খাদ্যে বিষক্রিয়ার লক্ষণ ও ঘরোয়া প্রতিকার – Food Poisoning Symptoms and Home Remedies in Bengali

by

খাদ্যে বিষক্রিয়া বা ফুড পয়সনিং যে কোনো কারণেই হতে পারে, হতে পারে সেটি কোনো জাঙ্ক ফুড বা আগেরদিনের পড়ে থাকা কোনো খাবার। অনেক সময় এতো বাড়াবাড়ি হয় যে মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে পারে। তাই এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য আমাদের এই প্রতিবেদনে থাকছে কতগুলি ঘরোয়া প্রতিকারের সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য।

খাদ্যে বিষক্রিয়া বা ফুড পয়সনিং ঠিক কি ?

আপনি যদি বাসি, নষ্ট হয়ে যাওয়া খাবার বা টক্সিক খাবার খেয়ে ফেলেন, তাহলে খাদ্যে বিষক্রিয়া বা ফুড পয়সনিং হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। এক্ষেত্রে বমি বমি ভাব, বমি হওয়া বা ডাইরিয়া হয়।

অল্প ধরণের এইসব লক্ষণ দেখা গেলেই শীঘ্রই ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। দেরি করবেন না, এতে প্রাণ সংশয়ও ঘটতে পারে।

ফুড পয়সনিং- এর কারণগুলি কি কি ?

  • নষ্ট হয়ে যাওয়া খাবার খেলে।
  • বাসি বা টক্সিক খাবার খেলে।
  • সালমোনেলা ব্যাকটেরিয়া হল খাদ্যে বিষক্রিয়া ঘটে অন্যতম কারণ। বিশেষ করে ডিম, মেয়োনিজ, চিকেন জাতীয় খাদ্য যদি ঠিক মতো সেদ্ধ বা রান্না না করা হয়, তাহলে এই ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি ফুড পয়সনিং ঘটাতে পারে। অনেক সময় স্যালাডের মতো খাবার থেকে ই.কোলাই (E. Coli)  ব্যাকটেরিয়ার জন্যও এটি হয়ে থাকে।
  • খাদ্যে যদি কোনো রকমে পরজীবীর সংক্রমণ ঘটে।
  • নোরোভাইরাস, স্যাপোভাইরাস, রোটাভাইরাস ইত্যাদি মূলত খাদ্যে বিষক্রিয়ার জন্য দায়ী। হেপাটাইটিস এ ভাইরাস খাদ্যের মধ্য দিয়েই ছড়িয়ে থাকে।

ফুড পয়সনিং- এর লক্ষণগুলি কি কি ?

নিচে এর সম্ভাব্য লক্ষণগুলি উল্লেখ করা হল।

  • পেটে ব্যথা ও টান ধরা
  • খিদে না পাওয়া
  • জ্বর
  • মাথা ব্যথা
  • ক্লান্তি ও দুর্বলতা।

ফুড পয়সনিং সারানোর ঘরোয়া প্রতিকার

১. অ্যাপেল সাইডার ভিনিগার

কি কি লাগবে ?

  • এক থেকে দুই টেবিল চামচ অ্যাপেল সাইডার ভিনিগার
  • এক গ্লাস ঈষৎ উষ্ণ জল।

কি করতে হবে ?

দুটিকে ভালো করে মিশিয়ে তখনই পান করুন , মিশিয়ে ফেলে রেখে দেবেন।

কতবার খাওয়া যায় ?

দিনে দুই থেকে তিনবার খান।

কিভাবে কাজ করে ?

অ্যাপেল সাইডার ভিনিগারে উপস্থিত অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল উপাদান খাবারে ব্যাকটেরিয়ার (যেমন- ই.কোলাই ) থেকে সংক্রমণ ঘটলে তা সারাতে সাহায্য করে (1)

২. লেবুর রস

কি কি লাগবে ?

  • আধা লেবু
  • এক গ্লাস জল
  • মধু

কি করতে হবে ?

