মৃগী রোগের কারণ, লক্ষণ এবং চিকিৎসা | Epilepsy (Mirgi) Symptoms and Treatment in Bengali

Written by

কিছু মানুষের হঠাৎ হঠাৎ কাঁপুনি বা খিঁচুনি শুরু হয়। সেসময় তারা চোখ-মুখ উল্টিয়ে ফেলে বা এক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে। অনেকের আবার চোখের পাতা স্থির হয়ে যায় আর কেউ কেউ পর্যায়ক্রমিকভাবে জ্ঞান হারাতে থাকে। মানসিকভাবে সুস্থ হওয়া সত্ত্বেও কোনো ব্যক্তি যদি হঠাৎ করে এরকম অস্বাভাবিক আচরণ শুরু করে, সাধারণ ভাষায় সেগুলিকেই মৃগী রোগের লক্ষণ বলা হয়।

আপনি কি জানেন, এমন সময়ে রোগীদের সাথে কী কী করা উচিৎ? কী করলে তারা দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে? ঠিক কখন এবং কী ধরণের চিকিৎসার প্রয়োজন তাদের? বেশীরভাগ লোকই মৃগী রোগের এইসব উপসর্গ বা কারণ সম্পর্কে সঠিক ভাবে জানেন না। তাই, অযথা আতঙ্কিত হয়ে গিয়ে দরকারের সময় তারা ভুলভাল কাজ করে ফেলেন। মানুষকে এই রোগ সম্পর্কে সচেতন করতে এবং এর সঠিক চিকিৎসা সম্পর্কে জানাতে, স্টাইলক্রেজের এই নিবন্ধে আজকে আমরা মৃগীরোগের প্রকার এবং লক্ষণগুলি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

মৃগী রোগ আসলে কী?

স্নায়ুতন্ত্রের একটি জটিলতাজনিত রোগ হল এই মৃগী। এই রোগে ব্রেন বা মস্তিষ্কের স্নায়ু কোষগুলিই সাধারণত আক্রান্ত হয়। তাই, মস্তিষ্কের কার্যকারিতা বাধাপ্রাপ্ত হয়। এই কারণে, ব্রেন শরীরের অন্য অংশে সঠিক বার্তা পাঠাতে সক্ষম হয় না। ফলস্বরূপ, রোগী তার সংবেদনশীলতা এবং অনুভূতিগুলি প্রকাশের ক্ষমতা কিছু সময়ের জন্য হারিয়ে ফেলে বা অত্যন্ত ম্লান হয়ে আসে। এমন পরিস্থিতিতে ব্যক্তি অদ্ভুত আচরণ করে, খিঁচুনি বা কাঁপুনি অনুভব করে, মাঝেমধ্যে অজ্ঞান হয়ে যেতেও পারে। বিশ্বব্যাপী প্রায় ৫ কোটি লোক এই মৃগী রোগে আক্রান্ত (1)। প্রতি বছর, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় দেড় লক্ষ মানুষ মৃগী রোগে আক্রান্ত হয়। (2)

মৃগী রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি খিঁচুনি শুরু হলে নিজের প্রতিকার নিজে করতে পারেন না। এই সময় রোগীর পাশে যিনি থাকবেন তিনিই একমাত্র সামান্য কিছু সাহায্য করে রোগীকে বাঁচিয়ে তুলতে পারেন। পথ চলতি কোনো মানুষ যদি হঠাৎ মৃগীতে আক্রান্ত হন, তবে আমাদের উচিৎ সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া। তার জন্য জেনে রাখা উচিৎ খিঁচুনির সময় এবং পরে আমাদের কী কী করা উচিৎ এবং কী কী করা উচিৎ না।

  • সুস্থ কোনো ব্যক্তিকে হঠাৎ করে এরকম অস্বাভাবিক সব আচরণ শুরু করেছে দেখে আমরা অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে পড়ি। প্রথমত এরকম পরিস্থিতিতে, রোগীরা অস্বাভাবিকভাবে মুখ বিকৃতি করলে, হাত বা পা ছোঁড়াছুড়ি করলে বা কাঁপলে তাদের বাধা দেওয়া উচিৎ না। এতে, রোগী এবং সামনের সাহায্যকারী ব্যক্তি উভয়েই বিশ্রীভাবে আহত হতে পারে।
  • খিঁচুনির সময় হাত-পা ছোড়াছুড়ির ফলে রোগী অনেক সময় আহত হন। তাই, রোগীকে নিরাপদ জায়গায় রাখতে হবে যাতে কাছাকাছি গরম কিছু বা আগুন না থাকে, ধারালো কিছু থাকলে তা সরিয়ে নিতে হবে।
  • খিঁচুনির সময় আমরা অনেকে রোগীর মুখের মধ্যে চামচ বা জল দিই, যাতে তাদের দাঁত বা জিভ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, এটা উচিৎ না। খিঁচুনির সময় মুখের মধ্যে কিছুই দেওয়া যাবে না।
  • রোগী দাঁতে দাঁত চেপে ধরে থাকলে এমনকী দাঁত দিয়ে জিভ কামড়ে ধরে থাকলেও সেই অবস্থায় মুখে আঙুল ঢুকিয়ে দাঁত ফাঁক করার চেষ্টা করবেন না একেবারেই। খিঁচুনির সময় রোগীকে জাপটে চেপে ধরবেন না একেবারেই, এতে রোগীর আরও বেশী ক্ষতি হয়। খিঁচুনি স্বাভাবিকভাবে শেষ হয়ে না যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করুন। তবে রোগী পড়ে গিয়ে মাথায় যাতে আঘাত না পান সেদিকে নজর রাখতে হবে।
  • রোগীর কাঁপুনি থামলে বা জ্ঞান ফেরার পরে রোগীর মধ্যে সামান্য কিছু সময়ের জন্য মানসিক বিভ্রান্তি দেখা যায়, সাময়িক স্মৃতিভ্রংশ ও হয়ে যেতে পারে গুরুতর ক্ষেত্রে। এক্ষেত্রে, রোগী পুরোপুরি স্বাভাবিক অবস্থায় না আসা পর্যন্ত রোগীর পাশে থেকে রোগীকে আশ্বস্ত করুন।
  • কাঁপুনি শেষে জ্ঞান ফেরার পরে রোগীর পোশাক হালকা করে দিতে হবে। খেয়াল রাখবেন, রোগীর আশেপাশে বেশি ভীড় না জমে এবং কেউ হৈ চৈ না করে।
  • মৃগীর খিঁচুনি শেষ হওয়ার পরে রোগীকে প্রথমে আরামদায়ক অবস্থায় উপুড় করে বা কাত করে আলতো ভাবে ধরে শুইয়ে দিতে হবে। দুই হাত দিয়ে রোগীর মাথাটাকে একদিকে কাত করানোর চেষ্টা করতে হবে যাতে মুখের সব লালা বাইরে পড়ে যায়। মাথার নিচে নরম জাতীয় কাপড় বা বালিশ রাখতে পারলে আরও ভাল হয়।
  • খিঁচুনি শেষ হওয়ার পরে রোগীর নাড়ীর স্পন্দন অনুভব করুন এবং খেয়াল রাখুন রোগী ঠিক মতো শ্বাস নিতে পারছে কিনা। শ্বাস-প্রশ্বাসের সমস্যা হলে খিঁচুনি শেষ হয়ে গেলে রোগী স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এলে তাকে দ্রুত হাসপাতালে অবশ্যই নিয়ে যান বা বাড়িতেই কৃত্রিমভাবে অক্সিজেন সরবরাহের ব্যবস্থা করবেন।
  • রোগীর খিঁচুনি যদি ৫ মিনিটের বেশী স্থায়ী হয় এবং প্রথমবারের খিঁচুনির জ্ঞান ফেরার সাথে সাথেই দ্বিতীয়বারের খিঁচুনি শুরু হয়ে গেলে তৎক্ষনাৎ রোগীকে চিকিৎসকের কাছে বা হাসপাতালে নিয়ে যান।

