চিকেন পক্সের কারণ, লক্ষণ এবং ঘরোয়া প্রতিকার । Home Remedies For Chicken Pox in Bengali

by

চিকেন পক্স বা জল বসন্ত হল এক ধরণের ভাইরাস ঘটিত সংক্রমণ। এটি একটি ছোঁয়াচে রোগ। বাতাসের মাধ্যমে এই সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এই রোগের সঙ্গে আমরা প্রায় সকলেই পরিচিত। চিকেন পক্স হলে শরীরে যে গুটি গুটি দেখা যায়, তরল পদার্থ ভরা ওই ভ্যাসিকুলার র‍্যাশগুলি প্রচণ্ড চুলকায় এবং অনেক সময় জ্বরও আসে। চিকেন পক্স সেরে গেলেও এর দাগ দীর্ঘদিন পর্যন্ত থেকে যায়। যারা একবারও এই রোগে আক্রান্ত হননি তাদের শরীরে এই সংক্রমণ দ্রুত ছড়ায় এবং প্রচণ্ড ব্যথা ও অস্বস্তির কারণ হয়ে ওঠে। প্রাকৃতিক ঘরোয়া উপায়ে এই ভাইরাল সংক্রমণের লক্ষণ অনেকটা কম করা সম্ভব। আমাদের এই প্রতিবেদনে চিকেন পক্স সম্পর্কে জরুরি তথ্য তুলে ধরা হল। সেইসঙ্গে এর যন্ত্রণা উপশমের কিছু ঘরোয়া প্রতিকার সম্পর্কে আলোচনা করা হল। আসুন এই বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জেনে নেওয়া যাক।

চিকেন পক্স কী?

চিকেন পক্স, অনেকের কাছে জলবসন্ত নামেও পরিচিত। এই ভাইরাল ইনফেকশনের জন্য দায়ী ভেরিসেলা-জস্টার ভাইরাস (Varicella-zoster Virus or VZV)। কখনও কখনও এটিকে ভেরিসেলা হিসেবেও চিহ্নিত করা হয় (1)। প্রথমে পিঠে ছোটো লাল রঙের জলের মতো গুটি দেখা দেয়। তারপর ধীরে ধীরে তা সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। প্রচণ্ড জ্বালা এবং যন্ত্রণা হয়। জ্বর আসে, মাথা ব্যথা করে এবং শরীর দুর্বল হয়ে যায়। এটি খুবই ছোঁয়াচে। এই রোগ পুরোপুরি সারতে প্রায় দশদিন মতো সময় লেগে যায়। টীকা নেওয়ার মাধ্যমে এই সংক্রমণ প্রতিরোধ করা সম্ভব। সাধারণত শিশু এবং প্রাপ্তবয়স্কদের এটি বেশি হয়ে থাকে। চিকেন পক্স নিয়ে নানান জনের নানা ধারণা রয়েছে। কারও মতে, জীবনে একবার হলেও এই রোগ হবে। আবার কেউ মনে করেন, একবার হয়ে গেলে আর কোনওদিন চিকেন পক্স হয় না।

চিকেন পক্স কীভাবে ছড়ায় ?

যেমনটা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে চিকেন পক্স বা জল বসন্ত একটি ভাইরাল সংক্রমণ। আর এই সংক্রমণের পিছনে মূলত দায়ী ভেরিসেলা-জস্টার ভাইরাসের সংস্পর্শে এলেই চিকেনপক্স হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এই ভাইরাস খুব সহজেই এক ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তির শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। কীভাবে সংক্রমণ ছড়ায় সে সম্পর্কে নিচে আলোচনা করা হল (2)।

  • এটি সর্দি, ফ্লু, কাশির মাধ্যমে একজন থেকে অন্য জনের শরীরে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
  • চিকেন পক্সে আক্রান্ত রোগীর সঙ্গে একসঙ্গে এক ঘরে থাকলে এটি ছড়ায়।
  • চিকেন পক্সের গুটি হাতে লাগলে সংক্রমণ ছড়াতে পারে।
  • রোগীর জামাকাপড়ের সংস্পর্শে এলেও এটি ছড়িয়ে যেতে পারে।
  • এছাড়া রোগীর ব্যবহৃত অন্যান্য জিনিসপত্র থেকেও সংক্রমণ ছড়াতে পারে।

