বেদানার উপকারিতা, ব্য়বহার এবং ক্ষতিকারক দিক – Pomegranate Benefits, Uses and Side Effects

by

ফল, প্রকৃতির এমন এক উপহার যা আমাদের শরীর, স্বাস্থ্য়, ত্বক, মন সব ভালো রাখতে সাহায্য় করে ৷ অনেকেই তাই নিজেদের প্রতিদিনের খাবারের তালিকায় ফল বা ফলের রস রাখেনই এবং রাখাও উচিত ৷ বিভিন্ন ফলের বিভিন্ন গুণাগুণ আজকে আমাদের আলোচ্য় বিষয়ে জায়গা করে নিয়েছে। Pomegranate বা বেদানা  এর গুণাগুণ সম্পর্কে জেনে নেওয়ার আগে এই ফলটি সম্পর্কে একটু জেনে নেওয়া যাক ৷

বেদানাকে আনার বা ডালিম-ও বলেন অনেকে৷ এর বৈজ্ঞানিক নাম Punica Granatum. ইংরেজিতে একে বলা হয় Pomegranate, যদিও নার, হিনার, দারিম বিভিন্ন ভাষায় বিভিন্ন নামে এটি পরিচিত এটি ৷ বেদানা Punica গণের অন্তর্ভুক্ত একটি গাছ  (1)

ইরান, ভারত, মধ্য়প্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ যেমন তুরস্ক, স্পেন, মরক্কো, মিশর, টিউনিসিয়া মূলত এই দেশগুলিতে বহুল পরিমাণে চাষ হয় বেদানা ৷ এই ফলের গাছটি প্রায় ৩০ ফুট পর্যন্ত দীর্ঘ হয় (1) এতে উজ্জ্বল লাল, কমলা বা গোলাপি রঙের ফুল হয় এবং ফলটি প্রায় ষড়ভুজাকৃতির (আপাত দৃষ্টিতে প্রায় গোল) বলা যায় ৷ এর পুরু খোসা ছাড়িয়ে ভিতরের উজ্জ্বল চকচকে লাল দানাগুলি বের করে নিয়ে তা এমনিই খাওয়া যায়, আবার অনেকে বেদানার রস তৈরি করেও খেয়ে থাকেন ৷

বেদানার রস বা জুসে কী কী উপাদান থাকে দেখে নিন একনজরে- ফ্রুকটোড, সুক্রোজ, গ্লুকোজ থাকে৷ সেই সঙ্গে থাকে কিছু সাধারণ অরগ্য়ানিক অ্য়াসিড, যেমন, অ্য়াসকরবিক, ক্রিটিক, ফিউম্য়ারিক এবং ম্য়ালিক অ্য়াসিড৷ এছাড়া কম পরিমাণে সব ধরণের অ্য়ামিনো অ্য়াসিড, যেমন, প্রোলিন, মিথিওনাইন এবং ভ্য়ালিন থাকে (1)

বেদানার উপকারিতা- Benefits of Pomegranate

বেদানার উপকারিতা নিয়ে অনেক অনেক কথাই বলেন ৷ তবে সঠিকভাবে জেনে নেওয়া দরকার ঠিক কতটা উপকারী এইফল ৷ এই ফলে থাকা উপাদান থেকে কিছুটা অনুধাবন করতেই পারছেন যে বেদানা আমাদের শরীরের জন্য কতটা প্রয়োজনীয়৷ শরীরের অভ্য়ন্তরীণ ক্ষেত্রে থেকে শুরু করে বাহ্য়িক, চুল, ত্বক সব কিছুতেই পৃথক পৃথক ভূমিকা পালন করে বেদানা৷ তাই প্রতিদিন খাবারের তালিকায় একটি করে বেদানা রাখা উচিত৷

খাবার পাশাপাশি আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা এবং ইউনানি চিকিৎসাতেও এই ফল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে ৷ শুধু ফলই নয়, এই ফলের খোসা থেকে শুরু করে গাছের শিকড়, ছাল, এর ফুল, এর তেল সবকিছুই বিভিন্ন রোগ নিরাময়ে সাহায্য় করে থাকে ৷ বিশেষ করে ক্য়ানসারের মতো রোগ প্রতিরোধে বেদানা অত্য়ন্ত প্রয়োজনীয় একটি ফল (2) ৷ এছাড়া হৃদযন্ত্রের কর্মক্ষমতা ঠিক রাখতে, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, রক্তচাপে ভারসাম্য় ধরে রাখতে, রক্তাল্পতা থেকে শুরু করে কিডনি, ওজন, হজমক্ষমতা, ত্বকের যত্ন, প্রতিটি ক্ষেত্রেই বেদানা গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে ৷ এবার বিস্তারিতভাবে দেখে নেওয়া যাক এই ফল কোন কোন সমস্য়া নিরাময়ে সাহায্য় করে ৷ বেদানার উপকারিতা যে কতটা তা এক দুটো অনুচ্ছেদে বলা সম্ভব নয়, রইল বিস্তারিত ৷

