সেলেরি পাতার জুসের উপযোগীতা, উপকার এবং পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া | Celery and Its Juice Benefits

by

দৈনন্দিন জীবনে অনেক জিনিসকেই আমরা খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করি। এতে শাক, সবজি থেকে শুরু করে ফলমূল সবই অন্তর্ভূক্ত থাকে। এসবের মধ্যেই এমন কিছু উপাদান রয়েছে যেগুলি অধিকাংশই ভেষজ গুণ সম্পন্ন হয়। যা অনেক গুরুতর শারীরিক সমস্যার অনায়াস সমাধান করে। এইসব খাদ্য গুলির মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য নাম হলো সেলারি। এই পাতার সম্পর্কে কম বেশি সকল মানুষই পরিচিত। তবে খুব মানুষই রয়েছেন যারা এই সেলেরির উপকারিতা সম্বদ্ধে ওয়াকিবহাল। স্টাইলক্রেজের এই প্রবন্ধে আমরা সেলেরির  উপকারিতা, স্বাস্থ্যোপযোগীতা এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করবো। আশা করা যায় এই প্রবন্ধ আপনাদের প্রয়োজনীয় তথ্য প্রদানে সহায়তা করবে।

সেলেরি আসলে কি?

সেলেরি এক ধরণের ছোট উদ্ভিদ যা খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এর বিজ্ঞান সম্মত নাম হলো অ্যাপিয়াম গ্রেভোলেন্স। এটি মূলত স্যালাড তৈরীর সময় ব্যবহৃত হয়। এছাড়াও খাদ্যের বিভিন্ন পদ সাজাতে সেলেরির ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে। বহু মানুষ সেলেরি পাতা স্যুপ রানার ক্ষেত্রেও ব্যবহার করে থাকেন। সেলেরি দেখতে অনেকটা ধনে পাতার মতন হলেও আদতে ধনে পাতা নয়। ইউরোপ এবং আমেরিকা, ও মধ্য প্রাচ্যে সেলেরি পাতার চাষ হয়। অনেক ঔষধী গুণের কারণে এখন সারা বিশ্বে সেলেরি পাতার জনপ্রিয়তা অপরিসীম।

 সেলেরি কেনো শরীরের জন্য উপকারী বলে মনে করা হয়?

বিশেষজ্ঞদের সেলেরিতে রয়েছে ক্যালসিয়াম, সোডিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, এবং আয়রন ইত্যাদি পৌষ্টিক উপাদান। এছাড়াও রয়েছে ভিটামিন এ, ভিটামিন সি, ভিটামিন ই, ভিটামিন বি৬, ভিটামিন বি ৯ এবং ভিটামিন কে প্রভৃতি। এইসব পৌষ্টিক উপাদান মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত অপরিহার্য বলে মনে করা হয়। এবার জেনে নেওয়া সেলেরির ঔষধী গুণাবলীর বিষয়ে। (1)

  • অ্যানথেলমিন্টিক (পরজীবি ধ্বংস)
  • অ্যান্টিস্পামোডিক (পেশী ব্যথা নিরাময় করে)
  • কার্মিনেটিভ (গ্যাসের সমস্যা দূর করে)
  • ডুরাটিক (প্রস্রাব বৃদ্ধিকারী)
  • লোক্সেটিব (মল নরম করে)
  • সেডেটিভ স্টিমুলেন্ট (মাথা ঠাণ্ডা করে)

এইসব কারণের জন্য সেলেরিকে স্বাস্থ্যের জন্য উপযোগী বলে মনে করা হয়। শুধু তাই নয় একইসাথে সেলেরি ত্বক এবং চুলের জন্যও খুবই কার্যকরী ভূমিকা পালন করে।