চিকেন পক্সের লক্ষণ

চিকেন পক্স হলে সাধারণত যে লক্ষণগুলি দেখা দেয় সেগুলি হল (1) –

  • ত্বকের উপর তরল পদার্থ ভরা র‍্যাশ দেখা দেয়
  • গুটিগুলি সাধারণত লাল অথবা গোলাপী রঙের হয়ে থাকে
  • প্রচণ্ড জ্বালা এবং চুলকানি
  • অস্থির লাগে
  • জ্বর
  • ক্লান্তিভাব
  • খিদে কমে যায়
  • মাথাব্যথা

চিকেন পক্সের রিক্স ফ্যাক্টরস

চিকেন পক্স যাদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে (2) :

  • যাদের আগে কখনও চিকেন পক্স হয়নি।
  • চিকেন পক্সের টিকা যারা নেননি।
  • ‘ভেরিসেলা-জস্টার ভাইরাস’ বাচ্চাদের খুব সহজেই আক্রান্ত করতে পারে।
  • শরীর দুর্বল হলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। এমন পরিস্থিতিতে সহজেই এই ভাইরাল সংক্রমণ হওয়া ভয় থাকে।

চিকেন পক্স প্রতিকারের ঘরোয়া উপায়

চিকেন পক্সের চিকিৎসা অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী করা উচিত। যদিও কিছু ঘরোয়া উপায়ে এর প্রভাব কিছুটা হলেও কম করা সম্ভব। তবে অবশ্যই ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করে তবেই এই ঘরোয়া টোটকা ব্যবহার করুন। সেইসঙ্গে মনে রাখবেন ঘরোয়া প্রতিকার রোগ নিরাময়ের চিকিৎসা নয়, এতে কেবলমাত্র রোগের লক্ষণ কিছুটা কম হতে পারে। তাতে সাময়িক আরাম পেতে পারেন। এবার জেনে নিন চিকেন পক্সের ঘরোয়া প্রতিকারগুলি কী কী –

১. অ্যালোভেরা দিয়ে চিকেনপক্সের চিকিৎসা

সামগ্রী :

  • একটি অ্যালোভেরা পাতা

কীভাবে ব্যবহার করবেন :

  • পাতার ভিতর থেকে অ্যালোভেরা জেল বের করে কোনও এয়ারটাইট কৌটোতে ভরে রাখুন।
  • জেল র‍্যাশের উপর লাগান
  • কিছুক্ষণ ত্বকে লাগিয়ে রেখে দিন।
  • বাকী জেল ফ্রিজে স্টোর করে রেখে দিন। সাতদিন পর্যন্ত তা ব্যবহার করতে পারবেন।

চিকেন পক্সের জ্বালা, যন্ত্রণা কমাতে দিনে ২-৩ বার অ্যালোভেরা জেল ব্যবহার করুন।

উপকারিতা :

অ্যালোভেরা যে ত্বকের জন্য উপকারী তা আমাদের জানা। চিকেন পক্সের সময়ও এটি দারুণ কাজ দেয়। ত্বক ঠান্ডা রাখে এবং ত্বকের জ্বালা, যন্ত্রণা দূর করে আরাম দেয়। এনসিবিআই (National Center for Biotechnology Information) এর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী, এতে অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি গুণ রয়েছে যা জ্বালা, যন্ত্রণা কম করতে সাহায্য করে (3)। ছোটো বড় সকলেই এটি ব্যবহার করে উপকার পেতে পারবেন।

২. নিম

সামগ্রী :

  • একমুঠো নিম পাতা
  • জল (প্রয়োজনমতো)

কীভাবে ব্যবহার করবেন :

  • প্রয়োজনমতো জল মিশিয়ে নিম পাতার পেস্ট তৈরি করে নিন।
  • পেস্টটি গুটিগুলির উপর লাগিয়ে কিছুক্ষণ রেখে দিন।
  • নিম পাতা জলে ফুটিয়ে সেই জল দিয়ে স্নান করলেও উপকার পাবেন।

নিম পাতার পেস্ট দিনে দুবার লাগাতে পারেন এবং নিম পাতা মেশানো গরম জল দিয়ে একবার স্নান করুন।

উপকারিতা :

