কুষ্ঠ রোগের কারণ, লক্ষণ এবং চিকিৎসা – Leprosy Causes, Symptoms and Treatment in Bengali

by

কুষ্ঠ রোগের নাম শুনলে আজও আতঙ্ক ছড়ায়। কারও এমন রোগ হয়েছে শুনলে আজও অনেকে সেই ব্যক্তির চারপাশে ঘেঁষতে চান না, এড়িয়ে থাকেন। কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির শারীরিক যন্ত্রণা তো থাকেই, পাশাপাশি ওই ব্যক্তি ও তার পরিবারকে নানারকম সামাজিক এবং মানসিক সমস্যায় পড়তে হয়। মানসিক এই জন্য, কারণ কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি অনেক ক্ষেত্রে অচ্ছূত হিসেবে গণ্য হন। এই রোগের কারণে ত্বক ক্ষতিগ্রস্থ হয়, ত্বকে পচন ধরে। তাই কুষ্ঠ রোগীকে অনেকে ঘেন্না করে। কিন্তু মনে রাখা দরকার কুষ্ঠ কোনও পাপ নয় এবং এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি অপরাধী নন। কুষ্ঠ একটি জীবাণুবাহিত সংক্রামণ। প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত এবং উপযুক্ত চিকিৎসায় এই রোগ সম্পূর্ণ নিরাময় করা সম্ভব। তাই মানুষের মধ্যে এই বিষয়ে সঠিক জ্ঞান থাকা জরুরি। আমাদের আজকের প্রতিবেদনে কুষ্ঠ রোগের কারণ, লক্ষণ এবং চিকিৎসা সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হল।

কুষ্ঠ রোগ কী?

কুষ্ঠ রোগ বা হ্যানসেন রোগ হল মাইকোব্যাক্টেরিয়াম লেপ্রি (Mycobacterium Leprae) নামক ব্যাক্টেরিয়ার কারণে সৃষ্ট দীর্ঘমেয়াদি সংক্রমণ। এই ব্যাক্টেরিয়া ত্বকের উপর দ্রুত সংক্রমণ ছড়ায়। তাছাড়াও সংক্রমণটি স্নায়ু, শ্বাস প্রশ্বাসের নালী এবং চোখের ক্ষতি করতে পারে। কুষ্ঠ রোগের কয়েকটি প্রকারভেদ রয়েছে –

  • টিউবারকুলার লেপ্রসি
  • ইন্টারমিডিয়েট লেপ্রসি
  • লেপ্রোমাটাস লেপ্রসি

সাধারণত বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কুষ্ঠ রোগ হাতের চামড়ায় হয়ে থাকে। সংক্রমণের ফলে ত্বকে ক্ষত, স্নায়বিক ক্ষয় এবং শরীর দুর্বল এবং অসাড় বোধ হতে পারে। বাচ্চা থেকে বয়স্ক, যে কোনও বয়সের ব্যক্তি এই রোগে আক্রান্ত হতে পারে (1) 

কুষ্ঠ রোগের কারণ এবং চিন্তার বিষয়

কুষ্ঠ হল মাইকোব্যাক্টেরিয়াম লেপ্রি নামক ব্যাক্টেরিয়ার কারণে সৃষ্ট একটি সংক্রমণ। এই সংক্রমণ এক ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তির মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে, আসুন জেনে নিন কীভাবে এই সংক্রমণ ছড়াতে পারে – (1), (2) :

  • হাঁচি বা কাশির মাধ্যমে সংক্রমিত ব্যক্তির থেকে অন্য ব্যক্তির শরীরে এই সংক্রমণ ছড়াতে পারে।
  • সংক্রমিত ব্যক্তির সর্দি হয়ে থাকলে, নাক থেকে নিসৃত তরলের মাধ্যমেও এই ব্যাক্টেরিয়া ছড়িয়ে পড়তে পারে।
  • সংক্রমিত ব্যক্তির সঙ্গে হাতে হাত মেলালে বা গাল স্পর্শ করলে সংক্রমণের ভয় থাকে।
  • বড়দের তুলনায় বাচ্চাদের মধ্যে এই সংক্রমণ ছড়ানোর ভয় বেশি।
  • যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তারা খুব তাড়াতাড়ি এই রোগের কবলে পড়েন।

কুষ্ঠ রোগের লক্ষণ

কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির মধ্যে প্রাথমিক যে লক্ষণগুলি দেখা দেয় সেগুলি হল (1), (3), (4):

  • ত্বকের রঙ পরিবর্তন, ফ্যাকাশে দাগ এবং ছোপযুক্ত ত্বক।
  • ত্বকের উপর জ্বালা, যন্ত্রণা অনুভব হয় এবং প্রচণ্ড গরম লাগে।
  • মাংসপেশী দুর্বল হয়ে পড়ে।
  • হাত ও পায়ে ঘা এবং অসাড় হয়ে যায়।
  • চুল উঠে যায়।
  • রুষ্ক ও শুষ্ক ত্বক।
  • পায়ের পাতার নীচের অংশে ঘা।
  • নাক বন্ধ এবং নাক দিয়ে রক্ত পড়ে।