স্বাস্থ্য়ের জন্য় বেদানার উপকারিতা- Health Benefits of Pomegranate

স্বাস্থ্য়ের উপকারিতায় বেদানার অবদান অনস্বীকার্য ৷ সকালে প্রাতরাশের সঙ্গে হোক বা দুপুরে খাওয়ার পরে অথবা ফ্রুট স্য়ালাড, যে কোনও একটি ক্ষেত্রে একটা গোটা বেদানা যদি খান তাহলে তা আপনার স্বাস্থ্যের জন্য় খুবই উপকারী ৷ কিন্তু কোন কোন ক্ষেত্রে খেয়াল রাখে এবং রোগ প্রতিরোধে সাহায্য় করে এই বেদানা, দেখে নেব এক এক করে ৷

  • হৃদযন্ত্রের সুরক্ষা হৃদযন্ত্র বা হার্ট, শরীরের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ একটি ইঞ্জিন যা সমগ্র শরীরের মধ্য়মণি, তাই এর যত্ন নিতেই হয়৷ এই হৃদযন্ত্রে পান থেকে চুন খসলেই দিতে হতে পারে বড় খেসারত৷ আশঙ্কা থাকে প্রাণহানিরও ৷ তাই এর কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি করতে এবং একে সচল রাখতে প্রয়োজন বাড়তি যত্ন ৷ আর এই যত্ন নেওয়ার ক্ষেত্রে বেদানাও কিন্তু অন্য়তম একটি হাতিয়ার হতে পারে৷ একেবারে প্রাকৃতিক একটি উপাদান যা আপনার হার্টকে রাখবে সচল, সজীব ৷

কেন এবং কীভাবে?

এই প্রশ্নের উত্তরে বলা যায়, বেদানাতে থাকে ৮৫ শতাংশ জল, ১০ শতাংশ চিনি এবং সেই সঙ্গে থাকে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি এবং বিভিন্ন ধরণের পলিফেনলস, ট্য়ানিস ৷ আর এর বীজে থাকে ফাইবার, স্টেরয়েড ইস্ট্রোজেন, ইস্ট্রোন এবং আইজোফ্লেবনস ৷ সেই সঙ্গে এমন এক ধরণের মৌলিক তেল থাকে যার মধ্য়ে রয়েছে ফ্য়াটি অ্য়াসিড এবং পিউনিসিক অ্য়াসিড (3)

বেদানার মধ্য়ে থাকা অ্য়ান্টি অক্সিডেন্ট এবং অ্য়ান্টি ইনফ্লেমেটারি উপাদানই হার্টকে সুরক্ষা প্রদান করে ৷ বেদানার রসে থাকা অ্য়ান্টি প্লেটলেট অ্য়াকশন ধমনীতে রক্ত জমাট বাঁধাকে প্রতিহত করে ৷ বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষায় দেখা গিয়েছে, বেদানা কার্ডিওভ্য়াসকুলার রোগে খুবই কার্যকরী ৷ বেদানার রস এলডিএল (খারাপ) কোলেস্টেরলকে দমন করে (3)

ধমনী সংক্রান্ত সমস্যা থেকে হাইপারটেনশনে চিকিৎসাবিজ্ঞানে বহুদিন ধরেই বেদানার মধ্য়ে থাকা উপাদানের ব্য়বহার হয়ে চলেছে ৷ আর্টারিয়াল হাইপারটেনশন, কার্ডিওভাসকুলার রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে ৷ বিজ্ঞানীদের মতে, বেদানার রস এই সমস্য়ার সঙ্গে লড়াই করতে খুবই কাজে আসে (4) ৷ এছাড়া বেদানা ফলের নির্যাস কার্ডিওক্সিটি-এর বিরুদ্ধে লড়তেও হৃদযন্ত্রকে সাহায্য় করে (5)

  • মধুমেহ রোগে বেদানা মধুমেহ বা ডায়াবেটিস, কম বয় থেকে বেশি বয়স, অনেকেই এই সমস্যায় ভোগেন৷ তাদের ডায়েট চার্টে তাই বেশ কড়াকড়ি থাকে ৷ কী খাবেন, কী খাবেন না তা নিয়ে চিন্তার শেষ নেই ৷ আর এক্ষেত্রে বেদানা কতটা উপকারী ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য় সে প্রশ্ন চলেই আসে৷ সাধারণত, যে সব ফল এইসব রোগীদের খেতে বলা হয় তার মধ্য়ে বেদানা অন্য়তম ৷ তবে পরীক্ষা বা চিকিৎসার ক্ষেত্রে বেদানা নিয়ে কী মত তা দেখে নেওয়া যাক ৷

ডায়াবেটিস বা মধুমেহ রোগে বেদানার ব্য়বহার কেন এবং কীভাবে?

