জিলাটিনের ব্যবহার, উপকারিতা ও পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া | Gelatin Benefits and Side Effects in Bengali

by

জীবজন্তুর ওপর গবেষণা করে বেশ কয়েকটি উপকারী যৌগ পাওয়া গেছে। তারই মধ্যে একটি হল জিলাটিন। সাধারণত জেলি, ক্যান্ডি ইত্যাদি বানাতে জিলাটিন ব্যবহার করা হয়। এর সাথে এতে যে উপাদান রয়েছে তার জন্য এটিকে বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা দূর করতে ওষুধ হিসেবেও ব্যবহার করা হয়ে থাকে। স্টাইলক্রেজের এই প্রবন্ধের মাধ্যমে আপনি জানতে পারবেন জিলাটিনের গুণাগুণ ও পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া। জিলাটিন স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী তো বটেই, তাই রোগের কিছু লক্ষণ কম করতে সাহায্য করে। কিন্তু সম্পূর্ণ চিকিৎসা করতে ডাক্তারের কাছে চেক আপ করানো প্রয়োজন।

জিলাটিন কী?

জিলাটিন এক প্রকার প্রোটিন যা পশুদের হাড়, মাংস ও কানেকটিভ টিস্যু থেকে প্রাপ্ত কোলাজেন নির্যাস থেকে পাওয়া যায়। এটি স্বাদহীন, রংহীন পদার্থ। জিলাটিন ত্বকের যত্নে, হাঁটুতে ব্যথা উপশমে কাজে লাগে। অস্টিওআর্থ্রারাইটিস ( হাঁটুতে সন্ধি তরল কমতে থাকা), অ্যানিমিয়া বা রক্তাল্পতা, অস্টিওপোরোসিস ( হাড়ের মজবুত না হওয়া ) আর ভঙ্গুর নখ ইত্যাদি সমস্যার লক্ষণ কম করতে সাহায্য করে। তবে জিলাটিনের এই ব্যবহারের কোনো সলিড প্রমাণ নেই। তবুও উপরিউক্ত সমস্যার সমাধানে প্রাথমিক ভাবে এবং ওষুধ, খাদ্য, প্রসাধনের সামগ্রী প্রস্তুতিতে জিলাটিন ব্যবহার করা হয়। (1)

জিলাটিনের উপকারিতা

জিলাটিনে পাওয়া নানা ঔষধি গুণের জন্য এর ব্যবহার খাবার ছাড়াও কিছু স্বাস্থ্য সম্পর্কিত সমস্যায় হয়ে থাকে। এখানে স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে জিলাটিনের কীভাবে ব্যবহার হয় এবং তার কী উপকারিতা সেই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হল।

১) ওজন কমানোর জন্য:

জিলাটিনের সেবন ওজন কমাতে খুব সাহায্য করে। দেখা গেছে যে এতে বেশ ভালো পরিমাণে প্রোটিন পাওয়া যায়। ব্রাজিলের এক গবেষণা কেন্দ্রের মতে, প্রোটিন খুব সহজে পাচিত হয় না এবং প্রোটিন সেবনে খিদেও কম পায়। এর জন্য সবসময় খাওয়া দাওয়ার ইচ্ছে খুব কম হয়। ফলে ওজন বাড়ার প্রক্রিয়া হ্রাস পায় এবং ধীরে ধীরে ওজন কমতে থাকে। জিলাটিন সেবনে শুধু মাত্র ওজন নিয়ন্ত্রিত থাকে এই নয়, জিলাটিন ওজন কমাতেও সাহায্য করে।

২) অস্টিওআর্থ্রাইটিসে:

আপনি কি জানেন জেলি ও অন্যান্য খাদ্য উপাদান থেকে তৈরি জিলাটিন হাঁটুর সন্ধির ব্যথা উপশম করতে সক্ষম? এনসিবিআই – এর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত একটি গবেষণা থেকে জানতে পারা যায় যে জিলাটিনে যে কোলাজেন পাওয়া যায় তা অস্টিওপোরোসিস, অস্টিওআর্থ্রাইটিস ইত্যাদি হাড়ের রোগের ক্ষেত্রে সাহায্য করে। (2)

