ভুট্টার উপকারীতা এবং পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া | All About Corn

by

বর্ষার মরশুমে ভুট্টা পোড়ার গন্ধ সকলের কাছেই বাড়তি একটা মন মুগদ্ধকর প্রাপ্তি। এইরকম আবহাওয়ায় একটা সেঁকা ভুট্টা খাওয়ার সুযোগ পেলে কে আর সেটা হাতছাড়া করতে চাইবে! জানলে হয়ত আপনার অবাক লাগবে যে ভুট্টায় রয়েছে এমন কিছু পৌষ্টিক গুণ যা শরীরকে কঠিন কঠিন সব অসুখের মোকাবিলা করতে প্রয়োজনীয় শক্তি জোগায়। যেসব মানুষেরা খাবার হিসেবে ভুট্টাকে প্রচণ্ড অপছন্দ করেন তারাও মানবদেহে ভুট্টার গুণাগুণ সম্পর্কে জানলে অবাক হবেন। তাহলে জেনে নেওয়া যাক খাদ্য হিসেবে ভুট্টার গুণাগুণ কী কী! মানবদেহে ভুট্টার উপকারীতাই বা কী! প্রতিদিন কতটা পরিমাণে ভুট্টা গ্রহণ স্বাস্থ্যের পক্ষে উপযোগী আর ভুট্টার পার্শ্ব প্রতিক্রিয়াই বা কী! তবে একথাও মাথায় রাখা দরকার, যে কোনো রকম শারীরিক সমস্যার চিকিৎসার জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করা দরকার।

ভুট্টা আসলে কী ?

ভুট্টার বিজ্ঞানসম্মত নাম হলো জি মেইজ। এটা সাধারণত দানা শষ্য হিসবে পরিগণিত হয়। মকাই বা ভুট্টাকে সারা ভারতেই প্রায় খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করা হয়। সমতল ভূমি থেকে প্রায় ২৭০০ মিটার উচ্চতায় পার্বত্য ভূমিতে ভুট্টা চাষ হয়। ভারতের একাধিক রাজ্য বিশেষত অন্ধ্রপ্রদেশ, বিহার, কর্ণাটক, রাজস্থান এবং উত্তরপ্রদেশে ব্যাপকভাবে ভুট্টার চাষ করা হয়। ভারতের বাইরে চীন, ব্রাজিল, মেক্সিকো এবং মার্কিনযুক্তরাষ্ট্র ভুট্টা চাষের ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।

ভুট্টার প্রকারভেদ

রঙ এবং স্বাদের নিরিখে ভুট্টাকে বেশ কয়েক ভাগে ভাগ করা যায়। নিম্নে সেগুলি সম্পর্কে আলোচনা করা হলো – (1)

  • হলুদ দানা বিশিষ্ট ভুট্টা – এটি প্রধাণত ইথানল উৎপাদনের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। ইথানল হলো এক ধরণের অ্যালকোহল যা পেট্রোলের সাথে মেশানো হয়। তারপর এই ধরণের পেট্রোল গাড়ির জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
  • মিষ্টি ভুট্টা বা সুইট কর্ন – এই ধরণের ভুট্টা বাজারে বা মুদি দোকানে কিনতে পাওয়া যায়।
  • সাদা ভুট্টা বা হোয়াইট কর্ন – এটি প্রধাণত খাদ্য এবং চিপস উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত হয়।
  • হাই অ্যামিলোজ ভুট্টা – অধিক পরিমাণে স্টার্চ যুক্ত এই প্রকার ভুট্টা মূলত বস্ত্র শিল্পে অধিক মাত্রায় ব্যবহৃত হয়।
  • পপকর্ন – এটা ভুট্টার একটি ধরণ। এই ধরণের ভুট্টা গরম করলে ফুলে যায় এবং ফেটে গিয়ে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে।
  • লাল ভুট্টা বা রেড কর্ন – এই ধরণের ভুট্টা স্বাদে অনেকটা বাদামের মতন হয়। আর এই ধরণের ভুট্টা মিষ্টি স্বাদের ভুট্টার শ্রেণীর অন্তর্ভূক্ত হয়।
  • নীল ভুট্টা বা ব্লু কর্ন – এই ধরণের ভুট্টা বিভিন্ন রকম খাদ্য বিশেষত চিপস তৈরী করতে ব্যবহৃত হয়।
  • অর্নামেন্টাল কর্ন– এই ধরণের ভুট্টা ভারতীয় ভুট্টা নামেও পরিচিত। এটা বর্ণে এবং আকৃতিতে নানান প্রকারের হয়।