গবেষণা থেকে জানা যায়, মধুমেহর সমস্যায় বেদানার রস কোষে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস এবং লিপিড পেরোক্সিডেশন হ্রাস করতে সাহায্য় করে৷ যদিও বেদানা বা এই ফলের রস ডায়াবেটিক রোগীদের চিকিৎসায় ব্য়বহারের আগে আরও পরীক্ষা নিরীক্ষা প্রয়োজন বলে মনে করা হচ্ছে (6)

বেদানার মধ্য়ে থাকা কিছু অরগ্য়ানিক উপাদান অ্যান্টি ডায়াবেটিক বলে মনে করা হচ্ছে৷ এতে রয়েছে, গ্য়ালিক, আরসোলিক এবং ওলিনোলিক অ্য়াসিড (7)

  • ক্য়ানসার প্রতিহত করতে যেসব রোগের বিরুদ্ধে লড়তে বেদানার কার্যকারিতা অনস্বীকার্য তার মধ্যে একটি হল ক্য়ানসার ৷ আর এক্ষেত্রে প্রোস্টেট, কোলন এবং স্তন ক্য়ানসারে বেদানার খুবই প্রয়োজনীয় একটি ফল ৷

প্রোস্টেট ক্য়ানসার পশু এবং মানুষ উভয়ের ওপর পরীক্ষা করেই দেখা গিয়েছে প্রোস্টেট ক্য়ানসারের বিরুদ্ধে লড়তে সাহায্য় করে (8) ৷ দেখা গিয়েছে, এই ফলের নির্যাস, প্রস্টেট ক্য়ানসারের বিরুদ্ধে কেমোথেরাপিউটিক এবং কেমোপ্রিভেনটিভে প্রভাব ফেলতে পারে (9)

সাম্প্রতিককালে বিজ্ঞানীরা এও জানিয়েছেন যে, বেদানার রসে ইলেজিক অ্য়াসিড, লুটিওলিন, পিউনিসিক অ্য়াসিড বিদ্য়মান যা প্রোস্টেট ক্য়ানসারকে প্রতিহত করতে সাহায্য় করে (10) ৷  এর অর্থ প্রোস্টেট ক্য়ানসারের সমস্য়ায় যারা ভুগছেন সেই সব রোগীদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনাকে আরও ত্বরান্বিত করে বেদানা (11)

কোলন ক্য়ানসারএই ক্য়ানসারের সঙ্গে লড়তেও বেদানা সাহায্য় করে৷ বেদানায় থাকা ট্য়ানিস, ইলেজিক অ্য়াসিড, এবং পিউনিক্য়ালাজিনে অ্য়ান্টিপ্রোলিফেরাটিভ উপাদান কোলন সেল-এর ওপর প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম (12)

গবেষণায় দেখা গিয়েছে, বেদানার রসে থাকা ইল্য়াজিট্য়ানিস কোলন ক্য়ানসারের সঙ্গে লড়তে সাহায্য় করে (13)

স্তন ক্য়ানসার প্রতিদিন বেদানার রস খেলে তা স্তন ক্য়ানসারের ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে দেয় ৷ পরীক্ষা থেকে জানা গিয়েছে, বেদানার রসে থাকা ইলেজিট্য়ানিস ইস্ট্রোজেনের উৎপত্তিকে হ্রাস করতে পারে, আর এভাবেই স্তন ক্য়ানসারের সম্ভাবনাও কমতে পারে (14)

এছাড়া, বেদানার রসে থাকা অ্য়ান্টিপ্রোলিফেরেটিভ উপাদানও স্তনকে রক্ষা করে ক্য়ানসারের হাত থেকে (15)

এর পাশাপাশি, ফুসফুসকে ক্য়ানসারের থাবা থেকে রক্ষা করতে বেদানা অপরিহার্য (16)