এই সামান্য কিছু বিষয় মাথায় রাখলেই আপনি একটি মৃগী আক্রান্ত অসহায় মানুষকে বাঁচিয়ে তুলতে পারেন। এই রোগ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে তাই সারা ভারত জুড়ে ১৭ ই নভেম্বর ন্যাশানাল এপিলেপসি ডে বা জাতীয় মৃগী দিবস পালিত হয়। মৃগী রোগের কারণ এবং লক্ষণগুলি সম্পর্কে বিশদে জানতে নিবন্ধটি শেষ পর্যন্ত পড়ুন।

মৃগী রোগের প্রকারভেদ

রোগী বিশেষে খিঁচুনির লক্ষণগুলি একজনের থেকে অন্যের থেকে আলাদা হতে পারে। আপনি যদি একটি একবার বা দু’বার সামান্য খিঁচুনি অনুভব করেন তবে এটি বোঝায় না যে আপনার মৃগী আছে। তবে, এরকম হলে একবার অন্তত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিৎ। সাধারণত, মস্তিষ্কের অস্বাভাবিক ক্রিয়াকলাপটি কীভাবে শুরু হয় তার উপর নির্ভর করে মৃগী রোগের খিঁচুনিগুলিকে দুটি ধরণের মধ্যে শ্রেণীবদ্ধ করা হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞান অনুসারে দু ধরনের মৃগী রোগ দেখা যায়। (3)

১. সাধারণ খিঁচুনি বা Generalized Seizures

যখন খিঁচুনি মস্তিষ্কের প্রায় সমস্ত অঞ্চলকে প্রভাবিত করে, তখন রোগী বিভিন্ন ধরণের অস্বাভাবিক কার্যকলাপ শুরু করে। মৃগী রোগের এটি খুব সাধারণ একটি ধরণ যাকে আবার ছ ভাগে ভাগ করা হয়েছে। যেমন –

  • অ্যাবসেন্স সিজারস (Absence Seizures) – এই ধরণের মৃগী রোগী কিছু সময়ের জন্য তার জ্ঞান-বুদ্ধি হারিয়ে ফেলে, মুখ বিকৃতি করে এবং এক দৃষ্টে তাকিয়ে থাকে। সাধারণত, বাচ্চাদের মধ্যে এধরণের মৃগী রোগ দেখা যায়।
  • টনিক সিজারস (Tonic Seizures) – এই ধরণের মৃগী রোগে, রোগীর পেশীগুলি অসাড় হয়ে পড়ে এবং রোগী অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে যেতে পারেন। সাধারণত, পিঠ, হাত এবং পায়ের পেশীগুলিই আক্রান্ত হ্য় এক্ষেত্রে। একই সময়ে, খিঁচুনি শেষ হওয়ার পরে বা জ্ঞান ফেরার পরে রোগী ক্লান্ত বোধ করতে পারে।
  • অ্যাটোনিক সিজারস (Atonic Seizures) – এগুলি ড্রপ খিঁচুনি হিসাবেও পরিচিত। এই ধরনের খিঁচুনিতে মাংসপেশীর নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারে, যার ফলে আক্রান্ত ব্যক্তি হঠাৎ করে মাটিতে পড়ে যেতে পারে।
  • ক্লোনিক সিজারস (Clonic Seizures) – এই ধরণের মৃগী রোগে রোগির ঘাড়, হাত, পা মুখের মাংসপেশীগুলি আক্রান্ত হয় এবং ১ বা ২ সেকেন্ড অন্তর ছন্দবদ্ধ ঝাঁকুনি বা কাঁপুনির সম্মুখীন হয়। এই ধরণের খিঁচুনি ১ থেকে ২ মিনিট স্থায়ী হয়।
  • মায়োক্লোনিক সিজারস (Myoclonic Seizures) – এই ধরণের রোগের ক্ষেত্রে রোগীর হাতে এবং পায়ে আকস্মিক এবং সামান্য কিছু সময়ের জন্য ঝাঁকুনি বা কাঁপুনি হতে পারে।
  • টনিক-ক্লোনিক সিজারস (Tonic-Clonic Seizures) – এই ধরণের মৃগী রোগে সবচেয়ে বেশি অস্বাভাবিকতা লক্ষ করা যায়। রোগীর দেহ হঠাৎ করে শক্ত হয়ে যায়, কাঁপতে থাকে, রোগী হঠাৎ করে জ্ঞাণ হারাতে পারে, অনেক ক্ষেত্রে রোগী জিভ কামড়াতে থাকেন এবং তার মূত্রাশযয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ হ্রাস পায়।

২. আংশিক খিঁচুনি বা Focal Seizures

ফোকাল সিজারস বা আংশিক খিঁচুনিতে মস্তিষ্কের কেবলমাত্র একটি অঞ্চলের অস্বাভাবিক ক্রিয়াকলাপের কারণে খিঁচুনি দেখা দেয়। এই ধরণের মৃগীরোগের খিঁচুনি কেবল মস্তিষ্কের একটি নির্দিষ্ট অংশকেই প্রভাবিত করতে পারে, তাই আংশিক খিঁচুনি ও বলা হয় একে।এই ধরনের খিঁচুনি আরও দুটি বিভাগে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়:

