গলা ব্যথা, কথা বলতে কষ্ট? জানুন কারণ এবং ঘরোয়া প্রতিকার | All About Sore Throat in Bengali

Written by

কালের নিরিক্ষে দেখতে গেলে এটা হচ্ছে বসন্ত কাল। ছোটোবেলায় বইতে পড়েছি বসন্তকাল হল ঋতুর রাণী। তবে এখন সে গুড়ে বালি। বসন্তের চিহ্নমাত্রও দেখা পাওয়া যায় না। শীতকাল পেরোতে না পেরোতেই হুট করে চরম তাপ নিয়ে হাজির গ্রীষ্ম। আবহাওয়ার এমন খামখেয়ালি পনায় জীবন একেবারে ওষ্ঠাগত। কখন ঠান্ডা তো কখনও গরম, এমন পরিস্থিতিতে অনেকেই সর্দি-কাশি, গলা ব্যথার মতো সমস্যায় কাতরাচ্ছেন। সর্দি, কাশি, গলা ব্যথার জেরে জল, খাবার খেতে সমস্যা হয়, এমনকী ঢোক গিলতেও গলায় খুব ব্যথা হয়।

তবে কেবলমাত্র আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে নয়, গরম এড়াতে এসি চালানো বা ফ্রিজ রাখা ঠান্ডা জল কিংবা কোল্ড ড্রিঙ্কস খাওয়াও এর পিছনে দায়ী। এর থেকে খুব তাড়াতাড়ি ঠান্ডা লেগে যায়। কাশি হয়, গলায় ব্যথা করে। বিশেষ করে যাদের খুব চট করে ঠান্ডা লাগে বা সর্দি হয় তাদের এই সমস্যায় ভুগতে হয় বেশি। আসুন জেনে নিন গলা ব্যথার সমস্যা থেকে কীভাবে ঘরোয়া উপায়ে মুক্তি পেতে পারেন। সেই সঙ্গে গলা ব্যথা প্রতিকারের আরও কিছু উপায় তুলে ধরা হল আমাদের এই প্রতিবেদনে।

গলা ব্যথা কী?

গলা ব্যথা খুব সাধারণ একটি সমস্যা। যা বাচ্চা থেকে বুড়ো সবারই হতে পারে। সাধারণত এই অবস্থায় গলা লাল হয়ে যায়, অনেক সময় গলা ফুলে যায়। খাবার গিলতে কষ্ট হয়, জল পর্যন্ত খাওয়া যায় না। সাধারণত গলা ব্যথার কারণ হচ্ছে ভাইরাস। তবে ব্যাক্টেরিয়া এবং অন্যান্য সংক্রমণের কারণেও হয়ে থাকে। গ্রুপ এ স্ট্রেপটোকক্কাস (জি এ এস) ব্যাক্টেরিয়া হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাক্টেরিয়া যা গলা ব্যথার অন্যতম কারণ। এই ব্যাক্টেরিয়া ১৫ থেকে ২০% বাচ্চাদের মধ্যে গলা ব্যথার কারণ (1)।

গলা ব্যথা থেকে অনেক সময় গলা চুলকায়, ঢোক গিলতে গেলে ব্যথা লাগে, গলা শুকিয়ে যায়। গলা ব্যথা অন্যতম বেদনাদায়ক একটি সমস্যা। সমীক্ষা অনুযায়ী, সারা বিশ্বে ১৩ মিলিয়ন মানুষ প্রত্যেক বছর এই সমস্যা নিয়ে ডাক্তারের কাছে যান।

বেশিরবাগ ক্ষেত্রে কোনও সংক্রমণ বা আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে এটা হয়ে থাকে। যদিও গলা ব্যথা খুব অস্বস্তিকর, তবে এটি সাধারণত নিজে থেকে সেরে যায়।

গলার কোন অংশটি প্রভাবিত তার উপর ভিত্তি করে গলা ব্যথা নিম্নলিখিত ভাগে ভাগ করা হয় (2) :

