গ্লিসারিনের উপকারিতা এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া | Glycerin Benefits and Side Effects in Bengali

by

ত্বক নিয়ে সমস্যা আমাদের সারা বছরই চলতেই থাকে। তবে এই সমস্যা শীতকালে খানিকটা বেড়ে যায়। ত্বক রুক্ষ শুষ্ক হয়ে ওঠার পাশাপাশি ত্বকের জৌলুস কমে যায়, ব্রণের সমস্যা দেখা দেয়, ত্বক প্রাণহীন হয়ে ওঠে। এমন ত্বক দেখতে কার ভালো লাগে বলুন তো?  বাজারচলতি বহু ক্রিম ব্যবহার করেও হয়তো এ ধরনের সমস্যা থেকে আমরা মুক্তি পাই না। কেননা আমাদের মধ্যে সকলেই একটি সুন্দর স্বাস্থ্যোজ্জ্বল ত্বকের অধিকারী হতে চাই। ত্বককে ভরপুর শীতেও যদি সুস্থ রাখতে চান তাহলে ব্যবহার করুন গ্লিসারিন। গ্লিসারিন বাজার চলতি অন্যান্য ময়েশ্চারাইজারের তুলনায় অনেকটাই প্রাকৃতিক উপাদান সমৃদ্ধ। এতে কোনো রকম কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয় না, যার কারণে এটি ত্বকে সরাসরি প্রভাব বিস্তার করতে পারে। এটি ত্বককে কোনো ক্ষতি না করেই সুন্দর করে তোলে। মূলত উদ্ভিজ্জ উৎস থেকে প্রাপ্ত এক ধরনের বর্ণহীন ও গন্ধহীন প্রাকৃতিক উপাদান হওয়ায় এগুলি ত্বকে ব্যবহারের ফলে যাদের তৈলাক্ত ত্বকের সমস্যা রয়েছে তারাও যেমন উপকার পাবে, তেমনই যাদের রুক্ষ এবং শুষ্ক ত্বকের সমস্যা রয়েছে তারাও এটি তে উপকার পাবে। এর পাশাপাশি এটি ত্বককে পরিষ্কার করতে সহায়তা করে। যে কারণে মেকআপ তোলার ক্ষেত্রেও গ্লিসারিন ব্যবহার করা হয়ে থাকে। খুব সহজেই এর সাহায্যে মেকআপ তুলে ফেলা যায় এবং ত্বককে নরম এবং আর্দ্র করতে এটি সহায়তা করে। গ্লিসারিন শুষ্ক, স্বাভাবিক এবং তৈলাক্ত প্রত্যেক ধরনের ত্বকেই ব্যবহার করা যায়। এটিকে বিভিন্ন পদ্ধতিতে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। তকে আশ্চর্যজনকভাবে বিভিন্ন সমস্যা গুলি নিরাময়ে করতে সহায়তা করে গ্লিসারিন। অনেকেই ভাবেন হয়ত গ্লিসারিন কেবল শুষ্ক ত্বকের উপযোগী। তবে এক্ষেত্রে ধারনাটা ভুল। এটি তৈলাক্ত ত্বকের ক্ষেত্রেও সমানভাবে উপযোগী। এটি প্রাকৃতিক উপাদান হওয়ায় এটি সংবেদনশীল ত্বকের ক্ষেত্রেও সমানভাবে কার্যকরী। আসুন তাহলে আজকের নিবন্ধ থেকে জেনে নিন গ্লিসারিনের নানান রকম গুনাগুন ও উপকারিতা এবং এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সর্ম্পকে।

গ্লিসারিন কি?

