অশ্বগন্ধার উপকারিতা ও অন্যান্য খুঁটিনাটি – All About Ashwagandha in Bengali

by

অশ্বগন্ধার ব্যবহার প্রায় ৬০০ খ্রিস্টাব্দ বা তার আগে থেকে শুরু হয়েছে। এটি হল একটি ভেষজ উদ্ভিদ। আজও আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে এর অবদান প্রচুর বলে জানা যায়। এটি মূলত স্ট্রেস, ক্লান্তি, নানা ধরণের ব্যথা ও প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে (1)।

অশ্বগন্ধার সব ধরণের গুণের কারণ হল এতে উপস্থিত একধরনের ফাইটোকেমিক্যাল উপাদান। শোনা যায় সঠিক পরিমাণে অশ্বগন্ধা ক্যান্সারের ক্ষেত্রেও নাকি কার্যকরী। আমাদের এই প্রতিবেদনে আপনাদের জানাবো অশ্বগন্ধা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য।

অশ্বগন্ধা কি ?

অশ্বগন্ধার বিজ্ঞানসম্মত নাম হল Withania somnifera ও এটি পাওয়া যায় ভারত, পাকিস্তান, স্পেন, আফ্রিকা, মধ্য প্রাচ্য এবং দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলিতে। প্রাচীনকাল থেকেই এই গাছের পাতা, ফল, বীজ ও শিকড় আয়ুর্বেদিক ঔষুধ তৈরী করার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয় (1),(2) ।

এখনও পর্যন্ত অশ্বগন্ধার নির্যাসে ৩৫ ধরণের ফাইটোকেমিক্যাল উপাদান আছে বলে জানা গেছে (2)।

All About Ashwagandha in Bengali

Shutterstock

অশ্বগন্ধায় কি কি ভেষজ উপাদান আছে ?

অশ্বগন্ধায় উপস্থিত থাকে অ্যালকালয়েড, স্ট্রেরয়ডাল ল্যাক্টনস, ট্যানিনস, স্যাপোনিনস এই সব উপাদান যা ক্যান্সার, স্ট্রেস, বার্ধক্যজনিত প্রভাব, যৌনক্ষমতা সংক্রান্ত ও প্রদাহ জনিত সমস্যার বিরুদ্ধে লড়তে সাহায্য করে (3), (4)।

এছাড়া উইথানন, উইথাফেরিন এ, ডি, ই , উইথাননোলাইড হল বায়োঅ্যাক্টিভ পর্দাথ যা অশ্বগন্ধায় থাকে।

অশ্বগন্ধার উপকারিতা

১. কোলেস্টেরল দূর করে

আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে বলা হয়, অশ্বগন্ধা শরীরের খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা কমিয়ে পেশির শক্তি বাড়াতে সাহায্য করে (5)।

২. অনিদ্রা দূর করে

অশ্বগন্ধা ক্লান্তি দূর করে স্নায়ুকে আরাম প্রদান করতে পারে, তা তো আগেই জানলেন। তাই ঘুমও আসে খুব তাড়াতাড়ি। বিভিন্ন গবেষণার থেকে জানা যায় যে, অশ্বগন্ধা ব্যবহার করলে মনোযোগ বৃদ্ধি পায়।

৩. স্ট্রেস কমায়

অশ্বগন্ধায় উপস্থিত অ্যানজাইলটিক উপাদান থাকে বলে এটি মানসিক চাপকে কমিয়ে ফেলতে উপযোগী অর্থাৎ এই স্নায়ুতন্ত্রের ওপর কাজ করতে সক্ষম (6) । আপনি যদি খুব ভয় পেয়ে যান কোনো কারণে তাহলে প্যানিক অ্যাট্যাক হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। তাই স্নায়ুর ওপর চাপ পড়ে, এই সমস্যা এড়াতে অশ্বগন্ধা সাহায্য করে (7) ।

