ডিপথেরিয়া রোগের কারণ, উপসর্গ এবং ঘরোয়া পদ্ধতিতে চিকিৎসার উপায় | Diphtheria Causes, Symptoms and Home Remedies

Written by

নাক এবং গলা সংক্রান্ত যেকোনো রকম শারীরিক সমস্যাই যন্ত্রনাদায়ক হয়। আর সঠিক সময়ে চিকিৎসার অভাবে সমস্যাগুলি জটিল আকার নিতে পারে। এইরকম সমস্যার মধ্যে ডিপথেরিয়া একটি উল্লেখযোগ্য নাম। যদি আপনার এই অসুখের বিষয়ে এখনও কোনো ধারণা না থাকে তাহলে সংশ্লিষ্ট প্রবন্ধ থেকে ডিপথেরিয়া রোগ এবং তার সংক্রমণের কারণ, উপসর্গ ও ঘরোয়া পদ্ধতিতে এই অসুখের চিকিৎসার কারণ গুলি সম্পর্কে জানতে পারবেন। এই প্রবন্ধে ডিপথেরিয়া রোগ প্রতিরোধে সহায়ক একাধিক তথ্য আলোচনা করা হবে যা পাঠকের উপকারে লাগবে বলে মনে করা হয়।

ডিপথেরিয়া আসলে কী?

ডিপথেরিয়া হলো এক ধরণের ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমন। যা মূলত কোরিনব্যাক্টেরিয়াম ডিপথেরিয়া নামক ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের ফলে হয়ে থাকে। এই ব্যাক্টেরিয়া প্রধাণত নাক এবং গলার মিউকাস ঝিল্লিকে প্রভাবিত করে থাকে। এই ধরণের ব্যাক্টেরিয়া খুব সহজেই একজন মানুষ থেকে অন্য মানুষের দেহে সংক্রমিত দেহে পড়ে। এই সংক্রমণের জন্য একাধিক কারণকে দায়ী করা যেতে পারে। সেই সম্পর্কে এই প্রবন্ধের পরবর্তী অংশে ব্যখ্যা করা হবে। ঘরোয়া পদ্ধতিতে এই রোগের চিকিৎসার উপায় রয়েছে ঠিকই কিন্তু পরিস্থতিতে কোনোরকম বেগতিক দেখলে অবিলম্বে একজন চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করা দরকার। (1)

ডিপথেরিয়া রোগের কারণ

কোরিনব্যাক্টেরিয়াম ডিপথেরিয়া নামক ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের কারণে ডিপথেরিয়া রোগের প্রাদুর্ভাব হয় একথা মরা আগেই জানতে পেরেছি। এই ব্যাক্টেরিয়া মূলত যে যে কারণগুলির জন্য সংক্রমনিত হয় সেগুলি হলো নিম্নরূপ (2) –

  • সংক্রমিত ব্যক্তির সংস্পর্শে এলে.
  • সংক্রমিত ব্যক্তির হাঁচি – কাশির সংস্পর্শে এলে
  • পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার অভাব ঘটলে
  • নির্দিষ্ট সময়ে ডিপথেরিয়া রোগ প্রতিরোধক টীকাকরণ না হয়ে থাকলে
  • অধিক মানুষের সমাবেশ হয়েছে এমন স্থানে উপস্থিত হলে
  • ডিপথেরিয়া ব্যাক্টেরিয়া রয়েছে এমন বস্তু স্পর্শ করলে।

ডিপথেরিয়ার উপসর্গ

সাধারণত যে যে উপসর্গ গুলি দেখলে ডিপথেরিয়ার সংক্রমিত হয়েছে বলে মনে করা হয় সেগুলি হলো যথাক্রমে –

  • জ্বর এবং একইসাথে শৈত্য অনুভূতি
  • কাশি এবং তারসাথে গলার স্বর ভেঙে যাওয়া
  • ঢোক গিলতে সমস্যা
  • কাশি
  • মুখ থেকে লালা নিঃসরণ
  • ত্বক নীল বর্ণে পরিণত হওয়া
  • নাক থেকে জল বের হওয়া অথবা রক্তপাত
  • নিঃশ্বাস গ্রহণের ক্ষেত্রে সমস্যা
  • ত্বকে ঘায়ের উৎপত্তি

