গলব্লাডার স্টোন বা পিত্তথলিতে পাথরের লক্ষণ এবং ঘরোয়া উপায়ে এর প্রতিকার | Gallbladder Stone Symptoms and Home Remedies in Bengali

Written by

আমাদের মধ্যে বেশিরভাগ মানুষই এমন কিছু অসুস্থতায় ভুগে থাকি যেগুলো আপাতদৃষ্টিতে কষ্টকর মনে না হলেও, পরবর্তী সময়ে এগুলি শরীরের ওপর খারাপ প্রভাব বিস্তার করে। যার ফলে শরীরে রোগাক্রান্ত হয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ে। এমনই এক ধরনের রোগ হল গলব্লাডার স্টোন বা পিত্তথলিতে পাথর। বিশেষত বয়স্ক ব্যক্তি এবং মহিলারা পিত্তথলির সমস্যায় ভোগেন। এই সমস্যা গুলোর মধ্যে রয়েছে পিত্তথলিতে পাথর, প্রদাহ ও সংক্রমণ কিংবা ক্যান্সারের কারণে ব্যথা। পিত্তথলি সংক্রমিত হয়েছে কিংবা পাথরে ভর্তি হয়েছে ততক্ষণ অবধি বোঝা যায় না, যতক্ষণ না সেটা ব্যথা হিসেবে প্রকাশ পায়। আজকের নিবন্ধে আমরা পিত্তথলিতে পাথর সংক্রান্ত বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করব এবং এর চিকিৎসা পদ্ধতি, কি কি কারণে এটি হয়ে থাকে সমস্ত বিষয়ে বিস্তারিত জানব। আসুন তাহলে শুরু করা যাক আজকের নিবন্ধ।

গলব্লাডার স্টোন বা পিত্তথলির পাথর কি?

গলব্লাডার স্টোন বা পিত্তথলিতে পাথর গুলো শক্ত, স্ফটিক আকারযুক্ত হয়। যা অতিরিক্ত কোলেস্টেরল বা পিত্ত লবণ থেকে পিত্তথলিতে গঠিত হয়। এই পাথরগুলি আকারে বিভিন্ন আকৃতির হতে পারে। শস্যের আকার থেকে টেনিস বল এর আকৃতি পর্যন্ত এগুলির মাপ হতে পারে। মূলত পিত্তনালীতে পিত্তরস জমাট বেঁধে এই পাথরগুলি তৈরি হয়ে থাকে। বলা যায় পিত্তনালীতে অসুবিধা দেখা দিলেই গলব্লাডার স্টোন হতে পারে। মূলত অন্য কোনো কারণে এই রোগটি হয় না। এই রোগে পিত্তকোষে যে পাথর হয় সেগুলো সাদা, কালো এবং সবুজ বর্ণের হতে পারে। বালির কনার মত হতে শুরু করে বড় আকৃতির পর্যন্ত এগুলি হতে পারে। যত বেশি পাথর সৃষ্টি হয় তত বেশি ব্যথা বাড়ে। আমাদের দেশে এই রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা অত্যন্ত বেশি, তার মধ্যে মহিলাদের এটির সম্ভাবনা বেশি থাকে। যতদিন পর্যন্ত পিত্তকোষে পাথর থাকে রোগী মাঝেমধ্যেই অসহ্য পেটে যন্ত্রণা অনুভব করে এবং খাবার বদহজম এ ধরনের লক্ষণগুলো দেখা যেতে পারে। এই পাথর গুলো যখন পিত্তকোষ থেকে পিত্তনালীর মধ্যে এসে পড়ে তখন অসম্ভব ব্যথার সৃষ্টি হয়, যাতে রোগীর ব্যথা অসহ্য পর্যন্ত হতে পারে। বিশেষত মহিলারা দীর্ঘক্ষন উপবাস কিংবা কাজের কারণে না খাওয়ার ফলে এই রোগে আক্রান্ত হয়। তবে সব সময় যে গলব্লাডার স্টোন হলে পেটে ব্যথা হবে এমনটা নয়, সে ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরো জটিল হতে পারে। রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশি হলে কিংবা বিলিরুবিনের মাত্রা বেশি হলে পিত্তরস ক্ষরিত হতে বাধা পায়, তখনই গলস্টোন তৈরি হয়। বর্তমানে এই ধরনের সমস্যা প্রত্যেকের ঘরে ঘরে। দীর্ঘদিন ধরে হরমোনের ওষুধ খেলে, অনিয়মিত খাদ্যাভাস, কোলেস্টেরল বাড়লে, অধিক সময় খালি পেটে থাকলে এই গলব্লাডার স্টোন এর সমস্যা বাড়তে পারে।

গলব্লাডার স্টোন এর কারণ :

পাথরগুলি যখন পিত্ত থলির মধ্যে বেড়ে ওঠে তখন তা বেদনাদায়ক হয়ে ওঠে।

১)  শরীরে অতিরিক্ত পরিমাণে কোলেস্টেরল জমা হলে এবং বিলিরুবিনের মাত্রা বৃদ্ধি পেলে পিত্তথলিতে ছোট ছোট পাথরের সৃষ্টি হয়।

২)  তবে পাথরগুলি পিত্ত লবণ দ্বারা গঠিত হতে পারে।

৩)  মহিলাদের ক্ষেত্রে গর্ভাবস্থার ফলে হরমোনের পরিবর্তন হয়, স্থূলতা দেখা দেয় সেগুলি পিত্ত পাথর গঠনের পথ প্রশস্ত করে।

৪) এছাড়াও ফাস্টফুড, জাংক ফুড এই ধরনের খাদ্য পিত্তথলিতে পাথরের ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে।

৫) এই পিত্তপাথর গুলি পিত্তনালী দিয়ে যায় এবং নালীতে বাধার সৃষ্টি করে, যার ফলে পিত্ত লিভার থেকে ছোট অন্ত্রের কাছে যেতে বাধা পায় যখন,  তখন এই ধরনের বাধা আসে তখনই পেটে ব্যথার সৃষ্টি হয়।

৬) মূলত খাদ্য ব্যবস্থার অনিয়মের জন্য পিত্তনালীর প্রদাহজনিত কারণে এই পিত্তরস জমাট বেঁধে পাথর সৃষ্টি হতে পারে ।

৭) গলব্লাডার স্টোন হলে তখন শরীর যথারীতি ভাবে ঠিক মতন চলতে পারেনা যার ফলে কোনরকম ভারী কাজ করলে কিংবা খাদ্যাভাস পরিবর্তন হলেই রোগী পেটে ব্যথা অনুভব করে।