  • সাধারণ আংশিক খিঁচুনি বা সিম্পল ফোকাল সিজারস – এই ধরণের খিঁচুনি মস্তিষ্কের খুব ছোট অংশকে প্রভাবিত করে। এক্ষেত্রে, রোগী সম্পূর্ণ চেতনা হারায় না, কেবল তার আবেগ প্রকাশ করার বা অনুভূতিগুলি বোঝার ক্ষমতা হারায়। খিঁচুনির সময় রোগী স্বাদ এবং গন্ধের পরিবর্তনগুলি বুঝতে পারে না, কিছু সময়ের জন্য শব্দ শুনতে পায় না বা শুনতে পেলেও সঠিকভাবে অনুভূতি প্রকাশ করতে পারে না।
  • জটিল আংশিক খিঁচুনি বা কমপ্লেক্স ফোকাল সিজারস – এই ধরনের খিঁচুনি কিছু সময়ের জন্য রোগীর মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে। একই সাথে, কিছু ক্ষেত্রে তার চিন্তাভাবনা করার ও বোঝার ক্ষমতা নষ্ট হতে পারে। খিঁচুনির সময় রোগী তার আশেপাশের পরিবেশে স্বাভাবিকভাবে প্রতিক্রিয়া দিতে পারে না, এক দৃষ্টে তাকিয়ে তাকেন শুধু। আক্রান্ত ব্যক্তি বার বার হাত ঘষেন, ঢোক গেলেন, জিভ বা ঠোঁট কামড়ান, হাত-পা ছোঁড়েন খিঁচুনি না থামা পর্যন্ত।

এ ধরণের মৃগীরোগের খিঁচুনিতে রোগীর মস্তিষ্কের একটি খুব ছোট অংশই প্রথমে আক্রান্ত হলেও পরে এটি ধীরে ধীরে মস্তিষ্কের উভয় অংশে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এছাড়াও, ফোকাল সিজারস বা আংশিক খিঁচুনির লক্ষণগুলি মাইগ্রেন বা মানসিক অসুস্থতা, নারকোলিপসি এবং অন্যান্য স্নায়বিক রোগগুলি মতো হয়। বিভ্রান্তি এড়াতে তাই সম্পূর্ণ পরীক্ষার করার পরই খিচুনির ধরণ নির্ণয় করা উচিৎ এবং যথাযথ চিকিৎসা করানো উচিৎ।

দ্রষ্টব্য – মৃগীরোগের খিঁচুনি কয়েক মিনিটের জন্য এবং দীর্ঘ সময়ের জন্যও স্থায়ী হতে পারে। উভয় ক্ষেত্রেই আপনাকে অবশ্যই আপনার ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করতে হবে।

আপনি মৃগীর ধরণগুলি জানেন, এখন এর কারণগুলি জানার পালা।

মৃগী রোগের কারণ

মৃগী সমস্যা হওয়ার অনেক কারণ থাকতে পারে। দুর্ঘটনার কারণে মস্তিষ্কে আঘাত লাগলে, গর্ভস্থ অবস্থায় কোনো সমস্যা হলে বা পরিবারের কারোর মৃগী থাকলে এই রোগ হতে পারে। প্রায় অর্ধেক মৃগী আক্রান্ত জনগোষ্ঠীর মধ্যে মৃগীরোগের সঠিক কারণ সনাক্ত করা যায়নি। তবে, অন্য অর্ধে, নিম্নলিখিত কারণগুলি দায়ী হতে পারে। যেমন – (4)

  • দুর্ঘটনার কারণে গর্ভস্থ অবস্থায় শিশুর মস্তিষ্কে আঘাত লাগলে
  • প্রসবকালীন সময়ে আঘাতের ফলে সেরিব্রাল পলসী বা মৃগী হতে পারে
  • জন্মের সময় মস্তিষ্কের বিকাশ হ্রাসের কারণে বা অটিজম এবং নিউরোফাইব্রোমাটোসিসের মতো বিকাশজনিত ব্যাধি থাকলে
  • মেনিনজাইটিস, এইডস এবং ভাইরাল এনসেফালাইটিসের মতো সংক্রামক রোগ হলে
  • দুর্ঘটনায় মস্তিষ্কের ক্ষতি হলে, ট্রমা বা মানসিক ক্ষতির কারণে
  • মস্তিষ্কের অস্বাভাবিক রক্তনালীগুলির কারণে
  • মস্তিষ্কের টিউমার এবং স্ট্রোক হলে
  • পরিবারের কারোর মৃগী থাকলে

মৃগী যে কোনও বয়সে দেখা দিতে পারে তবে শিশু এবং বয়স্কদের মধ্যে এটি বেশি দেখা যায়। উপরিউক্ত কারণগুলি অন্যতম মৃগী রোগ হবার জন্য। মনে রাখবেন, মৃগী রোগের চিকিৎসা করানো অবশ্যই প্রয়োজন।তাই এখন জেনে নিন, কী কী লক্ষন দেখে বুঝবেন রোগীর সমস্যাটি মৃগী নাকি অন্য কিছু।

মৃগী রোগের লক্ষণসমূহ

বারবার খিঁচুনিই মৃগী রোগের প্রধান লক্ষণ। খিঁচুনির পাশাপাশি অন্যান্য বেশ কিছু লক্ষণ কিছু সময়ের জন্য দেখা যেতে পারে। আপনি যদি লক্ষ্য করেন যে আপনি নিম্নলিখিত কোনও লক্ষণ অনুভব করছেন, অবিলম্বে চিকিৎসকের সহায়তা নিন।

  • সাময়িক বিভ্রান্তি
  • চিন্তাভাবনা করার ক্ষমতা হ্রাস পাওয়া
  • সচেতনতা / চেতনা হ্রাস পাওয়া
  • মাঝেমধ্যে সম্পূর্ণ জ্ঞাণ হারানো
  • পারিপার্শ্বিক পরিবেশ অনুসারে প্রতিক্রিয়া না দেওয়া
  • স্বাদ, গন্ধের পরিবর্তন অনুভব করতে না পারা
  • এক দৃষ্টে তাকিয়ে থাকা
  • মাথা ঘোরা
  • হাত, পা, ঘাড়ের পেশী শক্ত হয়ে যাওয়া বা ধীরে ধীরে অসাড় হয়ে পড়া
  • সাময়িকভাবে দাঁড়ানোর বা বসার ক্ষমতা হারিয়ে হঠাৎ মাটিতে পড়ে যাওয়া