৪. যৌনক্ষমতা বাড়ায়

প্রাচীনকাল থেকেই ছেলেদের যৌনসমস্যা দূর করতে অশ্বগন্ধা ব্যবহার করা হয়। এটি প্রমাণিত যে অশ্বগন্ধা শরীরে টেস্টোস্টেরন ও প্রোজেস্টেরনের পরিমান বাড়াতে পারে (8)। ফলে যৌন মিলনের ইচ্ছে বাড়ে। কিছু গবেষণা থেকে জানা যায় এটি কামশক্তি, বীর্যের পরিমান ও মান বৃদ্ধি করতে সক্ষম (9) (10)।

৫. ক্যান্সার প্রতিরোধ করতে

আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে অশ্বগন্ধা ক্যান্সারের প্রতিরোধক হিসেবে ব্যবহৃত হয় (11)। এর পাতা ও মূলের নির্যাসে উপস্থিত ফাইটোকেমিক্যালস টিউমার কোষকে ধ্বংস করতে ও সেই কোষে রক্ত সরবারহ বন্ধ করে দেয়।

কেমোথেরাপির মধ্যে দিয়ে যাদের যেতে হয়, তাদের জীবনের মানের উন্নতি ঘটাতে পারে অশ্বগন্ধা (11) ।

৬. ডায়াবেটিসের সমস্যা কমাতে

অশ্বগন্ধার মূল ও পাতার নির্যাস অ্যান্টি-ডায়াবেটিক উপাদান থাকে। এই অংশের কোষে যে ফ্ল্যাভোনয়েডস থাকে তা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষদের শরীরে ইনসুলিনের পরিমাণ বাড়াতে সাহায্য করে (12), (13) । এছাড়া ডায়াবেটিসে আক্রান্তদের শরীরে লিপিডের পরিমান ঠিক রাখতে সাহায্য করে বলে জানা যায় (12)।

৭. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়

অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট উপাদান থাকার জন্য অশ্বগন্ধা শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে (3)।

৮. থাইরয়েডের সমস্যা কমাতে

শরীরে থাইরক্সিন হরমোনের পরিমান বাড়ায় এই অশ্বগন্ধা (14) (15) । হাইপোথাইরয়েডের অর্থাৎ যাদের শরীরে থাইরয়েড হরমোনের পরিমান কম থাকে তাদের এই সমস্যা দূর করতে এটি ব্যবহৃত হয়।

৯. চোখের সমস্যা কমাতে

চোখের স্বাস্থ্য ভালো করতে অশ্বগন্ধা ব্যবহার করা হয় বলে জানা যায় (1) ।

১০. আর্থ্রাইটিস সারাতে

আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে আর্থ্রাইটিস সারাতে অশ্বগন্ধা ব্যবহৃত হয়। এর ব্যথার তীব্রতা কমাতে অশ্বগন্ধার গুঁড়ো (16), (17) খুবই উপযোগী।

১১. স্মৃতিশক্তি উন্নত করে

সাধারণ মানুষের স্মৃতিশক্তি ও যাদের অ্যালজাইমারস রোগ আছে, তাদের ক্ষেত্রেও অবস্থার উন্নতি করে এই অশ্বগন্ধা (18)।

১২. পেশী মজবুত করে

অশ্বগন্ধা পেশী মজবুত করতে উপযোগী যে তা প্রমাণিত (19)। এছাড়া ব্যায়াম করলে পেশিতে চাপের সৃষ্টি হয় তা কমাতেও এটি ব্যবহৃত হয়। পেশিতে কোনো আঘাত পেলে এটি তা সারাতে কাজে লাগে।

১৩. ইনফেকশন থেকে বাঁচায়

অশ্বগন্ধায় অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি উপাদান থাকার জন্য এটি নানা ধরণের ইনফেকশন থেকে বাঁচাতে সাহায্য করে।

১৪. হার্টের ক্ষেত্রে

শরীরে রক্ত চলাচল সঠিক রেখে হার্টকে স্বাস্থ্যকর করে তোলে অশ্বগন্ধা (3)।

১৫. শরীরের ওজন বৃদ্ধি করতে

অনেকে মনে করেন শরীরের ওজন বৃদ্ধি করতে অশ্বগন্ধার মূলের গুঁড়ো সাহায্য করে, কিন্তু এটি এখনও প্রমানিত নয়।

