কোষ্ঠকাঠিন্যের কারণ, লক্ষণ এবং কয়েকটি অব্যর্থ ঘরোয়া প্রতিকার | Home Remedies for Constipation in Bengali

Written by

কোষ্ঠকাঠিন্য খুবই যন্ত্রণাদায়ক একটি সমস্যা। যাঁর হয় সেই বোঝে এর কষ্ট। অনেকেই হয়ত বিশ্বাস করবেন না, কিন্তু প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ জীবনের কোনও না কোনও সময় একবার হলেও কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যায় ভুগেছেন। তারমধ্যে ৬০% মানুষের মধ্যে কোষ্ঠকাঠিন্য একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অনিয়মিত খাওয়াদাওয়া, অপরিকল্পিত ডায়েটের কারণে এই সমস্যা দেখা দেয়। কিছু ক্ষেত্রে এটি বংশগত। কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যায় সঠিক সময় উপযুক্ত ব্যবস্থা না নিলে এটি কোলন ক্যান্সারের আশঙ্কা বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে। এছাড়া কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা থাকলে পেট ভালো করে পরিষ্কার হয় না। ফলত সারাদিন অস্বস্তি বোধ হয়, কোনও কিছু খেতে ভালো লাগে না, কোনও কাজকর্মে ফুর্তি আসে না। আমাদের আজকের প্রতিবেদনে কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যার পিছনে কারণ, লক্ষণ এবং এর থেকে মুক্তি পাওয়ার কিছু ঘরোয়া উপায় সম্পর্কে আলোচনা করা হল।

কোষ্ঠকাঠিন্য কী ?

কোষ্ঠকাঠিন্য একটি অস্বাভাবিক শারীরিক অবস্থা যখন শরীর থেকে মল প্রতিদিন স্বাভাবিকভাবে নির্গত হতে পারে না। সাধারণত এক বা দু’দিন অন্তর মলত্যাগের বেগ ওঠে, ফলত মল খুব শক্ত হয়ে যায়। তবে সাধারণ সমস্যা বলে অবহেলা করবেন না। সঠিক সময় এর চিকিৎসা প্রয়োজন। চিকিৎসকেরা অনেক সময় এই গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল সমস্যা নির্ণয়ের জন্য শারীরিক পরীক্ষা, রক্ত পরীক্ষা এবং কোলনোস্কপির মতো নির্দিষ্ট কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পরামর্শ দেন (1)।

কোষ্ঠকাঠিন্যের কারণ

বিভিন্ন কারণে কোষ্ঠকাঠিন্য হতে পারে। স্বাস্থ্য এবং জীবনযাত্রার বেশ কিছু কারণে শিশু এবং প্রাপ্তবয়স্ক উভয়েরই কোষ্ঠকাঠিন্য হতে পারে। এমনকী ছোট্ট শিশুরাও এর থেকে রেহাই পায় না। এর পিছনে কারণগুলি এত সহজ হতে পারে যে আপনি অবাক হয়ে যাবেন। কোষ্ঠকাঠিন্যের পিছনে সাধারণ কারণগুলি হল :

১. কম ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার : ফাইবার খাবারের এমন একটি অংশ যা হজম হয় না। কিন্তু এটি পেট পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে। বিপাকে সাহায্য করে এবং অন্ত্রের প্রক্রিয়াকে ভালোভাবে কাজ করতে সাহায্য করে। প্রচুর ফাইবারযুক্ত খাবার কোষ্ঠকাঠিন্য রোধ এবং চিকিৎসা করতে সহায়তা করে।

২. কম পাণীয় : কোষ্ঠকাঠিন্যেরর মধ্যে অন্যতম জল কম খাওয়া। খাবার হজম করতে সারাদিনে প্রচুর জল খাওয়া প্রয়োজন। দিনে অন্তত ২-৩ লিটার জল খাওয়া দরকার। এটি কোষ্ঠকাঠিন্য রোধ এবং এর চিকিৎসায় সহায়তা করবে।