রোগী বিশেষে বিভিন্ন লক্ষণ ও উপসর্গ দেখা যায়। তাই মৃগী রোগের সাধারণ কিছু লক্ষণসমূহ নিয়ে আলোচনা করা হল।

মৃগী রোগের ঝুঁকির কারণগুলি

কিছু বিষয় মৃগী রোগ হবার ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। মৃগী রোগের ঝুঁকি বাড়ানোর কারণগুলির মধ্যে রয়েছে (5):

  • দুর্ঘটনা – মাথায় আঘাত লাগলে
  • নির্ধারিত সময়ের পূর্বে জন্ম – নির্ধারিত সময়ের পূর্বে কোনো শিশু জন্ম নিলে তার মধ্যে মৃগী রোগ হবার ঝুঁকি থাকে।
  • বংশগতি – পরিবারের কারোর মৃগী থাকলে পরবর্তী প্রজন্মের কারোর মৃগী রোগ হতে পারে।
  • শৈশবে খিঁচুনি – যারা শৈশবকালে দীর্ঘ সময় ধরে খিঁচুনি বা কাঁপুনিতে আক্রান্ত হয়েছেন তাদের মৃগী রোগ হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
  • ডিমেনশিয়া – ডিমেনশিয়া থাকলে বা মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহে সমস্যা হলে মৃগী দেখা দিতে পারে। এক্ষেত্রে, ডিমনেশিয়ার মত রোগ বয়স্কদের মধ্যে মৃগী রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলতে পারে।

মৃগী রোগে সঠিক সময়ে চিকিৎসা শুরু করা আবশ্যক।কয়েকটি প্রাকৃতিক উপায়ও রয়েছে যা খিঁচুনি নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে।

মৃগীরোগের ঘরোয়া প্রতিকার

১. নারকেল তেলঃ

উপাদান :

নারকেল তেল

কিভাবে ব্যবহার করবেন:

  • রান্নায় পরিশোধিত তেলের পরিবর্তে নারকেল তেল ব্যবহার করুন।
  • আপনি এটি স্যালাডেও ব্যবহার করতে পারেন।

কতবার ব্যবহার করবেন:

আপনি এটি নিয়মিত ব্যবহার করতে পারেন।

কতটা কার্যকর:

নারকেল তেলে শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বৈশিষ্ট্য পাশাপাশি ফ্যাটি অ্যাসিড রয়েছে। এই বৈশিষ্ট্যগুলির কারণে, নারকেল তেল মৃগীর সমস্যা কমাতে সহায়ক হিসাবে বিবেচিত হয়। (6)

২. ক্যানবিডিওল বা সিবিডি অয়েল

গাঁজা গাছ থেকে বের করা নির্যাসের ৪০ শতাংশ দিয়ে তৈরি হয় ক্যানবিডিওল বা সিবিডি অয়েল।ওষুধ হিসাবে পাওয়া যায় যে ক্যানবিডিওল (Cannabidiol) সেটিই ব্যবহার করা হয় মৃগীর খিঁচুনি নিয়ন্ত্রণ করতে।

উপাদান :

১০ গ্রাম ক্যানবিডিওল বা সিবিডি অয়েল

কিভাবে ব্যবহার করবেন:

  • একটি ড্রপারের সাহায্যে ১০ গ্রাম সিবিডি তেল জিভের নীচে ফেলুন।
  • এক মিনিটের জন্য জিভের নীচে এভাবেই রাখুন এবং পরে গিলে ফেলুন।
  • তেলটি যেহেতু ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তাই তেলটি ব্যবহারের আগে চিকিৎসকের সাথে অবশ্যই পরামর্শ করে নেবেন।

কতবার ব্যবহার করবেন:

এটি দিনে একবার ব্যবহার করা যেতে পারে।

কতটা কার্যকর:

বিশেষজ্ঞদের মতে, সিবিডি তেলের একটি এন্টি-মৃগী প্রভাব রয়েছে, যা মস্তিষ্কের ক্ষয়ক্ষতি (7) দূর করে মৃগী সমস্যা দূর করতে সাহায্য করে।

৩. ভিটামিন

ভিটামিন বি-৬, ভিটামিন ই, ফলিক অ্যাসিড (ভিটামিন বি -৯), ভিটামিন ডি, ভিটামিন কে এবং বায়োটিন (ভিটামিন বি -৭) এর ঘাটতির মৃগীরোগে আক্রান্ত হওয়ার সমস্যা। কারণ হতে পারে। পুষ্টির ঘাটতিজনিত কারণে মৃগীজনিত লক্ষণ ও উপসর্গগুলি কাটিয়ে উঠতে এইসব ভিটামিন সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করার পরামর্শ দেওয়া হয়। (8) প্রয়োজনীয় এইসব ভিটামিন সমৃদ্ধ খাবারের মধ্যে রয়েছে মুরগির মাংস, মাছ, ডিম, বাদাম এবং সবুজ শাকসবজি। এছাড়াও –

  • ভিটামিন বি-৬ এর ঘাটতিতে খিঁচুনি শুরু হতে পারে। তাই, ভিটামিন বি-৬ সমৃদ্ধ খাবার খেয়ে মৃগী রোগের প্রতিরোধ করা যেতে পারে। টুনা মাছ, শাক-সবজির মধ্যে ছোলা ও পালংশাকে এই ভিটামিনটি সব চেয়ে বেশি পরিমাণে থাকে।
  • ভিটামিন ডি-৩ এর অ্যান্টিকনভালস্যান্ট প্রভাব মৃগীরোগের সাথে সম্পর্কিত লক্ষণগুলি নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে। তৈলাক্ত মাছ, যেমন কর্ড বা হাঙর এর যকৃতের তেল, এ ছাড়া দুধ, ডিমের কুসুম, মাখন ও চর্বিযুক্ত খাদ্যে পর্যাপ্ত পরিমাণে ভিটামিন-ডি থাকে।
  • এন্টিপিলিপটিক ওষুধের সাথে ভিটামিন-ই সমৃদ্ধ খাবার খিঁচুনি নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। পালং শাক, কচুর মূল, আমন্ড বা কাঠ বাদাম, পেস্তা বাদাম, চীনা বাদাম, সূর্যমুখী বীজ, লাল মরিচের গুঁড়োতে যথেষ্ট ভিটামিন-ই আছে।

আপনি চাইলে এই ভিটামিনগুলির পরিপূরকও নিতে পারেন। আপনি যদি এই ভিটামিনগুলির ঘাটতি পুরনের জন্য অতিরিক্ত পরিপূরক নিতে চান তবে অবশ্যই আপনার ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করে নেবেন।

কখন আপনার ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করা উচিত?

