গাজরের উপকারিতা ও অন্যান্য খুঁটিনাটি – All About Carrots (Gajar) in Bengali

by

আপনাদের মধ্যে অনেকেই হয়তো গাজর খেতে ভালোবাসেন কারণ এর স্বাদ মিষ্টি ধরণের। অনেকে কাঁচাও খান বা স্যালাড বা জুস করে খেতে পছন্দ করেন। আবার অনেকে পছন্দও করেন না এটি খেতে। তবে আপনি জানেন কি গাজরের উপকারিতা সঠিকভাবে ? আজ আমাদের এই প্রতিবেদনে গাজরের উপকারিতাই শুধু নয়, এ সম্পর্কে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও আপনাদের জানানো হবে।

গাজরের বিজ্ঞানসম্মত নাম হল ডাউকাস ক্যারোটা ( Daucus carota) । এটি প্রচুর পুষ্টিগুণ সম্পন্ন একটি সবজি। প্রচুর গবেষণায় তা আজ প্রমাণিত। পাঁচ হাজারেরও বেশি সময় ধরে আমরা এই সবজি খেয়ে আসছি। এটির উৎপত্তি মধ্য প্রাচ্য ও আফগানিস্থানে।

চলুন তবে জানা যাক গাজর সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু তথ্য।

গাজর কেন শরীরের পক্ষে উপকারী ?

গাজরের এই রঙই হল এর পুষ্টিগুণের অন্যতম কারণ বলে মনে করা হয় (1)।  আজকাল বিজ্ঞানীরা হলুদ, লাল এবং গাঢ় কমলা রঙেরও গাজর তৈরী করছেন। চোখ, ত্বক, চুল এবং শরীরের অন্যান্য অংশের জন্যও গাজরের উপকারিতা প্রচুর।

গাজরের স্বাস্থ্য উপকারিতা

১.  চোখকে স্বাস্থ্যকর করে তুলতে

শরীরে দীর্ঘদিন  ধরে ভিটামিন এ -র ঘাটতি থাকলে রাতকানা রোগ হতে পারে (2)। গাজরে থাকে প্রচুর পরিমানে ভিটামিন এ, যা এই ঘাটতি মিশিয়ে এই রোগকে সারিয়ে তুলতে পারে (3) । এছাড়া এটি চোখের স্বাস্থ্যের জন্য খুবই উপকারী।

২. হার্টকে স্বাস্থ্যকর করে তুলতে

ইঁদুরের ওপর পরীক্ষা করার পর জানা গেছে যে গাজর খেলে শরীরে কোলেস্টেরল কমে ও দেহে অ্যান্টি-অক্সিডেন্টের পরিমাণ বাড়তে থাকে। তাই এটি কার্ডিওভাসকুলার স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করে (4) । কাঁচা গাজরে পেক্টিন নামক এক ধরণের ফাইবার উপস্থিত যা রক্তে কোলেস্টেরলের পরিমান কমাতে সাহায্য করে (5)

৩. ক্যান্সারের ঝুঁকি কমাতে পারে

আজ প্রমাণিত, গাজরে প্রচুর পরিমানে ফাইটোকেমিক্যালস থাকে, যা অ্যান্টি-ক্যান্সারের উপাদান বহন করে (6) । এই উপাদানগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বিটা ক্যারোটিন ও কিছু ধরণের ক্যারোটিনয়েড। এই উপাদানগুলি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় ও কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রোটিনকে সক্রিয় করে যা ক্যান্সারের কোষকে রোধ করতে পারে। এছাড়া গাজরের রস লিউকোমিয়া সারাতেও উপযোগী (7)

গাজরে উপস্থিত ক্যারোটিনয়েডগুলি পেট, কোলন, প্রস্টেট, ফুসফুস ও মেয়েদের ব্রেস্ট ক্যান্সারের ঝুঁকি কমাতে পারে বলে জানা যায় (8),(9),(10),(11)