এনসিবিআইয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, নিম পাতার মধ্যে রয়েছে অ্যান্টিভাইরাল গুণ। যা চিকেন পক্সের পিছনে দায়ী ভাইরাসের প্রভাব কম করতে পারে। সেইসঙ্গে সংক্রমিত ত্বকে জ্বালা কম করে আরাম দেয়। চুলকানি এবং র‍্যাশ দূর করতে নিম দারুণ ওষুধ। নিম পাতার পেস্ট পক্সের গুটি তাড়াতাড়ি শুকাতে সাহায্য করে (4)। তাই চিকেন পক্সের চিকিৎসা নিম পাতা ব্যবহার করতে পারেন।

৩. বেকিং সোডা দিয়ে স্নান

সামগ্রী :

  • অর্ধেক কাপ বেকিং সোডা
  • স্নানের জন্য গরম জল

কীভাবে ব্যবহার করবেন :

  • স্নান করা যাবে এমন গরম জল নিন।
  • এবার এক কাপ বেকিং সোডা স্নানের জলে মিশিয়ে নিন।
  • সেই জল দিয়ে ভালো করে স্নান করে নিন।

সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে প্রত্যেকদিন এর ব্যবহার করতে পারেন।

উপকারিতা :

স্নান করতে পারবেন এমন গরম জল নিন। খুব বেশি গরম জল নেবেন না। জলে সোডা মিশিয়ে স্নান করলে ত্বকের জ্বালা, যন্ত্রণা থেকে আরাম পেতে পারেন (5)। অন্যদিকে এতে উপস্থিত অ্যান্টিফাঙ্গাল এবং অ্যান্টি ব্যাক্টেরিয়াল গুণ সংক্রমিত ত্বককে ফাঙ্গাল এবং ব্যাক্টেরিয়ার সংক্রমণ থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করতে পারে (6), (7)। যদিও বেকিং সোডা সরাসরি কীভাবে চিকেন বক্সের জন্য উপকারী, সে বিষয়ে আরও গবেষণা করা দরকার।

৪. ওটমিল বাথ

সামগ্রী :

  • দুই কাপ ওট
  • চার কাপ জল
  • একটি কাপড়ের থলি
  • গরম জল

কীভাবে ব্যবহার করবেন :

  • প্রথমে ওটমিল পিষে চার কাপ জলে কিছুক্ষণ ভেজাতে দিন।
  • এবার ভেজানো ওটমিল একটি কাপড়ের থলিতে ভরে মুখ বেঁধে নিন।
  • স্নানের জলে ওটমিলের থলে পাঁচ থেকে দশ মিনিট রেখে দিন।
  • তারপর ওই জল দিয়ে ভালো করে স্নান করে নিন।

উপকারিতা :

চিকেন পক্সের অন্যতম আয়ুর্বেদিক প্রতিকার হল ওটমিল বাথ (5)। সংক্রমিত ত্বকের জ্বালা কম করতে এবং ত্বক পরিষ্কার রাখতে ওটমিল খুব উপকারী। এতে ময়েশ্চারাইজিং এজেন্ট রয়েছে যা ত্বকে চুলকানি কম করে। এর অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি গুণ জ্বালা কমাতে সাহায্য করে (8)।

৫. ভিনিগার বাথ

সামগ্রী :

  • এক কাপ ব্রাউন ভিনিগার বা অ্যাপেল সিডার ভিনিগার
  • গরম জল

কীভাবে ব্যবহার করবেন :

  • স্নানের জলে ভিনিগার মিশিয়ে স্নান করুন।
  • তারপর আরেকবার পরিষ্কার জল দিয়ে গা ধুয়ে নিন।

খুব বেশি সমস্যা হলে একদিন অন্তর এই পদ্ধতি ব্যবহার করতে পারেন।

উপকারিতা :

ভিনিগার দিয়ে স্নান চিকেন পক্সের সমস্যা কিছুটা হলেও কম করতে পারে। ভিনিগারে অ্যান্টি মাইক্রোবিয়াল (ব্যাক্টেরিয়া, পরজীবী, ভাইরাস এবং ফাঙ্গাসের বিরুদ্ধে লড়াই করতে) গুণ সমৃদ্ধ। এটি চিকেন পক্সের ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সহায়ক হতে পারে (9), (10)। চিকেন পক্সের চিকিৎসায় এই ঘরোয়া উপায় ব্যবহার করতে পারেন।