মৃগীরোগের নিম্নে উল্লিখিত লক্ষণগুলি যদি দেখা যায়, তবে অবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিৎ।

  • খিঁচুনি যদি ৫ মিনিটেরও বেশি সময় ধরে চলে এবং একাধিকবার ঘটে।
  • দ্বিতীয় খিঁচুনি প্রথম খিঁচুনির সাথে সাথেই শুরু হয়।
  • খিঁচুনি বন্ধ হয়ে যাবার পরেও যদি জ্ঞান না ফেরে, সচেতনতা বা চেতনা ফিরে ব্যক্তি স্বাভাবিক না হন।
  • খিঁচুনির পর যদি ব্যক্তির মানসিক অবস্থার অবনতি ঘটে।
  • খুব জ্বর আসে।
  • উত্তাপের কারণে যদি রোগী ক্লান্ত বোধ করেন।
  • রোগী যদি গর্ভবতী হন।
  • রোগীর যদি ডায়াবেটিস থাকে।
  • খিঁচুনির সময় পড়ে গিয়ে বা কোনোভাবে রোগী আহত হন।

মৃগী রোগের চিকিৎসার আগে রোগ নির্ণয় করা খুব গুরুত্বপূর্ণ। রোগের লক্ষণসমূহ বিশ্লেষণ করে এবং বেশ কিছু পরীক্ষার মাধ্যমে রোগের অবস্থা নির্ণয় করেন চিকিৎসকেরা। পরবর্তী অংশে, রোগ নির্ণয় সম্পর্কিত কিছু প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়া হল।

মৃগী রোগ নির্ণয়

মৃগীর কোনো রকম লক্ষণ দেখা গেলে, চিকিৎসক প্রথমে রোগীকে শারীরিকভাবে পরীক্ষা করেন। এছাড়াও, তিনি রোগীর সাথে কথা বলে কিছু তথ্য জানার চেষ্টা করেন, যেমন – কী কী লক্ষণ দেখা যায়, কখন এবং কবে থেকে রোগীর এই সমস্যা শুরু হয়েছে ইত্যাদি। রোগটি জিনগত কিনা তা জানার জন্য চিকিৎসক রোগীর পারিবারিক ইতিহাস নিয়েও গবেষণা করার চেষ্টা করেন। মৃগীরোগ নির্ণয় করা হয় খিঁচুনির ধরনের ওপর। অনেক সময় খিঁচুনির ধরণ রোগী বলতে না পারলেও, যিনি খিঁচুনি হতে দেখেছেন, তাঁর তথ্যের ওপর ভিত্তি করেও অনেক সময় রোগ নির্ণয় করা হয়।

রোগীর চিকিৎসার ইতিহাস এবং লক্ষণগুলি পর্যালোচনা করার পর, সাধারণত রোগীকে নিম্নলিখিত পরীক্ষাগুলি গ্রহণ করার পরামর্শ দিতে পারেন চিকিৎসক:

  • ইইজি – মৃগী রোগ নির্ণয়ের জন্য ইলেক্ট্রোয়েন্সফ্লাগ্রাম পরীক্ষা করার পরামর্শ দেওয়া হয়। এই পরীক্ষায়, রোগী একটি দিন বা এক সপ্তাহের জন্য একটি ইইজি রেকর্ডার পরে থাকেন। খিঁচুনির সময় আপনার মস্তিস্কের পরিবর্তনগুলি মস্তিষ্কের কোন অংশটি প্রভাবিত করছে তা নির্ধারণ করতে মস্তিষ্কের সারাদিনের কার্যকারীতা রেকর্ড করা হয়।
  • ভিডিও ইইজি – কিছু ক্ষেত্রে রোগীকে কয়েক দিনের জন্য হাসপাতালে রাখা হয়। এক্ষেত্রে, খিঁচুনির সময় রোগীর শারীরিক লক্ষণগুলি পরীক্ষা করা হয় বিশেষ কিছু যন্ত্রের সাহায্যে (যেমন ইইজি রেকর্ডার এবং ক্যামেরা)। মৃগী রোগ নির্ণয়ের এই প্রক্রিয়াটিকে ভিডিও ইইজি বলা হয়।

মৃগীরোগের ধরণ নির্ধারণ করার জন্য কিছ স্নায়বিক পরীক্ষা করা হয়। এক্ষেত্রে, রোগীর আচরণ, মস্তিষ্কের কার্যকারীতা, মস্তিষ্কের অস্বাভাবিকতাগুলি সনাক্ত করতে, আপনার ডাক্তার ইলেক্ট্রোয়েন্সফ্লাগ্রাম (ইইজি), উচ্চ-ঘনত্বের ইইজি, কম্পিউটারাইজড টমোগ্রাফি (সিটি) স্ক্যান, এমআরআই (MRI) স্ক্যান, এবং এফএমআরআই (fMRI) এর মতো পরীক্ষার পরামর্শও দিতে পারেন। এই পরীক্ষাগুলির পাশাপাশি মস্তিষ্কের যে অঞ্চলটি প্রভাবিত হতে শুরু করেছে সেটি চিহ্নিত করতে স্ট্যাটিস্টিকাল প্যারামেট্রিক ম্যাপিং (SPM), কারি বিশ্লেষণ এবং ম্যাগনেটোএেন্সফ্লোগ্রাফি (MEG) – এর মত কিছু রোগ বিশ্লেষণ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। (9)

এইসব স্নায়বিক পরীক্ষার পাশাপাশি, মৃগী রোগের বিকাশে অবদান রাখতে পারে এমন অন্যান্য রোগ সংক্রমণ, জিনগত অবস্থা বা অন্যান্য স্বাস্থ্য সংক্রান্ত কিছু সমস্যা আছে কী না জানার জন্য আরোও কিছু পরীক্ষা করা হয়। যেমন –

  • রক্ত পরীক্ষা
  • ব্লাড সুগার পরীক্ষা
  • সম্পূর্ণ রক্ত গণনা (সিবিসি) যা রক্তের কোষের ধরণ ও সংখ্যা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয়
  • কিডনির কার্যকারীতা পরীক্ষা
  • লিভারের কার্যকারীতা পরীক্ষা
  • মেরুদণ্ডের কোনো সমস্যা আছে কি না তার পরীক্ষা
  • সংক্রামক রোগের স্ক্রিনিং

এইসব পরীক্ষাগুলোর রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে মৃগীরোগের প্রকারএবং কারণ নির্ণয় করা হয়। কিন্তু যে কোনো একটা পরীক্ষা আপনার মৃগীরোগ আছে কি নেই তা প্রমাণ করতে পারে না। চিকিৎসকই সব মিলিয়ে সিদ্ধান্ত নেন আপনার চিকিৎসা পদ্ধতি কেমন হবে।

কিভাবে মৃগী রোগের চিকিৎসা করা হয়?