৮)  এছাড়াও অনেক সময় মহিলারা শরীরের ওজন কমানোর জন্য ক্রাশ ডায়েট করেন কিংবা কয়েক দিন অন্তর অন্তর উপোস করেন এক্ষেত্রে খাওয়া-দাওয়ার সময়ের পরিবর্তনেও গলব্লাডার স্টোন হওয়ার সমস্যা দেখা দেয়।

৯)  এছাড়াও মেনোপজ এর পরে এই সমস্যা বৃদ্ধি পায়।

১০)  অনেক মহিলাদের ক্ষেত্রে অধিক গর্ভনিরোধক বড়ি খাওয়ার কারণে পিত্তথলিতে পাথরের সমস্যা দেখা দেয়।

১১) গর্ভাবস্থায় শরীরে হরমোনের পরিবর্তন হওয়ার কারনেও পিত্তথলিতে পাথরের সম্ভাবনা থেকে যায়।

১২) এছাড়া মহিলাদের বয়স ৬০ বছর হলে এবং যে সমস্ত মহিলা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত তাদের পিত্তথলিতে পাথর জমার সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়ে যায়।

১৩) পিত্তথলিতে পাথর জমা হলে মূলত পেটের উপরের অংশে ডান দিকে ব্যথা শুরু হয়। সেই ব্যথা শরীরের ডান অংশ জুড়ে ছড়িয়ে পড়তে থাকে।

১৪)  এর পাশাপাশি জ্বর, বমি বদহজমের সমস্যা, গলা জ্বালা, পেটে ব্যথা এগুলি থেকেই যায়।

জেনে নিন তাহলে পিত্তথলিতে পাথর হলে কি কি লক্ষণ গুলো দেখা যেতে পারে।

গলব্লাডারে স্টোন বা পিত্তথলিতে পাথর এর লক্ষণ :

পিত্তথলিতে পাথর জমাট বেঁধেছে কিনা সেগুলি যে লক্ষণগুলো বুঝবেন সেগুলো হল –

১) পেটের ডান দিক থেকে চারিদিকে প্রচন্ড ব্যথা অনুভব করবেন, রোগী ব্যথায় ছটফট এবং অস্থির হয়ে পড়বে।

২)  অনেক সময় পেটে ব্যথার সাথে বমি, এমনকি পিত্ত বমি পর্যন্ত হয়ে থাকে।

৩) পেটে ব্যথার সাথে শরীর ঠান্ডা হয়ে ঘাম দেখা দেয়, নাড়ি দুর্বল হয়ে পড়ে, ছটফটে ভাব দেখা দেয়।

৪) রোগীর শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে কষ্ট হয়।

৫) রোগী যদি জন্ডিসে আক্রান্ত হয় সেক্ষেত্রে দেহ হলুদ বর্ণ হয়ে যায়।

৬) পিত্তথলিতে পাথর হলে যে পেটে ব্যথা শুরু হয় সেই ব্যথা দু-তিন দিন পর্যন্ত টানা থাকতে পারে। এক্ষেত্রে বুঝতে হবে পিত্তনালী থেকে পাথর ক্ষুদ্রান্তের কাছে চলে আসছে, যার ফলে অনেকের ক্ষেত্রে এটি মলের সাথে বেরিয়ে যায়। আবার অনেকের ক্ষেত্রে মলের সাথে বের না হয়ে ভিতরে আটকে থেকে যায়। সে ক্ষেত্রে অপারেশনের প্রয়োজন হয়।

৭) পিত্তথলির পাথর যখন পিত্তনালীর মুখ দিয়ে বের হতে থাকে তখন অসহ্য বেদনার সৃষ্টি হয় এবং এই পেটে ব্যথা পেটের চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।

৮) রোগীর পেটের ডান পাশে ব্যথা হওয়ার পাশাপাশি তার ডান কাঁধ পর্যন্ত ব্যথা ছড়িয়ে পড়ে।

৯) রোগীর কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসতে পারে।

১০) যেকোনো ধরনের তৈলাক্ত খাবার কিংবা চর্বিজাতীয় খাবার, মাছ, মাংস খেলে পেটে ব্যথা শুরু হবার সম্ভাবনা থাকে।

১১) জ্বরের পাশাপাশি জন্ডিসের লক্ষণ প্রকট হয়ে উঠতে পারে।

১২)  অনেকের ক্ষেত্রে আবার পেটের মাঝখানে ব্যথা হয় এবং সেই ব্যথা আস্তে আস্তে পিছনের দিকে চলে যায়।

১৩) ব্যথা হওয়ার সময় রোগী টক্সিক হয়ে যেতে পারে।

১৪) পাথর পিত্তনালীতে চলে গেলে সমস্যা বাড়তে পারে। এক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। কেবলমাত্র গ্যাসের ওষুধ খেলেই এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না।

পিত্তথলিতে পাথরের সমস্যা দূরীকরনের ঘরোয়া প্রতিকার :

পিত্তথলিতে পাথরের সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য শল্যচিকিৎসা হলো একটি সাধারণ বিষয়। তবে প্রথম থেকে যদি সাবধানতা অবলম্বন করা যায় সে ক্ষেত্রে এটি অপারেশন পর্যন্ত পৌঁছাতে নাও পারে। তবে গলব্লাডার স্টোন এর সমস্যা দেখা দিলে গা বমি ভাব, ডায়েরিয়া সহ অনেক ধরনের অস্বস্তি শরীরে দেখা যায়। এর পাশাপাশি এটি অন্ত্রের ক্যান্সার হবার সম্ভাবনা বাড়িয়ে তোলে। এছাড়াও রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা বৃদ্ধি হওয়ার কারণে ব্যথা বেদনা বাড়তে পারে। এবার তাহলে জেনে নিন ঘরোয়া উপায়ে কিভাবে পিত্তথলির পাথরের থেকে মুক্তি পাবেন –

১) পিত্তথলিতে পাথরের সমস্যা নিরাময়ে আপেলের রস এর ভূমিকা :

আপনার প্রয়োজনীয় উপাদান :

আপেলের রস – এক গ্লাস।

আপনাকে কি করতে হবে?

  • রোজ সকাল বেলা খালি পেটে এক গ্লাস করে আপেলের রস পান করতে হবে।
  • সম্ভব হলে দুপুরে দিকেও এটি খেতে পারেন।

কিভাবে কাজ করে?