১৬. অবসাদ কমাতে

জানা যায় অশ্বগন্ধার নির্যাস অবসাদ ও মনের উদ্বেগ কমাতে উপযোগী কারণ এটি হল অ্যাড্যাপটোজেন (20)।

১৭. মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখতে

যেহেতু অশ্বগন্ধা একটি অ্যাড্যাপটোজেন, তাই এটি মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি করতে সক্ষম।

১৮. ত্বকের ইনফেকশন ঠিক করতে

অশ্বগন্ধার পাতায় অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল উপাদান থাকার জন্য ত্বকের ইনফেকশনকে কমাতে সাহায্য করে (21)।

১৯. বার্ধ্যকের ছাপ দূর করতে

আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে মনে করা হয় বার্ধ্যকের ছাপ পড়তে দেয় না অশ্বগন্ধা গাছের নির্যাস।

২০. ক্ষত সারাতে

অশ্বগন্ধায় অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি উপাদান থাকার জন্য শরীরের ক্ষত সারাতে পারে বলা হয় (22)।

২১. কর্টিসল লেভেল কমাতে

অ্যাডরিনালিন গ্ল্যান্ডের কোনো সমস্যা থাকলে রক্তে কর্টিসলের পরিমান কম বেশি হয়, এই সমস্যা থেকে মুক্ত হতে অশ্বগন্ধা সাহায্য করে (23)।

২২. চুলকে মজবুত করতে

আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে চুলকে ঝলমলে ও স্বাস্থ্যকর করে তুলতে অশ্বগন্ধা খুবই উপযোগী বলে মানা হয়।

২৩. খুশকি কমাতে

অশ্বগন্ধার গুঁড়ো দিয়ে তৈরী তেল খুশকি কমাতে অনবদ্য (24) । তাই বেশিরভাগ খুশকি কমানোর শ্যাম্পুতে অশ্বগন্ধা থাকে।

২৪. অকালে চুল পাকা আটকাতে

অকালে চুল পাকা আটকাতে আয়ুর্বেদ শাস্ত্র অনুযায়ী অশ্বগন্ধা গাছের নির্যাস খুবই উপকারী।

অশ্বগন্ধার পুষ্টিগত মান

প্রতি ১০০গ্রাম অশ্বগন্ধার গুঁড়ো বা পাউডারের পুষ্টিগত মান নিচে উল্লেখ করা হল (25)।

  • এনার্জি ২০০ কিলো ক্যালোরি
  • কার্বোহাইড্রেট ৭৫ গ্রাম
  • ফাইবার ৭৫ গ্রাম

কিভাবে অশ্বগন্ধা ব্যবহার করবেন ?

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অশ্বগন্ধার পাউডার তৈরী করে বা এই গাছের নির্যাস ব্যবহার করা হয়। এছাড়া নানা তেল ও শ্যাম্পু তৈরিতে এটি ব্যবহৃত হয়।

কিভাবে অশ্বগন্ধা কিনবেন ও রাখবেন ?

  • অশ্বগন্ধা গাছের বিভিন্ন অংশের নির্যাস দিয়ে নানা টনিক তৈরী হয়।
  • অশ্বগন্ধা যুক্ত নানা ধরণের ক্রিম কিনতে পারেন।
  • এটি থেকে তৈরী যে কোনো জিনিস রোদের আলোতে রাখবেন না।

অশ্বগন্ধার পাউডার কিভাবে বানাবেন ?

অশ্বগন্ধা গাছের মূল সংগ্রহ করে তা রোদে শুকিয়ে নিয়ে মিক্সার গ্রাইন্ডারে গুঁড়ো করে নিতে পারেন। দুধ, ঘি বা মধুর সাথে মিশিয়ে এই গুঁড়ো খাওয়া যায়।

অশ্বগন্ধা ব্যবহার করার সময় কি কি মনে রাখবেন?