৩. ওষুধপত্র : অন্যান্য শারীরিক সমস্যা সমাধানের জন্য নেওয়া ওষুধের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া হিসেবে অনেক সময় কোষ্ঠকাঠিন্য দেখা দেয়। এন্টিহিস্টামাইনস, এন্টিডিপ্রেসেন্টস, ব্যথার ওষুধ (কোডাইন), অ্যান্টাসিড, আয়রন সাপ্লিমেন্ট নেওয়ার কারণেও কোষ্ঠকাঠিন্য হতে পারে।

৪. গর্ভাবস্থা এবং প্রসব : গর্ভাবস্থায় শারীরিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের নানা পরিবর্তন আসে। এইসময় পেশী সংকোচন ঘটে, প্রজেস্টেরনের নিঃসরণের কারণে খাদ্যনালীতে খাবার ধীর গতিতে যায় (2)। এছাড়াও অতিরিক্ত আয়রন সাপ্লিমেন্ট নেওয়ার কারণে এইসময় মহিলারা কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যায় ভোগেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রথম ত্রৈমাসিকের সময় এটি ঘটে, তবে বেশি সমস্যা হলে অবশই ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া ভালো।

৫. হাইপোথাইরয়েডিজম : হাইপোথাইরয়েডিজমের লক্ষণ এবং উপসর্গগুলি হরমোনের ঘাটতির তীব্রতার উপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হয়। এটি বেশ কয়েক বছর ধরে ধীরে ধীরে বিকশিত হয়। হাইপোথাইরয়েডিজমের লক্ষণগুলির মধ্যে ক্লান্তি, অতিরিক্ত ওজনবৃদ্ধি এবং কোষ্ঠকাঠিন্য অন্তর্ভুক্ত হতে পারে (3)।

৬. আইবিএস (Irritable Bowel Syndrome) : আইবিএস বা ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম সাধারণ একটি ব্যাধি যা বৃহৎ অন্ত্র বা কোলনকে প্রভাবিত করে। এর কারণে ব্যথা, ফোলাভাব, গ্যাস, ডায়রিয়া এবং কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা দেখা দিতে পারে। ডায়েট, লাইফস্টাইল এবং স্ট্রেস পরিচালনার মাধ্যে আইবিএস নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব (4)। ডাক্তারি চিকিৎসা এবং পরামর্শও সহায়ক।

৭. কর্মহীনতা : কোনওরকম শারীরিক পরিশ্রম, হাঁটা-চলা একেবারেই না করলেও কোষ্ঠকাঠিন্য হতে পারে। শারীরিক ক্রিয়াকলাপের ঘাটতি থাকে তবে বিপাক প্রক্রিয়াটি ধীর হয়ে যায়। যা কোষ্ঠকাঠিন্য এবং অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যার কারণ হতে পারে। শারীরিক অনুশীলন ফিট থাকতে এবং শারীরিক সুস্থতা বজায় রাখতে সাহায্য় করে।

৮. চকোলেট : চকোলেট আমাদের সকলেরই খুব পছন্দের কিন্তু খুব বেশি খাওয়া ভালো নয়। ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম আক্রান্ত ব্যক্তির চকোলেট পুরোপুরি এড়িয়ে চলা উচিত। চকোলেট এবং কোষ্ঠকাঠিন্যের মধ্যে যে যোগসূত্র রয়েছে যা অনেক গবেষণাতেও প্রমাণিত।

৯. স্বাস্থ্য পরিপূরক : নিউট্রিশেন সাপ্লিমেন্টগুলিও কোষ্ঠকাঠিন্যের কারণ হতে পারে। আয়রন এবং ক্যালসিয়াম পরিপূরক দুটি মূল কালপ্রিট। তাই পরিপূরক খাবার গ্রহণ থেকে বিরত থাকতে হবে এবং সঠিক খাবার খেতে হবে। সুষম এবং স্বাস্থ্যকর খাবার আপনাকে শরীরে প্রয়োজনীয় ভিটামিন এবং মিনারেল পেতে সহায়তা করবে।

