ওজন কমানোর জন্য গরম জলের উপকারীতা | Benefits of Hot Water for Weight Loss

by

বর্তমান সময়ের একটা অতি পরিচিত শারীরিক সমস্যা গুলির মধ্যে একটি হলো মেদ বৃদ্ধি। বয়স, লিঙ্গ নির্বিশেষে কম বেশি প্রায় প্রত্যেকটা মানুষই এই সমস্যার সম্মুখীন আজ। কিন্তু অবহেলা করার মতন বিষয়ও নয় আদৌ নয়। খুব সহজেই এই সমস্যার হাত থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। নাহ তার জন্য যে জিমখানায় যেতেই হবে এমন নয়। কতকগুলি ঘরোয়া পদ্ধতি অনুসরণ করলে অল্প দিনের মধ্যেই কিছুটা হলেও মেদ ঝরে যায় যার ফলে ওজন কমতে শুরু করে। এই নিবন্ধে আমরা দেখবো গরম জল পান করার ফলে কীভাবে আমাদের দ্রুত মেদ হ্রাস পাবে আর আমরা মেদবিহীন সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হয়ে উঠবো।

গরম জল পান করলে আদৌ কী ওজন কমে যায় ?

গরম জল পান করলে আদৌ ওজন কমে কী! সকলের মনেই এটা নিয়ে সন্দেহ জাগতে পারে। তবে অনেক গবেষণাত দেখা গেছে যে অতিরিক্ত জল পান করলে ওজন হ্রাস পায়। শুধু তাই নয় এটা আমাদের স্বাস্থ্যের জন্যও উপকারী। যদি আমরা গরম জলের বিষয়ে কথা বলি, তাহলে এনসিবিআই (ন্যাশানাল সেন্টার ফর বায়োটেকনোলজি ইনফরমেশান) এর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত একটি গবেষণা মূলক প্রবন্ধ থেকে জানতে পারা যায় যে নিয়মিত গরম জল পানের ফলের সত্যিই আমাদের ওজন হ্রাস পায়। উক্ত গবেষণা অনুসারে গরম জল পান করলে এর থার্মোজেনিক প্রভাবের দরুণ বিপাকীয় হার বৃদ্ধি পায়, যার ফলে ক্যালোরি কমে যায়। গরম জলের ফলে সৃষ্ট থার্মোজেনিক প্রভাব ওজন হ্রাস করতে এবং নিয়ন্ত্রন দুই ক্ষেত্রেই অভাবনীয় কাজ করে (1) ।

ওজন কমানোর জন্য গরম জলের উপকারীতা

অনেক সময় মানুষ ওজন কমাতে চায় বটে কিন্তু তার জন্য কোনো পরিশ্রম করতে চায়না। এই ধরণের মানুষদের জন্য গরম জল পান খুবই উপযোগী হতে পারে। এবার দেখে নেওয়া যাক ওজন কমানোর ক্ষেত্রে গরম জলের উপকারীতাগুলি।

১. শরীরকে আর্দ্র বা হাইড্রেটেড রাখে

আমাদের শরীরকে আর্দ্র রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এবং সেটা রাখার জন্য যথেষ্ট পরিমাণে জল, তা সে ঠাণ্ডা বা গরম যাই হোক না কেনো, পান করা জরুরী। জল প্রাণীর দেহে পুষ্টি, শোষণ, এবং শরীরের প্রতিটি কোষের বিষাক্ত পদার্থ অপসারণ ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শরীর যদি আর্দ্র না থাকে তাহলে হার্ট, কিডনি, এবং পেটের অসুখ ইত্যাদি, এমনকি ডিহাইড্রেশানের মতন শারীরিক সমস্যারও সৃষ্টি হতে পারে (2)। এটাও জেনে রাখা দরকার যে শরীর আর্দ্র রাখলেও অনেক সময় ওজন কমে যায়(3)। শরীর আর্দ্র রাখার জন্য প্রতিদিন অন্তত ৮ গ্লাস জল পান করা দরকার (4)।

২. প্রাকৃতিক ক্লিনজার (শুদ্ধিকারক) এবং পিউরিফায়ার (বিশোধক)

গরম জলকে পেটের জন্য প্রাকৃতিক শুদ্ধিকারক এবং বিশোধক হিসেবে মনে করা হয়। এই তথ্যের ওপর গবেষণা করে দেখা গিয়েছে গরম জল পেট পরিষ্কার করতে সহায়তা করে। সকালবেলা ঘুম থেকে ওঠার পর এক গ্লাস গরম জল পাণ করলে শরীর থেকে বিষাক্ত পদার্থ নিষ্কাশিত হয়ে যায় এবং শরীর বিষ মুক্ত হয়। শুধু তাই নয় গরম জল খাদ্য দ্রব্য সম্পূর্ণ রূপে হজমেও সহযোগীতা করে (5)। একটি গবেষণা থেকে আরোও জানা যাচ্ছে যে শরীর থেকে বিষ নিষ্কাশন প্রক্রিয়া ওজন নিয়ন্ত্রনের ক্ষেত্রেও সহায়ক ভূমিকা পালন করে (6)। এই তথ্যের ওপর ভিত্তি করে একথা বলা যায় যে গরম জল পান করলে শরীর ডিটক্স হয় এবং যার ফলে ওজন নিয়ন্ত্রিত হওয়ার একটা সম্ভবনা দেখা যায়। যদিও এই এখনও অনেক গবেষণা হওয়া দরকার।