আপেলের রসের মধ্যে যে ভিটামিন সমৃদ্ধ উপাদান গুলি রয়েছে সেগুলি পিত্তথলিতে পাথর হওয়ার সম্ভাবনাকে কম করার পাশাপাশি এটি পিত্তকোষ কে সুরক্ষা প্রদান করে থাকে। এছাড়াও কোলেস্টেরলের মাত্রা কম করতে সহায়তা করে। যার ফলে পিত্তথলিতে পাথর হওয়ার সম্ভাবনা কম হয়।

২)  পিত্তথলির পাথর নিরাময়ে লেবুর রসের ব্যবহার :

আপনার প্রয়োজনীয় উপাদান :

লেবুর রস – ১ চা চামচ

হালকা গরম জল – এক গ্লাস।

আপনাকে কি করতে হবে?

  • জলের মধ্যে লেবুর রস মিশিয়ে সকাল বেলা খালি পেটে এটি পান করতে হবে।
  • পরে সারা দিনের যেকোনো সময়ে আরও এক গ্লাস লেবুর জল পান করতে হবে।
  • এক দিনে চার গ্লাস পর্যন্ত লেবু জল পান করতে পারবেন। (1)

কিভাবে কাজ করে?

লেবুর রস হল ভিটামিন সি এর উৎকৃষ্ট উৎস। পিত্তথলি তে পাথর উৎপাদনের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য এটি ভিটামিন সি পরিপূরক হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। সুতরাং প্রতিদিন লেবুর রস পান করা এক্ষেত্রে পিত্তথলিতে পাথর হওয়ার সম্ভাবনাকে দূর করতে পারে। (2)

৩) পিত্তথলিতে পাথরের সমস্যা দূরীকরণে ড্যান্ডেলিওন এর ব্যবহার :

 আপনার প্রয়োজনীয় উপাদান :

শুকনো ড্যান্ডেলিওন এর শিকড় – ১ টেবিল চামচ

মধু – হাফ চা চামচ

গরম জল – এক কাপ।

আপনাকে কি করতে হবে?

  • ড্যান্ডেলিওন গুলি ভালো করে গুঁড়ো করে নিয়ে পাত্রের মধ্যে রাখুন।
  • এবার এতে কিছুটা গরম জল ঢালুন।
  • কয়েক মিনিট অপেক্ষা করুন।
  • এরপর এতে মধু যোগ করুন।
  • এবার চা হিসেবে এটি পান করুন।
  • এই ভেষজ চা দিনে দুবার পান করতে হবে।

কিভাবে কাজ করে?

পিত্তথলিতে পাথরের সমস্যা দূরীকরণের জন্য ড্যান্ডেলিওন হলো একটি অন্যতম প্রাকৃতিক উপাদান। ড্যান্ডেলিওন পিত্ত ক্ষরণের পরিমাণ কম করে এবং চর্বি বিপাক করে হজম করতে সাহায্য করে। এছাড়াও এই ভেষজ গ্রহণের ফলে পিত্তথলি উদ্দীপিত হতে সাহায্য করে।

তবে মনে রাখবেন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত লোকেরা এই ভেষজ চা টি গ্রহণ করার আগে অবশ্যই চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করে নেবেন।

৪) পিত্তথলির পাথর নিরাময়ে ন্যাসপাতির রসের ভূমিকা :

আপনার প্রয়োজনীয় উপাদান :

নাসপাতির রস – হাফ গ্লাস

গরম জল – হাফ গ্লাস

মধু – ২ টেবিল চামচ।

আপনাকে কি করতে হবে?

  • প্রথমে গরম জলে নাসপাতির রস ভাল করে মিশিয়ে নিন।
  • এবার এই মিশ্রণে মধু যোগ করুন।
  • গরম থাকতে থাকতেই এই রস পান করুন।
  • দৈনিক দিনে তিনবার এটি পান করুন। (3)

কিভাবে কাজ করে?

মধু এবং ন্যাসপাতি রসের মিশ্রন পিত্তথলিতে পাথরের বিকাশকে কম করতে সহায়তা করে। ন্যাসপাতি হলো এক ধরনের পেকটিন যুক্ত ফল, এই পেকটিন কোলেস্টেরলের বৃদ্ধিতে বাধা দেয় এবং বাড়তি কোলেস্টেরল শরীর থেকে বের করে দিতে সহায়তা করে।

৫) পিত্তথলির পাথর নিরাময়ে পুদিনা পাতার ভূমিকা :

আপনার প্রয়োজনীয় উপাদান :

পুদিনা পাতা ( তাজা বা শুকনো) – কয়েকটি

গরম জল – এক কাপ

মধু – হাফ চা চামচ।

আপনাকে কি করতে হবে?

  • জল গরম করে নিয়ে তার মধ্যে পুদিনা পাতা গুলো দিয়ে দিন।
  • এবার এটিকে ফুটাতে থাকুন।
  • জল ফুটে গেলে কিছুক্ষণের জন্য ঢাকা দিয়ে রেখে দিন।
  • এরপর উনান থেকে ছেঁকে নিয়ে এর সাথে মধু যোগ করে পান করুন।
  • দৈনিক একবার এটি খাওয়ার চেষ্টা করবেন। (4)

কিভাবে কাজ করে?

পুদিনা পাতা বৃহদান্ত্র এবং অন্যান্য পাচনতন্ত্রের প্রবাহকে উদ্দীপিত করে হজমে সহায়তা করে। এর মধ্যে টের্পিন নামক এক ধরনের প্রাকৃতিক যৌগ রয়েছে, যা পিত্তথলির পাথরকে কম করতে সহায়তা করে। দৈনিক যদি এক কাপ পুদিনা পাতার চা খাওয়া যায় এটি ব্যথার উপশম থেকে মুক্তি দিতে পারে এবং পিত্তথলিতে পাথরের সমস্যা নিরাময়ে সহায়তা করে।

৬) পিত্তথলির পাথর নিরাময়ে হলুদের ব্যবহার :

 আপনার প্রয়োজনীয় উপাদান :

হলুদ – হাফ চা চামচ

মধু – হাফ চা চামচ।

আপনাকে কি করতে হবে?

প্রত্যেকদিন সকালে খালি পেটে মধুর সাথে হলুদ মিশিয়ে নিয়ে খেতে হবে। এটি পিত্তথলি কে সুস্থ এবং স্বাস্থ্যসম্মত রাখতে সহায়তা করে। (6)

কিভাবে কাজ করে?

