ম্যালেরিয়া সারানোর ঘরোয়া উপায় – Home Remedies for Malaria in Bengali

by

ম্যালেরিয়া নাম শুনেই কি ভয় পেয়েছেন ? না ভয় পাওয়ার কিছু নেই। এই রোগের যদি সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা হয় তাহলে সারতে বাধ্য, অনেক রোগের ক্ষেত্রেই এই কথাটি প্রযোজ্য। আমাদের এই প্রতিবেদনে আপনাদের জানাবো ম্যালেরিয়া সারানোর কিছু ঘরোয়া প্রতিকারের সম্পর্কে।

ম্যালেরিয়া কি ?

ম্যালেরিয়া হচ্ছে মশা বাহিত প্লাজমোডিয়াম পরজীবী দ্বারা সৃষ্ট একটি রোগ। এটি কেবল সংক্রমিত স্ত্রী অ্যানোফেলিস মশার কামড়ে হয়ে থাকে । এখনও পর্যন্ত প্রায় ষাটের অধিক প্রজাতির ম্যালেরিয়ার পরজীবী আবিষ্কার করা সম্ভব হলেও এর মধ্যে ৪টি প্রজাতি মানুষের মধ্যে সংক্রমণের জন্য দায়ী।

গরম আবহাওয়া এই পরজীবী ও মশার বংশবৃদ্ধির জন্য উপযুক্ত। তাই যেসব মানুষ গরম আবহাওয়া যুক্ত দেশে বসবাস করেন, তারা এই রোগে বেশি আক্রান্ত হন (1)।

ম্যালেরিয়া কত প্রকারের হয় ?

মূলত ম্যালেরিয়া দু ধরণের হয়ে থাকে।

১. অল্প ধরণের ম্যালেরিয়া

ম্যালেরিয়া প্রথম দিকে ঠিক মতো চিকিৎসা না হলে তা জটিল হয়ে পড়ে। প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময় অন্তর এই রোগের উপসর্গ দেখা দেয়। এর উপসর্গগুলি নিচে উল্লেখ করা হল –

  • জ্বর
  • ঠান্ডা ভাব অনুভূত হওয়া
  • ঘেমে যাওয়া
  • মাথাব্যথা
  • বমি বমি ভাব
  • ক্লান্তি
  • গা-হাতে পায়ে ব্যথা
  • খিদে না পাওয়া
  • ডায়রিয়া।

২. জটিল ধরণের ম্যালেরিয়া

যখন কোনো রোগীর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে ও ম্যালেরিয়ার প্রথম পর্যায়ে ঠিক মতো চিকিৎসা করা হয় না, তখন এই জটিল ধরণের ম্যালেরিয়া হয়ে থাকে। এতে নানা অঙ্গ বিকলও হতে পারে। এর উপসর্গগুলি নিচে উল্লেখ করা হল –

  • নার্ভের সমস্যা
  • অ্যানিমিয়া
  • শ্বাসকষ্ট
  • লো মেটাবলিক রেট
  • লো ব্লাড প্রেসার।

জটিল ধরণের ম্যালেরিয়া হলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সঠিক চিকিৎসার প্রয়োজন (2) ।

কি কারণে ম্যালেরিয়া হয় ?

প্লাসমোডিয়াম যেমন পরজীবীর জন্য ম্যালেরিয়ার সংক্রমণ হয়ে থাকে। যেসব পরজীবীর কারণে ম্যালেরিয়া হয়ে থাকে তাদের নাম উল্লেখ করা হল।

  • প্লাসমোডিয়াম ফ্যালাসিপেরাম – আফ্রিকায় বেশি দেখতে পাওয়া যায়
  • প্লাসমোডিয়াম ভাইভ্যাক্স – এশিয়া, ল্যাটিন আমেরিকা ও আফ্রিকার কিছু অংশে পাওয়া যায়
  • প্লাসমোডিয়াম ওভালে – পশ্চিম এশিয়ায়তে পাওয়া যায়
  • প্লাসমোডিয়াম ম্যালেরি – পুরো পৃথিবীতে এর থেকে সংক্রমণ হয়
  • প্লাসমোডিয়াম নোলেসি – দক্ষিণ- পূর্ব এশিয়ায় পাওয়া যায় (3) ।