গ্লিসারিন হল এক ধরনের উদ্ভিজ্জ তেল যা ১৭৭৯ সালে অলিভ অয়েল এর মিশ্রণ থেকে হঠাৎ করে পাওয়া যায়। এটি প্রাকৃতিক পণ্য হওয়ায় সব ধরনের ত্বকে সমানভাবে কাজ করে থাকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের মতে গ্লিসারিন হলো এক ধরনের ট্রাই হাইড্রক্সি অ্যালকোহল। তবে গ্লিসারিনকে রাসায়নিক পণ্য হিসেবে পরিচিত করানো হয় না। এটি একটি জৈব পণ্য, যা উদ্ভিদ বা প্রাণীর ফ্যাট থেকে নেওয়া হয়েছে। গ্লিসারল বা গ্লিসারিন এক ধরনের বর্ণহীন এবং গন্ধহীন সাদা রঙের তরল মিষ্টি এবং স্বাদ বিহীন উপাদান। এটা প্রসাধন শিল্পের পাশাপাশি ওষুধ তৈরির ক্ষেত্রেও ব্যবহার করা হয়ে থাকে। ত্বক পরিচর্যার বিভিন্ন ক্ষেত্রে এটি ব্যবহার করা হয়ে থাকে। আসুন তাহলে জেনে নিন গ্লিসারিনের উপকারিতা গুলি।

গ্লিসারিনের উপকারিতা

গ্লিসারিন মূলত ত্বক এবং চুলের যত্নে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। আজকের নিবন্ধে আমরা ত্বক ও চুলের যত্নে কিভাবে গ্লিসারিন ব্যবহার করব সেগুলি বিস্তারিত আলোচনা করব :

১) ত্বককে নরম রাখতে

দৈনন্দিন রূপচর্চার তালিকায় যারা গ্লিসারিন ব্যবহার করে থাকেন তাদের ত্বক অন্যান্যদের ত্বকের তুলনায় নরম এবং আর্দ্র হয়ে থাকে। গ্লিসারিন এ এমন কিছু উপাদান রয়েছে যা ত্বককে নরম করতে সাহায্য করে। এছাড়াও গ্লিসারিনের মধ্যে থাকা উপাদানগুলি ত্বককে ময়েশ্চারাইজ করে ত্বকে এক ধরনের নরম এবং সমান্তরাল ভাব প্রয়োগ করে থাকে।(১)

কিভাবে ব্যবহার করবেন?

উপাদান 

এক চা-চামচ গ্লিসারিন, আপনার ব্যবহারকারী ক্রিম।

পদ্ধতি 

  •  প্রত্যেক দিন সকাল বেলা এবং রাতের বেলা আপনার ত্বক যেকোনো ক্লিনজিং মিল্ক দিয়ে ভালো করে পরিষ্কার করে নিন।
  •  এবার আপনার ব্যবহারকারী ফেস ক্রিম এর সাথে এক চা চামচ গ্লিসারিন মিশিয়ে ত্বকে ব্যবহার করুন।
  • এটি ত্বককে উজ্জ্বল এবং সমান্তরাল করতে এবং ত্বককে নরম করে তুলতে সহায়তা করবে।

২) ত্বকের বার্ধক্য রোধে

আমাদের মধ্যে বেশিরভাগ মানুষকেই দৈনন্দিন কাজের সূত্রে কিংবা পড়াশোনার সুত্রে বাইরে বের হতেই হয়। দিন দিন পরিবেশ দূষণ বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে তা আমাদের ত্বকে প্রভাব ফেলে। বাইরের ধুলোবালি, রোদের তাপ, দূষণ ত্বকের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। যার ফলে বয়সের আগেই বার্ধক্যের লক্ষণ স্বরূপ বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেয়। ত্বকে বলিরেখা, ডার্ক সার্কেল এর মতন প্রচুর সমস্যা দেখা দেয়। তবে আপনিও যদি এই সমস্ত সমস্যার সম্মুখীন হয়ে থাকেন তাহলে অন্তত একটিবার গ্লিসারিন ব্যবহার করে দেখুন। এর মধ্যে থাকা উপাদানগুলি ত্বকের বাইরের স্তরের আর্দ্রতা বজায় রাখতে সহায়তা করে। যার ফলে ত্বক তার স্থিতিস্থাপকতা বজায় রাখতে পারে। দৈনন্দিন ত্বক পরিচর্যার ক্ষেত্রে গ্লিসারিন ব্যবহার করলে মুখের চামড়া বুড়িয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা পায়। (২)

 কিভাবে ব্যবহার করবেন ?