স্ট্রেপটোকোকাল ফ্যারিঞ্জাইটিস বা স্ট্রেপ থ্রোট হল এমন এক রোগ যা “গ্রুপ এ স্ট্রেপটোকোকাস” নামক ব্যাক্টেরিয়ার কারণে হল। স্টেপ থ্রোট গলা এবং টনসিল এর ক্ষতি করে। টনসিল হল মুখ এর পিছনের দিকে গলার দুটি গ্রন্থি। স্ট্রেপ থ্রোট স্বরযন্ত্রেরও (বাগযন্ত্র) ক্ষতি করতে পারে।

টনসিলাইটিস, টনসিলের ফোলাভাব ও লালভাব দেখা দিলে এই সমস্যা দেখা দেয়।

ল্যারিনজাইটিস, ল্যারিংক্স অর্থাৎ স্বরযন্ত্র ও ভোকাল কর্ড অর্থাৎ স্বরতন্ত্রীর প্রদাহকে ল্যারিনজাইটিস বলে।

গলা ব্যথার কারণ

বিভিন্ন কারণে গলা ব্যথার সমস্যা হাজির হতে পারে। তার মধ্যে সাধারণ কয়েকটি কারণ হল :

১. সর্দি, ফ্লু এবং অন্যান্য ভাইরাল ইনফেকশন

৯০% ক্ষেত্রে ভাইরাসের কারণে গলা ব্যথা দেখা দেয় (3)। যে কারণে গলা ব্যথার হতে পারে সেগুলি হল –

  • সাধারণ সর্দি
  • ইনফ্লুয়েঞ্জা – দ্য ফ্লু
  • মনোনোক্লিয়োসিস, একটি সংক্রামক রোগ যা লালা দিয়ে সঞ্চারিত হয়।
  • হাম, এর থেকে ফুসকুড়ি এবং জ্বর দেখা দেয়।
  • চিকেনপক্স, একটি সংক্রমণ যা জ্বর এবং চুলকালি এবং ফুসকুড়ি দেখা দেয়।
  • মাম্পস, এমন একটি সংক্রমণ যা ঘাড়ের লাল গ্রন্থিগুলির ফোলাভাব ঘটায়।

২. অন্যান্য ব্যাক্টেরিয়ার সংক্রমণ

ব্যাক্টেরিয়ার সংক্রমণের ফলেও গলাতে সমস্যা হতে পারে। সবচেয়ে সাধারণ কারণ হল গ্রুপ এ স্ট্রেপ্টোকোকাস ব্যাক্টেরিয়া দ্বারা সৃষ্ট গলা এবং টনসিলের সংক্রণ। ৪০ শতাংশ শিশুদের মধ্যে গলার ব্যথার এটি অন্যতম কারণ (4)। টনসিলাইটিস এবং গনোরিয়া ও ক্ল্যামিডিয়ার মতো যৌন সংক্রমণও গলা ব্যথার কারণ হতে পারে।

৩. অ্যালার্জি

অনেকেরই নানা ধরণের অ্যালার্জির সমস্যা থাকে। অ্যালার্জির কারণে চোখ দিয়ে জল পড়া, হাঁচি, গলা জ্বালার মতো সমস্যা দেখা দেয়। নাকের অতিরিক্ত শ্লেষ্মা গলার পিছনে নেমে যেতে পারে। একে পোস্টনাসাল ড্রিপ বলা হয় এবং এটি গলায় অস্বস্তির কারণ হতে পারে (5)।

৪. শুষ্ক বাতাস

শুকনো বাতাস মুখ ও গলার আর্দ্রতা মুছে ফেলতে পারে। যার ফলে গলায় শুকনো ভাব এবং চুলকানি দেখা দিতে পারে (5)।

৫. ধোঁয়া, রাসায়নিক এবং অন্যান্য সমস্যা

পরিবেশে বিভিন্ন রাসায়নিক এবং অন্যান্য পদার্থ গলা জ্বালার কারণ হতে পারে,

  • সিগারেট এবং অন্যান্য তামাক ধোঁয়া
  • বায়ু দূষণ
  • পণ্য পরিষ্কার এবং অন্যান্য রাসায়নিক

৬. আঘাত

কোনও আঘাত যেমন ঘাড়ে আঘাত বা কাটার কারণেও গলা ব্যথা হতে পারে। সেক্ষেত্রে গলায় সামান্য খাবার আটকে গেলেও প্রচণ্ড জ্বালা হতে পারে।