সেলেরির স্বাস্থ্যোপযোগীতা

সেলেরির স্বাস্থ্যোপযোগীতা গুলি হলো যথাক্রমে –

  1. রক্তচাপ নিয়ন্ত্রক – এনসিবিআই (ন্যাশনাল সেন্টার ফর বায়োটেকনোলজি ইনফরমেশন) এর একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে যে সেলেরির বীজে উচ্চ রক্তচাপ প্রতিরোধক গুণ রয়েছে, যা উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে। এই কারণে, এটা মনে করা হয় যে সেলেরি উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রন করে। (2)
  1. ওজন হ্রাসক – কেউ যদি বেশি ওজন জনিত সমস্যায় ভোগেন তাহলে প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় সেলেরি অন্তর্ভূক্ত করতে পারেন। কারণ সেলেরি ওজন নিয়ন্ত্রনের ক্ষেত্রে কার্যকরী ভূমিকা পালন করে। সেলেরি যেমন ক্যালোরি হ্রাস করে একইসাথে এটা অতিরিক্ত ফাইবারযুক্ত হওয়ার কারণে দীর্ঘ সময় ব্যাপী পেট ভর্তি করে রাখে। ফলে সহজেই বারবার খিদে পাওয়ার প্রবণতা কমে যায়। (3)
  1. কোলেস্ট্রেরল হ্রাসক – সেলেরি পাতা এবং সেলেরি পাতার রসের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এটা কোলেস্ট্রেরল নিয়ন্ত্রন করে। এছাড়াও সেলেরিতে রয়েছে ৩ এন বুটিফ্যাথাইড নামক একটি রাসয়নিক যৌগ রয়েছে। যা রক্তের খারাপ কোলেস্ট্রেল কমাতে সহায়তা করে। শুধু তাই নয় মোট লিপিড প্রোফাইলের ভারসাম্য বজায় রাখতেও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এর থেকে এই ধারণা করা যেতেই পারে যে সেলেরির রস পান করলে রক্তে কোলেস্ট্রলের মাত্রা নিয়ন্ত্রনে থাকে। (4)
  1. ক্যান্সার প্রতিরোধক – ক্যান্সারের মতন ক্ষতিকারক রোগ প্রতিরোধের ক্ষেত্রেও সেলেরির ভূমিকা অনস্বীকার্য। বিশেষজ্ঞদের মতে, এপিজেইন নামক একটি উপাদান সেলেরিতে পাওয়া যায়, যা ক্যান্সার প্রতিরোধ করে এবং এর চিকিৎসাকে সহজতর করে তোলে। এই কারণে মনে করা হয় সেলেরি পাতা বা এর রস খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করলে ক্যান্সারের মতন রোগের ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়। তবে একথা মাথায় রাখা জরুরী যে ক্যান্সার রোগের চিকিৎসায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ জরুরী। তাই ঘরোয়া পদ্ধতিতে চিকিৎসার ওপর নির্ভর না করে একজন চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করুন। (5)
  1. পরিপাক ক্রিয়া নিয়ন্ত্রক এবং কোষ্ঠ্য কাঠিন্য প্রতিরোধক – সেলেরি পাতার রস পরিপাক ক্রিয়া বা হজমের সমস্যায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এছাড়াও সেলেরি সম্পর্কিত একটি গবেষণা পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করে যে এটি কোষ্ঠকাঠিন্য নিরাময় সঙ্গে পরিপাক স্বাস্থ্যের জন্য খুবই উপকারী। সেলেরি উপস্থিত ফাইবার এই কাজে কার্যকরী ভূমিকা পালন করে। তাই সেলেরিকে হজম এবং কোষ্ঠকাঠিন্য সমস্যা সহায়ক বিবেচনা করা যেতে পারে। (6)
  1. অ্যাজস্থমা প্রতিরোধক – বিশেষজ্ঞদের মতে সেলেরিতে রয়েছে পর্যাপ্ত পরিমাণ অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ভিটামিন, এবং মিনারেলস। এইসব গুরুত্বপূর্ণ পৌষ্টিক উপাদানের উপস্থিতির কারণে সেলেরি অনেক জটিল রোগের চিকিৎসায় ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। একটি গবেষণা সূত্রে জানা যায় যে সেলেরি বীজ ব্যবহার করলে অ্যাজস্থমা রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া যেতে পারে। অবশ্য এর কার্যকারীতা সম্পর্কে এখনও অনেক গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। (7)