ভুট্টা কেন আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী

ভুট্টা এমন একটি খাদ্য যা কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন এবং ফাইবার সহ একাধিক ভিটামিন এবং মিনারেলস সমৃদ্ধ হয়। তাই এটি শরীরে প্রয়োজনীয় পুষ্টি জোগায়। বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা যেমন জণ্ডিস বা পাণ্ডুরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, যকৃৎ বা লিভারের গোলযোগ, পরিপাক বা হজমের ক্ষেত্রে উপাদেয় এবং সর্বোপরি মানসিক সুস্বাস্থ্য বজায় রাখতেও সহায়তা করে। এইসব কারণের জন্যই ভুট্টাকে একটি গুরুত্ব পূর্ণ খাদ্য হিসেবে গণ্য করা হয় (2)। সংশ্লিষ্ট প্রবন্ধে ভুটার স্বাস্থ্যোপযোগীতা নিয়ে বিশদে আলোচনা করা হবে।

ভুট্টার স্বাস্থ্যোপযোগীতা

ভুট্টা একাধিক পুষ্টি গুণ সমৃদ্ধ হয়। নিম্নে ভুট্টার স্বাস্থ্যোপযোগীতা গুলি সম্বদ্ধে বিধদে আলোচনা করা হবে।

১. মধুমেহ বা ডায়বিটিস নিয়ন্ত্রক – ভুট্টা মধুমেহ রোগাক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য খুবই উপাদেয়। ভুট্টা রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। ভুট্টা সম্পর্কিত বিভিন্ন গবেষণা সূত্রে এই তথ্য পাওয়া গেছে। ইঁদুরের ওপর করা এনসিবিআই (ন্যাশানাল সেন্টার ফর বায়োটেকনোলজি) এর করা একটি গবেষণা থেকে জানা গেছে যে বেগুনী ভুট্টায় ( যা নীল ভুট্টা নামেও পরিচিত) এমন কিছু উপাদান রয়েছে যা শরীরের ইনসুলিনের পরিমাণ বৃদ্ধি করতে সহায়তা করে।(3)

শুধু তাই নয় ভুট্টা টাইপ ২ ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য অত্যন্ত উপাদেয়। একটি গবেষণা থেকে জানা গেছে প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় ভুট্টা অন্তর্ভুক্ত করলে মধুমেহ রোগীদের রক্তে শর্করার পরিমাণ অনেকটাই হ্রাস পেয়েছে (4)। এছাড়াও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, ভিটামিন, এবং ফাইবারের একটি উৎস হিসেবেও ভুট্টা কে চিহ্নিত করেন।

২. দৃষ্টি শক্তি উন্নত করে – ভুট্টার মধ্যস্থিত অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ল্যুটেইন, এবং জ্যাক্সন্থনথিন চোখের জ্যোতি উন্নত রাখতে সহায়তা করে। এই সংক্রান্ত বিষয়ে একটি গবেষণা থেকে জানা যায় যে বয়স্ক ব্যক্তিদের শরীরে পূর্বোক্ত উপাদানগুলির অভাবে চোখের শিরায় শিথিলতা দেখা যায়। যার প্রভাবে চোখের দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হয়ে যায় আবার কখনও কখনও অন্ধত্বও নেমে আসতে পারে। এইসব সমস্যা থেকে শরীরকে নিরাপদে রাখার জন্য চিকিৎসকেরা সকলকেই খাদ্য হিসেবে ভুট্টা গ্রহণের পরামর্শ দিয়ে থাকেন। (5)