উপাদান 

একটি ডিম, এক চা চামচ গ্লিসারিন এবং এক চামচ মধু।

পদ্ধতি 

  • ডিম ভেঙ্গে এর সাদা এবং হলুদ অংশটিকে আলাদা করে নিন।
  •  এরপর ডিমের সাদা অংশটি ভালোভাবে ফেটিয়ে নিন।
  •  এবার এর মধ্যে এক চা চামচ গ্লিসারিন এবং এক চা চামচ মধু যোগ করুন।
  • এবার এই মিশ্রণটি ভালোভাবে তৈরি করে নিন।
  • মিশ্রণটি তৈরি হয়ে গেলে ব্রাশের সাহায্যে সারা মুখে লাগিয়ে নিন।
  • মিশ্রণটি শুকিয়ে গেলে উষ্ণ গরম জল দিয়ে মুখ ধুয়ে ফেলুন।
  •  সপ্তাহে দুই বার এটি ব্যবহার করুন দেখবেন ত্বকের বার্ধক্য জনিত সমস্যা কম হতে শুরু করবে।

৩) ত্বককে আর্দ্রতা প্রদান করতে

ত্বকে গ্লিসারিন ব্যবহার করার অন্যতম প্রধান কারণ হলো এটি ত্বককে যথাযথ আর্দ্রতা প্রদান করে থাকে। বাইরের আবহাওয়া, শারীরিক অবস্থা, শরীরে জলের অভাব এসমস্ত বিভিন্ন কারণে ত্বক অনেক সময় শুষ্ক হয়ে যায়। যার ফলে ত্বকের উপরের অংশে মৃত কোষ বৃদ্ধি পায় এবং তা ত্বকের ছিদ্র গুলিকে বন্ধ করে দিতে থাকে। যার ফলে বাইরে থেকে কোনো ধরনের ক্রিম এর পুষ্টি ত্বকের অভ্যন্তরে সরাসরি যেতে পারে না। এই রূপ পরিস্থিতিতে ত্বকের যত্নে গ্লিসারিন ব্যবহার করা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ। কেননা এটি ত্বকে আর্দ্রতা প্রদান করার পাশাপাশি ত্বক খুব সহজেই থেকে তার প্রয়োজনীয় পুষ্টি শুষে নিতে পারে এবং এটি ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখতে সহায়তা করে।(৩)

কিভাবে ব্যবহার করবেন ?

উপাদান 

চার টেবিল চামচ গোলাপ জল, এক চা-চামচ গ্লিসারিন এবং একটি স্প্রে বোতল।

পদ্ধতি 

  •  গ্লিসারিন এবং গোলাপজল একটি বোতলের মধ্যে ভালো করে মিশিয়ে রেখে দিন।
  • প্রতিদিন স্নানের পরে এই মিশ্রণটি মুখে, হাতে, পায়ে এবং শরীরের সমস্ত উন্মুক্ত অংশে লাগিয়ে ফেলুন। এটি ত্বকের শুষ্কতা কমিয়ে ত্বককে আর্দ্র রাখতে সহায়তা করবে।

৪) ব্রণ নিরাময়ে

বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গিয়েছে ব্রণ নিরাময়ের ক্ষেত্রে ও গ্লিসারিন এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ত্বকে আর্দ্রতার অভাবে ব্রণের সমস্যা দেখা দেয়। গ্লিসারিনের মধ্যে যে উপাদান গুলি রয়েছে সেগুলি ত্বকের আর্দ্রতা বজায় রাখতে সহায়তা করে। ত্বকের এপিডারমাল স্তরে জলের ঘাটতি দেখা দিলে ব্রনের সমস্যা দেখা দেয়। গ্লিসারিন একা এই ট্রান্স এপিডারমাল স্তরে জলের প্রয়োজনীয়তার ২৯ শতাংশ বাড়িয়ে তুলতে পারে। গ্লিসারিন ও গোলাপ জলের সাথে মিশিয়ে ব্যবহার করা যেতে পারে। এছাড়াও গ্লিসারিনের মধ্যে রয়েছে অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি এবং মশ্চারাইজিং বৈশিষ্ট্যগুলি, যা ত্বকে ব্রণের সমস্যা গুলি কম করতেও সহায়তা করে। (৪)

কিভাবে ব্যবহার করবেন?

