ঢেঁড়সের উপকারিতা, ব্যবহার ও পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া – All About Lady Finger (Okra) in Bengali

by

ঢেঁড়স যেমন খেতে সুস্বাদু তেমনি রান্না করাও সহজ এবং এতে রয়েছে নানা ধরণের পুষ্টিগুণ। এই ঢেঁড়স গাছের প্রথম উৎপাদিত হয় এশিয়া ও পশ্চিম আফ্রিকায়। আমাদের এই প্রতিবেদনে রইলো ঢেঁড়স সম্পর্কিত সব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।

ঢেঁড়সের স্বাস্থ্য উপকারিতা

১. ডায়াবেটিস কমাতে

ঢেঁড়স রক্তে শর্করা পরিমান সঠিক রাখতে সাহায্য করে (1) এবং তার পাশাপাশি কোলেস্টেরলের মাত্রা ঠিক রাখতেও সক্ষম বলে জানা যায়। এর জন্য ঢেঁড়সের খোসা ও বীজই উপযুক্ত যা একটি গবেষণার থেকে জানা যায় (2)

ঢেড়সে উপস্থিত পলিস্যাকারাইড গ্লুকোজ সহনশীলতা উন্নত করে। তাছাড়া এই পলিস্যাকারাইডগুলি শরীরের বিপাকীয় রোগগুলি সারিয়ে তুলতে সাহায্য করে (3)

এছাড়া ঢেঁড়সে মাইরিসেটিন রক্তে শর্করার উচ্চ মাত্রাকে কম করতে সাহায্য করে (4)। ঢেঁড়সে থাকা ফাইবার অন্ত্রে গ্লুকোজ বেশি শোষিত হতে দেয় না, ফলে ডায়াবেটিসের সমস্যা দূর করতে পারে। কিন্তু মানুষের ওপর এ সম্পর্কে বহু গবেষণা এখনও অনেক বাকি (5)

২. হজমের সমস্যা ঠিক করতে

ঢেঁড়স গাছে সবে ফল হতে শুরু করলে বা কচি ঢেঁড়সে পলিস্যাকারাইড থাকে যা আঠালো প্রকৃতির হয় । তাই ধুয়ে নিয়ে কাঁচা চিবিয়ে খেলে এগুলি ব্যাকটিরিয়া ও নানা ধরণের জীবাণুগুলিকে সংক্রমণ ছড়াতে বাধা দেয় (6)। এই পলিস্যাকারাইড হেলিকোব্যাক্টর পাইলোরি নামক ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে বিশেষভাবে কার্যকর, যা গ্যাস্ট্রাইটিস এবং গ্যাস্ট্রিক আলসারের কারণ হিসাবে পরিচিত (6) অর্থাৎ এটি গ্যাস্ট্রিক আলসার কমাতে উপযোগী। শরীরের হজম ক্ষমতাকে উন্নত করতে সক্ষম এটি।

৩. হার্টকে স্বাস্থ্যকর করে তুলতে

আগেই আলোচনা করা হয়েছে যে ঢেঁড়স কোলেস্টেরলের মাত্রা ঠিক রাখতে উপযোগী, তাই হার্ট সংক্রান্ত রোগ থেকেও বাঁচাতে সাহায্য করতে পারে।

নানা গবেষণা অনুসারে, ঢেঁড়স কোলেস্টেরলের মাত্রা পরিচালনা করতে এতটাই কার্যকর যে এতে উপস্থিত পেকটিন অন্ত্রের মধ্যে পিত্তের উৎপাদন পরিবর্তন করে কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে এবং এটি কার্ডিওভাসকুলার রোগের ঝুঁকি হ্রাস করার সম্ভাবনা বাড়িয়ে তোলে (7)

৪. ক্যান্সার প্রতিরোধ করতে

ঢেঁড়স মানুষের স্তন ক্যান্সারের কোষগুলিতে অ্যান্টি-টিউমার প্রভাব প্রদর্শন করতে সক্ষম (8)

ঢেঁড়সের বীজগুলির নির্যাস ত্বকের ক্যান্সার কোষগুলিকে মেরে ফেলতে পারে তাই মেলানোমা (ত্বকের ক্যান্সার) ক্ষেত্রে নতুন দিশা এনে দিতে পারে (9)

৫. কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে

ঢেঁড়সে উপস্থিত ফাইবার কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে উপযোগী বলে জানা যায়। এটি আপনার ডায়েটে নিয়মিত থাকলে কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা দূর হয়ে যেতে পারে।