১০. অতিরিক্ত রেচক ব্যবহার : প্রতিদিন উত্তেজন রেচকগুলি ব্যবহার করলে কোলনের ক্ষমতা কমে যায়। এছাড়াও অতিরিক্ত অ্যানিমাস ব্যবহার একই প্রভাব ফেলতে পারে। এগুলির নিয়মিত ব্যবহার এড়িয়ে চলুন। কারণ এর থেকে সৃষ্ট কোষ্ঠকাঠিন্য খুব বেদনাদায়ক হতে পারে।

১১. দুগ্ধজাত দ্রব্য : আপনার যদি দুগ্ধজাত দ্রব্যে অসহিষ্ণুতা থাকে এবং এর থেকে গ্যাস ও অ্যাসিডিটির সমস্যা থাকে তাহলে এড়িয়ে চলাই ভালো। কারণ এর থেকেও কোষ্ঠকাঠিন্য হতে পারে। ১ বছরের নীচে বাচ্চাদের গরুর দুধ দেওয়া উচিত নয় এবং দুগ্ধজাত দ্রব্যগুলি দেওয়ার আগে ডাক্তারের পরামর্শ নিন। দুধ এবং দুগ্ধজাত দ্রব্য নিঃসন্দেহে পুষ্টিকর। কিন্তু এর থেকে অ্যালার্জি হলে এড়িয়ে চলাই ভালো।

কোষ্ঠকাঠিন্যের লক্ষণ

অনিয়মিত মল ত্যাগ ছাড়াও কোষ্ঠকাঠিন্যের আরও কয়েকটি লক্ষণ রয়েছে, সেগুলি হল –

  • গ্যাস
  • পেট ফুলে যাওয়া
  • সবসময় পেট ভর্তি লাগা
  • তলপেটে ব্যথা
  • তলপেটে ক্র্যাম্পস
  • মাথা ব্যথা

কোষ্ঠকাঠিন্যের প্রকারভেদ

সাধারণত কোষ্ঠকাঠিন্যের তিনটি প্রকারভেদ রয়েছে, তা হল(5) –

নরমাল ট্রানজিট কন্সটিপেশন : এটি খুব সাধারণ। মল ঠিকমতো পরিষ্কার হয় না, শক্ত হয়ে যায়। এর থেকে পেটে ব্যথা বা ফোলাভাব হতে পারে।
স্লো ট্রানজিট কন্সটিপেশন : এক্ষেত্রে অনেক সময় বাথরুম যাওয়ার তাগিদ অনুভব হয় না। সপ্তাহে একবারের চেয়েও কম মল ত্যাগ হয়। মল শুকনো, শক্ত হয়ে যায়। এর থেকে পেট ফুলে যায়, যা খুবই বেদনাদায়ক।
ডিফেকশন ডিসওর্ডারস : মল ত্যাগ করা খুব কঠিন হয়ে ওঠে। মল শক্ত হয়ে যাওয়ার কারণে সহজে বেরোতে পারে না। এক্ষেত্রে ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।

কোষ্ঠকাঠিন্যের ঘরোয়া প্রতিকার

১. জল : কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যার অন্যতম কারণ এবং প্রতিকার হল জল। কম জল খাওয়ার কারণে কোষ্ঠকাঠিন্য দেখা দিতে পারে। ঠিক তেমনই এই সমস্যা থেকে মুক্তি দিতে পারে জল। সারাদিনে প্রচুর পরিমাণে জল খান। জল মল নরম রাখতে সাহায্য করে এবং মলত্যাগে সুবিধা হয়। দিনের শুরু করুন এক গ্লাস গরম জল দিয়ে যা পেট পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করবে। রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে এক গ্লাস হালকতা গরম জল খান। গরম জল খেলে খাবার সহজে হজম হবে এবং কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা দূর হবে। তাই কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা থাকলে নিয়মিত রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে গরম জল খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন (6)।