  • হজমশক্তি বাড়াতেবেদানার মধ্য়ে থাকা ভিটামিন বি কমপ্লেক্স হজমশক্তি বৃদ্ধিতে সাহায্য় করে ৷ এই ভিটামিন শরীরের ফ্য়াট, প্রোটিন, এবং কার্বোহাইড্রেটকে এনার্জি-তে রুপান্তরিত করে ৷ বেদানার বীজে অ্য়ান্টি ইনফ্লেমেটারি উপাদান থাকে যা আলসারেটিভ কোলাইটিসের মতো বিভিন্ন গ্য়াস্ট্রোইনটেসটাইনাল সমস্য়ার সমাধানে কাজে করে ৷ তবে মাথায় রাখতে হবে এটি একটি অ্য়াসিডিক তাই অনেক ক্ষেত্রে অ্য়াসিড রিফ্লাক্স, অথবা পেটে বা মুখে আলসারের কারণ হয়ে দেখা দিতে পারে ৷ তাই এই ধরণের কোনও সমস্য়ার সম্মুখীন হলে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে (17)
  • রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে বেদানাতে থাকা শক্তিশালী অ্য়ান্টিঅক্সিড্য়ান্ট রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে তোলে ৷ মানুষের শারীরিক অসুস্থতায় যে সব ভাইরাস এবং ব্য়াকটিরিয়া কাজ করে তাদের প্রতিহত করতে বেদানা কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে তা বিভিন্ন পরীক্ষায় দেখা গিয়েছে (18) ৷ এই ফলে থাকা ভিটামিন সি প্রচুর পরিমাণে অ্য়ান্টিবডি দেহে তৈরি করে যার ফলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়, এছাড়া, এর অ্য়ান্টি ইনফ্লেমেটারি উপাদান রিউম্য়াটয়েড এবং অস্টেরো আর্থ্রাইটিস-এর সঙ্গে লড়তে সাহায্য় করে ৷
  • গর্ভাবস্থায় প্রেগন্য়ান্ট বা অন্তঃস্বত্তা মহিলাদের জন্য় বেদানার রস অত্য়ন্ত প্রয়োজনীয় ৷ এতে অনেক ধরণের শারীরিক জটিলতা এড়ানো সম্ভব ৷ বেদানার রস হিউম্য়ান প্লাজেন্টা-তে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস কমাতে সাহায্য় করে (19) ৷  প্রসঙ্গত, গর্ভপাত নিরাময়েও বেদানার প্রয়োজন ৷ এই গাছের পাতা বেটে তাতে মধু, দই একসঙ্গে মিশিয়ে খেলে গর্ভপাতের আশঙ্কা দূর হয় বলে মনে করা হয় ৷ এছাড়া প্রতিনিয়ত বেদানার রস খেলে মানসিক চাপ থেকে কর্টিসোল হ্রাস পায়, যা পুরুষ এবং মহিলা উভয়ের যৌনজীবনকেও স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য় করে (20)
  • ঋতুস্রাব স্বাভাবিক রাখতে ঋতুস্রাবের সময় অনেক মহিলাই বিভিন্ন ধরণের সমস্য়ায় ভোগেন ৷ বিশেষ করে অনিয়মিত বা অনিয়ন্ত্রিত মাসিক বা পিরিয়ডস বা ঋতুস্রাব ৷ সেই সঙ্গে থাকে দূষিত রক্ত জমাট বেঁধে পেটে প্রবল যন্ত্রণার সৃষ্টি ৷ বেদানার মধ্যে থাকা বিভিন্ন উপাদান এই সব সমস্য়ার সঙ্গে লড়াই করে ৷ শুধু তাই নয়, মহিলাদের শরীর এই সময় কিছুটা দুর্বল থাকে, বেদানার রস নিয়মিত খেলে শরীরে শক্তি বৃদ্ধি পায়৷ এছাড়া, এই ফেলর রস হিউম্য়ান প্লাজেন্টা-তে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস কমাতেও সাহায্য় করে (19)