আমরা অনেক রান্নার মধ্যেই হলুদ ব্যবহার করে থাকি। হলুদ মূলত তার anti-inflammatory এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বৈশিষ্ট্যের জন্য সুপরিচিত। খাবারের সাথে হলুদ খেলে পেটের দ্রবণীয়তা বাড়াতে সহায়তা করে। যার ফলে পিত্তথলিতে পাথর হওয়ার সম্ভাবনাকে এগুলি দূর করতে সহায়তা করে।

৭) পিত্তথলির পাথর নিরাময়ে দুধ থিসল এর ব্যবহার :

আপনার প্রয়োজনীয় উপাদান :

দুধ থিসল বীজ – ১ টেবিল চামচ

জল –  তিন কাপ

মধু – প্রয়োজনমত।

আপনাকে কি করতে হবে?

  • দুধের থিসল বীজগুলো গুঁড়ো করে নিন।
  • এবার এটি গরম জলের মধ্যে কুড়ি মিনিটের জন্য ফোটাতে থাকুন।
  • জল ফুটে গেলে উনান থেকে নামিয়ে এর মধ্যে মধু যোগ করে পান করুন।
  • দিনে দুই থেকে তিনবার এটি গ্রহণ করুন। (7)

কিভাবে কাজ করে ?

ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে উদ্ভূত এক ধরনের ঔষধি উপাদান হলো দুধ থিসেল। দীর্ঘদিন ধরে যকৃৎ পরিষ্কারের জন্য এবং গলব্লাডারের স্টোন প্রতিরোধের প্রাকৃতিক উপাদান হিসেবে এটি ব্যবহার করা হচ্ছে। এর সক্রিয় উপাদান সিলিমারিন, পিত্তথলি পরিষ্কার করে এবং ব্যথা উপশম করতে সহায়তা করে। এগুলো গুঁড়ো আকারে দুধের সাথে যুক্ত করে গ্রহণ করা যায়। তবে এটির স্বাদ যদি আপনার দুধের সাথে পছন্দ না হয় সে ক্ষেত্রে স্ন্যাকস কিংবা সালাদেও গুঁড়ো করে এটি ব্যবহার করতে পারেন।

৮) পিত্তথলির পাথর নিরাময়ে ক্রানবেরি রসের ব্যবহার :

 আপনার প্রয়োজনীয় উপাদান :

ক্রানবেরি রস – এক গ্লাস।

আপনাকে কি করতে হবে?

  • প্রতিদিন এক গ্লাস করে ক্রানবেরি রস পান করুন।
  • এই রসটি পান করার সময় সামান্য অ্যাসিড যুক্ত ভাব অনুভব হতে পারে।
  • সে ক্ষেত্রে অসুবিধা হলে কিছুটা জল দিয়ে পাতলা করে গ্রহণ করুন।
  • দিনে একবার এটি গ্রহণ করার চেষ্টা করুন। (8)

 কিভাবে কাজ করে?

ক্রানবেরি পিত্তথলি এবং পিত্তথলির পাথরের সমস্যা সমাধানের একটি অন্যতম উপাদান। ক্রানবেরি রসে উপস্থিত ডায়েটারি ফাইবার শরীরে কোলেস্টেরলের মাত্রা কম করে এবং এর ফলে কোলেস্টেরলের পিত্তথলিতে পাথর গঠন প্রতিরোধ করে। এটি পিত্ত থলির মধ্যে জমে থাকা পাথর গুলির জন্য এবং পিত্ত প্রবাহকে সচল করতে সহায়তা করে। ক্রানবেরি রসের মধ্যে থাকা অ্যান্টি অক্সিডেন্ট উপাদান গুলি পিত্তথলি এবং লিভারের স্বাস্থ্যকে সুরক্ষিত রাখতে সহায়তা করে। (9)

৯) পিত্তথলির পাথর নিরাময়ে নারকেল তেলের ব্যবহার :

 আপনার প্রয়োজনীয় উপাদান  :

নারকেল তেল – তিন টেবিল চামচ

আপেলের রস – এক-চতুর্থাংশ গ্লাস

লেবুর রস – অর্ধেক

লবঙ্গ – কয়েকটি (প্রয়োজনে)

আদা – একটি ছোট টুকরো।

আপনাকে কি করতে হবে?

  • নারকেল তেল হালকা গরম করে এর মধ্যে উপরিউক্ত সমস্ত উপাদানগুলি যোগ করুন এবং ভালোভাবে মিশিয়ে নিন।
  • প্রতিদিন একবার করে এগুলি গ্রহন করুন।
  • বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রত্যেকদিন যদি এগুলি পান করেন তাহলে পিত্তথলিতে পাথরের সমস্যা থেকে মুক্তি পাবেন। (10)

কিভাবে কাজ করে?

যদি আপনার পিত্তথলিতে পাথর হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়, তাহলে এই প্রক্রিয়াটি আপনার জন্য উপযুক্ত। নারকেল তেলের মধ্যে যে সমস্ত প্রয়োজনীয় চর্বি থাকে তা লিভারে সহজে হজম হতে পারে। এছাড়াও পিত্তথলিতে অস্বাস্থ্যকর চর্বি কোলেস্টেরল এবং পিত্ত লবণের সংক্রমণ রোধ করতে সহায়তা করে।

১০) পিত্তথলির পাথর নিরাময়ে ক্যাস্টর অয়েল এর ভূমিকা :

আপনার প্রয়োজনীয় উপাদান :

ক্যাস্টর অয়েল – ১ কাপ

একটি কাপড়।

আপনাকে কি করতে হবে?

  • ক্যাস্টর অয়েল টি আস্তে আস্তে গরম করে নিন।
  • এবার এই তেলটি পেটের ডান দিকে রেখে মালিশ করুন এবং এর ওপর একটি প্লাস্টিকের মোড়ক জড়িয়ে দিন।
  • যাতে ৩০ থেকে ৪০ মিনিট এটি গরম থাকে।
  • এই প্রক্রিয়াটি সপ্তাহে ৩ বার করুন। (11)

কিভাবে কাজ করে?

ক্যাস্টর অয়েলে অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি এবং আন্টি অক্সিডেন্ট বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা পিত্তথলিতে পাথরের কারণে হওয়া ফোলা ভাব এবং ব্যথা কম করতে সহায়তা করে। (12)

১১) পিত্তথলির পাথর নিরাময়ে ভেষজ চা এর ভূমিকা  :

আপনার প্রয়োজনীয় উপাদান :

গ্রিন টি পাতা – দুই চামচ

গরম জল – এক কাপ

মধু – অর্ধেকটা

লেবু – এক-চতুর্থাংশ।

আপনাকে কি করতে হবে?

  • পাঁচ থেকে দশ মিনিটের জন্য জলের মধ্যে চা পাতা দিয়ে ফুটাতে থাকুন।
  • এবার ফুঁটিয়ে নিয়ে উনান থেজে নামিয়ে এর মধ্যে মধু এবং লেবু যোগ করুন।
  • এবার গরম গরম এই চা টি পান করুন।
  • দিনে ২ থেকে ৩ বার গ্রিন টি পান করুন।

কিভাবে কাজ করে ?