ঘরোয়া পদ্ধতিতে ডিপথেরিয়ার চিকিৎসা

কতকগুলি ঘরোয়া পদ্ধতি অনুসরণ করলে অনায়াসেই ডিপথেরিয়ার মতন সংক্রামক ব্যাধি থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। তবে একটা কথা মাথায় রাখা দরকার যে ঘরোয়া পদ্ধতিতে যেকোনো রোগের চিকিৎসাই মেডিক্যাল পদ্ধতিতে চিকিৎসার বিকল্প হতে পারেনা। তাই যেকোনো অসুখের ক্ষেত্রেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার পূর্বে চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করা দরকার। এখানে ঘরোয়া পদ্ধতি অনুসরণ করে ডিপথেরিয়া রোগের চিকিৎসা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।

এবার দেখে দেখে নেওয়া যাক ঘরোয়া পদ্ধতিতে ডিপথেরিয়া রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত দ্রব্যাদি গুলি কী কী –

১. মধু এবং লেবু

উপকরণ

  • ১ চামচ মধু
  • ১ চামচ লেবুর রস
  • ১ গ্লাস জল

ব্যবহার পদ্ধতি

  • প্রথমে জল অল্প গরম করে নিতে হবে।
  • উষ্ণ গরম জলে মধু এবং লেবুর রস মিশিয়ে নিতে হবে।
  • এবার এই মিশ্রণ পান করতে হবে।
  • প্রতিদিন ১-২ বার করে এই মিশ্রণ পান করা যেতে পারে।

কীভাবে কাজ করে

ঘরোয়া পদ্ধতিতে ডিপথেরিয়ার চিকিৎসায় মধু এবং লেবু একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান বলে মনে করা হয়। আমরা আগেই জেনেছি যে ডিপথেরিয়া মূলত একটি ব্যাক্টেরিয়ার সংক্রমণ আর মধু এবং পাতিলেবুর রসে উপস্থিত ব্যাক্টেরিয়া প্রতিরোধক বৈশিষ্ট্য এই ব্যাক্টেরিয়ার সংক্রমণ প্রতিরোধে সহায়তা করে। (3) (4)

২. তুলসী পাতা

উপকরণ

  • কয়েকটি তুলসী পাতা
  • ১ গ্লাস জল

ব্যবহার পদ্ধতি

  • জলের মধ্যে তুলসী পাতা ভিজিয়ে রাখতে হবে।
  • তুলসী পাতাযুক্ত অল্প সময় গরম করে নিতে হবে।
  • এরপর ঐ ফোটানো জল ছেঁকে পান করতে হবে।
  • ডিপথেরিয়া অসুখ যতদিন না পর্যন্ত সম্পূর্ণভাবে আরোগ্য লাভ করছে ততদিন অবধি দিনে ১ – ২ বার পর্যন্ত এই এই মিশ্রণ পান করা যেতে পারে।

কীভাবে কাজ করে

একাধিক ভেষজ গুণ সম্পন্ন তুলসীতে রয়েছে পর্যাপ্ত পরিমাণ পুষ্টিগুণ যা শরীরের জন্য উপকারী। তুলসীর স্বাস্থ্যোপযোগীতা গুলির মধ্যে অন্যতম একটি হলো ডিপথেরিয়া প্রতিরোধক। তুলসীর ব্যাক্টেরিয়া প্রতিরোধক বৈশিষ্ট্য যাবতীয় ব্যাক্টেরিয়া ঘটিত সংক্রমণ প্রতিহত করে। যে কারণে মনে করা হয় যে তুলসী সেবনে ডিপথেরিয়ার মতন ব্যাক্টেরিয়ার সংক্রমন প্রতিহত হবে। যদিও এই সম্বদ্ধে এখনও কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যখ্যা পাওয়া যায়নি। (5)

৩. লবণ

উপকরণ

  • ১ চা চামচ লবণ
  • ১ গ্লাস জল

ব্যবহার পদ্ধতি

  • প্রথমে জল অল্প গরম করে নিতে হবে।
  • এরপর তাতে নির্দিষ্ট লবণ মিশিয়ে গুলিয়ে নিতে হবে।
  • এবার এই লবণ মিশ্রিত জল দিয়ে গার্গেল করে নিতে হবে।

কীভাবে কাজ করে

গলার যেকোনো রকম সাধারণ সমস্যার ক্ষেত্রেই লবণ মিশ্রিত গরম জলে গার্গেল করার একটা রীতি প্রচলিত রয়েছে। আর ডিপথেরিয়ার সংক্রমণের ক্ষেত্রে লবণ মিশ্রিত গরম জলে গার্গেল করার রীতির কোনো অন্যথা নেই। ব্যাক্টেরিয়া প্রতিরোধক গুণ সম্পন্ন লবণ ডিপথেরিয়া প্রতিরোধে সহায়তা করে এমন ধারণা রয়েছে। (6)

