মনে রাখবেন, এই প্রতিবেদনে আলোচিত রোগগুলির উপসর্গ কমাতে অড়হর ডাল উপকারী হতে পারে। কিন্তু এটি সেই সব রোগের চিকিৎসা নয়।

 অড়হর ডালের উপকারিতা

চলুন, প্রথমেই জেনে নিই অড়হড় ডালের উপকারগুলি কী কী।

১. ওজন কমাতে সাহায্য করে

ওজন কমানোর কাজে অড়হর ডালের উপকারিতা বেশ ভালোভাবেই লক্ষ্য করা যায়। আসলে, এই অড়হর ডালে অন্যান্য ডালের মতো পুষ্টিগুণ থাকলেও, এটিতে ফাইবার ভরপুর থাকে। (১) আর আমরা সকলেই জানি ফাইবার যুক্ত খাবার খেলে তা দীর্ঘ সময় পর্যন্ত আমাদের পেত ভরা থাকতে সাহায্য করে। পাশাপাশি তা আমাদের অতিরিক্ত খাবার খেয়ে ফেলার প্রবণতাও কমায়। এইভাবেই বড়তে থাকা ওজন নিয়ন্ত্রণ করতে ফাইবার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। (২) তবে ওজন কমাতে অড়হর ডাল সরাসরি ভাবে ঠিক কতটা উপকারী, তা নিয়ে এখনও বেশ কিছু গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।

২. কার্ডিওভাসকুলার বা হৃদরোগের হাত থেকে রক্ষা

বেশ কিছু কারণের জন্যই হৃদরোগ দেখা দিতে পারে। তার মধ্যে একটি অন্যতম কারণ হল শরীরে ফ্রি রেডিকেলস (Reactive Oxygen Species)- এর প্রভাব। হার্টের রোগের জন্য যে কারণগুলি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, যেমন- ডায়াবেটিস, মোটা হয়ে যাওয়া কিংবা উচ্চ রক্তচাপ অর্থাৎ সেগুলি কমাতে সাহায্য করে অক্সিডেটিভ উপাদান। (৩) সেভাবেই অড়হর ডালে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেটিভ উৎসেচক ফ্রি রেডিকেলসের প্রভাব কমিয়ে হার্টের রোগের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। (৪)

৩. রোগ প্রতিরোধ কমাতে বাড়ায়

অড়হর ডাল খেলে যে কেবলমাত্র আমাদের শরীর সুস্থ থাকে তাইই নয়, বরং তা আমাদের শরীরকে বিভিন্ন রোগের হাত থেকে দূরে রাখতেও সাহায্য করে। অড়হর ডালে থাকে ইমিউনোমডুলেটরি (Immunomodulatory) গুণ। এই গুণ আমাদের শরীরের ইমিউনিটি পাওয়ার অর্থাৎ শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। (৫)

৪. ডায়াবেটিস রুখতে সাহায্য করে

শরীরে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস বা জারণ চাপের স্তর বেড়ে গেলে তা মধুমেহ রোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ফুড সায়েন্স এবং নিউট্রিশন বিভাগের তরফে করা একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে, অক্সিডেটিভ স্ট্রেস বা জারণ চাপ কমাতে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট গুণে ভরপুর কোনও খাবার খেলে তা লাভজনক হতে পারে। সেই জায়গায় অড়হর ডালে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপাদান থাকে। তাই এটি ডায়াবেটিস বা মধুমেহ রোগের হাত থেকে বাঁচাতে আমাদের ভীষণ সাহায্য করে। সেই গবেষণায় আরও দেখা গিয়েছে যে, হাইপারগ্লেসেমিয়াকে (উচ্চ রক্ত শর্করা) নিয়ন্ত্রণ করতে অঙ্কুরিত অড়হর ডাল খুবই উপকারী। (৬)

৫. ক্যান্সার রুখতে সাহায্য

ক্যান্সারের মতো প্রাণঘাতী একটি রোগ রুখতে অড়হর ডালের ব্যবহার বেশ কিছু ক্ষেত্রে উপকারী প্রমাণিত হয়ে থাকে। ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অফ নিউট্রিশন (হায়দ্রাবাদ)-এর একটি গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, অড়হর ডাল অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের একটি অন্যতম উৎস। আর এই গুণের কারণে এটি আমাদের অক্সিডেটিভ স্ট্রেস বা জারণ চাপের কারণে হওয়া ক্যান্সারের ঝুঁকি থেকে বাঁচাতে সাহায্য করে। সেই গবেষণায় আরও দেখা গিয়েছে যে, অড়হরের মূলে থাকে অ্যান্টিক্যান্সার গুণ। অড়হরের মূলে পাওয়া যায় কেজোনল নামের একটি উপাদান। (৭) সেই উপাদানই অড়হরে পাওয়া যাওয়া অ্যান্টিক্যান্সার গুণের উৎস। তাই বলা যেতেই পারে যে অড়হর ডাল ও এই গাছের মূল আমাদের ক্যান্সারের হাত থেকে বাঁচাতে সাহয্য করে থাকে। তবে পাঠকদের মনে রাখা উচিৎ অড়হর ডাল কিন্তু ক্যান্সারের চিকিৎসা করতে সক্ষম নয়। তাই যে বা যাঁরা ক্যান্সারের মতো এই গুরুতর রোগে আক্রান্ত, তাঁদের উচিৎ চিকিৎসকের পরামর্শ মতো ওষুধ খাওয়া এবং তাঁদের নির্দেশ অমান্য না করা।

