আশোক গাছের উপকারিতা ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া – Ashoka Tree Benefits and Side Effects in Bengali

by

আশোক গাছের নাম নিশ্চয় শুনে থাকবেন। হিন্দুধর্মে পুজোআচ্চার সঙ্গে ওতোপ্রতোভাবে জড়িত এই গাছ। অশোকষষ্ঠীর কথা তো শুনেই থাকবেন। কিন্তু আপনিকী জানেন এই অশোক গাছের গুণাগুণ অনেক। এই গাছের ছাল থেকে ফুল, বীজ সবই দারুণ উপকারী। সবচেয়ে উপকারী হল অশোক গাছের ছাল। ত্বকের উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি থেকে ব্যথা উপশম এমন হাজারও সমস্যা দূর করতে পারে। বিশেষ করে মহিলাদের জন্য এর উপকার অনেক। আমাদের আজকের প্রতিবেদনে অশোক গাছের উপকারিতা. ব্যবহার এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে আলোচনা করা হল।

অশোক গাছ

আশোক গাছের ছাল, বীজ দিয়ে ভেষজ ঔষধ তারি করা হয়। চীন, ভারত, শ্রীলঙ্কায় এই গাছ দেখা যায়। এই গাছটি বহু শাখাবিশিষ্ট ছায়াতরু, আজকাল পথের ধারে ধারে রোপণ করতে দেখা যায়। এর বৈজ্ঞানিক নাম : Saraca asoca. এটি Fabaceae পরিবারের এক প্রজাতির উদ্ভিদ। মাঝারি আকৃতির ছায়াপ্রদানকারী বৃক্খ। এদের পাতা গাঢ় সবুজ রঙের হয়। পাতাগুলো দীর্ঘ, চওড়া ও বর্শাফলাকৃতির। কচিপাতাগুলো কোমল, নমনীয়, ঝুলন্ত ও তামাটে। ফুল ফোটার প্রধান মৌসুম বসন্তকাল। তবে হেমন্ত পর্যন্ত গাছে ফুল ফুটতে দেখা যায়। ফুল কমলা-লাল রঙের হয়ে থাকে। ফুলগুলিতে বেশ সুগন্ধ থাকে। ফল বড় সিমের মতো চ্যাপ্টা। বীজ থেকে সহজেই চারা জন্মায়। এই গাছের ছালে ট্যানিন, ক্যাটেকোহল, স্টেরল এবং বিবিধ ধরনের ক্যালসিয়াম যৌগ পাওয়া যায়।

নেপাল, ভারত এবং শ্রীলঙ্কায় একে পবিত্র গাছ বলে মনে করা হয়। বৌদ্ধ এবং হিন্দু সংস্কৃতির সঙ্গে এর যোগ রয়েছে। প্রাচীন হিন্দু পুরাণ, কলা, ভাস্কর্য এমনকী রামায়নেও এর সুনাম রয়েছে। কথিত রয়েছে যে, গৌতম বুদ্ধ লুম্বিনি-তে এই গাছের নীচে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। মহাবীর এই গাছের নীচে ধ্যান করে সিদ্ধিলাভ করেছিলেন। রামায়ণেও উল্লেখ আছে, রাম সীতাকে অপহরণ করে অশোকবনে রেখেছিলেন। আগেকার দিনে বলত বাড়িতে অশোক গাছ লাগালে সংসারে সুখ-শান্তি বজায় থাকে। কারণ অশোক গাছ লাগালে শরীর সুস্থ থাকত, শরীর সুস্থ থাকবে মন থাকবে তরতাজা।

মহিলাদের জন্য এই গাছটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কেন জানেন?

মহিলাদের জন্য এই গাছের গুরুত্ব অনেক। কারণ এই সেই গাছ যা আপনাকে চির যুবতী করে রাখবে। হ্যাঁ, মহিলাদের উপর এই গাছের উপকারিতা অনেক। শারীরিক ব্যথা, যন্ত্রণা, দুঃখ দূর করতে পারে। প্রসঙ্গত অশোক শব্দের সংস্কৃত ভাষায় “দুঃখ নেই” বা “দুঃখ ছাড়া” হিসেবে অনুবাদ করা হয়েছে।