রোগীর ধরণের উপর নির্ভর করে চিকিৎসার পদ্ধতি। নিবন্ধের এই অংশে মৃগী রোগের চিকিৎসা কীভাবে করা হয় সেই সম্পর্কে জানাব।

  • প্রাথমিক পর্যায়ে মৃগী নিয়ন্ত্রণের জন্য অ্যান্টিকনভালসেন্টস বা অ্যান্টিবায়োটিকের মতো কিছু ওষুধ খাবার পরামর্শ দেন চিকিৎসক। মৃগীর কারনে হওয়া মস্তিষ্কের ক্ষতির উন্নতি করে এই অ্যান্টিকনভালসেন্টস ওষুধগুলি। সময়ের সাথে সাথে ওষুধের ডোজ বাড়ানো বা কমানোর পরামর্শ দেন চিকিৎসক। খিঁচুনি কমানোর ওষুধও দেওয়া হয় মৃগী রোগে।
  • তবে, মস্তিষ্কে টিউমার, অস্বাভাবিক রক্তনালী যদি মৃগীর সমস্যার মূল কারণ হয় বা মস্তিষ্ক থেকে রক্তপাত হয় তবে চিকিৎসক সার্জারির পরামর্শ দেন।আক্রান্ত স্থানের সমস্যাটি শল্যচিকিৎসার মাধ্যমে সারিয়ে তোলা হয়। (10)
  • অনেক ক্ষেত্রে, ভ্যাগাস নার্ভ স্টিমুলেটর ব্যবহার করে ভ্যাগাস নার্ভ স্টিমুলেশন করা হয়। ভ্যাগাল নার্ভ স্টিমুলেটর মস্তিষ্কে প্রয়োগ করা হয়। হৃৎপিণ্ডের পেস মেকারের অনুরূপ একটি কৃত্রিম ডিভাইস হল এই ভ্যাগাল নার্ভ স্টিমুলেটর, যা মৃগীরোগের আক্রমণগুলি নিয়ন্ত্রণ করে।
  • এছাড়াও, আগেই বলা হয়েছে কয়েকটি প্রাকৃতিক উপায়ও রয়েছে যা খিঁচুনির পুনরাবৃত্তি নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে। একই সময়ে, মৃগীরোগের চিকিৎসার জন্য বিশেষত বাচ্চাদের ক্ষেত্রে কেটোজেনিক ডায়েট (বেশী ফ্যাট ও প্রোটিনযুক্ত এবং কম শর্করাযুক্ত খাদ্য) গ্রহণের পরামর্শ দেওয়া হয়।

চলুন এবার জেনে নেওয়া যাক, কোন কোন খাদ্যাভ্যাস মৃগী রোগ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। মৃগী থাকলে কোন কোন খাবার খাওয়া উচিৎ আর কোন কোন খাবার খাওয়া ক্ষতিকারক হতে পারে।

মৃগী রোগের জন্য ডায়েট

ডায়েটিশিয়ানরা খিঁচুনি নিয়ন্ত্রণ করতে এবং মৃগী রোগের অন্যান্য উপসর্গগুলি কমাতে প্রায়শই কম-কার্বোহাইড্রেট এবং উচ্চ ফ্যাটযুক্ত ডায়েটের পরামর্শ দেন। একটি গবেষণা অনুসারে, অ্যাটকিনস এবং কেটোজেনিক ডায়েট মৃগী সমস্যাটি অনেকাংশে উপশম করতে পারে বলে বিবেচিত হয়েছে। (11)

কী কী খাবেন

  • কম কার্বোহাইড্রেট এবং বেশি ফ্যাট এবং প্রোটিনযুক্ত কিছু খাবার
  • দুধ
  • পনির ও কিছু দুগ্ধজাত পণ্য
  • ডিম
  • মাছ
  • গরুর মাংস
  • কিছু ফলমূল ও শাকসবজি বিশেষত ব্রোকলি
  • বাদাম
  • জলপাই তেল
  • তিল তেল
  • মেয়োনিজ
  • মাখন
  • ফুল ফ্যাট ক্রিম

কী কী খাবেন না

  • পিজ্জা, সাদা ভাত / পাস্তা, কেক, সফট ড্রিঙ্কস বা কোল্ড ড্রিঙ্কস এবং চিপস এর মতো কিছু খাবার যাতে বেশী পরিমানে কার্বোহাইড্রেট আছে।
  • আম, কিসমিস, কলা, কাঁচা আলু এবং খেজুরের মতো উচ্চ গ্লাইসেমিক সূচকযুক্ত কয়েকটি ফল এবং শাকসবজি । (12)
  • যদিও মৃগী রোগের আয়ুর্বেদিক চিকিৎসায় জিঙ্কগো বিলোবা ভেষজ ওষুধ হিসাবে ব্যবহৃত হয়, তবে কিছু ক্ষেত্রে এটি মৃগী রোগে আক্রান্ত হওয়ার কারণ হিসাবে প্রমাণিত হয়েছে। এই কারণে, মৃগী সমস্যাতে জিঙ্কগো বিলোবা (Gingko biloba) না নেওয়াই বাঞ্ছনীয়।
  • একই সময়ে, মৃগী সমস্যাতে অ্যালকোহল সেবন ক্ষতিকারক হিসাবে প্রমাণিত হতে পারে, তাই এটি মৃগী রোগীদের মদ্যপান না করার পরামর্শ দেওয়া হয় (13)।