চিৎকার, উচ্চ স্বরে কথা বলা বা দীর্ঘ সময় ধরে গান করার পরও আপনি গলায় ব্যথা অনুভব করতে পারেন। ফিটনেস ইন্সট্রাক্টর এবং শিক্ষকদের কাছে গলা ব্যথা খুব সাধারণ একটি অভিযোগ, কারণ তাঁদের প্রায়শই চিৎকার করতে হয়।

৭. গ্যাস্ট্রোফাগিয়েল রিফ্লাক্স ডিজিজ (জিইআরডি)

এটি এমন একটি পরিস্থিতি যখন খাদ্যনালী (ইসোফেগাস)-র শেষে অবস্থিত বৃত্তাকার পেশী ঠিক করে বন্ধ হয় না আর পাকস্থলীতে থাকা যাবতীয় জিনিসগুলি খাদ্যনালীতে উঠে আসে ও জ্বালা সৃষ্টি করে, অনেকটা বুক জ্বালা করার মতো।

৮. টিউমার

গলা, ভয়েস বক্স এবং জিভের টিউমারও গলা ব্যথার কারণ হতে পারে। তবে এর সংখ্যা খুবই কম। ক্যানসারের কারণে যখন গলা ব্যথা হয় তখন তা সহজে সারতে চায় না।

গলা ব্যথার উপসর্গ

গলা ব্যথা বিভিন্ন কারণে হয়ে থাকে। কারণের উপর ভিত্তি করে এর লক্ষণ এবং উপসর্গও বিভিন্ন রকমের হতে পারে। সাধারণত গলা ব্যথায় যে সমস্ত উপসর্গ দেখা দেয় সেগুলি হল –

  • গলা ব্যথা
  • গলায় চুলকানি
  • জল এবং খাবার খেতে অসুবিধা
  • ঢোক গিলতে কষ্ট
  • গলা ভাঙা

এছাড়াও নিম্নলিখিত উপসর্গগুলিও দেখা দিতে পারে

  • কাশি
  • জ্বর
  • সর্দি
  • হাঁচি
  • গায়ে ব্যথা
  • মাথা ব্যথা
  • জয়েন্টে ব্যথা
  • কানে ব্যথা
  • থুতুতে রক্ত
  • নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট
  • বমি বমি ভাব
  • দূর্বলতা

উপরিউক্ত উপসর্গগুলির পাশাপাশি অসুস্থতাও বোধ হতে পারে।

 গলা ব্যথা থেকে মুক্তির ঘরোয়া উপায়

গলা ব্যথা থেকে মুক্তি পেতে ওষুধপত্র ছাড়াও প্রয়োজন নিজের যত্ন। ঘরোয়া টোটকা অবলম্বন করে দেখতে পারেন। আসুন জেনে নিন গলা ব্যথা থেকে মুক্তির সহজ কিছু ঘরোয়া উপায় –

১. লবণ জল

সামগ্রী

  • একগ্লাস গরম জল
  • একচামচ নুন

পদ্ধতি

  • গরম জলে লবণ মিশিয়ে গালগেল করুন।
  • দিনে দু থেকে তিন বার এই পদ্ধতি ব্যবহার করতে পারেন।

উপকারিতা

গলা ব্যথার অন্যতম প্রাথমিক ঘরোয়া চিকিৎসা হল হালকা গরম জলে সামান্য লবণ মিশিয়ে গার্গেল করা। একটি গ্লাসে হালকা গরম জল নিন। তাতে একচামচ লবণ দিয়ে ভালো করে মিশিয়ে নিন। গলা ব্যথায় চটজলদি আরাম পেতে এটি খুব কার্যকরী।

২. ক্যামোমাইল টি

সামগ্রী

  • এক চামচ ক্যামোমাইল টি
  • এক কাপ জল
  • এক চামচ মধু (প্রয়োজনে নাও দিতে পারেন)
  • সামান্য আপেলের টুকরো