  1. হৃদযন্ত্রের সুস্বাস্থ্য রক্ষা করে – হৃদরোগের চিকিৎসার ক্ষেত্রে সেলেরি একটি অতি পরিচিত নাম। বিভিন্ন গবেষণা সূত্রে জানা যায় যে সেলেরিতে ফাইবার এবং প্রোটিন সঙ্গে বিভিন্ন ভিটামিন এবং ফাইটোকেমিক্যাল আছে যা কার্ডিওভাসকুলার স্বাস্থ্য বজায় রাখতে কাজ করতে পারে। এই কারণে বলা যেতে পারে যে সেলারি ব্যবহার হৃদযন্ত্রের সমস্যায় আক্রান্ত রোগীদের জন্য একটি ভাল বিকল্প হতে পারে। এছাড়া আগেই বলা হয়েছে যে সেলেরির অ্যান্টি হাইপারটেন্ডেন্সিভ বৈশিষ্ট্যের কারণে এটা উচ্চ রক্তচাপ হ্রাস করতেও সহায়তা করে। এরফলে সহজেই হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কমে যায়। (8)
  1. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বর্দ্ধক – সেলেরি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সক্ষম। বিশেষজ্ঞদের মতে, ফ্ল্যাভোনয়েড, অ্যালকালয়েড এবং ফেনোলিক যৌগ সেলেরিতে পাওয়া যায়। এইসব যৌগের উপস্থিতির কারণে সেলেরি ইমিউনো স্টিমুলেটিং (প্রতিরোধ ক্ষমতা বর্দ্ধনকারী) প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। ফলস্বরূপ সেলেরির ব্যবহারের ফলে আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা অনাক্রম্যতা শক্তি বৃদ্ধি পায়। (9)
  1. ডায়বিটিস নিয়ন্ত্রক – ডায়বিটিসে আক্রান্ত মানুষদের জন্য সেলেরি খুবই উপকারী বলে মনে করা হয়। ইঁদুরের ওপর পরিচালিত একটি গবেষণা থেকে এই বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে। গবেষনা সূত্রে জানা যায় যে সেলেরি বীজে এমন কিছু উপাদানের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায় যা রক্তে শর্করার পরিমাণ নিয়ন্ত্রন করে। এর ওপর ভিত্তি করেই বলা যায় যে ডায়বিটিস বা মধুমেহ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের খাদ্য তালিকায় সেলেরির উপস্থিতি অত্যন্ত জরুরী। (10)
  1. কিডনি এবং লিভারের স্বাস্থ্যের জন্য উপযোগী – সেলেরি বীজের তেল কিডনির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই তেলে রয়েছে ক্রিসোরিঅয়েল, ডিগ্লুকোসাইড, লুটোলিন, এপিওসিগালুকোসাইড এবং লুটোলিন নামক উপাদান। যা কিডনিতে স্টোনের সম্ভবনা দূর করতে সক্ষম। এছাড়াও অন্য একটি গবেষণা সূত্রে জানা যায় যে সেলেরি পাতায় এমন কিছু উপাদান রয়েছে যা লিভারের স্বাস্থ্যের জন্য খুবই উপযোগী। (11)
  1. প্রদাহ নাশক – একাধিক পৌষ্টিক উপাদানের উপস্থিতির কারণে সেলেরিতে প্রদাহ নাশক বৈশিষ্ট্য দেখতে পাওয়া যায়। আর এই বৈশিষ্ট্যের কারণেই এটি শ্বাস – প্রশ্বাস, বিপাকীয় এবং হৃদরোগ এবং সর্বোপরি মানসিক রোগের মতন অনেক সমস্যারই সহজে সমাধান করে। (12)
  1. যৌন উদ্দীপনা বর্দ্ধক – একটা কথার প্রচলন রয়েছে যে সেলেরি পাতার ব্যবহার করলে যৌন উদ্দীপনা বৃদ্ধি করে। এই সংক্রান্ত বিষয়ে করা একটি গবেষণা সূত্রে জানা যায় যে এতে পর্যাপ্ত পরিমাণে পুরুষ হরমোন অ্যাণ্ড্রোস্টেরনের উপস্থিতি রয়েছে। যা পুরুষের যৌন উত্তেজনা বৃদ্ধি করে এবং ঘাম ক্ষরণের মাত্রাও বাড়িয়ে তোলে। পুরুষদের এই ঘামের মধ্যে দিয়ে ফেরোমোন নামক একটি হরমোন নির্গত হয়। এছাড়াও বিশেষজ্ঞদের মতে এই ফেরোমোন হরমোন মহিলদের যৌন উত্তেজনা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সহায়তা করে। তাই বলা হয় যে পুরুষ এবং মহিলা উভয়ের যৌন ক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সেলেরি একটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হয়ে উঠতে পারে।  (13)