এতক্ষণ আমরা আলোচনা করলাম অড়হর ডালের উপকারিতা নিয়ে। এবার আমরা আপনাদের জানাব এই ডালের পুষ্টিগুণ সম্বন্ধে।

অড়হর ডালের পুষ্টিগুণ

নীচের তালিকায় আমরা জানালাম এই ডালে কোন পুষ্টিগুণ কত মাত্রায় থাকে ()।

পুষ্টিগুণপ্রতি ১০০ গ্রামে কত মাত্রা
জল৬৮.৫৫ গ্রাম
শক্তি১২১ কিলোক্যালোরি
প্রোটিন৬.৭৬ গ্রাম
ফ্যাট০.৩৮ গ্রাম
কার্বোহাইড্রেট২৩.২৫ গ্রাম
ফাইবার৬.৭ গ্রাম
মিনারেল
ক্যালশিয়াম৪৩ মিলিগ্রাম
আয়রন১.১১ মিলিগ্রাম
ম্যাগনেশিয়াম৪৬ মিলিগ্রাম
ফসফরাস১১৯ মিলিগ্রাম
পটাশিয়াম৩৮৪ মিলিগ্রাম
সোডিয়াম৫ মিলিগ্রাম
জিংক০.৯ মিলিগ্রাম
কপার০.২৬৯ মিলিগ্রাম
সিলেনিয়াম২.৯ মাইক্রোগ্রাম
ম্যাঙ্গানিজ০.৫০১ মিলিগ্রাম
ভিটামিন
থিয়ামিন০.১৪৬ মিলিগ্রাম
রাইবোফ্লেবিন০.০৫৯ মিলিগ্রাম
নিয়াসিন০.৭৮১ মিলিগ্রাম
পেন্টোথেনিক অ্যাসিড০.৩১৯ মিলিগ্রাম
ভিটামিন- বি ৬০.০৫ মিলিগ্রাম
ফোলেট, DFE১১১ মাইক্রোগ্রাম
ভিটামিন-এ, আইইয়ু৩ আইইয়ু
লিপিড
ফ্যাটি অ্যাসিড টোটাল স্যাচুরেটেড০.০৮৩ গ্রাম
ফ্যাটি অ্যাসিড টোটাল মনোস্যাচুরেটেড০.০০৩ গ্রাম
ফ্যাটি অ্যাসিড টোটাল পলিআনস্যাচুরেটেড০.২০৫ গ্রাম

প্রতিবেদনের এই অংশে এবার আমরা জানাব যে অড়হর ডালের ব্যবহার কীভাবে করা যেতে পারে।

অড়হর ডালের ব্যবহার

নীচে আলোচিত উপায়গুলির মতো করে আপনি অড়হর ডালের ব্যবহার করতে পারেন।

  • খোসা ছাড়ানো ডাল দিয়ে তড়কা ডাল বানিয়ে খাওয়া যেতে পারে।
  • ডাল বানানোর জন্য অড়হরের গোটা ডালও ব্যবহার করা যেতে পারে।
  • অড়হর ডালকে বেটে নিয়ে তা ঘি-তে ভেজে নিন। এবার তাতে চিনি মিশিয়ে একটি পুর তৈরি করুন। এবার ময়দার লেচির মধ্যে তা ভরে পরোটা বানিয়েও খেতে পারেন।
  • অড়হরের গোটা ডালকে সেদ্ধ করে তাতে সবজি মিশিয়ে ঘন করে সেই ডালও খেতে পারেন।
  • অড়হর ডাল, চাল এবং বিভিন্ন সবজি মিশিয়ে তা দিয়ে খিচুড়ি বানিয়েও খাওয়া যেতে পারে।
  • কখন খাবেন?

দুপুরের কিংবা রাতের খাবারে আপনি অড়হরের ডাল খেতে পারেন। এছাড়া সকালের খাবারেও পরোটার পুর হিসেবে অড়হর ডাল খাওয়া যেতে পারে।

  • কত পরিমাণে খাবেন?