গ্রিন টির মধ্যে রয়েছে অ্যান্টি-অক্সিডেন্টসমৃদ্ধ উপাদান, যা আপনার শরীরকে শক্তি দেয় এবং যে কোনো প্রদাহ কম করে। পিত্তথলির পাথর নিরাময় এর ক্ষেত্রে এগুলি অত্যন্ত উপকারী উপাদান।

১২) পিত্তথলির পাথর নিরাময়ে কফির ভূমিকা :

 আপনার প্রয়োজনীয় উপাদান :

গরম কফি – এক কাপ।

আপনাকে কি করতে হবে?

  • আপনার প্রিয় গরম কফি এক কাপ তৈরি করুন এবং এটি পান করুন।
  • প্রতিদিন দুইবার পিত্তথলিতে পাথরের সম্ভাবনা দূর করার জন্য দিনে দু কাপ কফি পান করুন। (13)

কিভাবে কাজ করে?

গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে, দিনে এক কাপ কফি পিত্তথলির সমস্যা কমাতে সহায়তা করতে পারে। যার ফলে পিত্তথলিতে পাথরের সমস্যা দূর করতে সহায়তা করে। কফি পিত্তথলকে উদ্দীপিত করে এবং পিত্তথলির পথকে সহজ করে তুলতে সহায়তা করে।

১৩) পিত্তথলির পাথর নিরাময়ে ভিটামিন সি এর ব্যবহার :

ভিটামিন সি শরীরের অনাক্রমতা এবং ত্বকের জন্যই কেবল কাজ করে না, এটি পিত্তথলির পাথর নিরাময়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে থাকে। আপনার শরীর যদি প্রত্যেকদিন পর্যাপ্ত পরিমাণে ভিটামিন সি-এর ডোজ পায়, এক্ষেত্রে এসিড ভেঙে যায়, যার ফলে পিত্তথলিতে পাথর হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে। আপনি বিভিন্ন পদ্ধতিতে ভিটামিন সি গ্রহণ করতে পারেন। যদি মনে করেন ওষুধ হিসেবে গ্রহণ করতে পারেন। এছাড়াও পেয়ারা, লেবু এবং বিভিন্ন শাক-সবজি খেয়ে শরীরের দৈনিক ভিটামিন সি এর চাহিদা পূরণ করতে পারেন। (14)

১৪) পিত্তথলির পাথর নিরাময়ে মুলোর ব্যবহার :

 আপনার প্রয়োজনীয় উপাদান

একটি মূলো

জল।

আপনাকে কি করতে হবে?

  • মুলোর খোসা ছাড়িয়ে ছোট ছোট টুকরো করে কেটে নিন।
  • এবার এর মধ্যে জল মিশিয়ে মিক্সারে দিয়ে রস তৈরি করুন।
  • এই রস দিনে ৫ থেকে ৬ টেবিল চামচ পান করুন।
  • তবে একটি ছোট পাথরের জন্য এক চামচ বা দুই চামচ দিনে যথেষ্ট।

 কিভাবে কাজ করে,?

মূলো হয়তো আমাদের অনেকের কাছেই একটি প্রিয় সবজি নয়। তবে এটি পিত্তথলিতে পাথরের সমস্যা দূর করার জন্য একটি ভালো ঘরোয়া উপাদান। বিশেষত কালো মূলাে কোলেস্টেরল এবং পিত্তথলির চিকিৎসায় সাহায্য করে থাকে। তবে একদিনে মাঝারি পরিমাণে খাওয়া উচিত। পরিমাণের বেশি এটি গ্রহণ করা উচিত নয়।

১৫) পিত্তথলির পাথর নিরাময়ে ইসবগুলের ভুষির ভূমিকা :

আপনার প্রয়োজনীয় উপাদান :

ইসবগুলের ভুষি – এক চামচ

জল – এক গ্লাস।

কি করতে হবে?

  • রাতের বেলা এক চামচ ইসবগুলের ভুষি এক গ্লাস জলে ভিজিয়ে রাখতে হবে।
  • পরদিন সকালে উঠে এটি পান করতে হবে।
  • অন্তত এক মাস টানা এটি গ্রহণ করতে হবে।

কিভাবে কাজ করে?

ইসবগুলের ভুষির মধ্যে থাকা উপাদানগুলো পিত্তথলির রস নিঃসরণকে কম করতে সহায়তা করে। যার ফলে পিত্তথলিতে পাথর হওয়ার সম্ভাবনাকে এটি কম করতে সহায়তা করে।

কখন ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে?

গলব্লাডার স্টোন বা পিত্তথলিতে পাথরের সমস্যার ক্ষেত্রে এর লক্ষণ গুলি যখন প্রকট হয়ে উঠবে তখন শল্যচিকিৎসার মাধ্যমে এগুলি বের করে দেওয়া হয়ে থাকে। তবে শুরুতেই যখন থেকে পিত্তথলিতে পাথর হওয়ার সম্ভাব্য লক্ষণগুলি আপনার শরীরের মধ্যে দেখতে পাবেন সেক্ষেত্রে শুরুতেই যদি ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করা যায় তাহলে হয়তো অপারেশনের অপেক্ষা নাও করতে হতে পারে। অনেক সময় ওষুধের সাহায্যে মলের মাধ্যমে এই পাথর বের করে দেওয়া সম্ভব হয়। তবে সম্পূর্ণটাই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী করা উচিত। তাই উপরে উক্ত লক্ষণ গুলির মধ্যে কোন রকম লক্ষণ যদি আপনি অনুভব করেন তাহলে চিকিৎসকের সাথে যোগাযোগ করুন।

পিত্তথলিতে পাথরের রোগ নির্ণয় :

পিত্তথলিতে পাথরের সমস্যা শনাক্তকরণের জন্য বেশ কয়েকটি পরীক্ষা পদ্ধতির ব্যবস্থা রয়েছে, যেগুলোর মাধ্যমে পিত্তথলির সম্পূর্ণ চিত্রটা চিকিৎসকের সামনে উঠে আসে। এগুলির মধ্যে হল –

) আলট্রাসনোগ্রাফিএই পরীক্ষার মাধ্যমে পিত্তথলির লক্ষণ গুলি দেখার জন্য সর্বাধিক ব্যবহার করা হয়ে থাকে। পেটের আল্ট্রাসাউন্ড এর মাধ্যমে পেটের ওপরে একটি যন্ত্রের সাহায্যে কম্পিউটারের মাধ্যমে সম্পূর্ণ পেটের ভিতরের চিত্র টি উঠে আসে।

