ফ্রাঙ্কিনসেন্স অয়েলের উপকারিতা, ব্যবহার এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া – Frankincense Oil (Loban Ka Tel) Benefits and Side Effects in Bengali

Written by

আজকাল অনেকেই শরীরের যত্ন নিতে ব্যবহার করেন এসেনশিয়াল অয়েল। বিশেষ করে অ্যারোমা থেরাপিতে নানান ধরনের এসেনশিয়াল অয়েল ব্যবহৃত হয়। যার মধ্যে অন্যতম একটি এসেনশিয়াল অয়েল হল ফ্রাঙ্কিনসেন্স অয়েল। এটি লোবান তেল নামেও সুপরিচিত। অন্যান্য এসেনশিয়াল অয়েলের মতো এটিও বেশ সুস্বাস্থ্যকর। আমাদের এই প্রতিবেদনে ফ্র্যাঙ্কিনসেন্স অয়েলের উপকারিতা সম্পর্কে আলোচনা করা হল। সেই সঙ্গে এই তেল কীভাবে ব্যবহার করবেন এবং এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াগুলি কী সে সম্পর্কেও জেনে নিন। তবে মনে রাখবেন ফ্রাঙ্কিনসেন্স অয়েল কোনও শারীরিক সমস্যার ডাক্তারি চিকিৎসা নয়। এটি কেবলমাত্র কিছু শারীরিক সমস্যা থেকে সাময়িক আরাম পেতে সাহায্য করতে পারে।

ফ্রাঙ্কিনসেন্স অয়েল কী?

ফ্রাঙ্কিনসেন্স বা লোবান শাল্লকি নামেও পরিচিত। শাল্লকির যেমন গুণমান সমৃদ্ধ ঠিক তেমনই লোবান তেলেরও অনেক উপকার। ফ্রাঙ্কিনসেন্স বা লোবান তেল বসওলিয়া সের্রাটা নামের একটি গাছ থেকে পাওয়া সুগন্ধযুক্ত আঠালো পদার্থ থেকে তৈরি করা হয়। এই তেলের গুণ অনেক। এই এসেনশিয়াল অয়েলের মধ্যে অ্যান্টিব্যাক্টেরিয়াল এবং অ্যান্টিফাঙ্গাল বৈশিষ্ট্য রয়েছে। যা নানারকম শারীরিক সমস্যার সঙ্গে লড়াই করতে সাহায্য করে (1)। এই তেল ব্যবহার করলে কী কী শারীরিক উপকার পাবেন এবার তা জেনে নিন।

ফ্রাঙ্কিনসেন্স অয়েলের উপকারিতা

১. আর্থ্রাইটিসের সমস্যা কমায় : বয়স বাড়ার সঙ্গে গাঁটে ব্যথার সমস্যা বাড়ে। সেইসঙ্গে দেখা দেয় আর্থ্রাইটিসের মতো সমস্যা। এক্ষেত্রে ফ্রাঙ্কিনসেন্স অয়েল ব্যবহার লাভদায়ক হতে পারে। এনসিবিআই (ন্যাশনাল সেন্টার ফর বায়োটেকনোলজি ইনফরমেশন) দ্বারা প্রকাশিত একটি গবেষণা অনুযায়ী, লোবান তেলের মধ্যে অ্যান্টি ইনফ্ল্যামেটরি গুণ রয়েছে। সেই কারণে এই এসেনশিয়াল অয়েল আর্থ্রাইটিসের রোগীদের জন্য উপকারী হতে পারে (2)।

২. অন্ত্রের ক্রিয়াকলাপ উন্নত করে : ক্রোহন রোগ (অন্ত্রের প্রদাহজনিত রোগ) পেট ব্যথা, কোষ্ঠকাঠিন্য, ওজন হ্রাসের মতো নানা সমস্যা ডেকে আনতে পারে (3)। ফ্রাঙ্কিনসেন্স অয়েল এই সমস্যা দূর করতে সাহায্য করতে পারে। এই বিষয়ে বেশিকিছু গবেষণাও করা হয়েছে। গবেষণা অনুযায়ী, লোবান তেলের ব্যবহার এই রোগের ব্যথা কিছুটা হলেও কম করতে পারে (4)। অন্য আরেকটি পরীক্ষায় কোলেজনাস কোলাইটিস রোগে আক্রান্ত রোগীদের উপর ৬ সপ্তাহ ধরে দৈনিক ৪০০ মিলিগ্রাম লোবান অর্ক প্রয়োগ করা হয়। কোলেজনাস কোলাইটিস একপ্রকার অন্ত্রের সমস্যা, যা অন্ত্রের প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে। গবেষণা অনুযায়ী লোবান অর্কের ব্যবহার কোলেজনাস কোলাইটিস কম করতে সহায়ক হতে পারে (5)।