৩) ডায়াবেটিসে ব্যবহার:

ডায়াবেটিস এখন ঘরে ঘরে। ডায়াবেটিস থেকে বাঁচতে মানুষ বিভিন্ন উপাচারও প্রয়োগ করে থাকে। বলে দেওয়া ভালো যে এনআইএইচে ( ন্যাশনাল ইন্সিটিউট অফ হেল্থ ) প্রকাশিত এক গবেষণা অনুসারে মাছ থেকে পাওয়া জিলাটিনে ওমেগা – ৩ পলি আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিড পাওয়া যায়। খেয়াল রাখতে হবে যদি কেউ ডায়াবেটিস রোগে আক্রান্ত হন তাহলে ডাক্তারের পরামর্শ নিয়েই ঘরোয়া উপায় প্রয়োগ করা উচিৎ এবং ওষুধ খেতে ভুলবেন না। বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার সাথে সাথে ইনসুলিনের সক্রিয়তা বাড়িয়ে টাইপ – ২ ডায়েবেটিস নিয়ন্ত্রিত রাখতে জিলাটিন সেবন খুব লাভজনক হয়। (3)

৪) নখ বাড়াতে:

নখ পাতলা, ভঙ্গুর, নিষ্প্রাণ হয়ে যাওয়া নখের বিকাশ সম্পর্কিত সমস্যা, এই সমস্যা দূর করতে জিলাটিন খুব কাজে দেয়। জার্নাল অফ দ্য সোসাইটি অফ কেমিস্ট দ্বারা করা এক গবেষণা থেকে পাওয়া যায় – জিলাটিনে যে অ্যামিনো অ্যাসিড পাওয়া যায় সেটি নখের বিকাশের সাথে নখের বিভিন্ন সমস্যা দূর করতে সাহায্য করে।

৫) দাঁতের যত্নে:

মজবুত দাঁত পাওয়ার পাশাপাশি ক্যাভিটি অর্থাৎ দাঁতের গর্ত হওয়ার সমস্যা থেকে বাঁচতে জিলাটিন খুব লাভদায়ক। ইউনাইটেড স্টেট ডিপার্টমেন্ট অফ এগ্রিকালচারের মত অনুসারে জিলাটিনে প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন পাওয়া যায়। (4) অন্যদিকে এনসিবিআই – এ প্রকাশিত এক গবেষণা অনুসারে, প্রোটিন দাঁতের বিভিন্ন রকম সমস্যা দূর করতে খুব উপকারী। এটি শুধু মাত্র ক্যাভিটি থেকে দাঁতের রক্ষা করে না, এর সাথে পচে যাওয়া বা ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে দাঁতের এনামেল ক্ষয় থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে। (5) এই জন্য বলা হয় জিলাটিন দাঁতের জন্য খুব উপকারী।

৬) ভালো ঘুমের জন্য:

অনিদ্রা দূর করতে জিলাটিন বিশেষভাবে সহায়ক প্রমাণিত হয়েছে। ঘুমের সময় বাড়াতেও এটি সাহায্য করে। এনসিবিআই – এর এক গবেষণা অনুসারে এতে গ্লাইসিন নামক অনুঘটক পাওয়া যায়। (6)অন্যদিকে আরেকটি গবেষণা থেকে জানা যায় যে গ্লাইসিনের ব্যবহার চিকিৎসকীয় বিকল্প রূপে করা হয়। এতে ঘুমের সমস্যা দূর করার সাথে ঘুমের গভীরতা বাড়াতে সাহায্য করে। তাই জিলাটিন শুধু অনিদ্রার সমস্যাই দূর করে না, তার সাথে দীর্ঘ সময় ধরে গভীর ঘুম হতে সাহায্য করে। (7)

৭) হজমের জন্য:

হজমের সমস্যা দূর করার জন্য জিলাটিন একটি ভালো খাদ্য উপাদান হতে পারে। এনসিবিআই – এ প্রকাশিত একটি গবেষণা অনুযায়ী এতে প্রাপ্ত ট্যানিক অ্যাসিড ডায়েরিয়া ঠিক করার পাশাপাশি বমি আর অন্ত্রের বিভিন্ন সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে সাহায্য করে। (8)