) এন্ডোস্কোপিক আল্ট্রাসাউন্ড – এই পদ্ধতিতে ছোট ছোট পাথর গুলি সনাক্ত করা যায়, যা আল্ট্রাসনোগ্রাফিতে দেখা যেতে পারে না। এন্ডোস্কোপি চলাকালীন ডাক্তার মুখ দিয়ে এক ধরনের নল পেটের ভিতরে ঢোকায় এটির মাধ্যমে পেটের ভেতরের সমস্ত পাথর গুলির সঠিক চিত্র উঠে আসে।

) অন্যান্য পরীক্ষা উপরিউক্ত পরীক্ষাগুলো ছাড়াও ওরাল কোলেসিস্টোগ্রাফি, এইচ আই ডি এস স্ক্যান, সিটি স্ক্যান, এমআরসিপি, ইআরসিপি এই ধরনের পরীক্ষাগুলো করে পিত্তথলিতে পাথর সনাক্ত করা হয়ে থাকে।

) রক্ত পরীক্ষাএছাড়াও রক্ত পরীক্ষা করে রক্তে সংক্রমণ, জন্ডিস, অগ্নাশয় এবং পিত্ত থলির মধ্যে যে ধরনের জটিলতা গুলো রয়েছে সেগুলো দেখা হয়।

পিত্তথলির পাথর দূরীকরণের চিকিৎসা :

পিত্তথলিতে পাথর আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শুরুর দিকে লক্ষণগুলো দেখা যায় না। পরবর্তী সময়ে এমন ক্ষেত্রে লক্ষণগুলো প্রকাশ হয় যখন অপারেশন করা ছাড়া কোনো পথ থাকে না। এক্ষেত্রে উপরিউক্ত পরীক্ষাগুলোর মাধ্যমে গলব্লাডার স্টোনের চিত্রটি প্রকাশিত হয়ে থাকে। এর পরবর্তী পর্যায়ে ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করে এর চিকিৎসা পদ্ধতি বেছে নেওয়া হয়। কেননা পিত্তথলিতে জটিলতা যত বাড়তে থাকে ডানদিকে তলপেটের ব্যথা তীব্র হতে থাকে। এক্ষেত্রে যে পদ্ধতিতে গলব্লাডার স্টোন এর চিকিৎসা করা হয় সেগুলি হল –

কোলাই সিস্টেক্টমি সার্জারি – এই পদ্ধতিতে শল্য চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করে পিত্তথলি বাদ দিয়ে দেওয়া হয়ে থাকে। যদি পিত্তথলিতে পাথরের কারণে কিংবা অন্যান্য প্রদাহ বা সংক্রমণের কারণে পিত্তথলি অতিরিক্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যায় যা লিভারকে ক্ষতি করতে পারে সেই পরিস্থিতিতে পিত্তথলি বাদ দেওয়া হয়ে থাকে। কেননা পিত্তথলি থাকলে পরে তা খাবার হজম করার ক্ষেত্রে কোনো প্রভাবিত করে না, তবে পিত্তথলি বাদ দেওয়ার ফলে ডায়েরিয়ার সৃষ্টি হতে পারে।

) পিত্তথলি দ্রবীভূত করার ওষুধওষুধের মাধ্যমে পিত্তথলি থেকে পাথরকে অপসারণ করার চেষ্টা করা হতে পারে। তবে এক্ষেত্রে চিকিৎসায় কয়েক মাস থেকে কয়েক বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে কিংবা চিকিৎসা বন্ধ হলে পুনরায় পাথরগুলো গঠন হতে পারে। কখনো কখনো ঔষধ গুলো যথাযথ কাজ করে না। তাই এক্ষেত্রে পরিস্থিতি যদি জটিল হয় অস্ত্রোপচার করে নেওয়াই ভালো।

পিত্তথলিতে পাথর এর খাদ্য তালিকা :

একটি সুস্থ স্বাস্থ্য সম্মত খাদ্য তালিকা আপনার স্বাস্থ্যকর ওজন ধরে রাখার পাশাপাশি এটি শরীরের বিভিন্ন ধরনের রোগ এর ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করে। এক্ষেত্রে পিত্তথলির পাথরের সমস্যা দূর করতে যে বিষয়গুলি মাথায় রাখবেন সেগুলি হল –

১)  খাদ্যতালিকায় বেশি পরিমাণে ফাইবার জাতীয় খাদ্য, যেমন – ফল, শাকসবজি, মটরশুঁটি, বাদামী চাল ও গমের রুটি এগুলি রাখবেন।

২)  পরিশ্রুত কার্বোহাইড্রেট এবং চিনি কম খাবেন।

৩)  নিয়মিত স্বাস্থ্যকর চর্বি, যেমন জলপাই তেল, মাছের তেল  এগুলো খাবেন।

৪)  অস্বাস্থ্যকর ফ্যাট গুলি এড়িয়ে চলুন।

৫)  মিষ্টি, ভাজা খাবার এ ধরনের খাদ্যগুলো খাদ্য তালিকা থেকে সরিয়ে ফেলুন।

৬)  প্রয়োজনে একজন পুষ্টিবিদের সাথে যোগাযোগ করুন।

৭)  খাদ্যতালিকায় কম ক্যালরিযুক্ত খাদ্য রাখুন।

৮) এছাড়া যদি শল্যচিকিৎসা হয় সে ক্ষেত্রে তা দ্রুত ওজন হ্রাস করতে পারে।  প্রতিদিন কমপক্ষে পাঁচ ধরনের ফল এবং শাকসবজি খাওয়ার চেষ্টা করুন।

৯) দিনে দুধ এবং দুগ্ধজাত দ্রব্য, কম ফ্যাট যুক্ত দুধ খাদ্য তালিকায় রাখুন।

১০) মাছ, মাংস, ডিম এবং মটরশুঁটির খাদ্যতালিকায় রাখুন এবং শর্করা জাতীয় খাদ্য সীমিত পরিমাণে গ্রহণ করুন।

১১) স্যাচুরেটেড ফ্যাট, যেমন মাংস, পনির, কেক-বিস্কুট এগুলো সীমিত পরিমাণে গ্রহণ করুন।

১২) ডায়েটে ফাইবার বেশি পরিমাণে গ্রহণ করুন।

১৩) প্রচুর পরিমাণে তরল জাতীয় খাদ্য, যেমন ৩ থেকে ৪ লিটার জল দৈনিক খাদ্যতালিকায় রাখার চেষ্টা করুন।