২. ক্যাস্টর অয়েল :

কী কী প্রয়োজন :

১ টেবিলচামচ ক্যাস্টর অয়েল

ব্যবহার পদ্ধতি :

১. সকালে খালি পেটে ক্যাস্টর অয়েল খেতে পারেন।
২. যদি এতে কোনও সমস্যা হয় তাহলে লেমন জুস বা এক গ্লাস গরম জলে ক্যাস্টর অয়েল মিশিয়েও খেতে পারেন।

উপকারিতা : কোষ্ঠকাঠিন্য নিরাময়ে ক্যাস্টর অয়েল দারুণ কাজ দেয়। খালি পেটে খেলে, এই তেল মল নরম করবে এবং কয়েক ঘণ্টার মধ্যে কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করবে।

৩. পেঁপে :

কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে রোজ পাকা পেঁপে খান। কারণ পেঁপেতে রয়েছে পেপেন এনজাইম, যা খাবার হজম করতে সাহায্য করে। পেট পরিষ্কার রাখে। কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা দূর করে (6)।

৪. ফ্ল্যাক্সসিড

কী কী প্রয়োজন :

১ টেবিলচামচ ফ্ল্যাক্সসিড তেল

ব্যবহার পদ্ধতি :

কমলা লেবুর রসের সঙ্গে ফ্ল্যাক্সসিড তেল মিশিয়ে খান।

উপকারিতা : কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা দূর করতে ফ্ল্যাক্সসিড তেল বেশ কার্যকরী। কমলালেবুর রস ও ফ্ল্যাক্সসিড অয়েল একসঙ্গে খেলে কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা অনেকটাই কম হয়। আপনি চাইলে ফ্ল্যাক্সসিড ও ইসবগুলের ভুষিও খেতে পারেন (7)।

৫. বেকিং সোডা

কী কী প্রয়োজন :

  • ১ টেবিলচামচ বেকিং সোডা
  • এক গ্লাস কুসুম কুসুম গরম জল

ব্যবহার পদ্ধতি :

১. জলে বেকিং সোডা ভালো করে মিশিয়ে খেয়ে নিন।
২. এটি অল্প সময়ের মধ্যে খাবার হজম করতে সাহায্য করবে। সকালে খালি পেটে খেলে সবথেকে ভালো ফল পাবেন।

উপকারিতা : কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা দূর করার অন্যতম উপায় হল বেকিং সোডা। গ্যাস, অম্বলের সমস্যা দূরে, হজমে সাহায্য করে। এটি শিশু, প্রাপ্তবয়স্ক এবং বয়স্ক সকলের জন্য সমানভাবে কার্যকরী, এর কোনও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও নেই।

৬. মধু

কী কী প্রয়োজন :

  • ১ চামচ মধু
  • ১ চামচ পাতি লেবুর রস

ব্যবহার পদ্ধতি :

এক গ্লাস উষ্ণ জলে মধু ও লেবুর রস মিশিয়ে নিন।
রাতে শোবার আগে মিশ্রণটি খান, ভালো ফল পাবেন।

উপকারিতা : উষ্ণ জল কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা উপকারী। তার সঙ্গে লেবু ও মধু মিশিয়ে খেলে সহজে খাবার হজম হবে এবং কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা দূর করবে।

৭. দুধ

রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে এক গ্লাস হালকা গরম দুধ খান। কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা এটি উপকারী। ভালো ফল পেতে দুধে সামান্য ক্যাস্টর অয়েল মিশিয়ে খেতে পারেন, এটি ক্রনিক কন্সটিপেশনের সমস্যা থেকে মুক্তি দিতে উপকারী (6)।

৮. ত্রিফলা :

কী কী প্রয়োজন :

  • ২ টেবিলচামচ ত্রিফলা পাউডার
  • এক গ্লাস গরম জল

ব্যবহার পদ্ধতি :