৩. অ্যাস্থমা : লোবান তেলের ব্যবহার অ্যাস্থমার সমস্যায় বেশ উপকারী হতে পারে। একটি গবেষণা অনুযায়ী লোবান অর্কের মধ্যে বেশকিছু ঔষধি গুণ রয়েছে। যার মধ্যে অন্যতম হল অ্যান্টিইনফ্ল্যামেটরি। এই গুণ অ্যাস্থমার সমস্যা এবং এর সঙ্গে সম্পর্কিত শারীরিক সমস্যা কম করতে পারে (6)। যদি এই বিষয়ে আরও গবেষণা করা প্রয়োজন।

৪. মুখের সুস্বাস্থ্য বজায় রাখে : জিঞ্জিভাইটিস (Gingivitis) হল এক ধরনের মাড়ির সমস্যা। ফ্রাঙ্কিনসেন্স অয়েল ব্যবহার এই সমস্যা দূর করতে সাহায্য করতে পারে। এর উপর করা একটি গবেষণায় দেখা গেছে লোবান তেলের মধ্যে অ্যান্টিইনফ্ল্যামেটরি গুণ রয়েছে। এই বৈশিষ্ট্য জিঞ্জিভাইটিসের সমস্যা থেকে আরাম পেতে সাহায্য করে (7)।

৫. ক্যান্সার থেকে রক্ষা : লোবান তেল কিছুটা হলেও ক্যান্সার থেকে রেহাই পেতে সাহায্য করে। এনসিবিআইয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত গবেষণা অনুযায়ী, লোবান তেলে অ্যান্টি ক্যান্সার গুণ রয়েছে, যা ক্যান্সারের হাত থেকে রক্ষা পেতে সাহায্য করে। এছাড়াও গবেষণায় দেখা গেছে, লোবান তেল টিউমারের বিকাশে বাধা দেয়, যা শরীরের জন্য উপকারী (8)। তবে এই তেল একেবারে ক্যান্সার নিরাময় করতে পারে না। যদি কেউ এই রোগে আক্রান্ত হন তাহলে অবশ্যই ডাক্তারের কাছে যান এবং চিকিৎসা করান।

৬. ডায়াবেটিস কম করে : রক্তে সুগারের মাত্রা বেড়ে গেলেই ডায়াবেটিসের সমস্যা দেখা দেয়। এই সমস্যা দূর করতে ফ্রাঙ্কিনসেন্স অয়েল ব্যবহার করতে পারেন। এই বিষয়ের উপর করা গবেষণায় দেখা গেছে, লোবান অর্কের মধ্যে অ্যান্টিডায়াবেটিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এই গুণ রক্তে সুগারের মাত্রা কম করতে সাহায্য করে। এর ফলে ডায়াবেটিস কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব (9)।

৭. স্মৃতিশক্তি বাড়ায় : ইঁদুরের উপর করা একটি গবেষণায় দেখা গেছে, লোবান তেলের ব্যবহার স্মৃতিশক্তি বাড়াতে সাহায্য করতে পারে। যদিও এই বিষয়ে আরও জানার জন্য সঠিক গবেষণার প্রয়োজন (10)। এছাড়াও অন্য একটি গবেষণায় দেখা গেছে, লোবার তেলে বোসভেলিক অ্যাসিডও রয়েছে (1)। বোসভেলিক অ্যাসিড ব্যবহারের মাধ্যমে কিছুটা হলেও স্মৃতিশক্তি উন্নত করে তোলা সম্ভব (11)। যদিও এই বিষয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

৮. হার্টের সমস্যা থেকে মুক্তি : লোবান তেলের ব্যবহার হার্টের সমস্যা দূর করতে সাহায্য করতে পারে। গবেষণা অনুযায়ী, লোবান তেলে কার্ডিওপ্রোটেক্টিভ গুণ রয়েছে। যা হার্টের সমস্যা দূর করতে সাহায্য করতে পারে (12)। তবে হার্টের সমস্যা দেখা দিলে অবশ্যই ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করুন এবং চিকিৎসা করান। কারণ এটি কোনও ডাক্তারি চিকিৎসা নয় (12)।

৯. হরমোনের ভারসাম্য এবং দুশ্চিন্তা দূর : গবেষণায় দেখা গেছে, লোবান তেল স্ট্রেস হরমোন কমাতে সাহায্য করে। এর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট গুণ হরমোনগুলিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। তবে এটি কীভাবে হরমোনগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে সে বিষয়ে আরও গবেষণা করা দরকার। অন্য একটি গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, যে লোবান তেলের ব্যবহার ভালো ঘুমাতে সাহায্য করে যা দুশ্চিন্তা দূর করতে সহায়ক হতে পারে (13)।