 উপাদান 

এক চামচ দুধ ও এক চা-চামচ গ্লিসারিন।

 পদ্ধতি 

  • একটি বাটিতে এক চা চামচ দুধ এবং এক চা-চামচ গ্লিসারিন ভালো করে মিশিয়ে নিন। (৫)
  • এবার এই মিশ্রণটি আপনার ত্বকে যেখানে ব্রণের সমস্যা রয়েছে সেখানে লাগিয়ে নিন।
  •  পনেরো থেকে কুড়ি মিনিট অপেক্ষা করে সাধারন জল দিয়ে মুখ ধুয়ে ফেলুন।
  • সপ্তাহে তিনবার এটি ব্যবহার করুন। প্রথম সপ্তাহের থেকেই ব্রণর সমস্যা কম হতে থাকবে।

৫) ব্ল্যাকহেডস নিরাময়ে

ব্ল্যাকহেডস নিরাময়ের ক্ষেত্রেও গ্লিসারিন ব্যবহার করা হয়ে থাকে। মূলত ব্ল্যাকহেডসকেও এক ধরনের ব্রণ হিসেবেই আমরা মনে করি। এটি মূলত নাক এবং থুতনিতে কালো ধরনের ব্রণর মত হয়ে থাকে। মূলত মুলতানি মাটির সাথে গ্লিসারিন ব্যবহার করলে ব্ল্যাকহেডসের সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া যেতে পারে। জেনে নিন কীভাবে এটি ব্যবহার করবেন।

 কিভাবে ব্যবহার করবেন?

 উপাদান 

চার চা চামচ বাদাম গুঁড়ো, এক চামচ মুলতানি মাটি ও দুই চামচ গ্লিসারিন।

পদ্ধতি 

  • একটি পাত্রে বাদাম গুঁড়ো, মুলতানি মাটি এবং গ্লিসারিন ভালো করে মিশিয়ে নিন।
  •  এবার এই মিশ্রণটি যেখানে ব্ল্যাকহেডস হয়েছে সেখানে হালকা করে লাগিয়ে রাখুন।
  •  মিশ্রণটি শুকিয়ে গেলে পরিষ্কার জল দিয়ে মুখ ধুয়ে নিন।
  • সপ্তাহে দুবার এটি ব্যবহার করুন।

৬) একজিমা এবং অ্যাটোপিক রোগ নিরাময়ে

ত্বকের বিভিন্ন সমস্যাগুলি নিরাময়ের পাশাপাশি ত্বকের রোগ নিরাময়ের ক্ষেত্রেও গ্লিসারিন ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এটি কেবল ত্বকের সৌন্দর্যকে বাড়িয়ে তোলে না তার পাশাপাশি ত্বকের রোগ থেকে মুক্তি দিতে পারে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, গ্লিসারিনের মধ্যে ময়েশ্চারাইজিং উপাদানগুলো থাকার কারণে এটি ত্বককে আর্দ্র করে তোলার পাশাপাশি ত্বকে চুলকানি এবং ত্বকের শুষ্কতা কম করতে সহায়তা করে। যে কারণে একজিমার মতন  ত্বকের রোগ গুলি নিরাময়ের ক্ষেত্রে গ্লিসারিনযুক্ত ক্রিম ব্যবহার করা হয়ে থাকে।(৬)

ব্যবহার 

ত্বকে একজিমা এবং অ্যাটোপিক রোগের সমস্যা দেখা দিলে অবশ্যই ডাক্তারের সাথে পরামর্শ গ্রহণ করুন। ডাক্তারের পরামর্শমতো ক্রিম এবং ঔষধ গ্রহন করুন।

৭) ত্বকের প্রদাহ বিরোধী উপাদান

গ্লিসারিন ত্বককে নরম এবং কোমল করে তুলতে সহায়তা করে। যেহেতু এটি একটি উদ্ভিদজাত উপাদান তাই এটি ত্বকের জ্বালাভাব, ফুসকুড়ি এবং চুলকানি নিরাময়ের ক্ষেত্রে ব্যবহার হয়ে থাকে।

সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, গ্লিসারোল সোডিয়াম লোরিল সালফেট দ্বারা পরিচালিত হওয়ায় এটি ত্বকের জ্বালা নিরাময়ে সহায়তা করে এবং ত্বকের প্রতিরোধকারী প্রদাহ বিরোধী বৈশিষ্ট্য প্রদান করে থাকে। মূলত ত্বকের বিভিন্ন সমস্যার কারণে সোরিয়াসিস এবং একজিমার মতন সমস্যাগুলি সৃষ্টি হয়, এগুলি নিরাময়ে গ্লিসারিন ব্যবহার করা হয়ে থাকে। )(৭)

