কিশমিশের উপকারিতা, ব্যবহার ও পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া – All about Raisins in Bengali

Written by

কিশমিশ  দেখতে শুকনো হলেও এর স্বাদ অসাধারণ। চিনির পরিবর্তে এটি অনেকেই ব্যবহার করে থাকেন। অনেকেই এর উপকারিতা সম্পর্কে জানেন না, তাই আমাদের এই প্রতিবেদনে কিশমিশের উপকারিতা ও এর সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেওয়া হল।

কিশমিশ আসলে কি ?

আঙুর ফলের শুকনো রূপকে আমরা কিশমিশ হিসেবে জানি। অনেকেই ভাবেন, এটি খেতে মিষ্টি বলে নিয়মিত খেলে শরীরে নানা সমস্যা হতে পারে। নানা ধরণের রান্নায় ও মিষ্টি ধরণের খাবার তৈরিতে এটি ব্যবহৃত হয়।

জানেন কি এই কিশমিশ হতে উঠতে পারে আপনার জন্য একটি স্বাস্থ্যকর স্ন্যাক্স ? জানতে হলে পড়ুন এই প্রতিবেদন।

কিশমিশের প্রকারগুলি কি কি ?

কিশমিশ বাজারে পাওয়া যাওয়া ড্রাই ফ্রুটগুলির মধ্যে বেশ জনপ্রিয়। ব্ল্যাক কারেন্ট নামে আইসক্রিমের একটি ফ্লেভার আছে, যা একধরণের কিশমিশ দিয়ে তৈরী ও যার নাম কারেন্ট হিসেবে পরিচিত। এছাড়া সুলতানাস বলে এক ধরণের শুকনো আঙুর ফলও পাওয়া যায় বাজারে।

কিশমিশের উপকারিতা

কিশমিশের স্বাস্থ্য উপকারিতাগুলি নিচে উল্লেখ করা হল।

১. অ্যানিমিয়া সারাতে

কিশমিশে থাকে প্রচুর পরিমানে আয়রন ও ভিটামিন বি-কমপ্লেক্স যা অ্যানিমিয়া সারাতে উপযোগী (1)। কিশমিশে উপস্থিত কপার রক্তে শ্বেত রক্তকণিকার পরিমান বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে।

২. হার্টকে স্বাস্থ্যকর করে তুলতে

কিশমিশে খারাপ কোলেস্টরল থাকে না (2) এবং তাছাড়া কিশমিশের মধ্যে উপস্থিত স্যলুবল ফাইবার খারাপ কোলেস্টরল দূর করে কোলেস্টরলের সমস্যা কমিয়ে হার্টকে স্বাস্থ্যকর করে তুলতে সাহায্য করে।

৩. ইনফেকশনকে দূরে রাখতে

পলিফেনোলিক ফাইটোনিউট্রিয়েন্ট হল একধরণের অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরী অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, যা কিশমিশে উপস্থিত (3)।তাছাড়া অ্যান্টি-ব্যাক্টেরিয়াল বৈশিষ্ট্যও এই ফাইটোনিউট্রিয়েন্টে থাকে বলে  এটি প্রতিদিন খেলে ব্যাকটেরিয়া সংক্রান্ত কোনো ইনফেকশনের থেকে মুক্তি দেয়।

৪. ক্যান্সার রোধ করতে

কিশমিশে ক্যাটেচিং নামক এক অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট থাকে যা দেহকে রেডিক্যাল অ্যাক্টিভিটির থেকে বাঁচায় (4), ফলে টিউমার ও কোলন ক্যান্সারের সম্ভাবনা কমে।

৫.  অ্যাসিডিটি কমাতে

ভালো পরিমানে পটাশিয়াম ও ম্যাগনেশিয়াম উপস্থিত কিশমিশে। তাই এটি অ্যাসিডিটি কমাতে ও দেহ থেকে টক্সিন দূর করতে সাহায্য করে। এটি গাঁটে ব্যথা, কিডনিতে স্টোন ও হার্টের সমস্যা প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে বলে জানা যায় (5)