১. জলে ত্রিফলা পাউডার ভালো করে মিশিয়ে নিন এবং রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে মিশ্রণটি খান।
২. মিশ্রণটি খাওয়ার পর আর কিছু খাবেন না। মিশ্রণটি খাওয়ার ৩০ মিনিট পর খাবার খেতে পারেন।

উপকারিতা : আমলকি, হরিতকি এবং বহেড়া এই তিনটি উপাদান দিয়ে তৈরি ত্রিফলা একটি আয়ুর্বেদিক ওষুধ। যা হজমে সাহায্য করে। কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা থেকে মুক্তি দেয় (8)।

৯. নারকেল তেল :

কী কী প্রয়োজন :

নারকেল তেল

ব্যবহার পদ্ধতি :

১. অর্ধেক চামচ নারকেল তেল সকালে এবং অর্ধেক চামচ রাত্রে খান। খাবারের সঙ্গে মিশিয়ে খেতে পারেন।
২. দীর্ঘস্থায়ী কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে প্রতিদিন এটি খাবারে যোগ করতে পারেন।
দ্রুত আরাম পেতে সপ্তাহে ২-৩ দিন ব্যবহার করুন।

উপকারিতা : নারকেল তেলের মধ্যে উচ্চ মাত্রায় ফ্যাটি অ্যাসিড রয়েছে। যারা দীর্ঘস্থায়ী কোষ্ঠকাঠিন্যে ভুগছেন তাদের জন্য এই তেল আরামদায়ক হতে পারে।

১০. ভিটামিনস

কী কী প্রয়োজন :

  • ভিটামিন সি ট্যাবলেট
  • ভিটামিন বি কমপ্লেক্স ক্যাপসুল

ব্যবহার পদ্ধতি :

১. একগ্লাস জলে ভিটামিন সি ট্যাবলেট দিয়ে ভালো করে মিশিয়ে নিন তারপর মিশ্রণটি খান।
২. তারসঙ্গে একটি ভিটামিন বি কমপ্লেক্স ক্যাপসুল নিন।

উপকারিতা : ভিটামিন সি কোষ্ঠকাঠিন্যের প্রভাব কমাতে সাহায্য করে এবং এটি একটি ডিটক্সিফাইয়িং গ্যাস্ট্রিক স্টিমুল্যান্ট হিসেবে কাজ করে। ভিটামিন বি কমপ্লেক্সের উপাদানগুলি, প্রধানত বি ১, বি ৫, বি ৯ এবং বি ১২ প্রাকৃতিক রেচক হিসেবে কাজ করে এবং শক্ত মল ও কোষ্ঠকাঠিন্য থেকে মুক্তি দেয়। সঠিক হজম পদ্ধতি বজায় রাখতে উচ্চ ভিটামিন সমৃদ্ধ খাবার খান।

১১. পেয়ারা

কোষ্ঠকাঠিন্য থেকে মুক্তি পেতে পেয়ারা খান। কারণ এটি রাঘেজ সরবরাহ করে যা অন্ত্রগুলি পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে (6)।

১২. হার্বাল টি

কী কী প্রয়োজন :

  • হার্বাল টি
  • জল

ব্যবহার পদ্ধতি :

১. জল গরম করে তাতে হার্বাল টি মেশান।
২. ৩০ মিনিট রেখে দিন। তারপর হার্বাল টি ছেঁকে নিয়ে খান। সারাদিনে ৩-৪ কাপ হার্বাল টি খান।

উপকারিতা : হার্বাল টি পেট পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে। কোষ্ঠকাঠিন্য থেকে দ্রুত মুক্তি পেতে নিম্নলিখিত হার্বাল টি খেতে পারেন :

  • গ্রিণ টি
  • পেপারমিন্ট টি
  • ব্ল্যাক টি

যে সমস্ত শিশুরা কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যায় ভোগে তাদের হার্বাল টি দেওয়া যেতে পারে।

১৩. অলিভ অয়েল

কী কী প্রয়োজন :

২ টেবিলচামচ অলিভ অয়েল

ব্যবহার পদ্ধতি :