আধা লেবুর রস নিয়ে সেটি এক গ্লাস জলের মধ্যে দিয়ে অল্প মধু দিয়ে মিশিয়ে পান করে নিন।

কতবার খাওয়া যায় ?

আপনি দিনে দুই থেকে তিনবার এটি পান করতে পারেন।

কিভাবে কাজ করে ?

অ্যান্টি-অক্সিডেন্টে পরিপূর্ণ থাকে বলে লেবুর রস শরীরকে ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে লড়তে সাহায্য করে (2)

৩. তুলসী পাতা

  • তুলসী পাতা মধু 

তুলসী পাতায় থাকে অ্যান্টি-মাইক্রোবিয়াল উপাদান যা রোগ জীবাণু ধ্বংস করতে খুবই উপযোগী (3) । এছাড়া এটি ফুড পয়সনিং- এর যে লক্ষণগুলি থাকে, তা সারাতেও সাহায্য করতে পারে।

কি কি লাগবে ?

  • তুলসী পাতা
  • মধু

কি করতে হবে ?

বেশ কয়েকটা তুলসী পাতা নিয়ে তার থেকে রস বার করে নিন এবং তা মধু মিশিয়ে খেয়ে নিন। তাছাড়া এক কাপ জলে একটু তুলসীর তেল মিশিয়ে খেতেও পারেন।

কতবার খাওয়া যায় ?

আপনি দিনে তিন থেকে চারবার এটি পান করতে পারেন।

তুলসী পাতা এলাচ

তুলসী পাতা ও এলাচের মিলিত গুণ বমি বমি ভাব দূর করতে উপযোগী।

কি কি লাগবে ?

  • তুলসী পাতা
  • এলাচ

কি করতে হবে ?

কয়েকটা তুলসীপাতা ও একটি এলাচ চিবিয়ে খান।

কতবার বা কখন খাওয়া যায় ?

যখনই মনে হবে ফুড পয়সনিং- এর লক্ষণগুলি দেখবেন, খেয়ে নেবেন।

৪. রসুন

কি কি লাগবে ?

দুই থেকে তিনটে রসুনের কোয়া

কি করতে হবে ?

দুই থেকে তিনটে রসুনের কোয়া চিবিয়ে নিন অথবা একটু মধুর সাথে কুচি করা রসুন মিশিয়েও খেতে পারেন।

কতবার বা কখন খাওয়া যায় ?

দিনে একবার করে খাওয়ার চেষ্টা করুন যতদিন না লক্ষণগুলি সেরে যাচ্ছে।

কিভাবে কাজ করে ?

রসুনে থাকে অ্যান্টি-ব্যাক্টেরিয়াল, অ্যান্টি-ভাইরাল, অ্যান্টি-ফাংগাল উপাদান থাকার জন্য খাবারে বিষক্রিয়ার জন্য তৈরী রোগ জীবাণুকে ধ্বংস করতে পারে (4) । এটি ডায়রিয়া ও পেটে ব্যথাও দূর করতে পারে।

৫. আদা ও মধু

কি কি লাগবে ?

  • অল্প আদা কুচি
  • এক চামচ মধু

কি করতে হবে ?

এক চামচ মধু নিয়ে তাতে অল্প আদা কুচি নিয়ে মিশিয়ে খেয়ে ফেলুন।

কতবার বা কখন খাওয়া যায় ?

দিনে দুই থেকে তিনবার খান।

কিভাবে কাজ করে ?

আদায় থাকে অ্যান্টি-ইনফ্লামেটরি উপাদান, তাই ফুড-পয়সনিং হলে যে পেটে ব্যথা হয় তা সারাতে কাজে লাগে (5)

৬. এসেনশিয়াল অয়েল

  • অরিগ্যানো অয়েল 

অরিগ্যানো অয়েল ফুড-পয়সনিং -এর জন্য খুবই উপকারী বলে জানা যায়। এর অ্যান্টি-মাইক্রোবিয়াল উপাদান খাবারের রোগ-জীবাণুকে ধ্বংস করতে সাহায্য করে (6)

কি কি লাগবে ?