৬. এনার্জি বাড়াতে

তাড়াতাড়ি এনার্জি বাড়াতে কিশমিশ খাওয়া (6) একটি ভালো উপায় জানেন কি ? তাছাড়া এটি খেলে পেটও ভরা রাখতে সাহায্য করে অনেকক্ষণ।

৭. চোখের ক্ষেত্রে

কিশমিশে উপস্থিত পলিফেনোলিক ফাইটোনিউট্রিয়েন্ট নামক অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট চোখকে দৃষ্টিশক্তিকে প্রখর করতে সাহায্য করে। চোখের জন্য উপকারী ভিটামিন এ, বিটা ক্যারোটিন ও এ- ক্যারোটিনয়েড প্রত্যেকটি উপস্থিত এই কিশমিশে (6)

৮. দাঁতের যত্ন নিতে

ওলিনোলিক অ্যাসিড হল একধরণের ফাইটোনিউট্রিয়েন্ট যা কিশমিশে থাকে এবং এটি দাঁতকে ক্যাভিটি সমস্যার থেকে দূরে রাখে। এছাড়া দাঁতে ব্যাকটেরিয়ার প্রকোপ থেকে বাঁচায়। যেহেতু কিশমিশে ক্যালশিয়াম ভরপুর থাকে, তাই দাঁতকে সহজে ভাঙতে দেয় না। কিশমিশে উপস্থিত বোরন নামক এক উপাদান মুখের ভেতর জীবাণু জন্মাতে বাধা দেয় (7)

৯. শরীরের ওজন ঠিক রাখতে

আপনি যদি নিজের শরীরের ওজন বাড়াতে চান, তাহলে অবশ্যই নিয়মিত কিশমিশ খাওয়ার চেষ্টা করুন। কিশমিশে থাকা গ্লুকোজ ও ফ্রুক্টোজ আপনার শরীরকে এনার্জি বৃদ্ধি করতে পারে ও শরীরের ওজন বাড়ায়, কিন্তু খারাপ কোলেস্টেরল জমা হতে দেয় না শরীরে (8)

১০. ব্লাড প্রেসার সঠিক রাখতে

হাই ব্লাড প্রেসার থাকলে তা সঠিক করতে কিশমিশ সাহায্য করে (2)। খেতে মিষ্টি হলেও এটিতে খারাপ কোলেস্টরল থাকে না। এটি নিয়মিত খেলে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে।

 ১১. জ্বর সারাতে

কিশমিশে থাকা পলিফেনোলিক ফাইটোনিউট্রিয়েন্ট হল একধরণের অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরী অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট (3), যা জ্বর সারাতে উপযোগী বলে জানা যায়।

১২.ডায়াবেটিস কমাতে

কম গ্ল্যাইকেমিক ইনডেক্স ও ইনসুলিন পেয়ারিং এফেক্টর জন্য কিশমিশ শুধুমাত্র সাধারণ মানুষের জন্য নয়, যাদের ডায়াবেটিস আছে তাদের জন্যও স্বাস্থ্যকর (9)

১৩. যৌনতা সংক্রান্ত দুর্বলতা

কিশমিশে থাকে আর্জিনিন নামক এক অ্যামিইনো অ্যাসিড, যা কামশক্তি ও উৎসাহ বাড়িয়ে তোলে (6)। এটি নিয়মিত খেলে এনার্জিও বৃদ্ধি পায়, ফলে আপনার বিবাহিত জীবন হয়ে উঠতে পারে সুখময়।

১৪. ত্বককে স্বাস্থ্যকর করে তুলতে

কিশমিশ হল হাই এনার্জি ও কম ফ্যাট যুক্ত। এটি ত্বককে স্বাস্থ্যকর ও সুন্দর করে তুলতে সক্ষম।