৬. আদা

সামগ্রী :

  • দুই থেকে তিন চামচ আদা পাউডার

কীভাবে ব্যবহার করবেন :

  • স্নানের জন্য হালকা গরম জল নিন।
  • জলে আদার পাউডার মেশান এবং সেই জল দিয়ে স্নান করুন।

সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে প্রত্যেকদিন এটি ব্যবহার করতে পারেন।

উপকারিতা :

আদার মধ্যে অ্যান্টিভাইরাল গুণ রয়েছে (11)। আদার মধ্যে উপস্থিত গুণ চিকেন পক্সের ভাইরাসের প্রভাব কম করতে সাহায্য করতে পারে। তবে চিকেন পক্সে আদা কতটা প্রভাবদায়ী হবে সে বিষয়ে আরও গবেষণা করা প্রয়োজন। সেইসঙ্গে এর ব্যবহারে ত্বকে আরও জ্বালা অনুভব করতে পারেন, তাই ব্যবহারের আগে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিন।

৭. নুন দিয়ে স্নান

সামগ্রী :

  • অর্ধেক কাপ নুন
  • এক চামচ ল্যাভেন্ডার ওয়েল
  • স্নানের যোগ্য গরম জল

কীভাবে ব্যবহার করবেন :

  • স্নান করার উপযুক্ত গরম জল নিন এবং তাতে নুন এবং ল্যাভেন্ডার ওয়েল মিশিয়ে নিন।
  • ওই জল দিয়ে স্নান করুন।

প্রত্যেকদিন এই পদ্ধতি ব্যবহারে সমস্যা থেকে কিছু হলেও মুক্তি পেতে পারবেন।

উপকারিতা :

চিকেন পক্সের সময় নুন দিয়ে স্নান উপকারী হতে পারে। আসলে নুন অ্যান্টি মাইক্রোবিয়াল গুণমান সমৃদ্ধ (12)। যেমনটা উপরে উল্লেখ করা হয়েছে, যে নুন চিকেন পক্সের ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই এবং তার প্রভাব কম করতে সহায়ক হতে পারে। সেই কারণে বলা যেতে পারে চিকেন পক্সের অস্বস্তি থেকে আরাম পেতে নুন দিয়ে স্নান করতে পারেন।

৮. ক্যালামাইন লোশন

সামগ্রী :

  • এক কাপ ক্যালামাইন লোশন
  • চার-পাঁচ ফোঁটা ল্যাভেন্ডার ওয়েল

কীভাবে ব্যবহার করবেন :

  • একটি বোতলে ক্যালামাইন লোশনের সঙ্গে ল্যাভেন্ডার ওয়েল ভালো করে মিশিয়ে নিন।
  • তারপর সেই মিশ্রণটি চিকের পক্সের গুটির উপর লাগিয়ে নিন।

প্রত্যেকদিন তিন চার বার এর ব্যবহার করুন, উপকার পাবেন।

উপকারিতা :

চিকেন পক্সে আক্রান্ত হলে প্রচণ্ড জ্বালা এবং চুলকানি হয়। যা দূর করতে ক্যালামাইন লোশন খুব উপকারী (1)। ক্যালামাইন লোশন চুলকানি থেকে মুক্তি দেয় এবং সংক্রমিত ত্বকের জ্বালা কম করতে সহায়ক হতে পারে (13), (14)।

৯. হার্বাল টি

সামগ্রী :

  • একটি হার্বাল টি ব্যাগ
  • এক কাপ গরম জল
  • এক চামচ মধু

কীভাবে ব্যবহার করবেন :

  • গরম জলে হার্বাল টি ব্যাগটি কিছুক্ষণ ডুবিয়ে রাখুন।
  • চা ছেঁকে নিন এবং তাতে এক চামচ মধু মেশান।
  • তারপর ধীরে ধীরে চা চুমুক দিয়ে খান।
  • আপনি চাইলে এতে সামান্য দারুচিনি পাউডার বা লেবুর রসও মেশানে পারেন।

উপকারিতা :