দুপুর কিংবা রাতের খাবার খাওয়ার সময় অর্ধেক কিংবা এক বাটি অড়হর ডাল খাওয়া যেতে পারে। এই সম্বন্ধে আরও জানতে আপনি একজন অভিজ্ঞ ডায়াটেশিয়ানের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন।

আমরা এই প্রতিবেদনের একেবারে শেষ অংশে চলে এসেছি। এবার আমরা আলোচনা করব অড়হর ডালের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া নিয়ে।

  • অড়হর ডালের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া

অড়হর ডাল খেলে যে যে পার্শ্ব প্রতিক্রিয়াগুলির মুখোমুখি সাধারণত হতে হয়, সেগুলি নীচে আলোচনা করা হল।

  • অড়হর ডালের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া সম্বন্ধে বলতে গেলে শুরুতেই বলতে হয় এই ডালে থাকা অ্যান্টিনিউট্রেটিভ উপাদানের কথা। এই উপাদানটি আমাদের শরীরে পুষ্টি উপাদানের প্রবেশে বাধা দেয়। তাই জন্য পরিমিত মাত্রায় অড়হর ডাল খাওয়া উচিত।
  • এছাড়া কারও কারও শরীরে অড়হর ডাল আবার অ্যালার্জির সৃষ্টিও করে। তাই যাঁদের ফুড অ্যালার্জির সমস্যা রয়েছে, তাঁদের উচিৎ ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে তবেই অড়হর ডাল খাওয়া।

এই প্রতিবেদনটি সম্পূর্ণ পড়ার পর আশা করি আপনি বুঝতে পেরেছেন এই ডালের উপকারিতা কী কী এবং কী কী ভাবে এই ডালের ব্যবহার আপনি করতে পারবেন। যদি আপনি নিয়মিত শরীর চর্চা করেন এবং পরিমিত খাবার খান তাহলে আপনি আপনার খাবারের তালিকায় অবশ্যই অড়হর ডালকে যোগ করতে পারেন। এর পাশাপাশি অড়হর ডালের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া থেকে বাঁচতে আপনার উচিৎ একেবারে সীমিত পরিমাণে এই ডাল খাওয়া।

নিজের যত্ন করুন, সুস্থ থাকুন।

প্রায়শ জিজ্ঞাস্য প্রশ্নাবলী :

এবার চলুন জেনে নিই এই সম্পর্কিত কিছু প্রায়শ জিজ্ঞাস্য প্রশ্ন।

অড়হর ডালের কি আর কোনও নাম রয়েছে?

আমরা আগেই আপনাদের জানিয়েছি যে, অবাঙালিদের কাছে এই ডাল, তুর ডাল নামে পরিচিত এবং ইংরেজিতে এই ডালকে বলে পিজিয়ন পি। এছাড়াও এই ডালকে অনেকে কঙ্গো পি, অ্যাঙ্গোলা পি, রেড গ্রাম নামেও ডেকে থাকে। এই রকম নামের মূল কারণ হিসেবে উঠে আসে পূর্ব ভারত থেকে আফ্রিকা এবং মধ্য প্রাচ্যে এই ডালের চাষের বিস্তার। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বার্বাডোজে পায়রাদের এই ডাল খাওয়ানো হত বলে অনেকে এই ডালকে পিজিয়ন পি-ও বলে থাকেন।

অড়হর ডাল কি আপনার জন্য স্বাস্থ্যকর?

প্রোটিন, ডায়াটারি ফাইবার এবং বিভিন্ন ধরনের ভিটামিন যেমন- থিয়ামিন, ম্যাগনেশিয়াম, ফসফরাস, পটাশিয়াম, কপার এবং ম্যাঙ্গানিজের অন্যতম উৎস। পরিপূর্ণ ১০০ গ্রাম অড়হর ডাল থেকে প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় ফোলেটের ১১৪% পাওয়া যায়। গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে সেই পরিমাণটা ৭৬%।

অড়হর ডাল এবং মটরশুঁটি কি একই জিনিস?

না, অড়হর ডাল এবং মটরশুঁটি একই জিনিস নয়। দুটিই ডাল শস্য কিন্তু আলাদা।

অড়হর কি ডাল?

হ্যাঁ, অড়হর এক ধরনের ডাল শস্য।

অড়হর কি ডালশস্য?

হ্যাঁ, অড়হর এক ধরনের বহুবর্ষজীবী ডাল শস্য।

অড়হর ডাল কি ভিজিয়ে রাখতে হয়?

গোটা এবং শুকনো অড়হর ডাল বানানোর আগে ৬ ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখতে হয়।

অড়হর ডাল খেলে কি গ্যাস হওয়ার সম্ভাবনা থাকে?

হ্যাঁ, অড়হর ডাল অতিরিক্ত পরিমাণে খেলে তা পেটে গ্যাস সৃষ্টি করতে পারে।

ডায়াবেটিসের রোগীরা কি অড়হর ডাল খেতে পারবে?

অড়হর ডালে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপাদান থাকে। তাই এটি ডায়াবেটিস বা মধুমেহ রোগের হাত থেকে বাঁচাতে আমাদের ভীষণ সাহায্য করে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে, হাইপারগ্লেসেমিয়াকে (উচ্চ রক্ত শর্করা) নিয়ন্ত্রণ করতে অঙ্কুরিত অড়হর ডাল খুবই উপকারী।

অড়হর ডাল কি খাওয়া যায়?

অবশ্যই, অড়হর ডাল ভাত-রুটি কিংবা পরোটার পুর হিসেবেও খাওয়া যায়।

8 sources

Stylecraze has strict sourcing guidelines and relies on peer-reviewed studies, academic research institutions, and medical associations. We avoid using tertiary references. You can learn more about how we ensure our content is accurate and current by reading our editorial policy.

Was this article helpful?

LATEST ARTICLES

scorecardresearch