পদ্ধতি

এক কাপ জল প্রথমে ভালো করে গরম করে নিন। তাতে আপেলের টুকরো গুলো দিয়ে দিন। এবার ক্যামোমাইল টি যোগ করুন। মিনিট তিনেক রাখার পর চা ছেঁকে নিন। প্রয়োজনে সামান্য মধু মেশাতে পারেন। তবে চিনি একেবারেই মেশাবেন না। তাতে এই চায়ের উপকারিতা নষ্ট হয়ে যাবে।

উপকারিতা

ভেষজ চায়ের মধ্যে এটি অন্যতম একটি। বিভিন্ন ওষুধ তৈরিতে এর ব্যবহার হয়ে থাকে। এটি প্রায়শই অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং অ্যাস্ট্রিজেন্ট বৈশিষ্ট্যের জন্য ব্যবহৃত হয়ে থাকে (6) (7)।

৩. অ্যাপেল সিডার ভিনিগার

উপকরণ

  • এক কাপ গরম জল
  • ১ থেকে ২ টেবিলচামচ অ্যাপেল সিডার ভিনিগার

পদ্ধতি

  • এক কাপ জলে অ্যাপেল সিডার ভিনিগার মিশিয়ে গার্গেল করুন।
  • মিশ্রণটিতে অল্প পরিমাণে চুমুক দিন এবং ঘণ্টায় ২-৩ বার এই প্রক্রিয়াটি ব্যবহার করুন।
  • গার্গেল করার মাঝখানের সময়ে প্রচুর পরিমাণে জল খান।

উপকারিতা

অ্যাপেল সিডার ভিনিগারের মধ্যে অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল বৈশিষ্ট্য রয়েছে। একাধিক সংক্রণের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য এর অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল গুণও রয়েছে (8)। অম্লীয় প্রকৃতির হওয়ার কারণে এটি গলাতে শ্লেষ্মা জমতে দেয় না এবং ব্যাকটেরিয়ার বিস্তার রোধ করতে সাহায্য করে।

৪. মেথি

মেথির স্বাস্থ্য উপকারিতা অনেক (9)। এটি নানাভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে। আপনি মেথি বীজ শুধুই খেতে পারেন বা মেথির চা তৈরি করে খেতে পারেন। গলা ব্যথায় মেথি চা অন্যতম একটি প্রাকৃতিক প্রতিকার।

বিভিন্ন গবেষণায় মেথির গুণাগুণ বার বার প্রমাণিত হয়েছে। এটি যেমন ব্যথা উপশম করতে পারে ঠিক তেমনই জ্বালা বা প্রদাহ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়াগুলিকে মেরে ফেলতে পারে। এর মধ্যে অ্যান্টিফাঙ্গাল বৈশিষ্ট্যও রয়েছে। তবে গর্ভবতী মহিলাদের এটি এড়িয়ে চলা ভালো।

৫. রসুন

রসুনের মধ্যে রয়েছে অ্যান্টিব্যাক্টেরিয়াল এবং অ্যান্টিসেপটিক গুণ যা গলা ব্যথায় দারুণভাবে কার্যকরী। রসুনের মধ্যে উপস্থিত অ্যালিসিন গলা ব্যথার জন্য দায়ী ব্যাক্টেরিয়াকে মেরে ফেলতে সাহায্য করতে পারে। কাঁচা বা রান্না করে যেকোনও উপায়ে রসুন খেতে পারেন (10)।

৬. লবঙ্গ

মাঝে মধ্যে গলা খুসখুস, কাশি বা গলা ব্যথায় যারা ভুগছেন তারা লবঙ্গ খান। মাঝে মধ্যে মুখে দুটো লবঙ্গ রাখুন এবং সেগুলি নরম হয়ে গেলে চিবিয়ে খেয়ে নিন। গলা ব্যথায় এটি দারুণ কাজ দেয়। আপনি চাইলে চা তৈরির সময়ও তাতে দু-চারটে লবঙ্গ দিতে পারেন, উপকার পাবেন।