৪. দাঁতের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে

মনে করা হয়, গাজর চিবিয়ে খেলে দাঁত পরিষ্কার থাকে (12)। অনেকে বিশ্বাস করেন গাজর খেলে মুখের ভেতরের গন্ধ দূর হয়।

৫. হজম ক্ষমতা সঠিক রাখতে

গাজর খেলে সেটি ভালোভাবে তো হজম হয়ই এবং সঙ্গে আপনি যা খাবেন তাও খুব ভালোভাবে হজম হয় বলে জানা যায় (13) কারণ এতে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট পূর্ণ ।

৬. ব্লাড প্রেসার ঠিক রাখতে

গাজরের রস প্রত্যেকদিন পান করলে আপনার সিস্টোলিক ব্লাড প্রেসার ৫% কমতে পারে বলে জানা যায়। গাজরে উপস্থিত ফাইবার, পটাশিয়াম, নাইট্রেট, ভিটামিন সি এই ব্লাড প্রেসার ঠিক রাখেতে সাহায্য করে(14)

৭. বার্ধ্যকের ছাপ পড়তে বাধা দেয়

গাজর ক্যারোটিনয়েডে ভরপুর। আর এটি প্রমাণিত যে , নিয়মিত এই ধরণের উপাদান শরীরে প্রবেশ করলে ত্বককে সজীব রেখে বার্ধ্যকের ছাপ পড়তে বাধা দেয় না (15)

৮. হাড়কে মজবুত করতে

হাড়ের কোষের মেটাবলিসম ঠিক রাখে ভিটামিন এ বলে মনে করা হয়, যদিও এটি এখনও পর্যন্ত প্রমাণিত নয় । তবে ক্যারোটিনয়েড হাড়ের স্বাস্থ্য ভালো করতে ও বজায় রাখতে উপযোগী তা প্রমাণিত(16)

৯. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে

সাধারণত ভিটামিন এ শরীরের সব কার্যকলাপ ঠিকভাবে পালন করতে দেয় ও নানা ইনফেকশন থেকে দূরে রাখে। এটি সম্ভব হয় দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করার মাধ্যমে (17) । গাজরে থাকে ভিটামিন সি যা শরীরে কোলাজেন তৈরী হওয়া বৃদ্ধি করে, এটি ফলে দেহের কোনো ক্ষত তাড়াতাড়ি সেরে উঠতে পারে। এছাড়া এটি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও বাড়িয়ে তোলে (18)

১০. শরীরের ওজন কমাতে

তাজা গাজরে থাকে ৮৮% জল (19)। একটি মাঝারি ধরণের গাজরে থাকে মাত্র ২৫ক্যালোরি। তাই গাজর খেলে আপনার পেটও ভরবে কিন্তু শরীরে ক্যালোরিও কম প্রবেশ করবে। তাই এটি শরীরের ওজন কমাতে আপনার ডায়েটে যোগ করতেই পারেন।

১১. ডায়াবেটিসের সমস্যা কমাতে

গাজর ফাইবারে পরিপূর্ণ। গবেষণায় জানা গেছে, যাদের ডায়াবেটিস থাকে তারা যদি ফাইবার বেশি পরিমানে খায় তাহলে গ্লুকোজ মেটাবলিসম উন্নতি লাভ করে (20)। তাই ডায়াবেটিস থাকলে এটি আপনি অবশ্যই নিজের খাদ্যতালিকায় যোগ করুন।

১২. প্রেগন্যান্সির সময় শরীরকে সুস্থ রাখতে

অনেক গর্ভবতী মহিলাই বলেন যে, এই সময় নাকি একটু বেশি গলা শুকিয়ে যায়। যেহেতু তাজা গাজরে থাকে ৮৮% জল (19), তাই এটি যদি কোনো গর্ভবতী মহিলা নিয়মিত ডায়েটে রাখেন , তবে এই গলা শুকনো হয়ে যাওয়ার সমস্যা দূর হয় ও শরীরে ডিহাইড্রেশন হওয়ার ভয় থাকে না।