ম্যালেরিয়া সারানোর ঘরোয়া উপায়

১. অ্যাপেল সাইডার ভিনিগার

অল্প অ্যাপেল সাইডার ভিনিগার নিয়ে তাতে জল মিশিয়ে কাপড় ভিজিয়ে রাখুন, তারপর জল পট্টি যেমন দেয় তেমন দিন। ম্যালেরিয়ার সময় জ্বর কমাতে সাহায্য করে এই প্রক্রিয়া।

২. আদা

এক কাপ জলে অল্প আদা দিয়ে ফুটিয়ে নিন ও তারপর ছেঁকে নিয়ে জলটি ঠান্ডা হতে দিন। ঠান্ডা হলে তাতে অল্প মধু মিশিয়ে খেয়ে নিন। প্রত্যেকদিন দিনে দুবার করে খান। এইসময় যে বমি বমি ভাব বা বদহজম তা দূর করতে এই পানীয় উপযোগী (4)।

৩. তুলসী পাতা

তুলসী পাতা থেকে রস বার করে নিন, তারপর ঐ রসে গোলমরিচ মিশিয়ে খেতে ফেলুন। ম্যালেরিয়া হওয়ার প্রথম দিকে এটি খেলে ফল পাওয়া যেতে পারে। এটি ডায়রিয়া ও বমি বমি ভাব দূর করতে পারে (5) ।

৪. দারুচিনি

অল্প করে দারুচিনি গুঁড়ো ও গোলমরিচ গুঁড়ো নিয়ে মিশিয়ে জলে দিয়ে ফুটিয়ে নিন। তারপর ছেঁকে মধু মিশিয়ে খেয়ে নিন। ঘরোয়াভাবে ম্যালেরিয়ার উপসর্গকে দূর করতে এটি উপযোগী। কারণ দারুচিনিতে থাকে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, অ্যান্টি-মাইক্রোবিয়াল, অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি উপাদান (6)।

৫. কমলালেবুর রস

দিনে দু থেকে তিনবার কমলালেবুর রস খাওয়ার চেষ্টা করুন। এতে উপস্থিত ভিটামিন সি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে জ্বর কমাতে সাহায্য করতে পারে (7)।

৬. পেঁপে পাতা

জ্বর হলে আমাদের সবারই রক্তে প্লেটলেটের সংখ্যা কমে যায়। আর এই পেঁপে পাতার রস রক্তে প্লেটলেটের সংখ্যা সঠিক মাত্রায় এনে শরীরকে সুস্থ করতে সাহায্য করে।

৭. মেথি

পাঁচ গ্রাম মেথি নিয়ে সারারাত জলে ভিজিয়ে রাখুন ও সকালে খালি পেটে জলটি ছেঁকে তা পান করুন। প্রতিদিন এটি পান করলে ম্যালেরিয়া জলদি সারতে বাধ্য। মেথি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে তোলে ও পরজীবীর বিরুদ্ধে লড়তে পারে (8) ।

৮. মুসাম্বি লেবু

একটি মুসাম্বি লেবু কেটে খান। এতে ম্যালেরিয়ার মূল ওষুধ কুইনিনের মতোই একটি উপাদান উপস্থিত বলে জানা যায় , এটি ম্যালেরিয়ার উপসর্গ সারিয়ে তুলতে উপযোগী।

৯. গ্রীন টি

গ্রীন টি – এর ব্যাগ নিয়ে গরম জলে কিছুক্ষন চুবিয়ে রাখার পর তা ফেলে দিয়ে গ্রীন টি তৈরী। টি ব্যাগ গরম জলে দেওয়ার সময় একটু তেঁতুলও দিয়ে দেবেন। তারপর পান করে নিন। গ্রীন টিতে প্রচুর অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট থাকে, যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে তোলে ও তেঁতুল জ্বর কমাতে সহায়ক (9)।