১৪) একটি মিলের মধ্যে খুব বেশি ফ্যাট না গ্রহণ করার চেষ্টা করুন।

১৫) বারেবারে অল্প পরিমাণে খাবার খান। এতে দেখবেন পিত্তথলিতে পাথর জমার সম্ভাবনা দূর হবে।

১৬) লো ফ্যাট জাতীয় খাদ্য খাদ্য তালিকায় রাখার চেষ্টা করুন।

১৭)  প্রক্রিয়াজাত খাদ্য খাদ্য তালিকা থেকে সরিয়ে ফেলুন।

১৮)  চিনি বেশি পরিমাণে থাকে এমন খাবার না খাওয়াই ভালো।

১৯)  অতিরিক্ত তেল, ঝাল মসলা, খাদ্যতালিকায় না রাখার চেষ্টা করুন। এগুলি পেটে বদহজম এর সৃষ্টি করতে পারে এবং পেটে ব্যথা কে বাড়িয়ে তুলতে পারে।

২০)  সম্ভব হলে বাড়িতে রান্না করার চেষ্টা করুন।

২১)  উচ্চ ফ্যাটযুক্ত পণ্যগুলি কেনার সময় তার চর্বির পরিমাণ দেখে নিন।

২২) রান্না করার সময় তেল স্প্রে করে কিংবা হাত দিয়ে মুছে নিয়ে ব্যবহার করুন।

২৩)  খাবারে প্রাণিজ চর্বি বা তেল ব্যবহার করার চেষ্টা করুন।

২৪)  মাংস রান্না করার সময় জল ছিটিয়ে সেটিকে সিদ্ধ করে নিয়ে করার চেষ্টা করুন।

২৫)  খাবার না ভাজার পরিবর্তে বেক বা গ্রিল করে খাওয়ার চেষ্টা করুন।

পিত্তথলিতে পাথর নিয়ন্ত্রনের সতর্কতামূলক টিপস :

পিত্তথলিতে পাথর হওয়ার সম্ভাবনাকে দূর করতে যে বিষয়গুলি মাথায় রাখবেন সেগুলি হল –

) খাবার বন্ধ করবেন নাদিনে যতবার আপনি খাবার খাবেন গলব্লাডার থেকে ততোবারই বিলিরুবিন নির্গত হয়, তাই কোনও একটা খাবার যদি আমরা বন্ধ করে যাই সে ক্ষেত্রে বেশি পরিমাণে বিলিরুবিন নির্গত হবে, যার ফলস্বরূপ শরীরে কোলেস্টেরলের পরিমাণ পাল্লা দিয়ে বাড়বে। যার ফলে পরে ক্যানসারের সম্ভাবনা দেখা দেবে। তাই একদম খালি পেটে থাকা চলবে না।

) ফাইবার বেশি করে খানপেটকে ভালো রাখতে ফাইবার জাতীয় খাদ্য খাদ্য তালিকায় রাখার চেষ্টা করুন। যেমন –  ওটস, বাদামী ব্রেড, বাদামী চাল, পাস্তা, ওটমিল ধরনের খাবার গুলো প্রাতঃরাশে রাখার চেষ্টা করুন।

) ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন –  অতিরিক্ত স্থূলতার কারণে কিন্তু গলব্লাডারে স্টোন হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। সমীক্ষায় দেখা যায়, ওজন বাড়লে পরে শরীরে কোলেস্টেরলের মাত্রা বৃদ্ধি পায়। যার ফলস্বরূপ পিত্তথলিতে পাথর হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়।

) দুধ খাওয়া বন্ধ করুনযাদের সহ্য না হয় তারা দুধের তৈরি খাদ্য খাবার তালিকা থেকে বাদ দিয়ে দিন কিংবা খেলেও যেকোনো ধরনের লো ফ্যাট মিল্ক খাদ্য তালিকায় রাখতে পারেন। টকদই ও চলতে পারে। কিন্তু পায়েস মিষ্টি, ক্রিম এ ধরনের খাদ্য একেবারেই খাদ্য তালিকা থেকে বাদ দিয়ে দিন।

) ভাজা খাবার কে না বলুন তেল মশলা জাতীয় খাদ্য অনেকের পেটেই একদমই সহ্য হয় না। এক্ষেত্রে যাদের গলব্লাডারের সমস্যা রয়েছে সামান্য তেল জাতীয় খাদ্য খেলে ডায়রিয়া সম্ভাবনা থাকে। তাই পিত্তথলিকে যদি সুস্থ রাখতে চান যে কোন ধরনের ভাজাভুজি খাবার একদম খাওয়া বন্ধ করে দিন।

) মাটন খাওয়া বন্ধ করুনপিত্তথলিতে কোনো রকম সমস্যা থাকলে খাদ্যতালিকায় খাসির মাংস না রাখাই ভালো। কেননা এটি হজম করতে সময় লাগে। যার ফলস্বরূপ আমাদের লিভারের উপর অত্যধিক চাপ সৃষ্টি হয়। মুরগির মাংস খেলে অবশ্যই তার চামড়া ছাড়িয়ে খান। প্রয়োজনে চিকেন লেগ পিস খান এবং যেকোনো ধরনের হালকা রান্না তৈরি করুন। খাদ্যতালিকায় নিরামিষ প্রোটিন রাখার চেষ্টা করুন।

) তেল মেপে খানখাদ্যতালিকায় আমন্ড এবং ওয়ালনাট রাখার চেষ্টা করুন। এর পাশাপাশি অলিভ অয়েলের রান্না-খাওয়া চেষ্টা করুন। দৈনিক দুই থেকে তিন টেবিল চামচ তেল দিয়ে সম্পূর্ণ রান্না করুন। এর ফলে শরীরে কোলেস্টেরলের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে থাকবে এবং পিত্তথলির সমস্যা দূর হবে। এর পাশাপাশি নিয়মিত হাঁটা, ব্যায়াম করা এগুলি আপনাকে পিত্তথলির সমস্যা থেকে দূরে রাখবে, তেমনি ডায়াবেটিস থেকেও দূরে রাখতে সহায়তা করবে।