৭. আদা

আদার মধ্যেও প্রাকৃতিক অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি এবং অ্যান্টি ব্যাকটেরিয়াল বৈশিষ্ট্য রয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত এর ব্যবহার গলা ব্যথার জন্য দারুণ কার্যকরী (11)। জল গরম করে তাতে কয়েক টুকরো আদা দিয়ে দিন। ৫-১০ মিনিট জল ভালো করে ফোটান। হালকা গরম থাকা অবস্থায় চুমকে খান। দিনে অন্তত দু’বার ওই জল খান। প্রয়োজনে সামান্য মধু মিশিয়ে খেতে পারেন।

৮. আনারস

আনারসের মধ্যে অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি গুণাগুণ রয়েছে। যা সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করে এবং ব্যাকটেরিয়া মেরে ফেলে। আনারসের জুস খেলে গলা ব্যথায় আরাম পেতে পারেন।

৯. লিকোরাইস রুট

যুগ যুগ ধরে গলা ব্যথার চিকিৎসার এর ব্যবহার চলে আসছে। গবেষণায় দেখা গেছে, জলে এটি মিশিয়ে গার্গেল করলে কার্যকরী ফল পাওয়া যায়। যদিও গর্ভবতী মহিলা এবং যারা শিশুকে স্তন্যপান করাচ্ছেন তাদের এটি এড়িয়ে চলা দরকার (12)।

১০.  গোলমরিচ

সাধারণ সর্দি, কাশি, গলা ব্যথায় এটি দারুণ কাজ দেয়। জমে থাকা কফ বের করে এবং সর্দি, কাশির মতো সমস্যা বিরুদ্ধে লড়াই করতে শরীরে শক্তি জোগায়। সামান্য গরম জলে গুঁড়ো করে রাখা গোলমরিচ এবং মধু মিশিয়ে খেতে পারেন।

১১. পেপারমিন্ট টি

পেপারমিন্ট অন্য আরেকটি খুব জনপ্রিয় ভেষজ চা। যার মধ্যে একাধিক স্বাস্থ্য গুণ রয়েছে। গলা ব্যথা থেকে মুক্তি পেতে এটি দারুণ কাজ দেয়। এর মধ্যে রয়েছে মেন্থল, যার গলা জ্বালায় ঠান্ডা অনুভূতি দেয়।

১২. মধু

মধুর অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল এবং অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি গুণের কথা সবার জানা। প্রাচীন কাল থেকে নানা ওষুধ তৈরি থেকে শুরু করে নানা রোগের ঘরোয়া প্রতিকার হিসেবে এর ব্যবহার চলে আসছে। গলা ব্যথাতেও এর উপকারিতা কম নয়। এক কাপ গরম জলে এক থেকে দুই চামচ মধু মেশান এবং দিনে দুই থেকে তিনবার মিশ্রণটি খান। গবেষণায় দেখা গেছে, ঘুমাতে যাওয়ার আগে চায়ের সঙ্গে মধু মিশিয়ে খুব ভালো ফল পাওয়া যায় (13)।

১৩. বেকিং সোডা

গলা ব্যথায় লবণ জল দিয়ে গার্গেল করা খুবই উপকারী। লবণ মেশানো গরম জলে যদি সামান্য সোডা মিশিয়ে গার্গেল করেন তাহলে আরও ভালো ফল পাবেন। এই পদ্ধতির ব্যবহারে ব্যাকটেরিয়াদের মেরে ফেলতে পারবেন এবং সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারবেন (14)।

১৪. দারুচিনি

কয়েক ফোঁটা দারুচিনি তেলের সঙ্গে এক চা চামচ মধু মেশান। দিনে অন্তত একবার ব্যবহার করুন, গলা ব্যথা থেকে দ্রুত মুক্তি পাবেন। মধু এবং দারুচিনি গুড়ো একসঙ্গে খেলেও সর্দি, কাশি, গলা ব্যথায় আরাম পাবেন।

১৫. লাল লঙ্কা

শুকনো লাল লঙ্কায় রয়েছে ক্যাপসাইসিন যৌগ। যার মধ্যে অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি এবং অ্যান্টিব্যাকটেরিলায় উপাদান। এককাপ জলে অর্ধেক চামচ লঙ্কা গুঁড়ো মিশিয়ে নিন এবং ওই জল দিয়ে গার্গেল করুন। প্রদাহ কম হয় এবং গলায় ইনফেকশন দূর হয়।