৪. আদার রস

উপকরণ

  • ১ চামচ আদার টুকরো
  • কয়েক ফোঁটা পাতিলেবুর রস
  • ১/২ চামচ মধু

ব্যবহার পদ্ধতি

  • ভালো করে আদা থেঁতো করে রস বের করে নিতে হবে।
  • তারপর এই রসে মধু এবং পাতিলেবুর রস মিশিয়ে নিতে হবে।
  • এবার ১ চামচ এই মিশ্রন সেবন করতে হবে।
  • প্রতিদিন ১ বার এই মিশ্রণ সেবন করা যেতে পারে।

কীভাবে কাজ করে

একাধিক ঔষধী গুণ সম্পন্ন আদা অ্যান্টি মাইক্রোবিয়াল এবং অ্যান্টি ব্যাক্টেরিয়াল বৈশিষ্ট্যযুক্ত হয়। যা ব্যাক্টেরিয়ার সংক্রমণ প্রতিরোধে সহায়তা করে। যে কারণ ডিপথেরিয়া সংক্রমণে আদার রস সেবনে উপকারীতা পাওয়া যায়।(7)

৫. ভেষজ উপাদান

উপকরণ

  • কয়েকটা ক্যাস্টর পাতা
  • কয়েকটা সজনে পাতা
  • ২-৩ টি রসুন গাছের পাতা

ব্যবহার পদ্ধতি

  • উপরিল্লিখিত সবকটি পাতা একসাথে বেটে নিতে হবে।
  • এরপর এই মিশ্রণে প্রয়োজনানুসারে জল মিশিয়ে ভালো করে গুলিয়ে নিতে হবে।
  • সব শেষে এই মিশ্রণ থেকে জলীয় অংশ ছেঁকে তা দিয়ে গার্গেল করতে হবে।

কীভাবে কাজ করে

উপরে ব্যবহৃত সবকটি লতা গুল্মই বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য ভেষজ চিকিৎসা পদ্ধতিতে ব্যবহার করা হয়। ডিপথেরিয়া সেইসব শারীরিক সমস্যা গুলির মধ্যে একটি অন্যতম। আর এই সবকটি লতা গুল্মই ব্যাক্টেরিয়া প্রতিরোধক গুণ সম্পন্ন। যে কারণে ডিপথেরিয়া প্রতিরোধে ঘরোয়া পসশতিতে চিকিৎসার ক্ষেত্রে এগুলি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা হয়। (8) (9) (10)

বি দ্র – ঘরোয়া পদ্ধতিতে ডিপথেরিয়া রোগের চিকিৎসার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত দ্রব্য সামগ্রী আদৌ কতটা উপকারী যে বিষয়ে এখনও কোনো বৈজ্ঞানিক তথ্য পাওয়া যায়নি। এবং এখনও গবেষণার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। তাই ঘরোয়া পদ্ধতিতে ডিপথেরিয়া রোগের চিকিৎসার পূর্বে অবশ্যই একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সাথে আলোচনা করে নেওয়া দরকার।

ডিপথেরিয়া রোগের চিকিৎসা পদ্ধতি

ডিপথেরিয়া সংক্রমনের ভয়াভয় অবস্থা থেকে রক্ষা পেতে হলে অবশ্যই মেডিক্যাল পদ্ধতি অনুসরণ করে চিকিৎসার প্রয়োজন রয়েছে। এই সময় চিকিৎসকরা কী ধরণের ওষুধ সেবনের পরামর্শ দিয়ে থাকেন সেগুলি সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক –

  • অ্যান্টি টক্সিন – ডিপথেরিয়ার চিকিৎসার জন্য চিকিৎসকরা অ্যান্টি টক্সিন ইঞ্জেকশন ব্যবহার করেন। এই ইঞ্জেকশন মাংস পেশী অথবা সরাসরি ধমনীতে দেওয়া যেতে পারে।
  • অ্যান্টি বায়োটিক – চিকিৎসা পদ্ধতিকে কার্যকরী করার জন্য চিকিৎসকরা অ্যান্টি টক্সিন ইঞ্জেকশন দেওয়ার পর অ্যান্টি বায়োটিক ওষুধ সেবনের পরামর্শ দেন। এইসব ওষুধের মধ্যে রয়েছে পেনিসিলিন এবং এরিত্থোমাইসিন ইত্যাদি।

ডিপথেরিয়া রোগের সংক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায় কী ?