পিত্তথলিতে পাথর হওয়া খুব বেশী জটিল রোগ না হলেও, এটি যদি দীর্ঘদিন ধরে থেকে যায় তখন তা শরীরের জটিলতার সৃষ্টি করে। আজকের নিবন্ধ থেকে তাহলে কিভাবে প্রাকৃতিক ভাবে পিত্তথলির পাথর কমাবেন সেই বিষয়টি জেনে নিলেন এবং আপনি যদি পিত্তথলির পাথর সংক্রান্ত কোনো সমস্যায় ভুগে থাকেন তবে অবশ্যই চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করুন এবং এটি নিরাময়ের জন্য ওষুধ গ্রহণ করুন। এর পাশাপাশি এর পরিমাণ যদি বৃদ্ধি পায় সে ক্ষেত্রে অপারেশনের ব্যবস্থাও রয়েছে। তাই শুরুতেই যদি এর লক্ষণগুলো প্রকাশ পেয়ে যায় সে ক্ষেত্রে আপনি ঘরোয়া প্রতিকার গুলো ব্যবহার করতে পারেন। কিন্তু পরবর্তী সময় যদি এগুলো বেড়ে যায় তাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ করুন। আজকের নিবন্ধ থেকে পিত্তথলিতে পাথর সংক্রান্ত সমস্ত বিষয়টি সম্পর্কে আমরা আপনাকে অবগত করার চেষ্টা করলাম। এটি আপনার কতটা কাজে লাগলো সেটি আপনাদের জানাতে ভুলবেন না। ভাল থাকবেন, সুস্থ থাকবেন। পরিস্থিতি জটিল হলে অবশ্যই চিকিৎসকের সাথে যোগাযোগ করবেন।

প্রায়শঃ জিজ্ঞাস্য  :

কোথায় গলব্লাডারের ব্যথা হয়?

পেটের ডানদিকের ওপরের অংশে গলব্লাডারে ব্যথা হয়। অনেক সময় পেটের মাঝখানে থেকে পিছন দিকে এই ব্যাথাটা হতে দেখা যায়।

গলব্লাডার কি করে?

আমাদের শরীরে হজমে সহায়তা করে।

পিত্তথলির পাথর কি লিভারকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে?

পিত্তথলিতে যদি পাথর এর পরিমাণ বেড়ে যায় সে ক্ষেত্রে লিভার ক্ষতিগ্রস্ত হবার সম্ভাবনা রয়েছে।

পিত্তথলির পাথর অপারেশনের পর পিঠে ব্যথা থেকে কিভাবে মুক্তি পাবো ?

এক্ষেত্রে ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করুন। সম্ভব হলে একটু হালকা ব্যায়াম করার চেষ্টা করুন।

কিভাবে গলব্লাডারের সমস্যা পরীক্ষা করব?

ইতিমধ্যেই আমরা নিবন্ধে এই বিষয়ে আলোচনা করেছি। পিত্তথলিতে পাথর নির্ণয়ের ক্ষেত্রে আলট্রাসনোগ্রাফি, এন্ডোস্কোপি এই ধরনের পরীক্ষাগুলো করা হয়ে থাকে।

পিত্তথলি থেকে কি পাথর বের করা যায়?

হ্যাঁ, অপারেশনের মাধ্যমে পিত্তথলিতে পাথর বের করা সম্ভব হয়।

পিত্তথলির পাথর অপারেশনের পর সুস্থ হতে কত সময় লাগে?

এক্ষেত্রে অপারেশনের পর সুস্থ হতে একমাস মতন সময় লাগে।

পিত্তথলিতে পাথর থাকলে কি হয়?

পেটে ব্যথা, বমি ভাব, এমনকি জন্ডিসের মতন সমস্যাগুলো দেখা দিতে পারে।

লেবুর রস কি পিত্তথলির পাথর কমাতে পারে?

প্রাথমিক পর্যায়ে যদি লেবুর রস গ্রহণ করা যায় তাহলে এটি পিত্তথলিতে পাথর তৈরীর সম্ভাবনাকে দূর করতে পারে।

খাবার জল কি পিত্তথলির পাথর কমাতে সাহায্য করে?

দৈনিক তিন থেকে চার লিটার জল গ্রহণ করলে তা মূত্রের মাধ্যমে শরীরের অপ্রয়োজনীয় জিনিস গুলো বের করে দিতে সহায়তা করে। যার ফলে এটি পিত্তথলিতে পাথর হওয়ার সম্ভাবনা কেও দূর করে।

অপারেশন না করে কি পিত্তথলি থেকে পাথর বের করা যায়?

হ্যাঁ, অনেক সময় কেবলমাত্র ওষুধ প্রয়োগ করে পিত্তথলি থেকে পাথর বের করা সম্ভব হয়। তবে সম্পূর্ণটাই চিকিৎসকের চিকিৎসা পদ্ধতির ওপর নির্ভর করে।

আদা কি পিত্তথলিতে পাথরের সম্ভাবনা কম করতে পারে?

খাদ্যতালিকায় দৈনিক আদা রাখলে সেটি পিত্তথলিতে পাথর তৈরির সম্ভাবনা দূর করতে পারে।

Sources

Articles on StyleCraze are backed by verified information from peer-reviewed and academic research papers, reputed organizations, research institutions, and medical associations to ensure accuracy and relevance. Read our editorial policy to learn more.

    1. Vitamin C in Citrus juices
      https://www.ncbi.nlm.nih.gov/pmc/articles/PMC1253024/
    2. Vitamin C supplement use may protect against gallstones: an observational study on a randomly selected population
      https://www.ncbi.nlm.nih.gov/pmc/articles/PMC2763865/
    3. Pectin isolated from prickly pear
      https://pubmed.ncbi.nlm.nih.gov/2231018/
    4. Turmeric, the Golden Spice
      https://www.ncbi.nlm.nih.gov/books/NBK92752/
    5. Milk Thistle (PDQ®)–Health Professional Version
      https://www.cancer.gov/about-cancer/treatment/cam/hp/milk-thistle-pdq#section/_7
    6. Favourable impact of low-calorie cranberry juice consumption on plasma HDL-cholesterol concentrations in men
      https://pubmed.ncbi.nlm.nih.gov/16923231/
    7. Cocos nucifera (L.) (Arecaceae): A phytochemical and pharmacological review
      https://www.ncbi.nlm.nih.gov/pmc/articles/PMC4671521/
    8. Antioxidant, Antimicrobial, and Free Radical Scavenging Potential of Aerial Parts of Periploca aphylla and Ricinus communis
      https://www.ncbi.nlm.nih.gov/pmc/articles/PMC3418662/
    9. Using a castor oil-balsam of Peru-trypsin ointment to assist in healing skin graft donor sites
      https://pubmed.ncbi.nlm.nih.gov/12874484/
    10. Serum ascorbic acid and other correlates of gallbladder disease among US adults.
      https://www.ncbi.nlm.nih.gov/pmc/articles/PMC1508320/
Was this article helpful?
The following two tabs change content below.