মৃগী রোগ রোগীদেরকে তাদের সাধারণভাবে জীবনযাপন করা থেকে বিরত করতে পারে সাময়িকভাবে। তবে, এতে ভয় পাবার কিছু নেই। যথাযথ যত্নের পাশাপাশি খাদ্যাভ্যাসের কিছু বদলের মাধ্যমে রোগীরা তাদের এই অবস্থার সাথে সহজেই লড়াই করতে পারেন। প্রয়োজনীয় পুষ্টি সমৃদ্ধ খাবার খেলে এবং খাদ্যাভ্যাসের মাধ্যমে অত্যাবশ্যকীয় সব ভিটামিনের ঘাটতি পূরণ করে ফেলতে পারলে এই রোগের প্রকোপ অনেক কমে যায়। রোগী তুলনামূলকভাবে অনেক কমবার খিঁচুনি বা অন্যান্য আনুষঙ্গিক উপসর্গ অনুভব করেন। আর প্রয়োজনে উপযুক্ত চিকিৎসা তো চলবেই সঠিক খাদ্যাভ্যাসের পাশাপাশি।

নিবন্ধের পরবর্তী অংশে, মৃগী প্রতিরোধের জন্য কিছু ব্যবস্থার ব্যপারে আলোচনা করা হল।

মৃগী প্রতিরোধ করার উপায়

মৃগী রোগটিকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় এবং প্রতিরোধ করা গেলে তো খুবই ভাল হয়।আগেই বলেছি রোগটি জিনগত তাই যাদের পরিবারের কারোর মৃগী আছে, তাদের কাছে প্রতিরোধ করার সব উপায়গুলি মেনে চলা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।নিম্নলিখিত সামান্য কয়েকটি বিষয় মাথায় রেখে আপনি অবশ্যই এই রোগের ঝুঁকি হ্রাস করতে পারবেন।

  • সবসময় লো-কার্বযুক্ত এবং উচ্চ প্রোটিন ও ফ্যাট সমৃদ্ধ সুষম খাদ্য খাওয়া।
  • যথেষ্ট পরিমাণে ঘুমানো।
  • যথেচ্ছ মদ্যপান করবেন না।কোনো রকমের মাদকদ্রব্যই সেবন করবেন না।
  • মৃগী রোগীরা নিয়মিত শরীচর্চা করলে, বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ মতোন শারীরিক অনুশীলন অভ্যাস করলে তাদের খিঁচুনি ও রোগ সম্পর্কিত অন্যান্য উপসর্গগুলি নিয়ন্ত্রন হতে পারে।
  • যেহেতু মাথার আঘাত থেকেই মৃগী রোগ বেশী হয় তাই গাড়ি চালানোর সময় হেলমেট ব্যবহার করুন যাতে কোনও দুর্ঘটনা ঘটে তখন মস্তিষ্কের আঘাতের ঝুঁকি কম থাকে। এছাড়াও, সবসময় সতর্ক থাকুন যাতে মাথায় আঘাত না লাগে।

মৃগী রোগের ক্ষেত্রে, বেশীরভাগ রোগীর মৃগী রোগে আক্রান্ত হবার কোন কারণ নির্ধারণ করা যায় না। মৃগীর সমস্যা এত জটিল যে এটিকে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা সহজ নয়। তার সত্ত্বেও, নিবন্ধে আমরা ভালভাবে বর্ণনা করার চেষ্টা করেছি। নিবন্ধে, আমরা কী কী কারনে মৃগী হতে পারে, কাদের মৃগী রোগে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা বেশী, আক্রান্ত হলে কিরকম লক্ষণ প্রকাশ পাবে এবং কী কী ঘরোয়া প্রতিকারের মাধ্যমে রোগকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, সর্বোপরি যাদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশী তারা কীভাবে রোগটিকে প্রতিরোধ করবেন সেই ব্যপারে আলোচনা করেছি। অনেকসময় প্রাকৃতিক উপাদানগুলির কোনো এক বৈশিষ্ট্য চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধের কার্যকারীতা কমিয়ে দিতে পারে। তাই, ইতিমধ্যে কোনো মৃগী রোগীর যদি চিকিৎসা চলে, তাদের ক্ষেত্রে খিঁচুনি ও আনুষঙ্গিক উপসর্গগুলি নিয়ন্ত্রনের জন্য ঘরোয়া প্রতিকারগুলি প্রয়োগ করার আগে একবার চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করে নেবেন।

নিবন্ধে উল্লিখিত মৃগী প্রতিরোধ করার টিপস এবং ঘরোয়া প্রতিকারগুলিকে অনুসরণ করে রোগটির উপসর্গগুলিকে কেবল সাময়িক নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন আপনি। মনে রাখবেন, মৃগী থেকে সম্পূর্ণ মুক্তি পেতে গেলে রোগটির যথাযোগ্য চিকিৎসা অবশ্যই করাতে হবে এবং চিকিৎসকের সব পরামর্শ মেনে চলতে হবে।তাই কখন আপনাকে ডাক্তার দেখাতে হবে, এবং মৃগী রোগের চিকিৎসা পদ্ধতিই বা কিরকম হয় সেই বিষয়ে কিছু ধারণা দেবারও চেষ্টা করা হয়েছে এই নিবন্ধে।

আমরা আশা করি যে এই নিবন্ধটি মৃগী রোগের নিরাময়ের সন্ধানে অনেক রোগীর পক্ষে সহায়ক হবে। এ বিষয়ে আপনার কাছে যদি অন্য কোনও পরামর্শ বা প্রশ্ন থাকে তবে নীচে দেওয়া কমেন্ট বক্সের মাধ্যমে আমাদের জানাতে পারেন।

সম্ভাব্য জিজ্ঞাস্য প্রশ্নাবলী

বয়সের সাথে সাথে মৃগী রোগের প্রকোপ কী আরোও বাড়ে?

মৃগী যে কোন বয়সে মানুষকে প্রভাবিত করতে পারে তবে বয়স্ক ব্যক্তিদের মধ্যে এটির বিকাশের সম্ভাবনা বেশি হয়। সাধারণত, খিঁচুনি যা কৈশোরকালে এবং যৌবনকালেও অব্যাহত থাকে, তা বয়সের সাথে আরও বাড়ে এবং চিকিৎসাকের পরামর্শ মেনে না চললে অবস্থা আরোও খারাপ হতে পারে।
তবে, ওষুধ খেতে ভুলে গেলে, স্ট্রেস, উদ্বেগ বা উত্তেজনা হলে, হরমোন পরিবর্তন, বেশী পরিমাণে কার্বহাইড্রেট আছে এমন কিছু খাবার খেলে, মাত্রারিক্ত মদ্যপান করলে মৃগী রোগের প্রকোপ বাড়তে পারে।

খিঁচুনি কি বেদনাদায়ক?