এবার ত্বকের ক্ষেত্রে কিশমিশের কি কি উপকারিতা আছে তা জেনে নিন।

  • নিয়মিত কিশমিশ খেলে বার্ধ্যকের ছাপ যেমন রিঙ্কল, ব্লেমিসেস হতে প্রতিরোধ করে (10) । কিশমিশে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট উপস্থিত বলে ত্বকের কোষকে যেকোনো রকম ক্ষতির থেকে রক্ষা করে।
  • ত্বককে স্বাস্থ্যময় করে তোলে। এতে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট থাকার জন্য যেকোনো ধরণের ক্ষতির থেকে বাঁচাতে সাহায্য করে।
  • কিশমিশে উপস্থিত রেসভেরাট্রল ত্বকের স্বাস্থ্যের জন্য খুবই উপকারী বলে জানা যায় (11) । এই  উপাদানটি দেহ থেকে টক্সিক পদার্থ নির্গত করতে সাহায্য করে ত্বককে সজীব করে তোলে।
  • কালো কিশমিশ খেলে লিভারের কার্যকারিতা উন্নত হয় ও দেহ থেকে টক্সিক পদার্থ নির্গত করে ত্বককে উজ্জ্বল করে তোলে (12)
  • এটি ত্বককে সূর্যের ক্ষতিকারক রশ্মির থেকে বাঁচাতে সাহায্য করে।  কিশমিশে উপস্থিত ফাইটোকেমিক্যালসের জন্যই এটি সম্ভব হয়। একটি গবেষণায় জানা গেছে, এটি ত্বকের ক্যান্সার প্রতিরোধ করতে সক্ষম (13)
  • কিশমিশে থাকা ভিটামিন এ ও ই ত্বকের নতুন কোষ গঠন করতে সাহায্য করে এবং ত্বকের আদ্রতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। নিয়মিত কিশমিশ খেলে ত্বক হয়ে ওঠে সুন্দর ও চকচকে (14)

১৫. চুলের ক্ষেত্রে উপকারিতা

কিশমিশে চুলের ক্ষেত্রে উপযোগী বেশ কিছু পুষ্টিগুণ আছে। এতে ভিটামিন বি, আয়রন, পটাশিয়াম, অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট থাকার জন্য চুলকে স্বাস্থ্যকর করে তুলতে পারে।

  • আয়রনের পরিমাণ কিশমিশে ভরপুর থাকে বলে এটি চুলকে সজীব করে তুলতে পারে (15) । আয়রনের জন্য চুল পড়াও কমতে পারে বলে জানা যায়।
  • কিশমিশে থাকা ভিটামিন সি চুলকে করে তোলে খুশকি মুক্ত ও ঝলমলে।
  • এতে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট থাকার জন্য নতুন চুল গজাতেও সাহায্য করে।

কিশমিশের খাদ্যগুণ

প্রতি ১০০গ্রামে কিশমিশের খাদ্যগুণ নিচে উল্লেখ করা হল (16)

নামপরিমানএকক
            জল          ১৫.৪            গ্রাম
          এনার্জি          ২৯৯     কিলো ক্যালোরি
         প্রোটিন          ৩.০৭          গ্রাম
          আয়রন                       ১.৮৮        মিলিগ্রাম
         ক্যালশিয়াম           ৫০        মিলিগ্রাম

          

         ম্যাগনেশিয়াম           ৩২        মিলিগ্রাম

              

         পটাশিয়াম          ৭৪৯       মিলিগ্রাম
          ভিটামিন সি            ২.৩                   মিলিগ্রাম
        সোডিয়াম             ১১      মিলিগ্রাম
         ফসফরাস            ১০১      মিলিগ্রাম
         ফাইবার           ৩.৭         গ্রাম