  • এক থেকে দুই ফোঁটা অরিগ্যানো অয়েল
  • আধা কাপ জল

কি করতে হবে ?

এক থেকে দুই ফোঁটা অরিগ্যানো অয়েলের সাথে জল মিশিয়ে গুলে পান করে নিন।

কতবার বা কখন খাওয়া যায় ?

দিনে এক থেকে দুইবার খাওয়ার চেষ্টা করুন যতক্ষণ না ফুড পয়সনিং- এর লক্ষণ কমে।

  • থাইম অয়েল 

থাইম অয়েলে অ্যান্টি-মাইক্রোবিয়াল ও অ্যান্টি-প্যারাসাইটিক উপাদান থাকার জন্য (7)  ফুড পয়সনিং- এর বিরুদ্ধে লড়তে পারে ।

কি কি লাগবে ?

  • এক ফোঁটা থাইম অয়েল
  • এক গ্লাস জল

কি করতে হবে ?

এক গ্লাস জলে এক ফোঁটা থাইম অয়েল মিশিয়ে খেয়ে ফেলুন।

কতবার বা কখন খাওয়া যায় ?

দিনে এক থেকে দুইবার খাওয়ার চেষ্টা করুন।

৭. ভিটামিন সি

কি কি লাগবে ?

  • ১০০০ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি সাপ্লিমেন্ট ( যে ডোজ ডাক্তার বলবেন খেতে, সেটিই খাবেন ) ।

কি করতে হবে ?

ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করে ১০০০ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি সাপ্লিমেন্ট খান।

কতবার বা কখন খাওয়া যায় ?

ফুড পয়সনিং হওয়ার প্রথম দিকে দিনে দুই থেকে তিনবার খাবেন।

কিভাবে কাজ করে ?

ভিটামিন- সি হল অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট। গবেষণায় জানা গেছে, এটি শরীর থেকে ব্যাকটেরিয়া ও টক্সিন নির্গত হতে সাহায্য করে (8)। এছাড়া ভিটামিন- সি সমৃদ্ধ খাবার বেশি পরিমাণেও খেতে পারেন।

৮. কলা

কি কি লাগবে ?

  • কলা

কি করতে হবে ?

প্রতিদিন একটি করে কলা খেতে পারেন বা দুধ মিশিয়ে মিক্সার গ্রাইন্ডারে ব্লেন্ড করে পান করুন।

কতবার বা কখন খাওয়া যায় ?

দিনে এক থেকে দুইবার খেতে পারেন।

কিভাবে কাজ করে ?

ফুড পয়সনিং হলে শরীর থেকে বেরিয়ে যাওয়া পটাসিয়ামের পরিমাণ ঠিক রাখতে কলা সাহায্য করে (9) । এই সমস্যার লক্ষণ কমাতেও সাহায্য করে।

৯. আঙুরের বীজের রস

কি কি লাগবে ?

  • আট থেকে দশ ফোঁটা আঙুরের বীজের রস
  • এক গ্লাস জল

কি করতে হবে ?

এক গ্লাস জলে আট থেকে দশ ফোঁটা আঙুরের বীজের রস মিশিয়ে গুলিয়ে খেয়ে ফেলুন।

কতবার বা কখন খাওয়া যায় ?

তিন থেকে পাঁচ দিন দিনে তিনবার করে পান করুন।

কিভাবে কাজ করে ?

আঙুরের বীজের রসে থাকে পলিফেনল উপাদান যা খাদ্যে বিষক্রিয়ার লক্ষণ কমাতে ও দ্রুত এই সমস্যা থেকে মুক্ত হতে সাহায্য করে (10)

ফুড পয়সনিংএর সময় কি কি খাবার খাওয়া উচিত ?