কুষ্ঠ রোগের চিকিৎসা

যে কোনও শারীরিক সমস্যায় সঠিক সময় সঠিক চিকিৎসা প্রয়োজন। এখানে আমরা কুষ্ঠ রোগের চিকিৎসার বিষয়ে আলোচনা করব (1) :

অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ – কিছু রোগের চিকিৎসায় অ্যান্টিবায়োটিক দারুণ কাজ করে। রোগ সৃষ্টিকারী ব্যাক্টেরিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারে। এর ব্যবহার কুষ্ঠ রোগের চিকিৎসায় লাভদায়ক হতে পারে। এই অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধের মধ্যে রয়েছে ড্যাপসন (Dapsone), রিফাম্পিসিন (Rifampicin), ক্লোফাজামিন (clofazamine), ফ্লুরোকুইনোলোন (fluroquinolones),  ম্যাক্রোলাইডস (Macrolides) এবং মাইনোসাইক্লিন (Minocycline) অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি ওষুধ – অনেক রোগের কারণে শরীরে ক্ষত সৃষ্টি হয় যা প্রচণ্ড জ্বালা, যন্ত্রণার কারণ হয়ে ওঠে। সেক্ষেত্রে অ্যান্টি ইনফ্ল্যামেটরি ওষুধের ব্যবহার ফোলাভাব কমাতে সাহায্য করে এবং ব্যথা কমায়। এই ওষুধের মধ্যে অ্যাস্পিরিন (Aspirin), প্রেডনিসোন (Prednisone) এবং থালিডোমাইড (Thalidomide) রয়েছে।   

কুষ্ঠ রোগ থেকে বাঁচার উপায়

আমরা যখন কাউকে কোনও রোগে আক্রান্ত হতে দেখি, তখন আমরাও সেই রোগ থেকে বাঁচার উপায় খুঁজি। কুষ্ঠও তেমন একটি রোগ। আসুন জেনে নিন এই রোগ থেকে বাঁচার উপায়গুলি –

  • কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির থেকে দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করুন (2)
  • বিসিজি (Bacillus Calmette-Guerin) টীকার মাধ্যমে কুষ্ঠ রোগ থেকে মুক্তি পেতে পারেন (5)
  • যে কোনও ধরনের সংক্রমণের হাত থেকে রক্ষা পেতে নিজে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকা খুব জরুরি।
  • পুষ্টিকর খাবার খান, যাতে শরীরে প্রয়োজনীয় পুষ্টির অভাব না থাকে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে ওঠে।

কুষ্ঠ একসময় ভয়াভয় সংক্রমণ ছিল ঠিকই, তবে বর্তমানে চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ হওয়া সম্ভব। একটু সচেতন থাকলেই এই রোগ এড়িয়েও চলতে পারবেন। আশেপাশে কুষ্ঠ রোগী থাকলে তাকে ঘৃণা না করে সঠিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করে দিন। অযথা আতঙ্ক ছড়াবেন না। কারণ কুষ্ঠ রোগী সঠিক চিকিৎসা এবং দেখভাল প্রয়োজন। আশা করা যায়, এই প্রতিবেদনে উল্লিখিত তথ্য আপনাকে ভবিষ্যতে সাহায্য করবে। সুস্থ থাকুন, অন্যদের সুস্থ রাখুন। 

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী

কুষ্ঠ রোগ কী এখনও আছে?

কুষ্ঠ রোগ এখন আর আগের মতো ভয়াভয় নয়। আজকাল এটি একটি বিরল রোগ। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ব্যবস্থাও রয়েছে। বেশিরভাগ সংক্রমিত ব্যক্তি চিকিৎসার সময় এবং পরে সাধারণ জীবনযাপন করতে পারেন।

কুষ্ঠ কী ছোঁয়াছে রোগ?

রোগীকে একবার ছুঁলেই যে আপনারও কুষ্ঠ হয়ে যাবে তা নয়। চিকিৎসকরা বিশ্বাস করেন যে, এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গে দীর্ঘদিন সরাসরি যোগাযোগ থেকে কুষ্ঠ রোগী থেকে অন্য ব্যক্তির শরীরে সংক্রমণ ছড়াতে পারে। বিশেষ করে সংক্রমিত ব্যক্তির হাঁচি, কাশির থেকে এই রোগ ছড়ায় বেশি।

কুষ্ঠরোগে কাদের ঝুঁকি বেশি?

কুষ্ঠ রোগ যে কোনও বয়সে হতে পারে। ৫ থেকে ১৫ বা ৩০ বছরের বেশি বয়স্ক ব্যক্তিরও এই ব্যাক্টেরিয়ার সংক্রমণ হতে পারে। গবেষণা অনুযায়ী, মাইকোব্যাক্টেরিয়াম লেপ্রি ব্যাক্টেরিয়ায় সংক্রমিত ৯৫% এর বেশি ব্যক্তি কুষ্ঠরোগ বিকাশ করে না। কারণ এই সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করতে তাদের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে ওঠে।

5 References :

Stylecraze has strict sourcing guidelines and relies on peer-reviewed studies, academic research institutions, and medical associations. We avoid using tertiary references. You can learn more about how we ensure our content is accurate and current by reading our editorial policy.

Was this article helpful?
scorecardresearch