  • প্রদাহজনক সমস্য়ার সঙ্গে লড়তেএই সমস্য়ায় অনেকেই ভোগেন৷ যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অন্য়ান্য় আরও রোগকে আমন্ত্রণ জানায় ৷ যেমন হার্টের রোগ, টাইপ টু ডায়াবেটিস, অ্য়ালঝাইমার্স, ক্য়ানসার এমনকি ওবেসিটি পর্যন্ত ৷ তাই শুরু থেকেই একে প্রতিহত করতে প্রয়োজন বেদানার ৷ কারণ বেদানায় রয়েছে প্রচুর পরিমাণে অ্য়ান্টি ইনফ্লেমেটারি উপাদান (3), তাই প্রাকৃতিক উপায়েই লড়াই করা সম্ভব এই রোগের সঙ্গে ৷
  • ওজন হ্রাস শরীরের বাড়তি মেদ ঝরাতে বা ওজন কমাতে বেদানার জুড়ি মেলা যে ভার, একথা প্রায় সর্বজনবিদিত৷ গবেষণায় দেখা গিয়েছে শুধু বেদানা নয়, এই গাছের পাতার রসও ওজন হ্রাস করতে সক্ষম ৷ কোনও কৃত্রিম বা ওষুধ খেয়ে নয়, একেবারে প্রাকৃতিক, সহজ, সরলভাবে যারা ওজন কমাতে চান, তাদের ডায়েট চার্টে বেদানা রাখা খুবই প্রয়োজন (21)৷  তবে এই বিষয়ে আরও পরীক্ষা নিরীক্ষা চলছে ৷
  • হাড়ের শক্তিবৃদ্ধি বয়সের সঙ্গে সঙ্গে হাড়ের জোর কমতে থাকে৷ তাই বয়স্কদের, বা শিশুদের হাড় শক্ত করতে অথবা যারা হাড়ের কোনও সমস্য়ায় ভুগছেন তাদের জন্য় বেদানা অপরিহার্য ৷ বেদানা ইনফ্লেমেশন এবং অক্সিডেটিভ স্ট্রেস কমায় (22)৷  হাড় অতিরিক্ত মাত্রায় দুর্বল হয়ে গেলে অস্টিওআর্থ্রাইটিসের সমস্য়া দেখা দিতে পারে ৷ বেদানা হাড়কে মজবুত করে এই ধরণের সমস্য়াকে দূরে রাখে (23)
  • কিডনিতে পাথর হওয়া প্রতিহত করতে বেদানা কিডনিতে পাথর, এই সমস্য়া সম্পর্কে কম-বেশি অনেকেই অবগত৷ এর ফলে স্বাভাবিক জীবনযাপন কতটা ব্য়হত হতে পারে তাও অজানা নয় কারও ৷ বহু গবেষণা, কিডনিতে পাথর সৃষ্টির জন্য় অক্সিডেটিভ স্ট্রেস-কে দায়ী করে ৷ বেদানার রস এই অক্সিডেটিভ স্ট্রেস কমাতে সাহায্য় করে (24) ৷ একটি সমীক্ষায় বলা হয়েছে, বেদানার রস ক্য়ালসিয়াম অক্সালেটের অতিপৃক্তি বা সুপারস্য়াচুরেশন হ্রাস করে (25)
  • ফ্য়াটি লিভার হলে এই ফ্য়াটি লিভার দু ধরণের হতে পারে, একটি অতিরিক্ত মদ্য়পানের কারণে, যাকে বলা হয় অ্য়ালকোহলিক ফ্য়াটি লিভার ডিজিজ, এবং অন্য়টি অ্য়ালকোহল ছাড়াই হতে পারে, যাকে বলে নন-অ্য়ালকোহলিক ফ্য়াটি লিভার ডিজিজ৷ ভারতে এই দ্বিতীয় প্রকারের সমস্য়াই বেশি দেখা যায়৷ এই ফ্য়াটি লিভারের পিছনে অতিরিক্ত মাত্রায় শর্করাকেও দায়ী করা হয়৷