সকালে খালি পেটে অলিভ অয়েল খান। কয়েকদিন পর্যন্ত এটি ব্যবহার করুন।

উপকারিতা : প্রাকৃতিক তেল কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করার অন্যতম উপায়। অলিভ অয়েল রেচক হিসেবে কাজ করে। পেট পরিষ্কার রাখে (9)। এটি প্রাপ্তবয়স্ক এবং শিশুদের ক্ষেত্রেও ব্যবহার করা যেতে পারে। খালি পেটে খাওয়া ছাড়াও এটি খাবার তৈরির সময়ও ব্যবহার করতে পারেন।

১৪. আলুবোখারার রস (Prune Juice)

কী কী প্রয়োজন :

২ গ্লাস আলুবোখারার রস

ব্যবহার পদ্ধতি :

১. সকালে একগ্লাস এবং রাত্রে একগ্লাস এই জুস খান।
২. জুস খাওয়ার বদলে চাইলে কয়েকটা আলুবোখারা খেতে পারেন।

উপকারিতা : আলুবোখারায় প্রচুর পরিমাণে ফাইবার রয়েছে যা সহজেই মল পরিষ্কার হতে সাহায্য করে। এগুলিতে ডাইহাইড্রক্সেফেনিল ইসাটিন রয়েছে যা কোলন কার্যকারিতা ত্বরান্বিত করে। এতে গুরুত্বপূর্ণ ভিটামিন এবং খনিজগুলি রয়েছে, এতে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপাদানও রয়েছে (10)।

কোষ্ঠকাঠিন্যের জন্য খাদ্যতালিকা (কী খাবেন আর কী খাবেন না)

কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে সবার প্রথম আপনাকে নজর দিতে হবে খাদ্যতালিকার উপর। কারণ এই সমস্যায় খাদ্যতালিকার বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। কোষ্ঠকাঠিন্য রোধ করতে তন্তুজাতীয় অর্থাৎ ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া জরুরি। প্রচুর জল খাওয়ার পাশাপাশি ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার রাখুন খাদ্যতালিকায়। কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা থাকলে একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির সারাদিনে ২৫ গ্রাম ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া প্রয়োজন। ফাইবারের অন্যতম উৎস হল শস্যদানা, বাদাম, পাউরুটি, ওট এবং সিরিয়াল। এছাড়াও বিভিন্ন শুঁটি যেমন শিম, সয়াবিন তন্তুসমৃদ্ধ। ডায়েটে সবুজ শাকসবজিও রাখুন। প্রচুর জলের পাশাপাশি ফলের রসও খেতে পারেন। ব্যাক্টেরিয়া বা প্রোবায়োটিক সমৃদ্ধ খাদ্য হজম করতে সাহায্য করে এবং দীর্ঘস্থায়ী সুফল আছে।

খাদ্য সংক্রান্ত কোষ্ঠকোঠিন্য রদ করতে প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, প্যাকেটজাত এবং হিমায়িত খাবার এড়িয়ে চলা ভালো।

কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধে ব্যায়াম

নিয়মিত শরীরচর্চা খাবার হজমে সাহায্য করে এবং পেটের পেশী উত্তেজিত করে। কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে কী কী শরীরচর্চা করবেন সে বিষয়ে ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করতে পারেন।

কোষ্ঠকাঠিন্যের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া

মলত্যাগে কষ্ট ছাড়াও কোষ্ঠকাঠিন্যের আরও কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। যেমন :

  • চরম অস্বস্তি
  • পেট ফুলে যাওয়া
  • পেটে ব্যথা
  • বমি বমি ভাব
  • মাথা ব্যথা
  • পিঠে ব্যথা (বিশেষ করে গর্ভাবস্থায় এই সমস্যা হয়)
  • বুকে ব্যথা
  • পায়ে ব্যথা
  • রক্তক্ষরণ