১৩. শরীরকে টক্সিন মুক্ত করতে

গাজরে থাকে গ্লুটাথিওন। এটি একধরণের অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট যা লিভারের সমস্যাকে কমাতে সাহায্য করে (20) ও যার ফলে লিভার সঠিকভাবে তার কার্যকলাপ করতে পারে। এটিতে থাকে অনেক পরিমানে ফ্ল্যাভোনয়েড ও বিটা ক্যারোটিন। গবেষণায় জানা গেছে, বিটা ক্যারোটিনও লিভারের সমস্যাকে কমাতে পারে (21)

১৪. ত্বককে সজীব রাখতে

গাজর ক্যারোটিনয়েডে ভরপুর। আর এটি প্রমাণিত যে , নিয়মিত এই ধরণের উপাদান শরীরে প্রবেশ করলে ত্বককে সজীব রেখে বার্ধ্যকের ছাপ পড়তে বাধা দেয় না (15)। এছাড়া এতে উপস্থিত জল ও নানা অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ত্বককে স্বাস্থ্যকর করে তুলতে সাহায্য করে।

১৫. ত্বককে ট্যান মুক্ত করতে

গাজরে উপস্থিত ভিটামিন সি ত্বকে সূর্যের তাপের কারণে যে সানবার্ন বা ট্যান পরে তা থেকে মুক্ত করতে পারে। তাই গাজরের রস নিয়মিত মাখলে ত্বকে ট্যান পড়তে বাধা দেয়।

১৬. চুলের দৈর্ঘ্য বৃদ্ধিতে

গাজরে থাকে ভিটামিন এ, সি, ক্যারোটিনয়েড,  অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট। তাই চুলের বৃদ্ধিতে ও চুলের স্বাস্থ্য ফেরাতে এটি উপযোগী। তবে এ বিষয়ে গবেষণার কাজ চলছে।

গাজরের খাদ্যগুণ

প্রতি ১০০গ্রামে গাজরের খাদ্যগুণ নিচে উল্লেখ করা হল (22)

নামপরিমানএকক
            জল          ৮৮.২৯           গ্রাম
           এনার্জি            ৪১     কিলো ক্যালোরি
           প্রোটিন           ০.৯৩          গ্রাম
           লিপিড          ০.২৪          গ্রাম
           ফাইবার           ২.৮          গ্রাম
         ক্যালশিয়াম           ৩৩        মিলিগ্রাম
         ম্যাগনেশিয়াম            ১২         মিলিগ্রাম
           পটাশিয়াম            ৩২০          মিলিগ্রাম
         ফসফরাস            ৩৫           মিলিগ্রাম
          ভিটামিন সি           ৫.৯          মিলিগ্রাম
       ক্যারোটিন, বিটা           ৮২৮৫           মাইক্রোগ্রাম
         ভিটামিন ই          ০.৬৬            মিলিগ্রাম
         সোডিয়াম           ৬৯             মিলিগ্রাম
        রাইবোফ্ল্যাভিন      ০.০৫৮              মিলিগ্রাম

গাজরের ব্যবহার

  • আপনি কাঁচা গাজর চিবিয়ে খেতে পারেন, যা সবচেয়ে শরীরের পক্ষে উপকারী । তবে অবশ্যই খুব ভালো করে ধুয়ে নেবেন কাঁচা খেলে।
  • স্যালাড বানিয়েও খেতে পারেন।
  • মিষ্টি জাতীয় খাবারে ব্যবহার করতে পারেন। প্রায় সবার কাছে গাজরের হালুয়া খুবই একটি জনপ্রিয় খাবার।
  • গাজরের তরকারি বানিয়েও খেতে পারেন।

কিভাবে গাজরের জুস বানাবেন ?