৬. দৃষ্টিশক্তি উন্নত করতে

লিউটিন, জিয়া জ্যানথিন ও মেসো-জিয়া জ্যানথিন নামক ক্যারোটিনয়েড এবং ভিটামিন এ, অ্যান্টি অক্সিডেন্ট উপস্থিত থাকে এই ঢেঁড়সে। এগুলি চোখের স্বাস্থ্য উন্নত করতে পারে (10) । এক্ষত্রে কাঁচা ঢেঁড়স ভালো করে ধুয়ে চিবিয়ে খেলে বেশি উপকার পাওয়া যায়।

৭. ওজন হ্রাস করতে

ঢেঁড়সে থাকা ফাইবার অনেকটা সময় পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে এবং ঢেঁড়সে ক্যালোরির পরিমাণ খুব কম তাই খিদেও পায় না। তাই যারা আপনি যদি ওজন কমাতে চান, তাহলে অবশ্যই এটি নিজের খাদ্য তালিকায় যোগ করুন।

৮. ব্লাড প্রেসার সঠিক রাখতে

হার্টকে স্বাস্থ্যকর করে তুলে শরীরে রক্ত চলাচল স্বাভাবিক রাখে এই সবজি।

৯. গর্ভাবস্থায় সুবিধা

ঢেঁড়সে থাকে ফলিক অ্যাসিড, যা প্রেগন্যান্ট অবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান।

এই ফলিক অ্যাসিড গর্ভস্থ বাচ্চাকে জন্মগত ত্রুটি থেকে রক্ষা করে (একে নিউরাল টিউব ডিফেক্টস বলা হয়)। গর্ভাবস্থার প্রথম কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সাধারণত নিউরাল টিউব ডিফেক্টস দেখা দিতে পারে বাচ্চার মধ্যে (11)

এছাড়া ফলিক অ্যাসিড গর্ভাবস্থার চতুর্থ থেকে দ্বাদশ সপ্তাহের মধ্যে ভ্রূণের নিউরাল টিউব গঠনে সহায়তা করে। ঢেঁড়সে উপস্থিত ভিটামিন সি গর্ভস্থশিশুর বিকাশেও সহায়তা করে বলে জানা যায় (6)

১০. অ্যান্টি – অক্সিডেন্ট

ঢেঁড়স অ্যান্টি – অক্সিডেন্টে ভরপুর  (12), তাই এটি শরীরে বর্জ্য পদার্থ দূর করতে সাহায্য করে ও শরীরকে চনমনে করে তোলে।

১১. ত্বককে স্বাস্থ্যকর করে তুলতে

ত্বকের জন্য ভিটামিন সি -এর উপকারী ।(13) ত্বকের কোষগুলির যত্ন করতে ভিটামিন সি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এতে উপস্থিত অ্যান্টি – অক্সিডেন্ট ত্বকের বিষাক্ত পদার্থও দূর করতে পারে।

১২. চুলের স্বাস্থ্য উন্নত করতে

ঢেঁড়স চুলের খুশকি, স্ক্যাল্পের শুষ্কতা ও চুলকানি দূর করতে পারে এবং চুলকে স্বাস্থ্যকর করে তুলে চুলকে ঝলমলে রাখে।

ঢেঁড়সের পুষ্টিগত মান  (প্রতি ১০০ গ্রামে ) (14):

                       নাম                        পরিমান 
                       জল                     ৮৯.৫৮ গ্রাম
                    এনার্জি                     ৩৩ কিলো ক্যালোরি
                     প্রোটিন                      ১.৯৩ গ্রাম
                     ফাইবার                        ৩.২ গ্রাম
                 কার্বোহাইড্রেট                      ৭.৪৫ গ্রাম
                    ফোলেট                        ৬০ মাইক্রো গ্রাম
                   ভিটামিন সি                        ২৩ মিলিগ্রাম
                   পটাসিয়াম                       ৩০৩ মিলিগ্রাম
              লিউটিন-জিয়া জ্যানথিন                     ২৮০ মাইক্রোগ্রাম
                  বিটা ক্যারোটিন                      ৪১৬ মাইক্রোগ্রাম
                   ম্যাগনেসিয়াম                       ৫৭ মিলিগ্রাম
                    ফসফোরাস                        ৬১ মিলিগ্রাম
                    রাইবোফ্ল্যাবিন                       ০.০৬ মিলিগ্রাম
                      থিয়ামিন                       ০.২ মিলিগ্রাম

কিভাবে ঢেঁড়স ব্যবহার করবেন ?