  1. সংক্রমণ প্রতিরোধক – সংক্রমণ প্রতিরোধের ক্ষেত্রেও সেলেরি ব্যবহার করা যেতে পারে। একটি গবেষণা সূত্রে এমনটা জানা গেছে। ঐ গবেষণা থেকে জানা যায় যে সেলেরিতে এমন একটি পৌষ্টিক উপাদানের উপস্থিতি রয়েছে যা ব্যাক্টেরিয়া সংক্রমন প্রতিরোধের ক্ষেত্রে সহায়তা করে। এই কারণে বলা যেতে পারে যে এর ব্যবহার সংক্রমণ প্রতিরোধে সাহায্য করতে পারে।
  1. মানসিক স্বাস্থ্যের পক্ষে উপযোগী – সেলেরি ব্যবহার মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী বলে বিবেচনা করা হয়। একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে যে সেলেরিতে পাওয়া ঔষধী বৈশিষ্ট্য মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের উন্নতিতে কার্যকরী ভুমিকা পালন করে। এটি ডিমেনশিয়া (স্মৃতি বিলোপ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে অস্থিরতা) এবং অ্যালঝাইমারস এর মতন মস্তিষ্ক সম্বদ্ধীয় অনেক সমস্যা দূর করতে পারে। (14)
  1. চোখের স্বাস্থ্যের জন্য উপযোগী – সেলেরির ব্যবহার চোখের স্বাস্থ্যের জন্য খুবই উপকারী। বয়সজনিত কারণে চোখের জ্যোতি কমে যায় বলে মনে করা হয়। এই সংক্রান্ত বিষয়ে করা একটি গবেষণা থেকে জানা যায় যে, লুটেইন এবং জ্যাক্সন্থের বিশেষ উপাদান এই সমস্যা সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রসঙ্গত এই দুই উপাদান সবুজ শাক সব্জির মধ্যে পর্যাপ্ত পরিমাণে থাকে। তাই বলা হয় যে চোখের সুস্বাস্থ্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে সেলেরি ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে।  (15)
  1. বাতজ বেদনা নাশক – সেলেরির ব্যবহার বাতজ বেদনা এবং অন্যান্য গাঁটের ব্যথা প্রতিরোধ করে। কারণ এতে রয়েছে অ্যান্টিইনফ্লেমেটারি বৈশিষ্ট্য যার প্রভাবে ফোলা ভাব এবং ব্যথা উপশম হয়। (16)
  1. শরীরে আর্দ্রতা বজায় রাখে – সেলেরিতে প্রচুর পরিমাণ জলের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। জলের অভাবে শরীর শুষ্ক হয়ে পরে। ফলে ডিহাইড্রেশানের সমস্যা দেখা যায়। এই কারণে বলা হয় যে সেলেরি ব্যবহার করলে শরীরে জলের ঘাটতি পূরণ সহজে হয়। (17)
  1. স্মৃতি শক্তি বর্দ্ধক – এই প্রবন্ধে আগেই বলা হয়েছে যে সেলেরির ব্যবহার মস্তিষ্কের বিকাশে উপকারী ভূমিকা পালন করে। এই কারণে ডিমেনশিয়া এবং অ্যালঝাইমারস এর মতন মানসিক অসুস্থ্যতার ক্ষেত্রে সেলেরি সহায়ক ভূমিকা পালন করে। উল্লেখ্য এই দুই মানসিক সমস্যার ফলে স্মৃতি শক্তি দূর্বল হয়ে যায়। তাই দুর্বল স্মৃতি শক্তির ঝুঁকি এড়ানোর জন্য সেলেরি পাতা খাদ্য তালিকায় অন্তর্ভূক্ত করা জরুরী।
  1. ত্বকের জন্য উপকারী – জল এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের উপস্থিতির জন্য সেলেরি শরীর পরিশুদ্ধ করে এবং একইসাথে ত্বক পরিমার্জিত করে। অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট মূলত ফ্রি র‍্যাডিক্যালস নির্মূল করে ত্বকের ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার সম্ভবনা হ্রাস করে। অন্যদিকে জল শরীর থেকে বিষাক্ত পদার্থ অপসারণ করে। ফলে ত্বকের সুস্বাস্থ্য বজায় থাকে। একইসাথে সেলেরি বীজ ব্যবহার করলে সোরিয়াসিস এর মতন ত্বকের সমস্যায় উপকারী বলে প্রমাণিত হয়। এছাড়াও সেলেরি বীজ থেকে প্রাপ্ত তেলে অ্যান্টি ব্যাক্টেরিয়াল বৈশিষ্ট্য থাকার কারণে ইহা সহজেই ব্যাক্টেরিয়া নাশ করে ত্বকের পরিচর্যা করে।  (18)
  1. চুলের স্বাস্থ্যের জন্য উপযোগী – চুলের স্বাস্থ্যের জন্য সেলেরি একটি উপকারী সবজি বলে মনে করা হয়। কারণ এটি চুলের ক্ষতি বিরোধী প্রভাব যুক্ত হয় তাই সহজেই চুল পড়ার সম্ভবনা কমে যায়। একইসাথে সেলেরি চুলের গোড়া মজবুত করে তোলে। (19)