৮) ত্বকের স্বাস্থ্য উন্নত করতে

দীর্ঘ সময় ধরে বাইরে থাকলে অতিরিক্ত সূর্যের তাপে ইউভি রশ্মির অতিরিক্ত প্রভাবে ত্বকের কোলাজেন এর মাত্রা হ্রাস পেতে থাকে, যার ফলস্বরূপ ত্বকের ক্ষতি হতে দেখা যায়। ২০১৪ সালে একটি সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, গ্লিসারিনের উপস্থিত অন্যান্য যৌগগুলি ত্বকের যৌবন ধরে রাখতে সহায়তা করে। যার ফলে যারা দীর্ঘক্ষন বাইরে থাকেন তাদের রূপচর্চার ক্ষেত্রে গ্লিসারিন ব্যবহার করা আবশ্যক। (৮)

 কিভাবে ব্যবহার করবেন ?

এক চা-চামচ গ্লিসারিন ও এক চা-চামচ ক্রিম।

 পদ্ধতি 

  • প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে মুখ পরিষ্কার করে ক্রিমের সাথে গ্লিসারিন দিয়ে ভালো করে মিশিয়ে মুখে লাগাবেন এবং বাইরে বেরোনোর আগে অবশ্যই সানস্ক্রিন ব্যবহার করবেন।
  •  এটি ব্যবহার করার পর থেকেই ত্বকের পরিবর্তন বুঝতে পারবেন।

৯) ত্বকের ক্ষত নিরাময় এবং ঘা কমাতে

গ্লিসারিনের মধ্যে যে উপাদান গুলি রয়েছে তার মধ্যে ৮৫ শতাংশ উপাদানগুলি মধ্যে ব্যাকটেরিয়া ঘটিত এবং অ্যান্টিভাইরাল প্রভাব রয়েছে। যা দ্রুত ত্বকের ক্ষত নিরাময়ে সহায়তা করে। সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, ত্বকের যেকোনো ক্ষতস্থানে গ্লিসারিন প্রয়োগ করার ফলে তা প্রদাহ কমানোর পাশাপাশি সেখানে ক্ষত কমাতে সহায়তা করে। যে কারণে  গ্লিসারিন ভিত্তিক যেসমস্ত উপাদানগুলি বাজারে পাওয়া যায় সেটির মধ্যে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল বৈশিষ্ট্য রয়েছে। যা ত্বককে সুস্থ রাখতে সহায়তা করে।(৯)

এছাড়াও গ্লিসারিনের মধ্যে এমন কিছু উপাদান রয়েছে যা ত্বকে আর্দ্রতা প্রদান করতে পারে, যার কারণে ত্বক আর্দ্রতা শোষণ করতে পারলে দ্রুত ক্ষত নিরাময় করতে পারে।

তবে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ছাড়া একজিমা,  অ্যাটোপিক ত্বক, চুলকানি এবং ক্ষতর সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য কোন রকম ঘরোয়া প্রতিকার ব্যবহার না করাই ভালো। এক্ষেত্রে ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করে তিনি যদি মনে করেন সঠিক গ্লিসারিনযুক্ত ক্রিম আপনাকে পরামর্শ দিতে পারেন।

১০) খুশকি নিরাময়ে

ত্বক পরিচর্যায় ব্যবহার করার পাশাপাশি চুলের পরিচর্যা ক্ষেত্রেও গ্লিসারিন সমানভাবে কার্যকরী একটি উপাদান। আমাদের মধ্যে একটি সাধারণ সমস্যা হলো চুলে খুশকির সমস্যা। অনেকেই এই সমস্যায় ভুগছেন। তবে আপনি কি জানেন একবার মাত্র গ্লিসারিনের ব্যবহারে চুলের খুশকি থেকে মুক্তি পাওয়া যায়? বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, গ্লিসারিনের মধ্যে রয়েছে এন্টিফাঙ্গাল বৈশিষ্ট্য যা চুলের খুশকি দূর করতে সহায়তা করে। (১০)

 কিভাবে ব্যবহার করবেন?