৮) বাতের ব্যথা উপশমে:

বাতের ব্যথা যদি নিত্যসঙ্গী হয়ে যায় তাহলে জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। বাতের ব্যথা থেকে উপশম পেতে জিলাটিন সেবন করা খুব উপকারী। এতে কিছুটা হলেও ব্যথার উপশম হয়।

৯) লিভার ভালো রাখতে:

জিলাটিন যেমন ভালো হজম করতে সাহায্য করে তেমনি লিভার ভালো রাখতেও খুব উপযোগী। লিভারের বিভিন্ন অসুখ ঘরোয়া উপায়ে সমাধান করতে জিলাটিন সাহায্য করে।

১০) ত্বক পরিচর্যায়:

স্বাস্থ্য সম্পর্কিত সমস্যাগুলো দূর করতে যেমন জিলাটিন কার্যকরী, ঠিক তেমনই ত্বকের সমস্যা দূর করতে জিলাটিন সাহায্য করে থাকে। ইউএসডিএর অনুসারে জিলাটিন ভিটামিন সি ও প্রোটিনে সমৃদ্ধ। ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের মতে, স্বাস্থ্য, ত্বক ও তার কোষগুলোকে সুস্থ রাখতে প্রোটিনের প্রমুখ ভূমিকা আছে। অন্যদিকে এনসিবিআই – এর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত একটি গবেষণা থেকে জানতে পারা যায় ভিটামিন সি ত্বকের সংক্রমণ থেকে বাঁচার সাথে সাথে পর্যাপ্ত পরিমাণে পুষ্টি প্রদান করে। (9)

১১) চুলের যত্নে:

চুলের বিকাশে এবং তার সুরক্ষার জন্য জিলাটিন খুব উপকারী। এতে প্রোটিন ও ভিটামিন সি পাওয়া যায়। প্রোটিন চুলের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এটি চুলের শুষ্কতা দূর করতে, চুলকে করে মজবুত। এতে চুল পড়া রোধ হয়। ভিটামিন সি চুল পড়া কমাতে এবং লম্বা, ঘন, উজ্জ্বল চুল পেতে সাহায্য করে। (10)

জিলাটিনের উপকারিতা জানার পর এবার আমরা জিলাটিনের মধ্যে উপস্থিত পৌষ্টিক উপাদান সম্পর্কে জেনে নেব।

জিলাটিনের পুষ্টি মূল্য

জিলাটিনে থাকে প্রচুর ক্যালোরি। প্রোটিন , শর্করাতে পরিপূর্ণ জিলাটিন ভিটামিন সি তেও সমৃদ্ধ থাকে।

জিলাটিনে উপস্থিত পরিপোষক উপাদান গুলোর পরিমাণ নিচে দেওয়া হল।

পরিপোষক উপাদানপ্রতি ১০০ গ্রামে মাত্রা
ক্যালোরি৩৮১ কিলো ক্যালোরি
প্রোটিন৯.৫২ গ্রাম
কার্বহাইড্রেট০.০৯ গ্রাম
সুগার৮৫.৭১ গ্রাম
মিনারেলস
সোডিয়াম৩৫৭ মিলিগ্রাম
ভিটামিন
ভিটামিন সি৪২.৯ মিলিগ্রাম

জিলাটিন ব্যবহার করবেন কীভাবে?

চিকিৎসা ক্ষেত্রে জিলাটিন পাউডারের ব্যবহার ক্যাপসুলের কোটিং করতে এবং প্রসাধনী দ্রব্য প্রস্তুত করতে করা হয়। এছাড়াও কিছু অন্য অন্য উপায়েও জিলাটিন ব্যবহার করা হয়। (11) যেমন –

১) বাজারে যে সব ক্যান্ডি পাওয়া যায়, এগুলো তৈরি করতে জিলাটিন পাউডার ব্যবহার করা হয়।
২) মার্শম্যালো ( চিনি দিয়ে তৈরি এক প্রকার রঙিন ক্যান্ডি) তৈরিতে জিলাটিন ব্যবহার করা হয়।
৩) জিলাটিন ব্যবহার করে কেক সাজানো হয়।
৪) আইসক্রিম বানাতে জিলাটিন ব্যবহার করা হয়।

কখন খাওয়া যেতে পারে?