এই গাছের একাধিক ঔষধি গুণ রয়েছে ()। বলা বাহুল্য, গাছের শুকনো কান্ড, বাকর এবং ফুল নানা উপকারে লাগে। এছাড়াও এই গাছের বীজ, ফুল এবং ছাল বিভিন্ন চিকিৎসা ব্যবস্থায় ব্যবহার করা হয়।

অশোক গাছের উপকারিতা

১. স্ত্রীরোগ সংক্রান্ত সমস্যা : মহিলাদের মধ্যে স্ত্রীরোগ সংক্রান্ত সমস্যা এবং ঋতুস্রাবজনিত রোগের চিকিৎসার জন্য যুগ যুগ এই গাছের ব্যবহার চলে আসছে। ভেষজ এই উপাদানটি জরায়ুর পেশী এবং এন্ডোমেট্রিয়ামের জন্য টনিক হিসেবে কাজ করে, যা ঘা এবং পেটের যন্ত্রণা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।

এটি অনিয়মিত ঋতুস্রাব, ডিসমেনোরিয়া, লিউকোরিয়া, ফাব্রয়েডস, সিস্ট এবং অন্যান্য সম্পর্কিত অসুস্থতার লক্ষণগুলি নিরাময়ের জন্য এবং এড়াতে সাহায্য করে।

২. ত্বকের সৌন্দর্য : অশোক গাছের ভেষজ গুণ প্রাকৃতিকভাবে ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়াতে সাহায্য করে। এটি রক্ত পরিশোধন এবং ত্বকের আরও অ্যালার্জি প্রতিরোধে সাহায্য করে। এটি ত্বক থেকে ক্ষতিকারক টক্সিন বের করে এবং ত্বক পরিষ্কার রাখে। এই গাছ থেকে পাওয়া এক্সট্রাকশন পোড়ার এবং ত্বকের জ্বালা কমাতে সাহায্য করে।

৩. ব্যথা কমায় : অশোক গাছের মধ্যে ব্যথা উপশমকারী বৈশিষ্ট্য রয়েছে। নিরাপড বেদনানাশক হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। জয়েন্টে ব্যখা এবং দীর্ঘদিনের ব্যথা দূর করতে এই গাছের ছাল দারুণ উপকারী।

৪. অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ : ভেষজ এই উপাদানটি অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণের মতো সমস্যা চিকিৎসা করতে পারে। অশোক ফুলের এক্সট্রাক্ট হেমোরজিক ডিসেন্ট্রির চিকিৎসার জন্য ব্যবহৃত হয়। জলে সামান্য অশোক ফুলের গুঁড়ো মিশিয়ে খেলে এই সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে পারেন।

৫. ডায়াবেটিস : অশোক গাছের শুকনো ফুল ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য উপকারী। নিয়মিত টনিক ব্যবহারে উপকার পাবেন।

৬. রক্তযুক্ত অর্শ : যখন মলদ্বার থেকে তাজা রক্ত বেরোয় এবং প্রচন্ড যন্ত্রণা হয় শুকনো অশোক গাছের এক্সট্র্যাক্ট অনেক উপকার করতে পারে। এই ভোষজ উপাদানটি ছাল থেকে প্রস্তুত করে সেবন করা হয়।

৭. ইনফেকশন : ফাঙ্গাল এবং ব্যক্টেরিয়ার সংক্রমণ দূরে রাখতে গাছের ছাল খুব উপকারী। ছালে এমন বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা শরীরের শুদ্ধতা বজায় রাখে এবং সংক্রমণ দূরে থাকে।

৮. কৃমি : এটি খুব ভালো কৃমি ওষুধ। অশোক গাছের পাতা, ছাল সেবন করলে পেটে কৃমি পরিষ্কার হবে। তাছাড়া এটি কেবল ব্যথা থেকে মুক্তি দেয় না, ফোলাভাবও কমায়।

৯. ডায়রিয়া : অশোক গাছ কোনও রকম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়াই ডায়রিয়ার চিকিৎসা করে। অশোক গাছের পাতা, ফুল এবং ছাল টনিক হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন, উপকার পাবেন। রক্ত শুদ্ধ রাখতে এটি কার্যকরী।

১০. কিডনি স্টোন : অশোক গাছের বীজ কিডনিতে পাথর নিয়ন্ত্রণের অন্যতম প্রাকৃতিক পদ্ধতি। জলের সঙ্গে পাউডার মিশিয়ে খেলে পাথরের কারণে ব্যথা থেকে মুক্তি পাবেন।