সেলেরির পৌষ্টিক উপাদান –

সেলেরির পৌষ্টিক উপাদান গুলি হলো যথা –

পৌষ্টিক উপাদানপ্রতি ১০০ গ্রামে পরিমাণ
জল৯৫.৪৩ গ্রাম
শক্তি১৪ কিক্যালোরি
প্রোটিন০.৬৯ গ্রাম
মোট লিপিড০.১৭ গ্রাম
কার্বোহাইড্রেট২.৯৭ গ্রাম
ফাইবার১.৬ গ্রাম
শর্করা১.৩৪ গ্রাম
ক্যালসিয়াম৪০ মিলিগ্রাম
আয়রণ০.২মিলিগ্রাম
ম্যাগনেশিয়াম১১ মিলিগ্রাম
ফসফরাস২৪ মিলিগ্রাম
পটাশিয়াম২৬০ মিলিগ্রাম
সোডিয়াম৮০ মিলিগ্রাম
জিঙ্ক০.১৩ মিলিগ্রাম
ভিটামিন সি৩.১ মিলিগ্রাম
থিয়ামিন০.০২১ মিলিগ্রাম
রাইবোফ্লাবিন০.০৫৭ মিলিগ্রাম
নিয়াসিন০.৩২ মিলিগ্রাম
ভিটামিন বি ৬০.০৭৪ মিলিগ্রাম
ফলেট৩৬ আর.এ.ই
ভিটামিন এ২২ আর.এ.ই
ভিটামিন এ৪৪৯ আই.ইউ
ভিটামিন ই০.২৭ মিলিগ্রাম
ভিটামিন কে২৯.৩ মাইক্রোগ্রাম
স্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিড০.০৪২ গ্রাম
মনো অ্যানস্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিড০.০৩২ গ্রাম
পলি অ্যানস্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিড০.০৭৯ গ্রাম

সূত্র –  USDA (20)

সেলেরির ব্যবহার –

সেলেরি সাধারণত স্যালাড, স্যুপ এবং জুস হিসেবে ব্যবহার করা যায়। স্যালাডের সাথে এটি সকাল এবং সন্ধ্যার টিফিনে ব্যবহার করা যায়। এছাড়া জুস এবং স্যুপ হিসেবে সকালের জলখাবারে গ্রহণ করা যেতে পারে। এবার সেলেরির ব্যবহার সম্পর্কে বিস্তারিত ভাবে জেনে নেওয়া যাক।

১। স্যালাড –

উপকরণ –

  • ১ বাটি সেলেরি টুকরো
  • ২ টো পিঁয়াজ (বৃত্তাকারে বলয়ের মতন টুকরো)
  • ১ টা মূলো (টুকরো করা)
  • ১ টা গাজর (টুকরো করা)
  • লবন (স্বাদানুসারে)
  • পাতিলেবু (স্বাদানুসারে)

প্রস্তুত প্রণালী-

  • একটি প্লেটে সমস্ত কাটা সবজি গুলি রাখতে হবে।
  • এরপর এতে স্বাদানুসারে লবন যোগ করতে হবে।
  • স্বাদ বৃদ্ধি করার জন্য এতে পাতিলেবুর রস যোগ করতে হবে।
  • এবার সব কটি উপাদানকে ভালো ভাবে মিশিয়ে নিন।

২। স্যুপ –

উপকরণ –

  • ৫০ গ্রাম সেলেরি (কাটা)
  • ২ টো আলু (টুকরো করা)
  • ১ টা পিঁয়াজ (ছোট করে টুকরো)
  •  ২ টো কাঁচা লঙ্কা (ছোট করে টুকরো)
  • লবন (স্বাদানুসারে)
  • ২ চামচ অলিভ অয়েল
  • ৩ কাপ জল