জিলাটিন রঙিন ও স্বাদহীন হয়ে থাকে তাই শুধু শুধু জিলাটিন খেলে স্বাদ খারাপ হতে পারে। এর ব্যবহার ওর ওপর দেওয়া খাদ্য উপাদান রূপে যে কোনো সময় করা যেতে পারে।

কী পরিমাণে খাওয়া যেতে পারে?

প্রতিদিন ১০ গ্রাম পর্যন্ত জিলাটিন সেবন করা যেতে পারে। তবুও এটি সেবনের আগে ডায়েটেশিয়ানের পরামর্শ নেওয়া ভালো।

জিলাটিনের ব্যবহার সম্পর্কে জানতে পারলেন, এরপর এর পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে জেনে নেব।

জিলাটিনের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া

এতক্ষণ আমরা জিলাটিনের ব্যবহার, উপকারিতা, পুষ্টি মূল্য সম্পর্কে জানলাম। জরুরী নয় যে সবসময় জিলাটিন উপকারী হবে, কিছু কিছু সময় জিলাটিনের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়াও দেখা যায়। জিলাটিনের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া গুলো এইরকমের –

১) যেসব ব্যক্তির জিলাটিনে অ্যালার্জি আছে তাদের এটা থেকে দূরে থাকাই ভালো। নাতো এর পরিমাণ খুব খারাপ হতে পারে। (12)
২) ডায়েরিয়ার জন্য জিলাটিন দিয়ে বানানো পদার্থ থেকে দূরে থাকতে হবে। কারণ জিলাটিন সেবনে ডায়েরিয়ার অবস্থা বিগড়ে যেতে পারে।
৩) এনসিবিআই – এর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত একটি গবেষণা থেকে জানা গেছে যে অতিরিক্ত জিলাটিন সেবনে লিভার ও কিডনি সম্পর্কিত সমস্যা তৈরি করতে পারে।

ত্বকের ইলাসটিসিটি বাড়ানোর জন্য দেহে কোলাজেন তৈরি হওয়া প্রয়োজন। আপনার প্রতি দিনের ডায়েটে জিলাটিন থাকলে সহজে কোলাজেন তৈরি হয়। রোজ সকালে জিলাটিন সেবন করলে স্বাস্থ্যের জন্য খুব ভালো হয়। ফ্রুট স্যালাড বা জেলো তৈরি করেও খেতে পারেন। ক্ষত সারাতে, ইনসুলিনের মাত্রা ঠিক রাখতে, হজম ক্ষমতা বাড়াতেও সাহায্য করে জিলাটিন। ঘুমও ভাল হয়। তাই আপনার ডায়েটে জিলাটিন যোগ করুন। আশা করি এই আর্টিকেল পড়ে আপনি জিলাটিন সম্পর্কে বিস্তারিত জেনেছেন এবং উপকৃত হয়েছেন।

সচরাচর জিজ্ঞাস্য প্রশ্ন

জিলাটিন কী দিয়ে তৈরি?

জিলাটিন জীব জন্তুর কোলাজেন থেকে তৈরি হয়। শিল্প ক্ষেত্রে জিলাটিন মাংস ও লেদার শিল্পের বাই-প্রোডাক্ট থেকে তৈরি করা হয়।

প্রতিদিন কী পরিমাণ জিলাটিন সেবন স্বাস্থ্যের পক্ষে ঠিক?

প্রতিদিন ১০ গ্রাম পর্যন্ত জিলাটিন সেবন স্বাস্থ্যের পক্ষে ঠিক। অতিরিক্ত জিলাটিন সেবনে কিন্তু পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া দেখা যাবে।

জিলাটিন খাওয়া কি ঠিক?

জিলাটিন প্রোটিনে সমৃদ্ধ হওয়ায় দেহের জন্য খুব ভালো। একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় জিলাটিন সেবন করা স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।

12 Sources

Was this article helpful?
scorecardresearch