চিকেন পক্স হলে হার্বাল টি খেতে পারেন। তাতে কিছুটা হলেও স্বস্তি পাবেন। এই বিষয়ে করা একটি গবেষণায় দেখা গেছে ক্যামোমাইল চা চিকেন পক্সের জন্য খুব আরামদায়ক। এটি ত্বকের জ্বালাভাব এবং র‍্যাশ কম করতে সহায়ক হতে পারে (15)। শরীরের প্রতিরক্ষা ক্ষমতা বাড়াতে তুলসীর ব্যবহার করা যেতে পারে, কারণ এতে রয়েছে ইমিউনোথেরেপটিক গুণ (16)।

১০. মধু

সামগ্রী :

  • মধু (প্রয়োজনমতো)

কীভাবে ব্যবহার করবেন :

  • পক্সের গুটির উপর মধু লাগান।
  • কম করে ২০ মিনিট মধু লাগিয়ে রাখুন।
  • ২০ মিনিট পর পরিষ্কার জল দিয়ে ত্বকের উপর থেকে মধু মুছে নিন।

দিনে অন্তত দু’বার এই প্রক্রিয়া ব্যবহার করুন।

উপকারিতা :

ত্বকের উপর মধুর উপকারিতা অনেক। গবেষণায় দেখা গেছে মধুর মধ্যে অ্যান্টিব্যাক্টেরিয়াল গুণ রয়েছে, যা চিকেন পক্সের পিছনে মূল কারণ ভেরিসেলা জস্টার ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সহায়ক পারে (17)। এছাড়াও মধুর অ্যান্টিব্যাক্টেরিয়াল গুণ ত্বককে ব্যাক্টেরিয়ার সংক্রমণ থেকে রক্ষা করতে পারে (18)।

১১. গাঁদা ফুল

সামগ্রী :

  • সাত-আটটা গাঁদা ফুল
  • পাঁচ-ছ’টা হ্যাজেল গাছের পাতা
  • এক কাপ জল

কীভাবে ব্যবহার করবেন :

  • গাঁদা ফুল এবং হ্যাজেল গাছের পাতা সারারাত জলে ভিজিয়ে রাখুন।
  • সকালে এর পেস্ট তৈরি করে ত্বকে লাগান।
  • এই পেস্টটি এক-দু’ঘণ্টা লাগিয়ে রাখার পর জল দিয়ে ত্বক ধুয়ে নিন।

প্রক্রিয়াটি প্রত্যেকদিন দু’বার করে ব্যবহার করে দেখুন।

উপকারিতা :

গাঁদা ফুল ময়েশ্চারাইজিং-এর সঙ্গে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল এবং অ্যান্টি ভাইরাল গুণমান সমৃদ্ধ (19)। এর অ্যান্টিভাইরাল গুণ ভাইরাসের প্রভাব কম করতে সাহায্য করতে পারে। সেইসঙ্গে কোনওরকম সংক্রমণের হাত থেকেও রক্ষা করতে পারে।

১২. ভিটামিন ই ক্যাপসুল

সামগ্রী :

  • দুটি ভিটামিন ই ক্যাপসুল

কীভাবে ব্যবহার করবেন :

  • ক্যাপসুলের মধ্যে ভিটামিন ই অয়েল বের করে নিন।
  • এবার চিকেন পক্সের গুটির উপর তা লাগিয়ে কিছুক্ষণ রেখে দিন।

দিনে দুই থেকে তিন বার এটি ব্যবহার করতে পারেন।

উপকারিতা :

চিকেন পক্সের সমস্যায় ভিটামিন ই অয়েল সহায়ক হতে পারে। আসলে এটি ত্বক হাইড্রেট করে সেইসঙ্গে ত্বকের ঘা বা চোটের চিহ্ন মুছে ফেলতে সাহায্য করতে পারে (20), (21)। যদি, চিকেন পক্সের উপর এর প্রভাব কতটা লক্ষ্যণীয় সে বিষয়ে আরও গবেষণা করা প্রয়োজন।

১৩. এসেনশিয়াল অয়েল

সামগ্রী :

  • অর্ধেক কাপ নারকেল তেল
  • ১ চামচ নীলগিরি/টি ট্রি/ বা পেপারমিন্ট অয়েল

কীভাবে ব্যবহার করবেন :

  • যে কোনও একটি এসেনশিয়াল অয়েল নারকেল তেলের সঙ্গে মিশিয়ে নিন।
  • চিকেন পক্সের গুটির উপর মিশ্রণটি লাগিয়ে নিন।
  • যত বেশি সময় ধরে এটি লাগিয়ে রাখবেন তত ভালো ফল পাবেন।