প্রস্তুত প্রণালী –

  • প্রথমে একটা প্যানে তেল ঢেলে সেটা গরম করতে হবে।
  • তেল গরম হয়ে গেলে তাতে কাটা পিঁয়াজ দিতে হবে।
  •  পিঁয়াজ গুলোকে গোলাপী হওয়া অবধি ভাজা করতে হবে।
  • এবার এতে টুকরো কঅরে রাখা সেলেরি, আলু এবং লবন মিশিয়ে নিতে হবে।
  • এরপর এতে জল ঢেলে মিশিয়ে নিতে হবে।
  • ১০ – ১৫ মিনিটের জন্য প্যান টিকে কোনো প্লেট দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে। এই সময়

গ্যাসের ফ্লেম মাঝারি করে রাখা দরকার।

  • সময় সম্পূর্ণ হয়ে গেলে প্যানের রাখা মিশ্রনটি ফুটিয়ে নিতে হবে। এবং বাটিতে গরম

গরম ঢেলে পরিবেশন করতে হবে।

সেলেরির রস তৈরীর পদ্ধতি –

উপকরণ –

  • ৫০ গ্রাম সেলেরি
  • ১/২ পাতিলেবু
  •  লবণ স্বাদানুসারে
  •  ১/২ গ্লাস জল

প্রস্তুত প্রণালী –

  • গ্রাইণ্ডারে সেলেরি দিয়ে তাতে জল ঢালতে হবে।
  • এরপর এটা ভালো করে গ্রাইণ্ড করে নিতে হবে।
  • এরপর মিশ্রণটি বের করে তা সুতির কাপড়ের সাহায্যে ছেঁকে নিতে হবে।
  • সবশেষে রস গ্লাসে ঢেলে তাতে স্বাদানুসারে লবন এবং পাতিলেবুর রস মিশিয়ে নিতে

হবে।

সেলেরি পাতা বেছে নেওয়ার উপায় এবং সংরক্ষন পদ্ধতি –

নিম্নলিখিত উপায়ে সেলেরি পাতা বেছে নেওয়া এবং সংরক্ষণ করা যায়।

  • সাধারণত ২ সপ্তাহ পর্যন্ত রেফ্রিজারেটারে সেলেরি পাতা সংরক্ষণ করা যায়।
  • এছাড়াও সেলেরি পাতা ছোট ছোট টুকরো করে এয়ারটাইট পাত্রে ভরে দুই সপ্তাহের বেশি সময় সংরক্ষন করা যায়।
  • আপনি যদি ১ মাসেরও বেশি সময় সেলেরি পাতা সংরক্ষণ করতে চান তাহলে পাতা গুলিকে একদম শুকিয়ে এয়ারটাইট পাত্রে ভরে রাখতে হবে।
  • ১ মাসেরও বেশি সময় সেলেরি পাতা সংরক্ষন করতে হলে পাতা শুকিয়ে এয়ারটাইট

ব্যাগে ভরে জলপাই তেলের সাহায্যে সংরক্ষণ করা যায়।

সেলেরি পাতার পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া –

সেলেরি পাতার পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া গুলি হলো নিম্নরূপ –

  • যদি একসাথে প্রচুর পরিমাণে সেলেরি জুস বা রস পান করা হয় তাহলে ফটো টক্সিসিটি অর্থাৎ এক ধরণের ত্বকের অ্যালার্জি সহ অন্যান্য ত্বকের সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে।
  • এছাড়াও বেশি পরিমাণে সেলেরি পাতা গ্রহণ করলে কিডনিতে পাথর হওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। তাই পরিমিত পরিমাণে সেলেরি পাতা ব্যবহার করা উচিৎ।
  • বাজারে চলতি সেলেরি পাতার ব্যবহার এড়িয়ে চলা উচিৎ। কারণ এতে প্রচুর অপ্রয়োজনীয় উপাদান বিশেষত ক্ষতিকারক উপাদান থাকে। যা শরীরের ওপর খারাপ প্রভাব ফেলে। অবশ্য এই ব্যাপারে এখনও অবধি কোনো জোরালো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
  • ইতিমধ্যে যারা ডায়াবিটিসে আক্রান্ত এবং নিয়মিত ইনসুলিন ব্যবহার করেন। সেলেরি গ্রহণের পূর্বে অবশ্যই তাদের চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করা দরকার। তাহলে ওপরের প্রবন্ধ থেকে আপনারা সেলেরির