প্রথমে আপনার চাহিদামতো গাজর নিয়ে নিন, তারপর সেগুলির খোসা ছাড়িয়ে নিন। তারপর মিক্সার গ্রাইন্ডারে বা জুসারে দিয়ে ভালোভাবে ঘুরিয়ে নিন, যাতে সব অংশেরই জুস তৈরী হয়ে যায়। লক্ষ্য রাখবেন, অনেক সময় নিচের দিকে গাজরের কিছু অংশ গ্রাইন্ড হয় না। যদি এরম থেকে থাকে আরেকবার জুসারটি চালিয়ে নিন। চিনি কিন্তু এর মধ্যে দেবেন না।

কিভাবে বাড়িতে গাজর রাখবেন ?

বাজার থেকে গাজর কিনে এনে প্রথমে হালকা উষ্ণ জলে নুন ফেলে তাতে কিছুক্ষন চুবিয়ে রেখে দিন। কমপক্ষে আধ ঘন্টা রেখে দেওয়ার পর তা তুলে নিয়ে শুকিয়ে নেবেন ও তারপর একটি ঠান্ডা স্থানে রেখে দিন। আর যদি বেশি দিন রেখে খেতে চান , তাহলে রেফ্রিজারেটরে একটি কাগজ জড়িয়ে রেখে দিন , যাতে ওই কাগজ ফ্রিজে থাকার জন্য গাজরের আদ্রতাকে শুষে নিতে পারে।

গাজরের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া

আমরা জানি, কোনো কিছুই বেশি খাওয়া উচিত না। এক্ষেত্রেও আপনাকে পরিমান মতো গাজরই ডায়েটে রাখা উচিত, কখনোই ভাববেন না বেশি পরিমানে গাজর খেলে এর উপকারিতাও বাড়বে।

  • বেশি পরিমানে গাজর খেলে ত্বকে ক্যারোটেনমিয়া রোগ হতে পারে। এই রোগে ত্বকে হলুদ ও কমলা রঙের ছাপ পড়ে (23)
  • অনেকেরই গাজর খেলে অ্যালার্জি হয় বলে জানা যায় (24) । কিছু ক্ষেত্রে অ্যানাফিল্যাক্সিস অবস্থার সৃষ্টি হয়, এটিকে সিভিয়ার অ্যালার্জিক শক ও বলা হয় (25)

নিয়মিত খাওয়ার আগে অবশ্যই ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করে নেবেন অবশ্যই।

গাজরের গুনাগুণ সম্পর্কে তো জানলেন, তাহলে বুঝতেই পারছেন এটি শরীরের পক্ষে কতটা স্বাস্থ্যকর। এবার থেকে এটি নিজের ডায়েটে যোগ করতে ভুলবেন না যেন। নিজের যত্ন করুন ও সুস্থ থাকুন।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী :

আমরা কি কাঁচা গাজর প্রত্যেকদিন খেতে পারি ?

হ্যাঁ, অবশ্যই খেতে পারেন। এর খাদ্যগুণ প্রচুর।

দিনে কতগুলি গাজর খাওয়া উচিত ?

দিনে দুই থেকে তিনটে গাজর খাওয়া যায়।

গাজরের পাতা কি খাওয়া যায় ?

গাজরের পাতায় থাকে ভিটামিন সি, পটাশিয়াম, ক্যালশিয়াম ও প্রোটিন। তাই সেটি   অনায়াসেই খাওয়া যেতে পারে। কিন্তু খেতে এটি একটু তেতো ধরণের। তাই প্যানে একটি অলিভ অয়েল দিয়ে নুন দিয়ে নেড়ে ছেড়ে খেতে পারেন।

সকালে খালি পেটে গাজর খেলে তার উপকারিতা কি ?

সকালে উঠে খালি পেটে গাজর খেলে তা হজম ক্ষমতার উন্নতি করে।

22 সূত্র :

Articles on StyleCraze are backed by verified information from peer-reviewed and academic research papers, reputed organizations, research institutions, and medical associations to ensure accuracy and relevance. Check out our editorial policy for further details.
Was this article helpful?
The following two tabs change content below.

Sruti Bhattacharjee

scorecardresearch