নানা রোগ নিরাময়ে এই গাছটির ভূমিকা অতুলনীয়। তবে গর্ভবতী মহিলাদের জন্য অশোক গাছের এক্সট্র্যাক্ট নিরাপদ নয়।

অশোক গাছের পুষ্টিগত মান

অশোক গাছ থেকে নানান প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান পাওয়া যায়। এতে রয়েছে ট্যানিনস, গ্লাইকোসাইড, এসেনসিয়াল অয়েল এবং ক্যালসিয়াম। এছাড়াও এতে কার্বন এবং আয়রনের কার্বনিক যৌগ রয়েছে। গাছের বাকলে কেটোস্টেরল থাকে।

আশোক গাছের ব্যবহার

  • চামড়া কসখসে হয়ে গেলে অশোক বীজ বেটে হলুদের মতো করে মাখুন উপকার পাবেন। আপনি চাইলে অশোক ছালের ক্বাথ একটু ঘন করে গায়ে লাগিয়ে এক থেকে দেড় ঘণ্টা রেখে স্নান করে নিন।
  • যাঁদের শরীরে জ্বালা ভাব রয়েছে তারা অশোক গাছের ছাল ২০ থেকে ২৫ গ্রাম সামান্য জলে সিদ্ধ করে নিন। ঠান্ডা করে সেই ক্বাথ শরীরে লাগান। কিছুক্ষণ রাখার পর ধুয়ে ফেলুন। দেখবেন অনেকটা আরাম বোধ করবেন।
  • কোনও জায়গা কেটে গেলে অশোক ছালের মিহি গুড়ো সেখানে লাগিয়ে টিপে ধরে থাকুন। দেখবেন রক্ত পড়া বন্ধ হয়ে যাবে।
  • যারা অর্শের কষ্ট পাচ্ছেন তারা গরম জলে অশোকের ছাল সারারাত ভিজিয়ে রেখে সেবন করুন অর্শ নিয়ে রক্ত পড়া বন্ধ হয়ে যাবে।
  • অশোকের ছাল ক্ষত স্থানে বেঁটে লাগান দেখবেন আরাম পাবেনষ
  • বিষাক্ত পোকা কামড়ালে জ্বালা হতে পারে, তার থেকে মুক্তি রেতে অশোকের ছালের কাথ সেবন করুন।
  • হাড় সরে গেলে অশোকের ছালের গুড়ো দুধের সঙ্গে মিশিয়ে খেলে উপকার পাবেন।
  • অশোকের বীজ খেলে শ্বাস কষ্ট দূর করতে পারবেন।
  • কোষ্ঠকাঠিন্য কমাতো অশোক ধন্বত্বরী। অনিদ্রা দূর করতে এর জুড়ি মেলা ভার।

পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া

যদিও অশোক গাছের উপকারিতা অনেক, কিন্তু এর কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও রয়েছে –

  • যাদের অ্যামিনোরিয়া বা অনিয়মিত ঋতুস্রাবের সমস্যা রয়েছে তাদের জন্য এটি ক্ষতিকারক হতে পারে।
  • সরাসরি ব্যবহারে পেটে ব্যথা এবং হজমের সমস্যা হতে পারে।
  • গর্ভবতী মহিলাদের জন্য এটি নিরাপদ নয়। তাই গর্ভাবস্থায় এই সেবন না করাই ভালো।

কিছু গবেষণায় অসোকের ছাল ব্যবহার করার ফলে বিষাক্ত প্রভাবের কথা জানানো হয়েছে। তাই এই গাছের কোনও কিছু ব্যবহারের আগে অবশ্যই একবার ডাক্তারের পরামর্শ নিন।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী

কীভাবে অশোকের বাকল পাউডার ব্যবহার করবেন?

পেটে ব্যথা বা আঁচড় থেকে মুক্তি পেতে খাওয়ার পর দিনে দুবার চূর্ণ/গুঁড়ো বা ক্যাপসুল আকারে নেওয়া যেতে পারে। অশোকের ছালের রস বা ক্বাথ গ্রহণ করলে ত্বকের উন্নতি হতে পারে।

1 sources

Articles on StyleCraze are backed by verified information from peer-reviewed and academic research papers, reputed organizations, research institutions, and medical associations to ensure accuracy and relevance. Check out our editorial policy for further details.
Was this article helpful?
The following two tabs change content below.
scorecardresearch