১৬. লেবু জল

বিশেষজ্ঞদের মতে, লেবু আমাদের শরীরের টক্সিন দূর করার ক্ষেত্রে খুব উপকারী। তাই গলা ব্যথায় এক গ্লাস গরম জলে লেবুর রস ও এক চা চামচ মধু ভালোভাবে মেশান। দিনে অন্তত দু’বার খান। গলা ব্যথা ও টনসিলের সমস্যা দূর করতে সাহায্য করবে।

১৭. স্লিপারি এলম

গলা ব্যথা থেকে মুক্তি পেতে স্লিপারি এলম অন্যতম বিকল্প ওষুধ। গলা ব্যথায় আরাম পেতে স্লিপারি এলম বার্ক ক্যাপসুল বা এলম বার্ক থেকে তৈরি চা ব্যবহার করতে পারেন। তবে এই বিষয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

গলা ব্যথার চিকিৎসা

গলা ব্যথার সমস্যা দেখা দিলে প্রথমে বাড়িতেই নিজের যত্ন নিন। তাতে না কমলে অবশ্যই চিকিৎসকের কাছে যান। সাধারণত গলা ব্যথা থেকে মুক্তি পেতে ডাক্তারবাবুরা যে সমস্ত ওষুধ খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন –

ব্যথা ও জ্বরের ওষুধ

ভাইরাসের কারণে গলা ব্যথা হলে তা সাধারণত ৫ থেকে ৭ দিনের মধ্যে ওষুধ ছাড়াই ভালো হয়ে যায়। কখনও কখনও জ্বর ও ব্যথা কমার ওষুধ দিলেই কম হয়ে যায়। তবে বাচ্চাদের ক্ষেত্রে ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া কোনও ওষুধ দেবেন না।

অ্যান্টিবায়োটিক

ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের কারণে গলা ব্যথা হলে সাধারণত অ্যান্টিবায়োটিকের একটি কোর্স প্রেসক্রাইব করেন চিকিৎসকেরা। উপসর্গ কমে গেলেও কোর্স পুরো করা দরকার। ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ না খেলে পরবর্তাকালে ফের সমস্যা দেখা দিতে পারে।

এগুলি ছাড়াও শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী চিকিৎসকেরা অন্যান্য ওষুধ দিতে পারে। গলা ব্যথায় দীর্ঘদিন কষ্ট পেলে অবহেলা করবেন না। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ডাক্তারের কাছে যান।

গলা ব্যথা থেকে মুক্তি পাওয়া আরও কিছু টিপস

ডাক্তারি চিকিৎসার পাশাপাশি শরীরের সঠিক যত্ন প্রয়োজন। তাই যতটা সম্ভব নিজের খেয়াল রাখার চেষ্টা করুন। সেইসঙ্গে জরুরি কিছু টিপস মাথায় রাখুন :

  1. পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিন। সেইসঙ্গে আপনার গলাকেও বিশ্রাম দিন।
  2. প্রচুর জল এবং পানীয় খান। তাতে গলার আর্দ্রতা বজায় থাকবে।
  3. গরম গরম স্যুপ জাতীয় জিনিস খান। গরম জলে মধু মিশিয়েও খেতে পারেন।
  4. হালকা গরম জল দিয়ে দিনে অন্তত ৩-৪ বার গার্গেল করুন।
  5. গলায় আরাম দেবে এমন লজেন্স মুখে রাখতে পারেন। তাতে লালাগ্রন্থির ক্ষরণ ঠিক থাকে।
  6. কফি এবং অ্যালকোহল সেবন থেকে বিরত থাকুন।
  7. এইসময় যেহেতু খাবার খেতে অসুবিধা হয়, তাই শক্ত খাবার এড়িয়ে চলুন। নরম খাবার খান।
  8. সাইট্রাস যুক্ত ফল এই সময় খাবেন না তাতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
  9. ভিনিগার এবং অতিরিক্ত নুন সমৃদ্ধ খাবার গলায় যন্ত্রণা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
  10.  ধূপমান একেবারেই নিষেধ। সিগারেটের ধোঁয়া, ধূপের ধোঁয়া এবং কড়া গন্ধযুক্ত পদার্থ গলাব্যথা বাড়িয়ে দিতে পারে।