ফ্রাঙ্কিনসেন্স অয়েলের পুষ্টিগত মান

ফ্রাঙ্কিনসেন্স অয়েলের মধ্যে যে সমস্ত প্রধান উপদানগুলি রয়েছে সেগুলি হল, α- থুজিন (১২%), α-পাইনিন (৮%), সেবিনিন (২.২%), লিমোজিন (১.৯%), লিনালল (০.৯%), পেরিলিন (০.৫%), মিথাইল চ্যাভিওকল (১১.৬%), মিথাইলুজেনল (২.১%), কেসেন (০.৯%), সেমব্রিন এ (০.০%) এবং সেমরনল (১.৯%) (1)।

ফ্রাঙ্কিনসেন্স অয়েলের ব্যবহার

এই তেলের সুবিধা পেতে বিভিন্ন উপায়ে এর ব্যবহার করা যেতে পারে। নীচে এই তেল ব্যবহারের কয়েকটি উপায় উল্লেখ করা হল।

  • শরীরের জ্বালা যন্ত্রণা কমাতে ফ্রাঙ্কিনসেন্স তেল ব্যবহার করতে পারেন।
  • টুথব্রাশে এই এসেনশিয়াল এক ফোঁটা দিয়ে ব্রাশ করুন। এটি মাড়ির সমস্যা, দাঁত ব্যথা এবং মুখের দুর্গন্ধ দূর করতে সাহায্য করবে। তবে দাঁতের জন্য এটি ব্যবহারের আগে কোনও ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করে নিন।
  • মাথা ব্যথা উপশমে লোবান তেল দারুণ কার্যকরী।
  • ফ্রাঙ্কিনসেন্স অয়েল সুগন্ধী এবং ত্বকের যত্নের জন্য তৈরী পণ্যগুলি উৎপাদনে ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

ফ্রাঙ্কিনসেন্স অয়েলের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া

ফ্রাঙ্কিনসেন্স অয়েলের যে কোনও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রয়েছে, সে বিষয়ে কোনও বৈজ্ঞানিক গবেষণা নেই। লোবান অর্ক ব্যবহারের কিছু প্রত্যাশিত ক্ষতিকারক দিক এখানে তুলে ধরা হল (15)।

  • যাদের অ্যালার্জির সমস্যা রয়েছে বা ত্বক খুব সংবেদনশীল তারা এর ব্যবহারের ফলে অ্যালার্জির সমস্যায় পড়তে পারেন।
  • এর থেকে গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল বা পেটের সমস্যা দেখা দিতে পারে।

অনেকেই হয়ত এই এসেনশিয়াল অয়েলের সঙ্গে পরিচিত নন। কিন্তু বর্তমানে যুগে যেভাবে এসেনশিয়াল অয়েলের চাহিদা বেড়েছে, এই বিষয়ে সঠিক জ্ঞান থাকা জরুরি। এবার আপনিও বাজার থেকে দেখে শুনে, কোনটা কী তেল, কী উপকারিতা ইত্যাদি দেখে এসেনশিয়াল অয়েল কিনতে পারবেন। ফ্রাঙ্কিনসেন্স তেল ব্যবহারের বেশকিছু উপকারিতা রয়েছে ঠিকই, তবে মনে রাখবেন এটি কোনও রোগ সম্পূর্ণভাবে নিরাময় করতে পারে না। হ্যাঁ, এর ব্যবহারে সাময়িক আরাম পেতে পারেন। সেইসঙ্গে ফ্রাঙ্কিনসেন্স অয়েলের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াগুলিও মাথায় রাখবেন। গুরুত্বর শারীরিক সমস্যা দেখা দিলে ঘরোয়া পদ্ধতি ব্যবহার করুন, কিন্তু অবশ্যই আগে ডাক্তারের কাছে যান এবং উপযুক্ত চিকিৎসা করান।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী

ত্বকের উপর কীভাবে ফ্রাঙ্কিনসেন্স অয়েল ব্যবহার করব?

একটি কালো কাঁচের বোতলে ঠান্ডা জল ভরে নিন। তাতে ৬ ফোঁটা ফ্রাঙ্কিনসেন্স অয়েল মেশান। মুখ ধোয়ার সময় কিংবা স্নানের সময় এটি মুখের উপর স্প্রে করে নিন, দেখবেন বেশ ফ্রেশ লাগবে।

ফ্রাঙ্কিনসেন্স কী ভালো ঘুমাতে সাহায্য করে?

ফ্রাঙ্কিনসেন্স অয়েল অন্যতম একটি এসেনশিয়াল অয়েল যা স্ট্রেস কমায় এবং ভালো ঘুমাতে সাহায্য করে। হাতে কয়েক এই এসনশিয়াল অয়েল নিয়ে তালুতে ঘষুন এবং ঘুমানোর আগে এই তেলের গন্ধ শুঁকে নিন। এভাবে কিছুক্ষণ শ্বাস নিলে ভালো ফল পাবেন।

Sources

Articles on StyleCraze are backed by verified information from peer-reviewed and academic research papers, reputed organizations, research institutions, and medical associations to ensure accuracy and relevance. Read our editorial policy to learn more.

Was this article helpful?
The following two tabs change content below.