৩. গর্ভাবস্থায় উপকারী – গর্ভাবস্থায় খাদ্য হিসেবে ভুট্টা গ্রহণকে খুবই উপকারী বলে মনে করা হয়। কারণ ভুট্টায় রয়েছে ক্যালসিয়াম, আয়রণ, এবং ফলিক অ্যাসিড সহ ভিটামিন এ, ভিটামিন সি, ভিটামিন ডি ইত্যাদি। আর এইসব পৌষ্টিক উপাদান গর্ভবতী মহিলাদের স্বাস্থ্যের পক্ষে খুবই উপকারী। একইসাথে গর্ভস্থ শিশুর জন্য ফলিক অ্যাসিড এবং ভিটামিন বি খুবই উপকারী বলে মনে করা হয়। এগুলি শিশুর মস্তিষ্ক এবং মেরুদণ্ড গঠনের ক্ষেত্রে যাবতীয় ত্রুটির সম্ভবনা খর্ব করে দেয়। এছাড়াও গর্ভাবস্থায় মধুমেহ আক্রান্ত মহিলাদের জন্যও চিকিৎসকেরা খাদ্য হিসেবে ভুট্টা গ্রহণের পরামর্শ দিয়ে থাকেন। এইসব তথ্য থেকেই জানা যাচ্ছে যে গর্ভবস্থায় ভুট্টার প্রয়োজনীয়তা কতটা। (6) (7)

৪. ওজন নিয়ন্ত্রক – ওজন বৃদ্ধির সমস্যায় দিশেহারা এমন মানুষের সংখ্যা নেহাত মন্দ নয়। ওজন নিয়ন্ত্রক উপাদান হিসেবে ভুট্টা একটি খুবই পরিচিত নাম। এর একমাত্র কারণ ভুট্টায় রয়েছে পর্যাপ্ত পরিমাণে ফাইবার যা ওজন নিয়ন্ত্রণ করতে সহায়তা করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন বিদ্যালয়ে কর্তৃক একথা স্বীকৃত হয়েছে। গবেষণা সূত্রে জানা গিয়েছে যে ভুট্টা রেশমের (ভুটতায় উপস্থিত হালকা আঁশ রোঁয়া) নির্যাস ওজন কমাতে সাহায্য করে। (8)

৫। আয়রণের ঘাটতি পূরণ করে – খাদ্য হিসেবে ভুট্টা গ্রহণের একাধিক উপকারীতা রয়েছে। সেগুলির মধ্যে একটি হলো ভুট্টা মানুষের শরীরে আয়রণের ঘাটতি পূরণ করে। প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় ভুট্টার অন্তর্ভূক্তি শরীরে আয়রণের ঘাটতির প্রবণতা একেবারেই কমিয়ে দেয়। এনসিবিআই এর একটি গবেষণা এই বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। গবেষণা সূত্রে জানা গেছে যে বেশ কিছু ধরণের ভুট্টায় লোহার উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। তাই খাদ্য হিসেবে ভুট্টা গ্রহণের ফলে শরীরে শুধু আয়রণের ঘাটতি দূর হয় তাই নয়, শরীরে আয়রণের ঘাটতি পূরণ হলে শরীরে রক্তাল্পতা বা অ্যানিমিয়ার সম্ভবনাও কম হয়।(9)

৬. রক্তাল্পতা নাশক – ভুট্টা শরীরে রক্তাল্পতা নাশ করে। ইতিমধ্যেই আমরা জানতে পেরেছি যে ভুট্টা শরীরে আয়রণের ঘাটতি পূরণ করে। আর আয়রণের ঘাটতির সাথে রক্তাল্পতা সম্পর্কিত। আয়রণের ঘাটতি ছাড়াও ভুট্টা স্থিত ভিটামিন বি ১২, ফলিক অ্যাসিড অন্যান্য কঠিন রোগের অনায়াসেই নিরাময় করে। (10)

৭. হার্টের স্বাস্থ্যের জন্য উপযোগী – রোস্টেড বা সেঁকা ভুট্টার ওপর হওয়া একটি গবেষণা থেকে জানা গেছে যে এতে উপস্থিত ফেনোলিক যৌগ অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ হয়। এই কারণে ভুট্টা হার্টের যাবতীয় সমস্যার নিরসন করে, একইসাথে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে। ঐ একই গবেষণা থেকে আরোও জানা যায় যে, হার্টের সুস্বাস্থ্য বজায় রাখতে ভুট্টাস্থিত ফেরোলিক অ্যাসিড একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। (11)