এক্ষেত্রে বেদানা কেন প্রয়োজনীয় এবং কীভাবে কাজ করে এই ফল?

শরীরের দ্বিতীয় বৃহত্তম অঙ্গ হল লিভার ৷ রক্তের পরিশ্রুতকরণ, রক্তে গ্লুকোজের স্বাভাবিক ঘনত্ব বজায় রাখা থেকে শুরু করে আয়রন, গ্লাইকোজেন সঞ্চয়, পিত্তরস নিঃসরণে সাহায্য় করে লিভার ৷ এমনই বহু গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে লিভার৷ কিন্তু উপরোক্ত বিভিন্ন কারণে অথবা ওবেসিটি, রক্তে অতিরিক্ত পরিমাণে শর্করার উপস্থিতি এমনই বিভিন্ন কারণে ফ্য়াটি লিভারের সমস্য়া হতে পারে ৷ বেদানা বা বেদানা পাতার রসে এইসব সমস্য়া প্রতিহত করা যেতে পারে ৷

এর জন্য় প্রতিদিন ডায়েট চার্টে রাখতে হবে বেদানা ৷ বলা যায়, অক্সিডেটিভ স্ট্রেস এবং ইনফ্লেমশন কমানোর ক্ষেত্রে বেদানা সাহায্য় করে যা ফ্যাটি লিভার সমস্যার সঙ্গে যুঝতে শক্তিপ্রদান করে ৷ নিয়ম করে বেদানার রস খেলে তা নন- অ্য়ালকোহলিক ফ্য়াটি লিভার-এর সমস্য়াকে দূরে রাখে (26)

ত্বকের জন্য় বেদানার উপকারিতা- Skin Benefits of Pomegranate

শরীরের পাশাপাশি আপনার ত্বকের জন্য়ও বেদানার উপকারিতা অনেক ৷ যেমন-

  • ত্বকের ঔজ্জ্বল্য় ধরে রাখা এবং বলিরেখা প্রতিহত করা- বেদানাতে পলিফেলন নামক অ্য়ান্টি অক্সিডেন্ট বর্তমান, যা ফ্রি-ব়্য়াডিকেলের হাত থেকে ত্বকের ক্ষতি হওয়াকে আটকায়৷ নিয়মিত বেদানা খেলে এই কার্যকারিতা অক্ষুণ্ণ থাকে এবং ত্বকে যেমন বার্ধক্য়ের ছাপ পড়ে না, তেমনই ত্বকের ঔজ্জ্বল্য়ও বজায় থাকে (27)
  • ত্বককে ক্য়ানসারের থাবা থেকে বাঁচায়- স্কিন ক্য়ানসার, অন্য়তম একটি ভয়াবহ বিষয় ৷ এক্ষেত্রেও বেদানার রস গুরুত্বপূর্ণ কারণ বেদানার রসে থাকা উপাদান ত্বককে সুরক্ষা প্রদান করে ৷

কীভাবে?

বেদানায় রয়েছে প্রচুর পরিমাণে অ্য়ান্টি অক্সিডেন্ট উপাদান যা ত্বকের জন্য় খুবই প্রয়োজনীয় ৷ বেদানা স্কিন সেল-গুলিকে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস থেকে রক্ষা করে (27) ৷ সূর্যকিরণের ইউবিভি রেডিয়েশন ত্বকের বিভিন্ন সমস্য়ার সৃষ্টি করে, এবং সেই সঙ্গে এটি স্কিন ক্য়ানসারের অন্য়তম কারণ (28) ৷   প্রতিনিয়ত বেদানার রস খেলে তা ত্বকের রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে বাইরে এবং ভিতর থেকে ৷ ডার্ক সার্কেল থেকে ত্বকের কালো ছোপও দূর হয় ৷ কিছু গবেষণায় এও বলা হয়েছে বেদানার বীজে থাকা তেল এপিডারমিসের পুনর্গঠনের মধ্য় দিয়ে ত্বকের মেরামতের কাজ করে(29) ৷  এক কথায় ত্বকের জন্য় বেদানার উপকারিতা অনস্বীকার্য ৷

চুলের জন্য় বেদানার উপকারিতা- Hair Benefits of Pomegranate

স্বাস্থ্য় এবং ত্বকে বেদানার উপকারিতার বিষয়ে তো জানলেন এবার একটু নজর দিন চুলে ৷ কারণ, চুল পড়ে যাওয়া বা চুলে স্বাস্থ্য় খারাপ, এ যেন বর্তমানে একটি অন্য়তম সমস্য়া হয়ে দাঁড়িয়েছে ৷ বাইরের দূষণ, সেই সঙ্গে ব্য়স্ত জীবনযাত্রা, খাবারের অনিয়ম, এবং চুলের যত্ন না নেওয়ায় চুল প্রায় যায় যায় অবস্থা ৷

বেদানার বীজে থাকা পিউনিসিক অ্য়াসিড চুলের গোড়া শক্ত করতে, রক্ত চলাচলে সাহায্য় করে ৷ পমিগ্রেনেট অয়েল চুলের স্বাস্থ্য় ভালো করে, তাই এই তেল দিয়ে মাসাজ করলে উপকার পাওয়া যায়৷ বেদানার ইলেজিক অ্য়াসিডও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে (10)

অনেকে বেদানার দানা, পাতা এবং খোসা একসঙ্গে বেটে তা সরষের তেলে হালকা গরম করে তা ছেঁকে নেয় ৷ তারপর সপ্তাহে দুই থেকে তিনবার সেই তেল মাথায় লাগায়, যা চুল ঝরা কমাতে সাহায্য় করে ৷ সেই সঙ্গে চুল পরিপুষ্টও হয়৷ তাই বেদানার খোসা বা পাতা ফেলে না দিয়ে তুলে রাখুন, আপনার চুলের যত্নে বেদানার এই টোটকাই কাজে আসবে ৷