কোনো জিনিসই বেশি খাওয়া বা ব্যবহার করা উচিত নয়, তাই নিচে এর ডোজের কথা উল্লেখ করা হল, অবশ্যই তা মাথায় রাখবেন।

অশ্বগন্ধার ডোজ

  • এর প্রকৃত ডোজ হল দিনে একবার এক থেকে দু চামচ অশ্বগন্ধার গুঁড়ো বা পাউডার দুধ, ঘি বা মধুর সাথে মিশিয়ে খেতে পারেন।
  • অশ্বগন্ধার পাতা দিয়ে তৈরী পেস্ট ক্ষততে লাগাতে পারেন।
  • এছাড়া এর নির্যাসের সঙ্গে অ্যালকোহল মিশিয়ে টিংচার তৈরী করা যায়, তবে এর ডোজ রোগীর বয়স ও লিঙ্গের ওপর নির্ভর করে।

তবে এটি ব্যবহার করা শুরু করার আগে অবশ্যই ডাক্তার বা ভেষজবিদের পরামর্শ নিয়ে নেবেন।

কোথায় থেকে কিনবেন অশ্বগন্ধা ?

দোকানে অশ্বগন্ধার গুঁড়ো বা পাউডার পাওয়া যায়। এছাড়া এটির নির্যাস মিশ্রিত অনেক ধরণের প্রসাধনীও পাওয়া যায়।

অশ্বগন্ধার ক্ষতিকারক দিক

চলুন এবার অশ্বগন্ধার পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে জানা যাক। এর তেমন কোনো পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া নেই বলেই জানা যায়। তবে নিয়িমিত অনেকদিন ধরে ব্যবহার করলে হয়তো শ্বাসপ্রশ্বাস সংক্রান্ত সমস্যা, ঝিমিয়ে পড়া, ব্লাড প্রেসার কমতে পারে ও অস্বাভাবিক হৃৎস্পন্দনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। গর্ভবতী মহিলারা এটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকবেন। ডাক্তারের সঙ্গে অবশ্যই পরামর্শ করে নেবেন এটি ব্যবহার করা শুরু করার আগে ।

অশ্বগন্ধার ভেষজ গুনাগুণ সম্পর্কে তো জানলেন, তাহলে বুঝতেই পারছেন এটি শরীরের পক্ষে কতটা স্বাস্থ্যকর। তাহলে এখন থেকে এটি নিশ্চয়ই ব্যবহার করা শুরু করবেন। নিজের যত্ন করুন ও সুস্থ থাকুন।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী :

প্রতিদিন কি অশ্বগন্ধার গুঁড়ো খাওয়া যেতে পারে ?

হ্যাঁ, অবশ্যই পরিমান মতো খেতে পারেন। তবে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে ভুলবেন না কিন্তু।

অশ্বগন্ধা কি কোনো ভাবে খাবার খাওয়ার আগে বা পড়ে খাওয়া যায় ?

না, খাওয়াই ভালো।

খালিপেটে কি অশ্বগন্ধার নির্যাস খাওয়া যায় ?

খালিপেটে অশ্বগন্ধার নির্যাস না খাওয়াই উচিত।

অশ্বগন্ধার নির্যাস কতদিন ব্যবহার করলে এর ফলাফল পাওয়া যায় ?

কমপক্ষে দুই সপ্তাহ ব্যবহার করলে এর ফলাফল পেতে পারেন।

অশ্বগন্ধা কি দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার করা উচিত?

না, দীর্ঘদিন ধরে অশ্বগন্ধা ব্যবহার বা খাওয়া করা উচিত নয়।

 অশ্বগন্ধার তেল কিভাবে ব্যবহার করবেন ?

আর্থ্রাইটিসের ব্যথা কমাতে এই তেল মালিশ করা যায়।

বাচ্চাদের জন্য এটি কি সুরক্ষিত ?

না, বাচ্চাদের জন্য এটি সুরক্ষিত নয়।

কত পরিমান অশ্বগন্ধার পাউডার ব্যবহার করা উচিত ?

এক থেকে দুই চামচ অশ্বগন্ধার পাউডার ব্যবহার করা উচিত।

যেকোনো ধরণের অপারেশনের আগে কি অশ্বগন্ধার নির্যাস খাওয়া যেতে পারে ?

না খাওয়াই ভালো।

24 sources

Stylecraze has strict sourcing guidelines and relies on peer-reviewed studies, academic research institutions, and medical associations. We avoid using tertiary references. You can learn more about how we ensure our content is accurate and current by reading our editorial policy.
Was this article helpful?
scorecardresearch