কোষ্ঠকাঠিন্য নিয়ন্ত্রণে রাখার কিছু টিপস

প্রতিটি সমস্যার কিছু সমাধান থাকে, এটিও তার বিকল্প নয়। কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা দেখা দেওয়ার আগে অবশ্যই এগুলো মেনে চলুন :

১. সময়সূচী : আপনার ঘুমের ধরণ এবং খাবারের মধ্যে সময়ের ব্যবধান সর্বদা নির্দিষ্ট হওয়া উচিত। কারণ এটি আপনার অন্ত্রের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করে।

২. ভ্রমণ : আপনাকে যদি কর্মসূত্রে অনেক বেশি বাইরে যেতে হয় তাহলে খাওয়ার সময়সূচী যতটা সম্ভব বজায় রেখে চলার চেষ্টা করুন। আর যদি আপনার কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা আগে থেকেই থেকে থাকে, তাহলে বিভিন্ন জায়গার যে স্থানীয় খাবার সেগুলির সন্ধান করতে যাবেন না।

৩. নিয়মানুবর্তিতা : সকালে নিয়মিত মল ত্যাগের অভ্যাস গড়ে তুলুন। দীর্ঘক্ষণ মলত্যাগের বেগ চেপে থাকাও গুরুত্বর এবং দীর্ঘস্থায়ী কোষ্ঠকাঠিন্যের কারণ হতে পারে।

৪. খাদ্যতালিকায় কী রাখবেন : পুরো শস্য, ওট, ব্রাউন রাইস, শাক সবজি এবং ফাইবার সমৃদ্ধ ফল, যেমন ব্রকলি, মিষ্টি আলু, মটরশুটি, আপেল, পিচ, নাশপাতি এবং বেরি খান। ড্রাই ফ্রুট এবং বাদামও ফাইবার সমৃদ্ধ এবং কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা প্রশমিত করতে সহায়ক।

৫. কোন খাবার এড়িয়ে চলবেন : যাদের হজমের সমস্যা রয়েছে তাদের দুগ্ধজাত দ্রব্য, যেমন দুধ, পনির ইত্যাদি এড়িয়ে চলা ভালো। এছাড়াও কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে রেড মিট, প্যাকেটজাত হিমশীতল খাবার, ফ্রায়েড খাবার এবং কলা এড়িয়ে চলুন।

৬. নিয়মিত শরীরচর্চা : শারীরিক পরিশ্রম ছাড়া, একেবারেই হাঁটা-চলা না করা এমন জীবনযাপন করলে কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা ভোগাতে পারে। তাই শরীর ফিট রাখাও জরুরি। তাই সামান্য দৌড়াদৌড়ি, হাঁটা, লন টেনিস, জিমে যাওয়া, বায়বীক, কার্ডিও ড্রিলস বা সাইক্লিংয়ের মতো কোনও এক্সারসাইজ করতে পারেন। শারীরিক ক্রিয়াকলাপ আপনাকে অনেক বেশি তরল গ্রহণ করতে বাধ্য করবে যা কোষ্ঠকাঠিন্যের চিকিৎসায় উপকারী।

৭. যোগা : যদি নিয়মিত বাইরে গিয়ে জগিং করতে না পারেন, তাহলে বাড়িতেই কিছু যোগব্যায়াম অনুশীলন করতে পারেন। কোষ্ঠকাঠিন্যের মতো গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে পবনমুক্তাসন, সুখাসন, বজ্রাসন ইত্যাদি অনুশীলন করুন।

দীর্ঘদিন কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা সত্যিই খুব বেদনাদায়ক। দীর্ঘদিন ধরে এই সমস্যা চলতে থাকলেও আরও নানা সমস্যা হাজির হতে পারে। তাই এটি যাতে আপনার জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রকে প্রভাবিত করতে না পারে, সঠিক সময় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিন। কোষ্ঠকাঠিন্য নিরাময়ে উপরিউক্ত ঘরোয়া উপায়গুলি প্রয়োগ করে দেখতে পারেন। পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন বজায় রাখুন। সঠিকভাবে খাওয়াদাওয়া, পর্যাপ্ত ঘুম এবং প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় মলত্যাগ করতে যাওয়ার অভ্যাস মেনে চলুন। কোষ্ঠকাঠিন্য শিশু, প্রাপ্তবয়স্ক এবং বয়স্ক সকলের হতে পারে। তবে শিশুদের উপর কোষ্ঠকাঠিন্যের ঘরোয়া প্রতিকারগুলি প্রয়োগের আগে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিন।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী

কোষ্ঠকাঠিন্যের কোনটি দ্রুত আরাম দেয়?

কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা থেকে দ্রুত আরাম পেতে প্রচুর জল খান এবং আপনার খাদ্য তালিকায় ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার যোগ করুন।

কোষ্ঠকাঠিন্যের একটি লক্ষণ কী হতে পারে?

কোষ্ঠকাঠিন্য একটি উপসর্গ, এটি কোনও রোগ নয়। সাধারণ এর পিছনে অন্যতম কারণ হতে পারে পুষ্টিকর খাবারের অভাব। এছাড়াও

হজমের সমস্যা, গর্ভাবস্থা, ভ্রমণ, নির্দিষ্ট কোনও শারীরিক সমস্যা, হরমোনের ব্যাঘাত এবং স্নায়ুর ক্ষতি ইত্যাদি কারণেও হতে পারে।

কোষ্ঠকাঠিন্য কতদিন পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে?

তিনদিন বা তার বেশি সময় পর্যন্ত একবারও মল ত্যাগ না হওয়া সাধারণত খুব দীর্ঘ। তিনদিন পর মল শক্ত এবং মলত্যাগ আরও কঠিন হয়ে যায়।

কোন খাবার পেট পরিষ্কার রাখবে?

ফাইবার সমৃদ্ধ শাকসবজি এবং ফলমূল খাদ্যতালিকায় রাখুন। ওট, ব্রাউন রাইস, শাক সবজি এবং ফাইবার সমৃদ্ধ ফল, যেমন মিষ্টি আলু, মটরশুটি, আপেল, পিচ, নাশপাতি এবং বেরি খান। ড্রাই ফ্রুট এবং বাদামও খেতে পারেন।

Sources

Articles on StyleCraze are backed by verified information from peer-reviewed and academic research papers, reputed organizations, research institutions, and medical associations to ensure accuracy and relevance. Read our editorial policy to learn more.

  1. Constipation
    https://www.niddk.nih.gov/health-information/health-topics/digestive-diseases/constipation/Pages/definition-facts.aspx
  2. Treating constipation during pregnancy
    https://www.ncbi.nlm.nih.gov/pmc/articles/PMC3418980/
  3. Thyroid Disease
    https://www.ncbi.nlm.nih.gov/books/NBK241/
  4. Irritable Bowel Syndrome
    https://www.niddk.nih.gov/health-information/health-topics/digestive-diseases/irritable-bowel-syndrome/Pages/symptoms-causes.aspx
  5. Constipation
    https://medlineplus.gov/constipation.html
  6. Constipation
    https://www.nhp.gov.in/Constipation-(Qabz)_mtl
  7. Healthy food trends – flaxseeds https://medlineplus.gov/ency/patientinstructions/000728.htm#:~:text=Flaxseeds%20are%20a%20good%20source,movements%20regular%20and%20prevent%20constipation
  8. An open-label, prospective clinical study to evaluate the efficacy and safety of TLPL/AY/01/2008 in the management of functional constipation
    https://www.ncbi.nlm.nih.gov/pmc/articles/PMC3193686/
  9. The short-term effects of olive oil and flaxseed oil for the treatment of constipation in hemodialysis patients https://pubmed.ncbi.nlm.nih.gov/25238699/
  10. Randomised clinical trial: dried plums (prunes) vs. psyllium for constipation
    https://pubmed.ncbi.nlm.nih.gov/21323688/
Was this article helpful?
The following two tabs change content below.