এগুলি ছাড়াও গলা ব্যথা হলে প্রচুর পরিমাণে জল খান এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিন। তাতে শরীর ডিহাইড্রেশন কবলে পড়বে না সেইসঙ্গে দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে নিজেকে সুস্থ রাখতে অনেক বেশি সচেতন থাকতে হবে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকুন। ঘন ঘন হাত, পা পরিষ্কার করুন। নিজের জল খাওয়ার গ্লাস আলাদা রাখুন। গলা ব্যথায় আক্রান্তদের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলুন, বিশেষ করে তাদের লালা থেকে। হাঁচি, কাশির সময় মুখ ঢেকে রাখুন। মনে রাখবেন নিজের সুরক্ষা নিজের কাছে। সচেতন থাকুন, সুস্থ থাকুন।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী

গলা ব্যথা থেকে সহজেই কীভাবে মুক্তি পেতে পারি?

গলা ব্যথা থেকে মুক্তি পাওয়ার বিভিন্ন ঘরোয়া উপায় প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। তবে চটজলদি এই সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে ঘন ঘন গরম জল দিয়ে গার্গেল করুন।

গলা ব্যথা কতদিন পর্যন্ত থাকে?

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ভাইরাসের কারণে গলা ব্যথা হয়ে থাকে। যা নিজে থেকেই ৩-১০ দিনের মধ্যে সেরে যায়। তবে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ এবং অ্যালার্জির কারণে গলা ব্যথা দীর্ঘদিন পর্যন্ত ভোগাতে পারে।

কোন পানীয় গলা ব্যথা উপকারী?

গরম পানীয় যেমন ক্যাফাইন ছাড়া চা, সঙ্গে লেবুর রস এবং মধু মিশিয়ে খেলে উপকার পাবেন। এছাড়া স্যুপ জাতীয় খাবার খেতে পারেন।

মিনিটের মধ্যে কীভাবে গলা ব্যথা থেকে মুক্তি পাবেন?

গরম জলে নুন দিয়ে গার্গেল করুন। তাতে সামান্য ভিনিগার মেশাতে পারেন আরও ভালো ফল পাবেন।

গলা ব্যথায় কখন ডাক্তারের কাছে যাবেন?

প্রথমে বাড়িতেই ঘরোয়া পদ্ধতি অবলম্বন করে দেখুন। সাধারণত গলা ব্যথা ৩-১০ দিনের মধ্যে সেরে যায়। এরপরও যদি সমস্যা থেকে যায় তাহলে অবশ্যই ডাক্তারের কাছে যান।

স্ট্রেপ থ্রোট নাকি গলা ব্যথা কীভাবে বুঝবেন?

স্ট্রেপটোকোকাল ফ্যারিঞ্জাইটিস বা স্ট্রেপ থ্রোট হল একধরণের গ্রুপ এ স্ট্রেপটোকোকাস ব্যাকটেরিয়া ঘটিত রোগ। গলা এবং টনসিলের ক্ষতি করে।

গলা ব্যথা কখন চিন্তার কারণ?

অধিকাংশ ক্ষেত্রে গলা ব্যথা ঘরোয়া প্রতিকারে সেরে যায়। তবে যদি নিম্নলিখিত লক্ষণগুলি দেখা দেয় তাহলে তা চিন্তার বিষয়। সেক্ষেত্রে দেরি না করে অবশ্যই ডাক্তারের কাছে যান –

  • নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট।
  • ঢোক গিলতে কষ্ট।
  • ১০১ ডিগ্রির বেশি জ্বর।
  • কফ বা শ্লেষ্মার সঙ্গে রক্ত।
  • গলায় ফোলাভাব।
  • দীর্ঘদিন ধরে কাশি এবং গলা ব্যথা।

Sources

Articles on StyleCraze are backed by verified information from peer-reviewed and academic research papers, reputed organizations, research institutions, and medical associations to ensure accuracy and relevance. Read our editorial policy to learn more.

Was this article helpful?
The following two tabs change content below.