৮. পরিপাক বা হজমে সহায়ক – ভুট্টার অন্যতম একটি উপকারীতা হলো খাদ্য হিসবে ভুট্টা গ্রহণের ফলে হজম শক্তি বৃদ্ধি পায়। একটি গবেষণা থেকে জানা যায় ভুট্টার মধ্যে উপস্থিত পর্যাপ্ত পরিমাণ ভিটামিন বি কমপ্লেক্স হজম শক্তি শক্তিশালী করে তোলে। শুধু তাই নয় খাদ্য হিসেবে ভুট্টা গ্রহণ করলে হজমে সহায়ক পাচক রস উৎপাদনও বৃদ্ধি পায়। এই তথ্যের ভিত্তিতে একথা অনায়াসেই বলা যায় যে, ভুট্টা পরিপাক তন্ত্র শক্তিশালী করতে সাহায্য করে।

৯. কোলেস্ট্রেরল নিয়ন্ত্রক – মানবদেহে কোলেস্ট্রেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রন করতেও ভুট্টার জুরি মেলা ভার। ভুট্টা সম্পর্কিত একটি গবেষণা থেকে জানা গিয়েছে যে ভুট্টার তেলে লিনোলিক অ্যাসিডের উপস্থিতি লক্ষ্য করে যায়। এই লিনোলিক অ্যাসিড বর্দ্ধিত কোলেস্ট্রেরল হ্রাস করতে একইসাথে নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে। কাজেই বোঝা যাচ্ছে ভুট্টা শরীরে কোলেস্ট্রেরল মাত্রা নিয়ন্ত্রনে কতটা কার্যকরী ভূমিকা পালন করে।

১০. এনার্জি বর্দ্ধক – এনার্জি বা কর্ম শক্তি বৃদ্ধি করার ক্ষেত্রেও ভুট্টা একটি অতি পরিচিত নাম। অন্য সব পৌষ্টিক উপাদানের পাশাপাশি মানব শরীরে শক্তির ও প্রয়োজন আছে। দেহজ শক্তির বলেই মানুষ হাঁটাচলা থেকে শুরু করে যাবতীয় কাজকর্ম করতে সক্ষম হয়। শক্তি ছাড়া মানব শরীর স্থির জড় বস্তুর ন্যায় আচরণ করত। শরীরের শক্তি সঞ্চয়ের জন্যই আমাদের খাদ্য হিসেবে ভুট্টা গ্রহণ করা দরকার।

১১. অ্যালজাইমার প্রতিরোধক – ভুট্টা অ্যালজাইমার বা স্মৃতিলোপ অসুখের উপশমের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত সহায়ক। এর একমাত্র কারণ হলো ভুট্টায় রয়েছে ভিটামিন ই এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। ইন্টারন্যাশানাল জার্নাল অফ মোলার সায়েন্স এর একটি গবেষণা সূত্রে জানা গিয়েছে যে ভিটামিন ই অ্যালজাইমারস রোগ প্রতিরোধের ক্ষেত্রে কার্যকরী ভূমিকা পালন করে। (12)

১২. হাড়ের শক্তি বর্দ্ধক – ভুট্টার স্বাস্থ্যোপযোগীতার মধ্যে হাড়ের শক্তি বৃদ্ধিও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ভুট্টার মধ্যস্থ দ্রবণীয় ফাইবার হাড়ের স্বাস্থ্যের জন্য খুবই উপকারী বলে মনে করা হয়। এছাড়াও ভুট্টায় রয়েছে ক্যালসিয়াম যা হাড়ের শক্তি বৃদ্ধির জন্য অন্যতম প্রধান একটি উপাদান বলে স্বীকৃত। একইসাথে ভুট্টা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ হওয়ার জন্য হাড়ের ক্ষয় রোগ প্রতিরোধ করে। এইসব তথ্যাদি থেকে সহজেই ধারণা পাওয়া যায় যে ভুট্টার মানবদেহে হাড়ের স্বাস্থ্যের জন্য কতটা উপযোগী। (13)