দিনে ২-৩ বার এই মিশ্রণটি লাগান।

উপকারিতা :

গবেষণা অনুসারে এসেনশিয়াল অয়েল যেমন নীলগিরি অয়েল, টি ট্রি অয়েল, পেপারমিন্ট অয়েল চিকেন পক্সের জন্য উপকারী হতে পারে (22)। অন্যদিকে নারকেল তেল ত্বককে হাইড্রেট করে, পুষ্টি জোগায় এবং চুলকানির সমস্যা থেকে মুক্তি দিতে পারে (23)।

চিকেন পক্সের জন্য কখন ডাক্তারের পরামর্শ নেবেন?

জল বসন্তের লক্ষণ বা ধরণ সবার এক হয় না। কারও শরীরে দু-একটা লাল গুটি দেখা দেয়, আবার কারও শরীর বড় বড় গুটিতে ঢেকে যায়। সেইমতো কারও সামান্য জ্বর-জ্বালা হয়, আবার কেউ জ্বর-জ্বালায় কাবু হয়ে পড়েন। ঘরোয়া উপায়ে এর প্রভাব কম না হলে অবশ্যই ডাক্তারের কাছে যান। যদি জ্বর না কমে, খুব দুর্বল বোধ করেন সেক্ষেত্রে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া দরকার।

চিকেন পক্সের ডায়াগনোসিস

কিছু উপায় রয়েছে যার সাহায্য চিকেন পক্সের ডায়াগনোসিস বা নির্ণয় করা যেতে পারে। এখানে আমরা চিকেন পক্সের ডায়াগনোসিস সম্পর্কে আলোচনা করব (23) –

  • শারীরিক পরীক্ষার মাধ্যমে চিকেন পক্স হয়েছে কিনা তা জানা সম্ভব।
  • ভাইরাসের উপস্থিতি জানার জন্য ফোসকার মধ্যে উপস্থিত তরল পদার্থ নমুনা পরীক্ষা করা যেতে পারে।

ডাক্তারবাবু রক্ত পরীক্ষা করানোর পরামর্শও দিতে পারেন।

চিকেন পক্সের চিকিৎসা

ঘরোয়া প্রতিকার ছাড়াও চিকেন পক্সের চিকিৎসা কীভাবে করা যায়, নিচে সেই তথ্য দেওয়া হল  (24), (25):

  • ডাক্তারবাবু বেড রেস্টে থাকার পরামর্শ দিতে পারেন।
  • তরল খাবার খাওযার পরামর্শও দিতে পারেন।
  • জ্বর বেশি হলে প্যারাসিটামল নিতে পারেন।
  • নোনতা এবং টক জাতীয় খাবার এড়িয়ে চলুন।
  • নখ ছোটো করে কাটুন। প্রয়োজনে গ্লাফস পড়ুন। তাতে সংক্রমণ ছড়ানোর ভয় কম থাকবে।
  • সংক্রমণ বেশি হলে অ্যান্টিভাইরাল ড্রাগস নিতে পারেন।
  • ভ্যাকসিনও নিতে পারেন। চিকেন পক্স এড়াতে ছোটোদের এর ভ্যাকসিন দেওয়া হয়ে থাকে।

চিকেন পক্স হলে কী খাবেন ?

চিকেন পক্স হলে খাওয়াদাওয়ার দিকেও বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন। এখানে আমরা চিকেন পক্সের ডায়েট সম্পর্কে আলোচনা করব, কী খাওয়া উচিত আর কী নয় (26) ।