বেদানার পুষ্টিগত মান- Pomegranate Nutritional Value

বেদানার টাটকা রস বা জুসে থাকে প্রচুর পরিমাণে প্রয়োজনীয় উপাদান, যা আপনার স্বাস্থ্য়ের জন্য় খুবই প্রয়োজনীয় ৷ এতে থাকে প্রচুর ভিটামিন, মিনারেলস, প্রয়োজনীয় ফাইবার, ফ্য়াটি অ্য়াসিড এবং জিরো কোলেস্টেরল৷ ক্য়ালোরি থাকে অত্য়ন্ত কম পরিমাণে ৷

ইউএসডিএ অনুযায়ী, প্রতি ১০০ গ্রাম টাটকা বেদানার রসে নিম্নোক্ত উপাদানগুলি থাকে (30)

  • এনার্জি- ৫৪ কিলোক্য়ালোরি
  • প্রোটিন- ০.১৫ গ্রাম
  • কার্বোহাইড্রেট- ১৩.১৩ গ্রাম
  • ডায়েটারি ফাইবার- ০.১ গ্রাম
  • সুগার- ১২.৬৫ গ্রাম

এছাড়া বেদানার জুসে থাকে ভিটামিন এ, থিয়ামিন, নিয়াসিন, ফোলেট, রাইবোফ্লেভিন, পটাশিয়াম, ম্য়াগনেসিয়াম, জিঙ্ক, ক্য়ালসিয়াম৷ পাশাপাশি থাকে বিভিন্ন ধরণের অ্য়াসিড, যেমন- অ্য়াসকরবিক অ্য়াসিড, ক্রিটিক অ্য়াসিড, ম্য়ালিক অ্য়াসিড এবং ফিউমারিক অ্য়াসিড৷ এছাড়া কিছু অ্য়ামাইনো অ্য়াসিড যেমন, মিথিওনাইন, প্রোলাইন এবং ভেলাইন-ও বিদ্য়মান থাকে এতে ৷

বেদানার ব্য়বহার- How to Use Pomegranate

বেদানার উপকারিতার কথা তো জানলেন কিন্তু বেদানার ব্য়বহার সম্পর্কেও একটু সচেতন থাকা প্রয়োজন ৷ কীভাবে এবং কখন খেতে হয় জানেন? চলুন এবার সেই সব বিষগুলিতে চোখ রাখা যাক ৷ এই ফলের দানা সরাসরিও খেতে পারেন আবার তার রস বা জুস করেও খেতে পারেন ৷ বিভিন্ন ভাবেই বেদানা ব্য়বহার করা যেতে পারে ৷ ফল খাওয়ার অভ্য়াস ভালো, তবে সঠিক সময়ে এবং সঠিক পরিমাণে তা খেতে হবে ৷

বেদানার ব্য়বহার-এর ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞদের মতে, খাওয়ার পরে সঙ্গে সঙ্গেই ফল না খেলেই ভালো৷ মূল খাবার খাওয়া আধ ঘন্টার ব্য়বধানে ফল খেতে পারেন ৷ তবে আঙুর, কমলালেবুর মতো সাইট্রাস জাতীয় ফলের ক্ষেত্রে বলা হয়৷ অন্য়দিকে কলা, আপেলের মতো বেদানা খালি পেটে খেলে তা শরীরের অভ্য়ন্তরীণ কার্যক্রমে সহায়তা করে ৷ তবে রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে ফল না খাওয়ারই পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা ৷

বেদানা ছাড়িয়ে খেতে যারা পছন্দ করেন না বা শিশুদের জন্য় বেদানার রস করে খাওয়ানো যেতে পারে ৷ তবে এই জুস তৈরি করে নেওয়ার আগে দেখে নেবেন বেদানাটি টাটকা এবং ভালো কিনা ৷

  • প্রথমে কয়েকটি টাটকা বেদানা নিন ৷
  • এবার সেগুলি ভালো করে ধুয়ে নিন ৷
  • বেদানার খোসা ছাড়িয়ে দানাগুলি একটি পাত্রে রাখুন ৷
  • এবার সেগুলি ব্লেন্ডারে দিয়ে ভালো করে ব্লেন্ড করে নিন ৷
  • প্রয়োজন মনে করলে এই রস ছেঁকে নিন একটি ছাঁকনি দিয়ে ৷
  • সেটি তখনই খেতে পারেন অথবা একটু ঠান্ডা করেও খেতে পারেন ৷