১০. কালো জিরে

ঠান্ডা লাগা বা সর্দি কমানো বা মাথা ব্যথা কমানোর জন্য আমরা অনেকেই কালো জিরে ব্যবহার করে থাকি। একটি কাপড়ের কিছুটা কালো জিরে রেখে সেটি বেঁধে দিন এমন ভাবে যাতে কালো জিরে বাইরে না আসতে পারে অর্থাৎ পুটুলি করে নিন।

১১. চিরতা

সারারাত এক গ্লাস জলে চিরতা ভিজিয়ে রাখুন, সকালে উঠে ছেঁকে নিয়ে দারুচিনি গুঁড়ো মিশিয়ে পান করে নিন। এটি ম্যালেরিয়ার জ্বর কমাতে উপযোগী বলে জানা যায়। শরীরের তাপমাত্রা কমাতে সাহায্য করে।

১২. হলুদ

এক গ্লাস গরম দুধ নিয়ে তাতে এক চা চামচ হলুদ গুঁড়ো মিশিয়ে নিন। তারপর ভালো করে গুলে নিয়ে পান করে নিন। হলুদে থাকে অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি উপাদান যা ম্যালেরিয়ার উপসর্গ গা হাতে পায়ে ব্যথা বা গাঁটে গাঁটে ব্যথা কমিয়ে দিতে পারে (10)।

১৩. ফিটকারী

ফিটকারী গুঁড়ো করে রাখুন ও প্রতি দু ঘন্টা অন্তর এক চা চামচ এই গুঁড়ো খেয়ে নিন, দেখবেন ম্যালেরিয়ার উপসর্গ কমতে পারে কারণ এতে থাকে অ্যান্টি-মাইক্রোবিয়াল উপাদান (11)।

১৪. নিম

নিম পাতা বাটা বা নিম পাতা ভেজে নিয়মিত ভাতের সঙ্গে খেতে পারেন এতে ম্যালেরিয়ার উপসর্গ কমতে পারে বলে জানা যায়।

ডাক্তারকে কখন দেখাতে হবে ?

জ্বর ২দিনের মধ্যে না কমলে ও বার বার কাঁপুনি দিয়ে জ্বর এলে শীঘ্রই ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করুন। চার থেকে পাঁচ দিন হয়ে গেলেও যদি উপসর্গ না কমে তাহলে হয়তো হাসপাতালে ভর্তি করতে হতে পারে। যদি বাড়িতে থাকেন ম্যালেরিয়া হওয়ার পর থেকেই ডাক্তারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগে থাকবেন, যাতে এটি জটিল ধরনের না হয়ে যায়। তাহলে প্রাণহানির ভয় থেকে যায়।

ম্যালেরিয়া হয়েছে কিভাবে বুঝবেন?

যদি দেখেন বার বার কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসছে এবং উপসর্গ কিছুতেই কমছে না, হতেই পারে ম্যালেরিয়া হয়েছে। শীঘ্রই ডাক্তারের কাছে যান। শুধু রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমেই এই রোগ নির্ণয় সম্ভব।

ম্যালেরিয়ার চিকিৎসা

ম্যালেরিয়া নিরাময় করতে পাইপেরাকুইনের সমন্বয়ে তৈরি ‘আর্টেমিসিনিন’ নামের ওষুধটি বেশ কার্যকর। বেশিরভাগ ডাক্তারই এই ধরণের ওষুধ খাওয়ার কথা বলে থাকেন।

ম্যালেরিয়া হলে কি খাবেন এবং কি খাবেন না?