১৩. শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করে – ভুট্টার উপকারীতা সম্বদ্ধিত গবেষণার পরে বৈজ্ঞানিকরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে ভুট্টা মানবদেহে শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। কারণ শারীরিক কার্যকলাপের জন্য মানব শরীরের যেটুকু শক্তি প্রয়োজন তার প্রধান উৎস হলো কার্বোহাইড্রেট। আর কার্বোহাইড্রেটের ব্যবহার শরীরে গ্লাইকোজেনের পরিমান বৃদ্ধি করে। এইভাবেই শরীরের শারীরিক ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।(14)

১৪. ত্বক এবং চুলের স্বাস্থ্যের জন্য উপযোগী – বিশেষজ্ঞদের মতে ভুট্টাস্থিত ভিটামিন বি কমপ্লেক্স ত্বক এবং চুলের জন্য খুবই উপকারী। এছাড়াও ভুট্টায় উপস্থিত ভিটামিন এ, সি, ডি, ই, জিঙ্ক এবং আয়রণ ত্বক এবং চুলের জন্য অতি প্রয়োজনীয় পৌষ্টিক উপাদান। তাই বলা হয় যে ভুট্টা শুধুমাত্র শরীরের আভ্যন্তরীন অঙ্গের জন্য উপকারী এমন নয়, এটা চুল এবং ত্বকের জন্যও একইভাবে উপকারী। (15)
এইগুলি হলো ভুট্টার স্বাস্থ্যোপযোগীতা।

ভুট্টার পুষ্টিগুণ

ভুট্টার পুষ্টি গুণ গুলি হলো নিম্নরূপ –

পৌষ্টিক উপাদানপ্রতি ১০০ গ্রামে পরিমান
জল৭৬.৩ গ্রাম
শক্তি১০৯ কিক্যাল
প্রোটিন২.১৪ গ্রাম
মোট লিপিড (ফ্যাট)৫.৪৬ গ্রাম
কার্বোহাইড্রেট১৫.৩২ গ্রাম
ফাইবার১.৬ গ্রাম
শর্করা৭.১৫ গ্রাম
                  মিনারেলস
ক্যালসিয়াম১৩ মিলিগ্রাম
আয়রন০.২২ মিলিগ্রাম
ম্যাগনেশিয়াম১২ মিলিগ্রাম
ফসফরাস৪৬ মিলিগ্রাম
পটাশিয়াম১২১ মিলিগ্রাম
সোডিয়াম২১৮ মিলিগ্রাম
জিঙ্ক০.৩ মিলিগ্রাম
কপার০.০২৮ মিলিগ্রাম
সেলেনিয়াম০.৭ মাইক্রোগ্রাম
                  ভিটামিন
ভিটামিন সি১.৫ মিলিগ্রাম
থিয়ামিন০.০৩৫ মিলিগ্রাম
রাইবোফ্লাবিন০.০৮৯ মিলিগ্রাম
নিয়াসিন০.৮৩৩ মিলিগ্রাম
ভিটামিন বি ৬০.৩০৩ মিলিগ্রাম
ফলেট৩০ মাইক্রোগ্রাম
ভিটামিন এ৬৫ আইইউ
ভিটামিন ই১.৬ মিলিগ্রাম
ভিটামিন কে৭.৩ মাইক্রোগ্রাম
                    লিপিড
স্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিড১.১১৬ গ্রাম
মনো অ্যানস্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিড১.৭৪২ গ্রাম
পলি অ্যানস্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিড২.৩৪১ গ্রাম

সূত্র – (USDA)