চিকেন পক্সের সময় এই সমস্ত খাবার খাওয়া উপকারী –

  • ভিটামিন এবং মিনারেল সমৃদ্ধ ফল এবং সবুজ শাক-সবজি খান।
  • বিশেষ করে ভিটামিন সি তে ভরপুর খাবার যেমন গাজর, ব্রকোলি, শসা বেশি করে খান।
  • জিঙ্ক, ম্যাগনেশিয়াম এবং ক্যালশিয়াম সমৃদ্ধ খাবার যেমন পালং, মাশরুম, নাটস, ওটস এবং কুমড়োর বীজ খান।
  • ইমিউনিটি বাড়াতে নিয়মিত ফলের রস খান।
  • এর পাশাপাশি পর্যাপ্ত জল খান, যাতে শরীরে জলের ঘাটতি না তৈরি হয়।
  • চিকেন স্যুপ করে খেতে পারেন, এতে শরীরে শক্তি আসবে। তবে অনেকেই নানা কারণে এই সময় আমিষ খান না , তবে এখন ডাক্তাররা আমিষ খেতে বলেন শরীরের ক্লান্তি দূর করে শরীরকে তাড়াতাড়ি সুস্থ করার জন্য। তবে মনে রাখবেন, রান্নায় যেন তেল মশলা খুবই অল্প দেওয়া হয়। এই সম্পর্কে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে নেবেন।

চিকেন পক্সের সময় যেগুলি এড়িয়ে চলবেন –

  • বেশি পরিমাণে লঙ্কা, আদা, গোল মরিচ, সরষে, রসুন এবং পিঁয়াজ।
  • সি-ফুড এড়িয়ে চলুন কারণ কারণ এতে হিস্টামিন থাকে, যা চুলকানি এবং অ্যালার্জির কারণ হতে পারে।
  • চকোলেট
  • ক্যাফেইনযুক্ত পানীয়
  • রেড মিট না খাওয়াই ভালো
  • মশলাদার খাবার এড়িয়ে চলুন।

চিকেন পক্স থেকে বাঁচার উপায়

চিকেন পক্স থেকে বাঁচার উপায় নিচে দেওয়া হল (27) –

ভ্যাকসিন : চিকেন পক্স এড়াতে সবচেয়ে ভালো উপায় হল এর ভ্যাকসিন। ভেরিসেলা ভ্যাকসিন বাচ্চাদের ১২ থেকে ১৫ মাসের মধ্যে দেওয়া হয়। ভ্যাকসিনের দ্বিতীয় ডোজটি চতুর্থ এবং ষষ্ঠ বছরের মধ্যে দেওয়া হয়।

  • যদি কোনও ব্যক্তির চিকেন পক্স হয়, তার সংস্পর্শ এড়িয়ে চলুন।
  • কোনও ধরণের ইনফেকশন এড়াতে নিজেকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখুন।
  • সেইসঙ্গে খাওয়াদাওয়া সম্পর্কে খেয়াল রাখুন। ডায়েট সম্পর্কে উপরে দেওয়া তথ্য মাথায় রাখুন।

আশা করি চিকেন পক্স সম্পর্কিত তথ্য পড়ে আপনি উপকৃত হবেন। অযথা আতঙ্কিত হবেন না। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকুন, সতেচন থাকুন। তাহলেই আপনি নিজেকে এবং আপনার পরিবারকে যে কোনও ধরণের সংক্রমণ থেকে রক্ষা করতে পারবেন। যদি কেউ চিকেন পক্সে আক্রান্ত হন তাহলে ঘরোয়া প্রতিকার ব্যবহার করুন। তবে যদি পরিস্থিতি গুরুতর হয় তাহলে অবিলম্বে ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী

চিকেন পক্স কী খুব বিপজ্জনক?

সময়মতো চিকিৎসা করালে এতে ভয়ের কিছু নেই। তবে অবহেলা করবেন না। তাতে ক্ষতি হতে পারে।

শরীরে চিকেন পক্সের গুটি কোথায় প্রথম শুরু হয়?

লাল রঙের ফুসকুড়ি প্রথমে বুকে, পিঠে এবং মুখের উপর দেখা দিতে পারে। তারপর সমস্ত শরীরে ছড়িয়ে পড়ে।

বড়দের কী কোনও বাচ্চার থেকে চিকেন পক্স হতে পারে?

হ্যাঁ, যাদের ইমিউনিটি পাওয়ার কম থাকলে চিকেন পক্সে আক্রান্ত কারও সংস্পর্শে এলে এই ভাইরাল সংক্রমণ হতে পারে।

চিকেন পক্সে কেন এত চুলকানি হয় এবং কীভাবে চুলকানি থেকে মুক্তি পাওয়া যায়?

এই ভাইরাল সংক্রমণের কারণে চুলকানি হয় এবং এর থেকে মুক্তি পেতে নিবন্ধে উল্লিখিত ঘরোয়া প্রতিকারগুলি ব্যবহার করা যেতে পারে।

স্মলপক্স আর চিকেনপক্স কী একইরকম?