উপাদান 

হাফ কাপ গ্লিসারিন।

পদ্ধতি 

  • একটি কাপ এরমধ্যে গ্লিসারিন নিয়ে আপনার মাথার ত্বকে আঙুলের সাহায্যে গ্লিসারিন লাগিয়ে নিন।
  • অথবা আপনার ব্যবহারকারী তেলের মধ্যে তিন চার ফোঁটা যোগ করে ব্যবহার করতে পারেন।
  • সপ্তাহে তিন বার এটি ব্যবহার করুন। খুশকির সমস্যা থেকে পুরোপুরি মুক্তি পেয়ে যাবেন।

১১) চুলের ডগা ফাটা কমাতে

চুল পরিচর্যার বিভিন্ন সমস্যাগুলির ক্ষেত্রে ব্যবহার করার পাশাপাশি চুলের ডগা ফাটার সমস্যার সমাধান ক্ষেত্রেও গ্লিসারিন একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এটি চুলের ডগা ফাটা কম করতে সহায়তা করে। জেনে নিন কিভাবে গ্লিসারিন এর সহায়তায় চুলের আগা ফাটা কম করবেন।

 কিভাবে ব্যবহার করবেন?

 উপাদান 

গ্লিসারিন হাফ কাপ, এক চা-চামচ অ্যালোভেরা জেল, আধা কাপ জল ও একটি স্প্রে বোতল।

পদ্ধতি  

  •  গ্লিসারিন, জল এবং অ্যালোভেরা জেল স্প্রে বোতলে নিয়ে ভালো করে মিশিয়ে নিন।
  • এবার চুলটা খানিকটা ভিজিয়ে নিয়ে এই মিশ্রণটি ভেজা চুলে স্প্রে করুন।
  •  সপ্তাহে দুইবার এটি ব্যবহার করুন চুলের ডগা ফাটার সমস্যা কমে যাবে।

১২) পা ফাটার সমস্যা কমাতে

চুল এবং ত্বকের পাশাপাশি পা ফাটার সমস্যা কম করতেও গ্লিসারিন ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এর মধ্যে থাকা উপাদানগুলি ফাটা গোড়ালিতে আর্দ্রতা প্রদান করে শুষ্কতা কম করে। জেনে নিন কিভাবে ফাটা গোড়ালি ঠিক করবেন গ্লিসারিনের সহায়তা।

কিভাবে ব্যবহার করবেন?

গ্লিসারিন এক চা-চামচ।

পদ্ধতি 

  • রাতে ঘুমানোর আগে ফাটা গোড়ালির মধ্যে ভালো করে গ্লিসারিন লাগিয়ে নিন।
  • এবার পায়ে মোজা পড়ে ঘুমোতে যান।
  •  গোড়ালির ফাটা পুরোপুরি নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত এটি প্রতিদিন রাতে ব্যবহার করুন। দেখবেন আপনার পায়ের গোড়ালি নরম হয়ে উঠবে।

১৩) ঠোঁট ফাটার সমস্যা কমাতে

হঠাৎ করে আবহাওয়ার পরিবর্তন হলে কিংবা শরীরে জলের অভাব দেখা দিলে ঠোঁট ফাটার সমস্যা বেড়ে যায়। এ ক্ষেত্রে ঠোট ফাটা থাকলে পরে মুখের সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে যায়। ত্বকে ব্যবহার করার পাশাপাশি ঠোঁট ফাটার সমস্যা নিরাময়েও গ্লিসারিন ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

 কিভাবে ব্যবহার করবেন?

 উপাদান 

গ্লিসারিন পরিমাণমতো।

পদ্ধতি 

  •  রাতে ঘুমাতে যাবার আগে ঠোঁটে বেশি করে গ্লিসারিন লাগিয়ে নিন।
  • এটি সারারাত ঠোঁটে লাগিয়ে রেখে সকাল বেলা মুখ ধুয়ে নিন।
  •  যতদিন না ঠোঁট ফাটার সমস্যা কমছে এটি প্রতিদিন ব্যবহার করুন।

মুখে কিভাবে গ্লিসারিন ব্যবহার করবেন?