  • ডালের সাথে এই সবজি ভাজা করে খেতে পারেন। এতে অল্প আলুও মেশাতে পারেন।
  • ঢেঁড়সের তরকারি বানিয়েও খেতে পারেন।
  •  ঢেঁড়স পোস্ত বানাতে পারেন।
  • মূলত এটি ভাত বা রুটি দিয়ে খাওয়া যায়।

ঢেঁড়স কিভাবে কিনবেন ও বাড়িতে স্টোর করবেন ?

  • ঢেঁড়স সবসময় কচি দেখে ও আকারে ছোটো দেখে কিনবেন। ঢেঁড়সটি কচি কিনা বোঝার জন্য ঢেঁড়সের শুরু দিকটা ভেঙে দেখে নেবেন। যদি সহজে ভেঙে যায় তাহলে বুঝবেন সেটি কচি।
  • কিনে এনে ভালো করে নুন জলে ধুয়ে শুকিয়ে নেবেন।
  • পুরো জল শুকিয়ে গেলে তবেই ফ্রিজে রাখবেন।
  • চাইলে হালকা সুতির কাপড় জড়িয়েও রাখতে পারেন।

ঢেঁড়সের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া

অন্য যেকোনো সবজির মতো ঢেঁড়সও অধিক মাত্রায়  খাওয়া উচিত নয়। নিচে এর পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে আলোচনা করা হল।

  •  ঢেঁড়সে পটাসিয়ামের মাত্রা বেশি থাকে, তাই এটি বেশি পরিমানে খেলে কিডনির সমস্যা দেখা দিতে পারে (15)
  • ঢেঁড়সে ফ্রুকটোন্স (fructans) নামক কার্বোহাইড্রেট জাতীয় উপাদান থাকে, যা শরীরে বেশি প্রবেশ করলে পেটের গন্ডগোল তৈরী করতে পারে।
  • ভিটামিন কে তে পরিপূর্ণ এই ঢেঁড়স আর ভিটামিন কে যদি শরীরে বেশি প্রবেশ করে তাহলে রক্ত জমাট বাঁধার সম্ভাবনা বেড়ে যায় (16)

ঢেঁড়সের গুনাগুণ সম্পর্কে তো জানলেন, তাহলে বুঝতেই পারছেন এটি শরীরের পক্ষে কতটা স্বাস্থ্যকর। এখন থেকে এটি নিজের ডায়েটে যোগ করতে ভুলবেন না যেন, কিন্তু তার আগে পারলে ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করে নেবেন । নিজের যত্ন করুন ও সুস্থ থাকুন।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলি:

১. ঢেঁড়সে কিভাবে ফ্রিজে রাখবেন ?

উঃ কিনে এনে ভালো করে নুন জলে ধুয়ে শুকিয়ে নেবেন। পুরো জল শুকিয়ে গেলে তবেই ফ্রিজে রাখবেন। চাইলে হালকা সুতির কাপড় জড়িয়েও রাখতে পারেন।

২.  ঢেঁড়স গাছের পাতা কি খাওয়া যায় ?

উঃ হ্যাঁ, ঢেঁড়স গাছের পাতা খাওয়া যায়।

৩. ঢেঁড়স কি কাঁচা খাওয়া যায় ?

উঃ হ্যাঁ, খেতে পারেন। এটির অনেক ধরণের উপকারিতা পাওয়া যায়।

৪. দিনে কতটা ঢেঁড়স খাওয়া যায় ?

উঃ দিনে একশো থেকে দুশো গ্রাম ঢেঁড়স খেতে পারেন।

৫.  ঢেঁড়স ভেজানো জলের কি কোনো উপকারিতা আছে ?

উঃ সারারাত ঢেঁড়সের বীজ ভিজিয়ে রেখে সকালে সেই জল ছেঁকে নিয়ে পান করতে পারেন। অনেকে বলেন যে, এই জল খেলে ডায়াবেটিস কমতে পারে। কিন্তু এই তথ্যটি এখনও প্রমাণিত হয়নি।

2 sources

Stylecraze has strict sourcing guidelines and relies on peer-reviewed studies, academic research institutions, and medical associations. We avoid using tertiary references. You can learn more about how we ensure our content is accurate and current by reading our editorial policy.
Was this article helpful?
scorecardresearch