দুটিই ভাইরাল সংক্রমণ, তবে এগুলি বিভিন্ন ভাইরাসের কারণে ঘটে। যেমন, চিকেন পক্সের জন্য দায়ী ভেরিসেরা-জস্টার ভাইরাস এবং স্মল পক্স হয়ে থাকে ভ্যারিওলা মেজর ভাইরাসের কারণে। তবে এই দুটি সংক্রমণই এক ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তির শরীরে ছড়াতে পারে। এর থেকে জ্বর এবং মাথাব্যথার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে (1), (28)।

চিকেন পক্স ঠিক হতে কতদিন সময় লেগে যায়?

সাধারণত চিকেন পক্স ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যে ঠিক হয়ে যেতে পারে (1)।

একটি শিশুকে চিকেন পক্সের টিকা কখন দেওয়া হয়?

বাচ্চাদের প্রথম ভেরিসেলা ভ্যাকসিন ১২ থেকে ১৫ তম মাসের মধ্যে দেওয়া হয়।

টিকা নেওয়ার পরও কি চিকেন পক্স হতে পারে?

হ্যাঁ, তবে এর লক্ষণগুলি খুব বেশি হয় না। হালকা ফুসকুড়ি এবং জ্বর হতে পারে (28)। তবে এটি খুব কম লোকের মধ্যে ঘটে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মানুষ এর থেকে নিরাপদ থাকে।

যদি চিকেন পক্স না হয়, তাহলে কী দাদ হতে পারে?

চিকেন পক্স ভাইরাস জনিত কারণে এবং দাদ ফাঙ্গাল সংক্রমণের কারণে ঘটে। এমন পরিস্থিতিতে চিকেনপক্স না হলে যে দাদ হবে তা বলা যায় না।

হাম এবং চিকেন পক্সের মধ্যে পার্থক্য কী?

চিকেন পক্স হয়ে থাকে ভেরিসেলা-জস্টার ভাইরাসের কারণে। অন্যদিকে হাম জন্য রুবেলা টিকা দেওয়া হয়। উভয়ই টিকাকরণের মাধ্যমে প্রতিরোধ করা সম্ভব।

চিকেন পক্সের ভ্যাকসিন কী ঋতুস্রাবে বিলম্ব তৈরি করতে পারে?

না, চিকেন পক্সের ভ্যাকসিনের সঙ্গে ঋতুস্রাবের কোনও সম্পর্ক নেই।

গর্ভাবস্থায় চিকেনপক্স কী বিপজ্জনক?

হ্যাঁ, গর্ভাবস্থায় চিকেন পক্স হলে তা গর্ভবতী মহিলা এবং ভ্রুণ উভয়ের জন্য জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।

চিকেন পক্সের কারণে কী জন্মগত ত্রুটি হতে পারে?

ভেরিসেলা ভাইরাসটি গর্ভবতী মা থেকে তার গর্ভস্থ শিশুর শরীরে ছড়াতে পারে। যার ফলে ভেরিসেলা সিন্ড্রোমের সঙ্গে জন্ম নেওয়ার শিশুর মধ্যে জন্মগত ত্রুটি দেখা দিতে পারে (29)।

গর্ভবতী হওয়ার সময় কী চিকেন পক্সের টিকা নিতে পারি?

না, গর্ভবতী মহিলাদের টিকা দেওয়া উচিত নয়। এ বিষয়ে সঠিক তথ্য পেতে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিন (29)।

গর্ভবতী মহিলার আশেপাশে চিকেন পক্সে আক্রান্ত শিশু থাকা নিরাপদ?

না, এটি নিরাপদ নয়। কারণ চিকেন পক্সের সংক্রমণ একটি রোগ যা সংস্পর্শের মাধ্যমে এক জনের থেকে অন্য জনের শরীরে ছড়াতে পারে।

জীবনে একবারের বেশি চিকেন পক্স হতে পারে?

জীবনে দ্বিতীয়বার সংক্রমিত হয়েছে, এমনটা খুব কম হয়ে থাকে। তবে দ্বিতীয়বার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে (30)।

30 Sources

Was this article helpful?
scorecardresearch