ভুট্টা ব্যবহারের পদ্ধতি

ভুট্টা ব্যবহারের প্রসঙ্গ উঠলেই প্রথমে সকালের প্রাতরাশের কথা মাথায় আসবে। অনেকেই এই ভুট্টা থেকে তৈরী কর্নফ্লেক্স সকালের প্রাতরাশে দুশের সাথে গ্রহণ করতে পছন্দ করেন। কেউ কেউ আবার কর্ণ দিয়ে স্যুপ তৈরী করে খেতে ভালোবাসেন। অবশ্য পপ কর্ণের কথা উঠলেই মনে হবে এটা এমন একটা খাবার যেটা যে কোনো সময় যে কোনো অবস্থায়, হোক সে ভরা পেট বা খালি পেট, অনায়াসেই খাওয়া যায়। এছাড়াও যদি সহজেই পেট ভর্তি হবে এমন ভারী খাবারের কথা ওঠে তাহলে অবশ্যই শীতকালে ভুট্টার রুটির কথা আসবে। প্রায় সব বয়সের মানুষের কাছেই ভুট্টার রুটি একটি লোভনীয় এবং অন্যদিকে পছন্দসই একটা খাদ্য।

এবার আমরা চটজলদি ভুট্টা দিয়ে বাড়িতে তৈরী করা যায় এমন কয়েকটা পদের ব্যপারে জেনে নেবো।

১. সুইট কর্ণ কারি

উপকরণ

  • ২ চা চামচ মাখন
  • ১ চা চামচ আমের চাটনি
  • রোস্টেড কারি পাওডার (প্রয়োজন অনুসারে)
  • ১০০ গ্রাম ভুট্টার দানা

রান্না করার পদ্ধতি

  • প্রথমে ভুট্টার দানা গুলোকে ভালো করে ভেজে নিতে হবে।
  • রোস্ট করা হয়ে গেলে ভুট্টার দানা গুলোকে আলাদা প্লেটে রাখতে হবে।
  • এরপর মাখন আর আম চাটনির সাথে কারি পাওডার মেশাতে হবে।
  • সবশেষে রোস্ট করা ভুট্টার ওপর তৈরী করা পেস্টটা ছড়িয়ে ভালো করে মাখিয়ে নিতে হবে।

২. সুইট কর্ণ মশালা

উপকরণ

  • সেদ্ধ ভুট্টা (প্রয়োজন অনুসারে)
  • ১ চা চামচ মাখন
  • মশলা গুঁড়ো (স্বাদ অনুসারে)

রান্না করার পদ্ধতি

  • একটা পাত্রে ভুট্টা সেদ্ধ আলাদা করে রাখুন।
  • তারপর এতে ১ চা চামচ মাখন যোগ করতে হবে।
  • এরপর সেদ্ধ করা ভুট্টার ওপর থেকে মশলা গুঁড়ো ছড়িয়ে দিতে হবে।
  • সব মশলা একসাথে মিশিয়ে নেওয়ার পর খাওয়ার জন্য পরিবেশন করুন।

ভুট্টা বেছে নেওয়ার এবং দীর্ঘ সময় পর্যন্ত সংরক্ষণ করার পদ্ধতি

ভুট্টা বেছে নেওয়ার পদ্ধতির কথা বলতে গেলে প্রথমেই বলতে হবে যে ভুট্টা যেনো টাটকা এবং দাগহীন হয়।

দীর্ঘ সময় পর্যন্ত ভুট্টা সংরক্ষণ করার জন্য নিম্নলিখিত পদ্ধতি গুলি অনুসরণ করতে হবে, যথা –

  • টাটকা ভুট্টা ঘরের স্বাভাবিক তাপমাত্রায় তিন দিন রাখা যেতে পারে।
  • ৩ দিনেরও বেশি সময় ভুট্টা সংরক্ষিত রাখলে হলে প্লাস্টিকের মধ্যে ভরে ১ সপ্তাহ সময় পর্যন্ত ফ্রিজে রাখা যেতে পারে।
  • আরোও দীর্ঘ সময়ের জন্য ভুট্টা সংরক্ষিত রাখার জন্য এই শস্য একটা জিপার ব্যাগে ভরে আলাদা করে ফ্রিজে রাখতে হবে।

ভুট্টা ঠাণ্ডা না গরম কেমন প্রকৃতির হয়

ভুট্টা গরম বা উষ্ণ প্রকৃতির হয় তাই খাদ্য হিসেবে ভুট্টা গ্রহণের পরেই জল পান করা বাঞ্ছনীয় নয়।