উপকারিতা, স্বাস্থ্য গুণ, পৌষ্টিক উপাদান সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা পেলেন। এবং সেলেরির পার্শ প্রতিক্রিয়া সম্পর্কেও একটা ধারণা লাভ করলেন। এসব কিছুর পরেও একটা কথা মাথায় রাখা দরকার যে, যেকোনো খাদ্য বা পাণীয়ই পরিমিত পরিমাণে গ্রহণ করা স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। এর অন্যথা হলে নানারকম শারীরিক সমস্যার সৃষ্টি হয়।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী –

দৈনিক কতটা পরিমাণ সেলেরি গ্রহণ করা যায়?

সাধারণ ভাবে দৈনিক ২ টি সেলেরি গাছ খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করা যেতে পারে। তবুও এই বিষয়ে বিশদে জানতে হলে একজন পুষ্টিবিদের সাথে পরামর্শ গ্রহণ করে নেওয়া জরুরী।

সেলেরি কী লিভারের জন্য ভালো?

সেলেরি লিভারের জন্য ভালো। বিস্তারিত ওপরের প্রবন্ধে আলোচনা করা হয়েছে।

সেলেরি এবং পিনাট বাটার কী স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী?

সেলেরি এবং পিনাট বাটার এর সমন্বয় একটা ভালো স্ন্যাক্সের উদাহরণ হতে পারে। অতএব সুস্বাস্থ্য গঠনের জন্য এটাকে ভালো হিসবেই বিবেচনা করা হয়।

সেলেরির থেকে সর্বোচ্চ পরিমাণে স্বাস্থ্যোপযোগীতা পাওয়ার উপায় কী?

তাজা সেলেরির রস থেকে সর্বোচ্চ পরিমাণে উপযোগ পাওয়া যায়।

সেলেরি কোথায় চাষ করা হয়?

এই সম্পর্কে এই প্রবন্ধে এই প্রবন্ধে আগেই আলোচনা করা হয়েছে।

সেলেরির কোন অংশ আমরা গ্রহণ করি?

আমরা সাধারণত সেলেরির পাতা এবং কাণ্ড ব্যবহার করে থাকি।

সেলেরির গাছের কাটা অংশ থেকে কী নতুন গাছ জন্মায়?

হ্যাঁ সেলেরির গাছের কাটা ডাল মাটিতে পুঁতে দিলে তা থেকে শিকড় বের হয়ে নতুন গাছের জন্ম হয়।

সেলেরির উপরের অংশ কি?

সেলেরির উপরের অংশ একটি পাতা ধারণকারী স্টেম, যা খাদ্যের জন্য ব্যবহার করা হয়।

সেলেরি পাতা কী খাওয়া যায়?

হ্যাঁ, আমরা সেলেরির ডাল এবং পাতা খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করি।

সেলেরি কীভাবে রেফ্রিজারেটারে সংরক্ষণ করা যায়?

এই বিষয়ে ওপরের প্রবন্ধে বিশদে আলোচনা করা হয়েছে।

সেলেরি কী একটি সুপারফুড?

হ্যাঁ, এর উপকারীতার ওপর ভিত্তি করে একে সুপারফুড বলা যেতে পারে।

সেলেরি কী ওজন কমাতে সহায়তা করে?

হ্যাঁ তা করে।

সেলেরি জুস কী কিডনিতে পাথর সৃষ্টি ক্রতে পারে?

মাত্রাতিরিক্ত পরিমানে সেলেরি গ্রহণ করলে কিডনি পাথর হওয়ার সম্ভবনা তৈরী হয় বৈকি।

প্রতিদিন সকালে সেলেরি জুস পান করলে কি হয়?

প্রতিদিন সকালে নিয়মিত সেলেরি জুস পান করলে, ওপরের প্রবন্ধে উল্লিখিত সকল স্বাস্থ্য সম্পর্কিত উপকারিতা পেতে পারেন।

সেলারি জুস কি রাতে পান করা যায়?

রাতে সেলারি রস পান না করার কোনো কারণ নেই। তাই এই মুহূর্তে সেলারি জুসের উপকারিতা পেতে রাতে এটি পান করলে কোন ক্ষতি নেই। যাইহোক, নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে, রাতে সেলেরির  রস পানের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

20 Sources

Was this article helpful?
scorecardresearch