  • স্পোর্টস বা এনার্জি ড্রিঙ্ক
  • স্যুপ
  • ওটমিল
  • কলা
  • প্রোবায়োটিক যুক্ত খাবার যেমন দই।

ফুড পয়সনিংএর সময় কি কি খাওয়া অনুচিত ?

  • অ্যালকোহল
  • ক্যাফিন জাতীয় খাবার
  • তেল মশলা যুক্ত খাবার
  • তেলে ভাজা খাবার
  • ডেয়ারি প্রোডাক্ট
  • নিকোটিন
  • প্রসেসড প্রোডাক্ট

ফুড পয়সনিংএর চিকিৎসা

ফুড পয়সনিং- এর লক্ষণ প্রকাশ পাওয়া মাত্রই উপরে উল্লেখিত ঘরোয়া প্রতিকার গুলি মানার চেষ্টা করুন ও ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করুন। এতে বিলম্ব করবেন না।

কখন ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত ?

ফুড পয়সনিং হলে ঘরোয়া প্ৰতিকারগুলি মানুন , তাতে যদি এর লক্ষণগুলি না কমে তাহলে অবশ্যই ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করবেন। তবে দেরি করবেন না এ ব্যাপারে।

টিপস

  • ফুড পয়সনিং- এর লক্ষণ প্রকাশ পেলে এর জন্য উপরে উল্লেখিত প্রতিকারগুলি মানুন।
  • যদি দেখেন এর লক্ষণ বেড়েই চলছে ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করুন।

ফুড পয়সনিং থেকে বাঁচার টিপস

  • বাইরের আধা সেদ্ধ করা খাবার খাবেন না।
  • বাড়িতে ভালো করে সেদ্ধ করে খাবার খান।
  • ফোটানো জল খাওয়া অভ্যেস করুন।
  • হাত ভালো করে ধুয়ে পরিষ্কার করে খেতে বসুন।

ফুড পয়সনিং হলে অতি অবশ্যই ঘরোয়া প্রতিকারগুলি মানুন, তাতে যদি এর প্রকোপ না কমে ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করুন। নিজের যত্ন করুন ও সুস্থ থাকুন।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী

ফুড পয়সনিং- এর ভালো ওষুধ কি ?

শরীরকে হাইড্রেটেড রেখে ফুড পয়সনিং- এর সমস্যা দূর করা যায়। নুন চিনি লেবুর জল খেলেও এর লক্ষণ কমতে পারে।

কতদিন ফুড পয়সনিং স্থায়ী হতে পারে ?

আপনি কতটা কন্টামিনেটেড খাবার খেয়েছেন,  তার ওপর নির্ভর করবে ফুড পয়সনিং কতদিন স্থায়ী হবে। অল্প ফুড পয়সনিং হলে তা দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে ঠিক হয়ে যায়।

ফুড পয়সনিং হলে কি জ্বর হতে পারে ?

অল্প ফুড পয়সনিং হলে হালকা জ্বর আসতে পারে। যদি খুব বেশি ফুড পয়সনিং হয় তবে অনেকেরই ভালো জ্বর আসে।

ফুড পয়সনিং হলে কি মাথা ব্যথা হয় ?

ফুড পয়সনিং হলে মাথা ব্যথা হতেই পারে।

ফুড পয়সনিং ও পেটে ভাইরাসের আক্রমণ কি আলাদা ?

দুটি সমস্যার লক্ষণ অনেকটাই এক তবে এর চিকিৎসা আলাদা।

ফুড পয়সনিং – এর জন্য কতদিন অসুস্থ থাকে শরীর ?

ফুড পয়সনিং হলে পাঁচ দিন মতো দুর্বল হয়ে থাকে শরীর।

10 sources

Stylecraze has strict sourcing guidelines and relies on peer-reviewed studies, academic research institutions, and medical associations. We avoid using tertiary references. You can learn more about how we ensure our content is accurate and current by reading our editorial policy.
Was this article helpful?
scorecardresearch