ইতিমধ্যেই গ্লিসারিন এর বিভিন্ন গুনাগুন গুলি সম্পর্কে আমরা জেনে গিয়েছি। আমাদের মধ্যে অনেকেই দৈনন্দিন রূপচর্চার তালিকায় গ্লিসারিন ব্যবহার করে থাকেন। তবে আপনার সুবিধার্থে এবার জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে কি কিভাবে আপনি ত্বক পরিচর্যায় গ্লিসারিন ব্যবহার করতে পারবেন।

১) গ্লিসারিনকে ফেসিয়াল ক্লিনজার হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। ক্লিনজিং মিল্ক এর পরিবর্তে দু তিন ফোঁটা গ্লিসারিন দিয়ে মুখ পরিষ্কার করে নিতে পারেন।

২) গ্লিসারিন গোলাপ জলের সাথে মিশিয়ে টোনার হিসেবে ত্বকে ব্যবহার করা যেতে পারে।

৩) যেকোনো ফেসপ্যাকে চার-পাঁচ ফোঁটা গ্লিসারিন দিয়ে ব্যবহার করা যেতে পারে।

৪) যদি আপনি আর্দ্র ও নরম ত্বক পেতে চান সেক্ষেত্রে দৈনিক আপনি যে ক্রিম ব্যবহার করেন তাতে দু তিন ফোঁটা গ্লিসারিন মিশিয়ে ব্যবহার করতে পারেন।

৫) আপনি যে মেকআপ করছেন সেটা যদি একটু উজ্জ্বল দেখাতে চান সেক্ষেত্রে মেকআপ করার আগে মুখটাকে আর্দ্র করে তুলতে গ্লিসারিন এবং গোলাপ জলের মিশ্রণ ব্যবহার করতে পারেন।

চুলে কিভাবে গ্লিসারিন ব্যবহার করবেন?

ইতিমধ্যেই আমরা জেনে গিয়েছি চুলের যত্নে গ্লিসারিন কতখানি গুরুত্বপূর্ণ উপকারী একটি উপাদান। এবার জেনে নিন কীভাবে চুলের যত্নে গ্লিসারিন ব্যবহার করলে আপনার চুল স্বাস্থ্যোজ্জ্বল এবং ঝলমলে হয়ে উঠবে।

১) চুলে গ্লিসারিন ব্যবহার করার সর্বশেষ্ঠ পদ্ধতি হলো সমপরিমাণ জল এবং গ্লিসারিন একটি স্প্রে বোতলে ভরে রাখুন।

২) এবার এটি শুকনো চুলে স্প্রে করুন। এটি চুলের গোড়ায় স্প্রে করার পাশাপাশি ডগাতেও করুন।

৩) এছাড়া আপনার প্রিয় তেলের সাথে ও গ্লিসারিন মিশিয়ে চুলে ম্যাসাজ করতে পারেন। এতে মাথার ত্বকে রক্ত সঞ্চালন হওয়ার পাশাপাশি ত্বকের আর্দ্রতা বজায় থাকবে।

গ্লিসারিন ব্যবহার করার আগে কি কি সর্তকতা অবলম্বন করতে হবে?

গ্লিসারিন ব্যবহার করার যেমন বেশকিছু গুণও আছে তেমনি এর কিছু পার্শপ্রতিক্রিয়া আছে। এক্ষেত্রে গ্লিসারিন ব্যবহার করার আগে এর পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া গুলো এড়াতে বেশ কয়েকটি জিনিস মনে রাখবেন তাহলে আর এর থেকে আপনার কোন সমস্যার সৃষ্টি হবে না।

১)  গ্লিসারিন কেনার সময় কোনও বিশ্বস্ত ব্র্যান্ড এর কিনুন। কেননা এক্ষেত্রে ভেজাল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

২) গ্লিসারিন এর তৈরির তারিখ এবং সমাপ্তির তারিখ দেখে নিয়ে কিনুন। যাতে এটি আপনার ত্বকে কোন ক্ষতি করতে না পারে।

৩) ত্বকের কোনো সংক্রমণ কিংবা ক্ষতে সরাসরি গ্লিসারিন ব্যবহার করার আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করুন।

৪) ত্বকে এবং চুলে গ্লিসারিন লাগানোর সময় সচেতন থাকুন। যাতে তা চোখে না চলে যায়।

৫)  সংবেদনশীল ত্বকে ব্যবহার করার আগে প্যাচ পরীক্ষা করে নিন।

৬) আপনার যদি অ্যালার্জির সমস্যা থাকে এক্ষেত্রে ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া ক্রিম ব্যবহার করবেন না।