দৈনন্দিনের জীবন যাপনে খাদ্য এবং পাণীয় গ্রহণের অভ্যাসে সামাণ্য কিছু পরিবর্তণ করলেই ডিপথেরিয়ার মতন একটি সংক্রামক অসুখ থেকে অনায়াসে মুক্তি পাওয়া যায়। এবার সেই উপায় গুলি সম্বদ্ধে জেনে নেওয়া যাক –

  • শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা অনাক্রম্যতা শক্তিশালী থাকলে অনায়াসেই ডিপথেরিয়া সংক্রমন এড়িয়ে চলা যায়। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী রাখার জন্য শরীরের উপযোগী ফল এবং শাক সবজি প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় অন্তর্ভীক্ত করা উচিৎ।
  • নির্দিষ্ট সময়ে প্রতিষেধক টীকাকরণ করা হলে ডিপথেরিয়ার সংক্রমণ প্রতিহত করা যায়।
  • ডিপথেরিয়া সংক্রমিত ব্যক্তির সংস্পর্শ থেকে দূরত্ব বজায় রাখা উচিৎ।
  • বসবাসের স্থান পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে রাখলে যে কোনো সমহক্রমণ থেকেই সুরক্ষিত থাকা যায়।
  • কোনো রকম খাদ্য এবং পাণীয় গ্রহণের পূর্বে ভালো করে হাত ধুয়ে নেওয়া দরকার।

তাহলে পাঠকেরা এখন নিশ্চই বুঝতে পারছেন ডিপথেরিয়া কী। এই অসুখের লক্ষণ বা উপসর্গ গুলি কী কী। কি ধরণের ঘরোয়া উপায় অবলম্বন করলে ডিপথেরিয়ার মতন একটি অসুখের সংক্রমন এড়িয়ে চলা যায়। তবে একইসাথে একথাও ঠিক যে যে কোনো অসুখের চিকিৎসার ক্ষেত্রেই ঘরোয়া পদ্ধতিতে চিকিৎসার উপায় অবলম্বন না করে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করে নেওয়া দরকার।

Sources

Articles on StyleCraze are backed by verified information from peer-reviewed and academic research papers, reputed organizations, research institutions, and medical associations to ensure accuracy and relevance. Read our editorial policy to learn more.

  1. Diphtheria
    https://medlineplus.gov/diphtheria.html
  2. Diphtheria
    https://medlineplus.gov/ency/article/001608.htm
  3. Honey: its medicinal property and antibacterial activity
    https://www.ncbi.nlm.nih.gov/pmc/articles/PMC3609166/
  4. Phytochemical, antimicrobial, and antioxidant activities of different citrus juice concentrates
    https://www.ncbi.nlm.nih.gov/pmc/articles/PMC4708628/
  5. Herbal Product Based Remedies Against Microbial Infections And Resistance
    http://citeseerx.ist.psu.edu/viewdoc/download;jsessionid=341115C61DEE589C5497FAA2F3861B50?doi=10.1.1.405.8123&rep=rep1&type=pdf
  6. Salt-Independent Abnormality of Antimicrobial Activity in Cystic Fibrosis Airway Surface Fluid
    https://www.atsjournals.org/doi/full/10.1165/ajrcmb.25.1.4436
  7. Active ingredients of ginger as potential candidates in the prevention and treatment of diseases via modulation of biological activities
    https://www.ncbi.nlm.nih.gov/pmc/articles/PMC4106649/
  8. Antibacterial activity of garlic extract on streptomycin-resistant Staphylococcus aureus and Escherichia coli solely and in synergism with streptomycin
    https://www.ncbi.nlm.nih.gov/pmc/articles/PMC3217283/
  9. Moringa oleifera Lam. (Moringaceae) grown in Nigeria: In vitro antisickling activity on deoxygenated erythrocyte cells
    https://www.ncbi.nlm.nih.gov/pmc/articles/PMC3341715/
  10. Antimicrobial potential of Ricinus communis leaf extracts in different solvents against pathogenic bacterial and fungal strains
    https://www.ncbi.nlm.nih.gov/pmc/articles/PMC3621469/
The following two tabs change content below.

    LATEST ARTICLES