জেগে থাকা অবস্থায় এমনকী ঘুমিয়ে গেলেও হঠাৎ হঠাৎ খিঁচুনি দেখা দিতে পারে মৃগী রোগীদের। কিছু খিঁচুনি শরীরকে ঝাঁকুনি দেয় এবং রোগীরা কাঁপুনি অনুভব করেন কয়েক সেকেন্ডের জন্য। কিছু রোগীর ক্ষেত্রে এই খিঁচুনি কয়েক মিনিট স্থায়ী হতে পারে। খিঁচুনির সাথে রোগির সচেতনতা হ্রাস পেতে পারে বা তারা অস্বাভাবিক আচড়ন বা মুখ বিকৃতি করতে পারেন। কারোর কারোর স্বাদ গন্ধ বোঝার ক্ষমতা, চিন্তাভাবনা করার ক্ষমতা, পারিপার্শ্বিক পরিবেশ অনুসারে প্রতিক্রিয়া দেবার ক্ষমতাও হারাতে পারে সামান্য কিছু সময়ের জন্য।খিঁচুনি বন্ধ হবার পরে, রোগী মাথা ব্যথা, মাংসপেশীতে ব্যথা বা শক্তভাব অনুভব করেন, এবং গভীর ক্লান্তি অনুভব করতে পারেন।
আবার টোনিক-ক্লোনিক সিজারস থাকলে অনেক রোগী বিশেষত বাচ্চারা কান্নাকাটি করে, মাটিতে পড়ে গিয়ে আঘাত পায়, এমনকী খিঁচুনি শেষ হবার পরে তারা মাথায়, পেটে এবং মাংস্পেশীতে ব্যথা অনুভব করেন।

মৃগী রোগ কী সম্পূর্ণ নিরাময় হতে পারে?

মৃগীরোগের কোনও নিরাময় নেই, তবে প্রাথমিক অবস্থা থেকে চিকিৎসা করালে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। কিছু মৃগীরোগে আক্রান্তদের খিঁচুনি নিয়ন্ত্রণের জন্য আজীবন চিকিত্সার প্রয়োজন হয়, কিছু লোকের আবার সামান্য চিকিৎসার পরেই ধীরে ধীরে খিঁচুনি চলে যায়।

মৃগী রোগের সতর্ক হয়ে যাবার মত লক্ষণগুলি কী কী?

মৃগী রোগের প্রধান লক্ষণ হল খিঁচুনি। এর সাথে মৃগীর প্রকারভেদে রোগীবিশেষে বিভিন্ন রকমের উপসর্গ দেখা যায়। তবে, নিম্নলিখিত এই লক্ষণগুলি অনুভব করলে অবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিৎ।
অদ্ভুত অনুভূতি হওয়া বা রোগী খিঁচুনির সাথে অস্বাভাবিক আচড়ন করলে।
স্বাদ, গন্ধ পরিবর্তনের অনুভূতি হারালে।
সময়কাল ভুলে যাওয়া বা সাময়িক স্মৃতি হারিয়ে গেলে।
রোগীর মধ্যে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হলে।
হাত পা নড়াচড়া করতে না পারা
শরীরের কোনো অংশে অসাড়তা অনুভব করলে
মাথাব্যথা
অতিরিক্ত ক্লান্তিভাব বা দুর্বলতা
অপ্রত্যাশিতভাবে প্রস্রাব করে ফেললে বা মলত্যাগ করে ফেললে।
মৃগীর উপসর্গগুলি যদি গুরুতর হয় এবং খিঁচুনি ঘন ঘন হয় এবং রোগের উপসর্গগুলি রোগীর প্রতিদিনের ক্রিয়াকলাপে হস্তক্ষেপ করে তাও সঠিক চিকিৎসা না করা হলে রোগী প্রতিবন্ধী পর্যন্ত হয়ে যেতে পারেন।

মৃগী কি কোনও রোগ?

স্নায়ুতন্ত্রের একটি জটিলতাজনিত রোগ হল এই মৃগী। এই রোগে ব্রেন বা মস্তিষ্কের কার্যকারীতা সাময়িকভাবে বাধাপ্রাপ্ত হয়। বিশ্বব্যাপী প্রায় ৫ কোটি লোক এই মৃগী রোগে আক্রান্ত।

Sources

Articles on StyleCraze are backed by verified information from peer-reviewed and academic research papers, reputed organizations, research institutions, and medical associations to ensure accuracy and relevance. Read our editorial policy to learn more.

  1. Epilepsy
    https://www.who.int/news-room/fact-sheets/detail/epilepsy
  2. Epilepsy Across the Spectrum: Promoting Health and Understanding (part 1) –
    https://www.ncbi.nlm.nih.gov/books/NBK100605/
  3. Simple Partial Seizure
    https://www.ncbi.nlm.nih.gov/books/NBK500005/
  4. Epilepsy
    https://medlineplus.gov/ency/article/000694.htm
  5. Epilepsy Across the Spectrum: Promoting Health and Understanding (part-3) –
    https://www.ncbi.nlm.nih.gov/books/NBK100596/
  6. Ketogenic Diet Based on Extra Virgin Coconut Oil Has No Effects in Young Wistar Rats With Pilocarpine-Induced Epilepsy
    https://pubmed.ncbi.nlm.nih.gov/29570799/
  7. Efficacy and Safety of Cannabidiol in Epilepsy: A Systematic Review and Meta-Analysis
    https://pubmed.ncbi.nlm.nih.gov/30390221/
  8. Natural approaches to epilepsy
    https://pubmed.ncbi.nlm.nih.gov/17397265/
  9. Seizures and Epilepsy: An Overview for Neuroscientists
    https://www.ncbi.nlm.nih.gov/pmc/articles/PMC4448698/
  10. Current treatments of epilepsy
    https://pubmed.ncbi.nlm.nih.gov/15994220/
  11. The Ketogenic and Atkins Diets Effect on Intractable Epilepsy: A Comparison – https://www.ncbi.nlm.nih.gov/pmc/articles/PMC4135275/
  12. Efficacy of low glycemic index treatment in epileptic patients: a systematic review
    https://pubmed.ncbi.nlm.nih.gov/29368115/
  13. Fatal seizures due to potential herb-drug interactions with Ginkgo biloba –
    https://pubmed.ncbi.nlm.nih.gov/16419414/
Was this article helpful?
The following two tabs change content below.