ভুট্টার পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া

ভুট্টার একাধিক স্বাস্থ্য গুণ থাকলেও অনেক সময় ভুট্টা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকারক ও হয়ে ওঠে। খাদ্য হিসেবে ভুট্টা গ্রহণের ফলে সৃষ্ট পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া গুলি সম্পর্কে নিম্নে আলোচনা করা হলো-

  • ইতিমধ্যেই জানা গিয়েছে ভুট্টায় রয়েছে অধিক মাত্রায় ফাইবার। আর এই উচ্চ মাত্রার ফাইবারই পেটে ব্যথার জন্ম দেয়। শুধু পেটের যন্ত্রনাই নয়, একইসাথে পেট ফাঁপা, পেট খারাপ এর মতন একাধিক পেট সংক্রান্ত সমস্যা সৃষ্টি হয়। বিশেষজ্ঞরা প্রতিদিন ২৫-৩০ গ্রাম পর্যন্ত ফাইবার খাদ্য হিসেবে গ্রহণের পরামর্শ দেন।
  • কিছু ক্ষেত্রে আবার অধিক ভুট্টা গ্রহণ শরীরে পেলেগ্রা (ভিটামিন বি ৩ এর ঘাটতির জন্য সৃষ্ট) রোগের জন্ম হয়। পেলেগ্রায় ডায়রিয়া, চর্মরোগ, বিভ্রান্তির মতন শারীরিক সমস্যা দেখতে পাওয়া যায়।
  • ভুট্টার মধ্যস্থিত গ্লুটেন আবার অনেক মানুষের ত্বকে অ্যালার্জির সৃষ্টি করে।

এই প্রবন্ধটি পড়ার পর আপনি নিশ্চই ভুট্টার ব্যবহার, উপকারীতা, পুষ্টি গুণ, এবং পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা লাভ করেছেন। শুধু তাই নয় কীভাবে ভুট্টা বেছে নিতে হবে, বেশ কয়েকদিনের জন্য ভুট্টার সংরক্ষণ, প্রতিদিন কতটা পরিমান ভুট্টা আমাদের শরীরের জন্য দরকার সে সম্পর্কেও একটা পরামর্শ পাওয়া গিয়েছে। তাই ভুট্টা শরীরের জন্য উপযোগী মনে করে বেশ পরিমাণ ভুট্টা গ্রহণ মোটেও স্বাস্থ্যকর নয়। তাই নির্দিষ্ট পরিমাণে করা দরকার।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী

প্রতিদিন খাদ্য হিসেবে ভুট্টা গ্রহণ করা যেতে পারে কী ?

হ্যাঁ, পরিমিত পরিমাণে ভুট্টা গ্রহণ করা যেতেই পারে।

রাতের বেলায় খাদ্য হিসেবে ভুট্টা গ্রহণ করা যেতে পারে কী?

নিশ্চই গ্রহণ করা যেতে পারে, তবে সেক্ষেত্রে পরিমাণ ২৫ গ্রাম পর্যন্ত রাখা যেতে পারে।

খাদ্য হিসবে ভুট্টা গ্রহণ করার ফলে ওজন বৃদ্ধি পায় কী?

আমরা ওপরের প্রবন্ধ থেকে জানতে পেরেছি যে ভুট্টা ওজন কমাতে সহায়তা করে। একইসাথে ভুট্টা অধিক ক্যালোরি সমৃদ্ধ হওয়ার কারণে নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি ভুট্টা গ্রহণ করলে মেদ বৃদ্ধি পায়।

গর্ভাবস্থায় ভুট্টা গ্রহণ করা যায়?

ভুট্টায় এমন কিছু পুষ্টি গুণ রয়েছে যা গর্ভবতীদের জন্য খুবই উপযোগী। তাই খুব স্বাভাবিক ভাবেই গর্ভাবস্থায় ভুট্টা গ্রহণ করা যেতে পারে। এই ব্যাপারে ওপরের প্রবন্ধে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

15 sources

Stylecraze has strict sourcing guidelines and relies on peer-reviewed studies, academic research institutions, and medical associations. We avoid using tertiary references. You can learn more about how we ensure our content is accurate and current by reading our editorial policy.
Was this article helpful?

LATEST ARTICLES

scorecardresearch