এছাড়াও অন্য়ভাবে বেদানা ব্য়বহার করতে পারেন, যেমন, ফ্রুট স্য়ালাডে দিয়েও খেতে পারেন ৷ প্রতিদিন নিয়ম করে বেদানা বা বেদানার রস খান ৷ এই উপায়ে বেদানার উপাদান খুব সহজ এবং স্বাভাবিকভাবে শরীরে প্রবেশ করতে পারে ৷

বেদানার ক্ষতিকারক দিক- Side Effects of Pomegranate

সঠিক নিয়ম এবং পরিমাণ মেনে বেদানার রস খেলে তা শরীরের কর্মক্ষমতা বৃদ্ধিতে কাজে আসে ৷ তবে বেদানার ক্ষতিকারক দিক বা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও রয়েছে ৷ তাই সে সব দিকে অবশ্য়ই নজর দিতে হবে ৷ চলুন এবার চোখ রাখা যাক সেই বিষয়গুলিতে-

  • বেদানার রস রক্তচাপের মাত্রা কমিয়ে ফেলতে পারে ৷ তাই অতিরিক্ত বেদানার রস না খাওয়াই ভালো (31)
  • বেদানার ক্ষতিকারক দিক বলতে এই পয়েন্টেও নজর রাখতে হবে ৷ সে প্রচুর পরিমাণে পটাশিয়াম থাকে (30) ৷ অতিরিক্ত মাত্রায় এই ফলের রস খেলে হাইপারক্য়ালেমিয়া হতে পারে ৷ বিশেষ করে কিডনির সমস্য়া যাদের রয়েছে বা যারা অ্য়ান্টিহাইপারটেনসিভ ওষুধ নিচ্ছেন তাদেরকে এই বিষয়টি মাথায় রাখতেই হবে ৷
  • বেদানাতে অ্য়ালার্জি সংক্রান্ত সমস্য়া থাকলে এই ফলের রস এড়িয়ে যাওয়ায় ভালো ৷ নাহলে এর থেকে বড় বিপদও হতে পারে ৷ গলায় চুলকুনি, গলাজ্বালা, পেটে ব্য়থা, শ্বাসকষ্ট, এমনই বিভিন্ন সমস্য়া দেখা দিতে পারে (32)
  • অন্তঃস্বত্তা অবস্থায় বেদানার রস উপকারী তাই অনেকেই এটি খান, তবে অ্য়ালার্জি সংক্রান্ত সমস্য়া থাকলে একেবারেই খাবেন না, বেদানার ক্ষতিকারক দিকের মধ্য়ে অন্য়তম এটি ৷ অ্য়ানিমাল স্টাডিজ-এ বলা হয়েছে, বেদানার রসের সাপ্লিমেনটেশন ভ্রূণের ওপর খারাপ প্রভাব ফেলতে পারে৷ তাই এক্ষেত্রে সাবধান থাকতে হবে (33)
  • হজমে যেমন বেদানার রস সাহায্য় করে তেমনই অতিরিক্ত খেলে তা বিপরীত কাণ্ড ঘটাতে পারে, হতে পারে বদহজম৷ যদিও এই বিষয়ে এখনও বিশেষ তথ্য় উঠে আসেনি ৷
  • যদি বেদানা থেকে কোনওরকম শরীর বা ত্বকে অ্য়ালার্জি দেখা দেয় বা অস্বস্তি হচ্ছে বলে মনে হয় তাহলে দেরি না করে অবশ্য়ই ডাক্তারকে দেখিয়ে সঠিক পরামর্শ নিন ৷

বেদানার উপকারিতা যেমন অপরিসীম তেমনই বেদানার ক্ষতিকারক দিকটিও মাথায় রাখা প্রয়োজন ৷ এই ফলে কোনওরকম অ্য়ালার্জি সংক্রান্ত সমস্য়া না থাকলেছোট থেকে বড় সকলেরই ডায়েট চার্টে রাখা উচিত ৷ উপরোক্ত বেদানার উপকারিতা ছাড়াও আরও বহু উপকারিতা রয়েছে এর ৷ আমাশয়, রক্তাল্পতা, রক্তপাত বন্ধ করতে, বাতের ব্য়থা, ক্রিমিনাশ, যৌনক্ষমতা বৃদ্ধি ইত্যাদি বিভিন্ন সমস্য়ায় বেদানার ভূমিকা অনস্বীকার্য ৷

2 sources

Stylecraze has strict sourcing guidelines and relies on peer-reviewed studies, academic research institutions, and medical associations. We avoid using tertiary references. You can learn more about how we ensure our content is accurate and current by reading our editorial policy.
Was this article helpful?

LATEST ARTICLES

scorecardresearch