৭) গ্লিসারিন ব্যবহার করে রোদে যাবেন না।

এই বিষয়গুলি মাথায় রাখলে গ্লিসারিন ব্যবহার করার ফলে আর কোনো সমস্যা দেখা দেবে না।

গ্লিসারিন এর পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া

যেকোনো জিনিস ব্যবহার করলে তা যদি সাবধানে ব্যবহার করা যায় তার যেমন উপকারিতা রয়েছে, তেমনি তা ব্যবহারের ক্ষেত্রে যদি সচেতনতা কম থাকে সে ক্ষেত্রে তার ক্ষতিকর দিক রয়েছে। তেমনই গ্লিসারিন ব্যবহারের বেশ কয়েকটি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রয়েছে, সেগুলি সম্পর্কে জেনে নিন :

১)গ্লিসারিন ত্বকে ব্যবহারের ফলে অনেকের নাকে জ্বালার সৃষ্টি হতে পারে, যা হাঁপানির সম্ভাবনা হতে পারে।

২) ত্বকে গ্লিসারিন ব্যবহার করার ফলে চোখ এবং ত্বকের জ্বালাভাব দেখা দিতে পারে।

৩) গ্লিসারিনকে মৌখিক ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করা হয় সে ক্ষেত্রে মাথাব্যথা, মাথা ঘোরা, বমি বমি ভাব, ক্লান্তি ভাব দেখা দিতে পারে।

৪) এটি অতিরিক্ত গ্রহণ করার ফলে শরীরে জলশূন্যতা দেখা দিতে পারে।

৫) গ্লিসারিন উপাদানসমৃদ্ধ ওষুধ গ্রহণ করা হলে সেক্ষেত্রে পেটে সমস্যা দেখা দিতে পারে।

৬)  এছাড়াও গবেষণায় দেখা গিয়েছে গ্লিসারিন এর ফলে ছত্রাকজনিত আক্রমণ বাড়তে পারে।

ইতিমধ্যেই এই নিবন্ধ থেকে আপনারা গ্লিসারিন সম্পর্কে বহু তথ্য গ্রহণ করেছেন। ত্বকের যত্নে এবং চুলের যত্নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান গ্লিসারিন তা আপনারা জেনেছেন। তবে হ্যাঁ, যাদের সংবেদনশীল ত্বক রয়েছে তারা এটি ব্যবহার করার আগে অবশ্যই প্যাচ টেস্ট করে নেবেন। আশা করি গ্লিসারিন এর এই গুনাগুন গুলি জেনে আপনাদের উপকার হবে। তাহলে গ্লিসারিন ব্যবহার করে আপনার কতটা উপকার হলো সেটি আপনি আমাদের জানাতে ভুলবেন না।

প্রায়শই  জিজ্ঞাস্য প্রশ্নাবলী

গ্লিসারিন কি সারারাত মুখে লাগিয়ে রাখা যায়?

হ্যাঁ, যদি ত্বকের কোন সমস্যা না থাকে, সেক্ষেত্রে আপনি সারারাত গ্লিসারিন মুখে রেখে দিতে পারেন।

গ্লিসারিন কি ত্বকে সরাসরি ব্যবহার করা যায়?

হ্যাঁ, প্যাচ পরীক্ষা করার পর গ্লিসারিন সরাসরি মুখে ব্যবহার করা যেতে পারে।

গ্লিসারিন কি ত্বকে চুলকানির সৃষ্টি করে?

খুব কম ক্ষেত্রেই গ্লিসারিন থেকে চুলকানির সম্ভাবনা থাকে। তবে কারও ত্বক সংবেদনশীল হলে সে ক্ষেত্রে এটি ব্যবহার করার আগে প্যাচ পরীক্ষা করা উচিত। যদি আপনার কোন প্রকার জ্বালা বা লাল ভাব অনুভব হয় সেক্ষেত্রে তৎক্ষণাৎ চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের সাথে যোগাযোগ করুন।

10 sources

Articles on StyleCraze are backed by verified information from peer-reviewed and academic research papers, reputed organizations, research institutions, and medical associations to ensure accuracy and relevance. Check out our editorial policy for further details.
Was this article helpful?
The following two tabs change content below.
scorecardresearch