কিশমিশের ব্যবহার

  • কিশমিশ আপনি শুধু শুধুও খেতে পারেন আবার অন্য ড্রাই ফ্রুটের সাথে মিশিয়েও খেতে পারেন।
  • গরম দুধের সঙ্গে এটি মিশিয়ে খেলে খুব ভালো লাগে।
  • ব্রেকফাস্ট করার সময় কর্ন ফ্লেক্স বা ওটমিল খেলে তার সঙ্গে মিশিয়ে কিশমিশ খেতে পারেন।
  • স্ন্যাক্স হিসেবেও খেতে পারেন।
  • মিষ্টি জাতীয় খাবারেও দিতে পারেন এটি।
  • বেকিং করার সময় এটি ব্যবহার করতে পারেন। যেমন কেক, বিস্কুট, পাই এসবে কিশমিশ থাকলে অসাধারণ লাগে।

কিভাবে বাড়িতে কিশমিশ রাখবেন ?

  • বাড়িতে কিশমিশ অবশ্যই একটি শক্ত ঢাকনাযুক্ত কৌটোয়ে রাখবেন , যাতে বাইরের আদ্রতা  কৌটোর ভেতরে প্রবেশ করতে না পারে।
  • সূর্যের তাপ যেখানে পড়ে সেখানে রাখবেন না কিশমিশের কৌটো।
  • কিশমিশ  কেনার পর ছয় মাসের মধ্যে খেয়ে নেবেন অবশ্যই।
  • আর যদি বেশি দিন রেখে খেতে চান , তবে কৌটোটি রেফ্রিজারেটরে রেখে দিন। এভাবে এক বছর পর্যন্ত কিশমিশ ঠিক রাখা যায়।

কিশমিশের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া

আমরা জানি, কোনো কিছুই বেশি খাওয়া উচিত না। এক্ষেত্রেও আপনাকে পরিমান মতো কিশমিশ খাওয়া উচিত, কখনোই ভাববেন না বেশি পরিমানে কিশমিশ ব্যবহার করলে এর উপকারিতাও বাড়বে।

নিয়মিত খাওয়ার আগে অবশ্যই ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করে নেবেন অবশ্যই।

কিশমিশের গুনাগুণ সম্পর্কে তো জানলেন, তাহলে বুঝতেই পারছেন এটি শরীরের পক্ষে কতটা স্বাস্থ্যকর। এবার থেকে এটি নিজের ডায়েটে যোগ করতে ভুলবেন না যেন। নিজের যত্ন করুন ও সুস্থ থাকুন।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী :

খালি পেটে কিশমিশ খেলে তার উপকারিতা কি ?

উপরে যেসব উপকারিতাগুলি উল্লেখ করা আছে, সেগুলি আরও দ্রুত সম্ভব হতে পারে খালি পেটে কিশমিশ খেলে।

কিশমিশ ও মধু একসঙ্গে খেলে এর কি উপকারিতা পাওয়া যায় ?

এটি খেলে আপনার মিষ্টি ধরণের খাবার খাওয়ার প্রবণতা কমায়। কারণ দুটি জিনিসই মিষ্টি প্রকৃতির এবং তার পাশাপাশি উভয়েরই খাদ্যগুণ প্রবল।

জলে ভিজিয়ে কিশমিশ খেলে কি উপকারিতা পাওয়া যায় ?

জলে ভিজিয়ে কিশমিশ কিছুক্ষণ রেখে দিয়ে তারপর নিয়মিত খেলে ওজন হ্রাসে সাহায্য করে বলে জানা যায় কারণ এটি আপনার  মিষ্টি ধরণের খাবার খাওয়ার প্রবণতা কমিয়ে দেয়।

Sources

Articles on StyleCraze are backed by verified information from peer-reviewed and academic research papers, reputed organizations, research institutions, and medical associations to ensure accuracy and relevance. Check out our editorial policy for further details.
Was this article helpful?
The following two tabs change content below.