ম্যালেরিয়া হলে হজম শক্তির খুবই ক্ষতি হয়, তাই এই সময় তেল মশলা জাতীয় খাবার খাবেন না। হালকা ধরণের খাবার খাবেন। প্রচুর পরিমানে জল খাবেন। শরীরে কখনোই যেন জলের কমতি না হয়। খাবারের মধ্যে ফল ও ডিম সেদ্ধ রাখবেন।

ম্যালেরিয়া প্রতিরোধ করার টিপস

  • দিনে বা রাতে ঘুমানোর সময় অবশ্যই মশারি বা কয়েল ব্যবহার করুন । দরজা-জানালায় মশক নিরোধক জাল, প্রতিরোধক ক্রিম, স্প্রে ব্যবহার করুন ।
  • বাড়ির আশপাশে কোথাও যেন জল জমতে না পারে কারণ জমা জলেই মশা ডিম পেড়ে থাকে ।
  • আপনার বাড়ির এলাকায় কোনো পুকুর থাকলে তা যেন নিয়মিত পরিষ্কার করা হয় তার দিকে নজর দিতে হবে ।
  • নিয়মিত বাড়ি ও বাথরুম পরিষ্কার রাখতে হবে।

আশা করি, এই প্রতিবেদন পড়ে আপনারা ম্যালেরিয়া রোগ থেকে কিভাবে বাঁচবেন ও ম্যালেরিয়া হলে তার প্রতিকার কিভাবে করবেন তার সম্পর্কে ধারণা হয়েছে। এই রোগ থেকে বাঁচতে উপরে উল্লিখিত টিপস গুলি মেনে চলুন।

নিজের যত্ন করুন ও সুস্থ থাকুন।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী :

ম্যালেরিয়া রোগ কি ভাইরাসের কারণে হয়ে থাকে ?

উঃ না, এটি প্লাসমোডিয়াম নামক পরজীবীর কারণে হয়ে থাকে।

ম্যালেরিয়ার জন্য শরীরের কোন অঙ্গে প্রভাব পড়ে ?

উঃ প্রথমে এটি রক্ত কণিকার ওপরই শুধু তার প্রভাব থাকে। তবে ধীরে ধীরে এটি লিভারকে সংক্রামিত করে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে মস্তিষ্কে এর প্রভাব পড়ে, এটিকে সেরিব্রাল ম্যালেরিয়া বলে।

ম্যালেরিয়ার ইনকুবেশন পিরিয়ড কতদিনের হয় ?

উঃ মূলত নয় থেকে চোদ্দ দিনের ইনকুবেশন পিরিয়ড হয়ে থাকে।

কিভাবে ম্যালেরিয়া মানুষের শরীরে ছড়ায় ?

উঃ মশার দ্বারা এই রোগ মানুষের শরীরে ছড়িয়ে থাকে।

গর্ভবতী মহিলাদের ম্যালেরিয়া হলে সেটি কি মিসক্যারেজ ঘটাতে পারে ?

উঃ মিসক্যারেজ হওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে ম্যালেরিয়া জটিল রূপ ধারণ করলে মিসক্যারেজ ঘটার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।

ম্যালেরিয়াতে কি গাঁটে গাঁটে ব্যথা হয় ?

উঃ হ্যাঁ , হতেই পারে।

ম্যালেরিয়া কি ছোঁয়াচে ?

উঃ না, ম্যালেরিয়া ছোঁয়াচে নয়।

ম্যালেরিয়া হলে সারতে কতদিন সময় লাগে ?

উঃ এটি সারতে কমপক্ষে দু সপ্তাহ সময় লাগে।

ম্যালেরিয়াতে কি মানুষের মৃত্যু হতে পারে ?

উঃ সাধরণত ম্যালেরিয়াতে মানুষের মৃত্যু হয় না। তবে সেরিব্রাল ম্যালেরিয়া হলে মৃত্যুর সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়।

ম্যালেরিয়ার ভ্যাকসিন কতদিন কার্যকরী ?

উঃ ম্যালেরিয়ার ভ্যাকসিন এখনও বাজারে আসেনি।

ম্যালেরিয়া কি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে নষ্ট করে দেয় ?

উঃ হ্যাঁ। ম্যালেরিয়া শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে নষ্ট করে দেয়।

References :

Stylecraze has strict sourcing guidelines and relies on peer-reviewed studies, academic research institutions, and medical associations. We avoid using tertiary references. You can learn more about how we ensure our content is accurate and current by reading our editorial policy.
Was this article helpful?
scorecardresearch