৩. শরীরের চর্বি হ্রাস করে

অতিরিক্ত মেদ বৃদ্ধি অনেকসময়ই হৃদরোগ, টাইপ ২ ডায়াবেটিস, অস্টিওআর্থ্রাইটিস, এবং ক্যান্সার ইত্যাদির কারণ হতে পারে। এই সব রোগের প্রকোপ থেকে শরীরকে নিরাপদে রাখতে হলে অতিরিক্ত মেদ হ্রাস করা খুবই জরুরী। এনসিবিআই ওয়েবসাইটে প্রকাশিত একটি গবেষণার রিপোর্ট থেকে জানতে পারা যায় যে গরম জল শরীরের মেদ বা চর্বি কম করতে সহায়তা করে। উক্ত গবেষণা সূত্রে আরো জানা গিয়েছে যে গরম জল পান শরীরে থার্মোজেনেসিস প্রভাব সৃষ্টি করে যা বিপাকীয় হার বাড়িয়ে দেয়। এই প্রক্রিয়ায় দৈনিক ক্যালোরি ক্ষয় বৃদ্ধি করে, যার ফলে শরীরে জমা চর্বি অনায়াসেই গলে যায় (7)।

৪. জলে রয়েছে ০% ক্যালোরি

মেদ কমানোর কথা ভাবলেই প্রথমেই যেটা মাথায় আসবে সেটা হলো ক্যালোরি। জল হলো এমন একটি অতি প্রয়োজনীয় পানীয় যা একেবারে ক্যালোরিবিহীন (8)। পর্যাপ্ত পরিমাণে জল পান করলে ক্যালোরি গ্রহণ কম হয় এবং ওজন নিয়ন্ত্রনে থাকে।

৫. জল খিদে কমায়

কখনও কখনও প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাওয়ার ফলে এবং অস্বাস্থ্যকর খাদ্য গ্রহণ করলে শরীরে মেদ জমতে দেখা যায়। ফলস্বরূপ ওজন বাড়ে। জল পানের মাধ্যমে এই সমস্যা থেকে সহজে অব্যাহতি পাওয়া যায়। বেশি জল পান করার জন্য বেশিরভাগ সময়ই খিদে মরে যায়। এছাড়া বেশি জল পান করলেও শরীরে কোনো ক্যালোরি বৃদ্ধি পায়না (9)। তাই বেশি জল পান করলে ওজন নিয়ন্ত্রনে থাকে বলে মনে করা হয়। অবশ্য এই বিষয়ে আরো গবেষণার দরকার আছে।

৬. জল পান ওজন হ্রাসের প্রাকৃতিক উপায়

আগেই বলা হয়েছে যে জলে কোনো ক্যালোরি থাকেনা। তাই নিশ্চিন্তে যত ইচ্ছে জল পান করতে পারেন। গরম জল পান করলে শরীরের চর্বি হ্রাস পায় এবং ওজন কমে। এছাড়াও গরম জল পান করার ফলে শরীরে মেটাবলিজম বা বিপাক বৃদ্ধি পায়, যা দ্রুত ক্যালোরি হ্রাসের ক্ষেত্রে সাহায্য করে। তাই খাদ্য তালিকা থেকে সোডাযুক্ত খাওয়ার অপসারণ না করে দুধ ছাড়া লিকার চা লেবু সহযোগে পান করা যেতে পারে। এখন কেউ যদি মনে করেন শরীর আর্দ্র রাখার জন্য সোডাযুক্ত খাদ্য , পাণীয় এবং চা কফি ইত্যাদি গ্রহণ করবেন, তাহলে তিনি ভুল কিছু ভাবছেন না তবে পূর্বোক্ত দ্রব্য গুলি পাণের ফলে খুবই দ্রুত হারে ওজন বাড়তে পারে। আর এটাও ঠিক যে কোনো পাণীয়ই জলের বিকল্প হতে পারেনা (10) (11)। অবশ্য গরম জল পান করে কতদিনের মধ্যে ওজন কম হবে সে বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।

মেদ হ্রাস করার জন্য গরম জল ব্যবহারের পদ্ধতি

ইতিমধ্যে আমরা জল এবং গরম জলের উপকারীতা সম্বদ্ধে একাধিক প্রয়োজনীয় তথ্য জেনে গিয়েছি। এরপরেও অনেকেরই মনে প্রশ্ন আসতে পারে যে গরম জল পান করলে ওজন হ্রাস পাবে তাতো বোঝা গেলো কিন্তু কি উপায়ে বা কেমন করে গরম জল ব্যবহার করলে দ্রুত আর সঠিক ফলাফল পাওয়া যাবে সেটাও জানা দরকার। তাহলে এবার জেনে নেওয়া যাক ওজন হ্রাস করার জন্য গরম জল ব্যবহারের উপায় গুলি কী কী।

  • আপনি যদি ব্যায়াম বা শরীরচর্চা করেন তাহলে সেটা করার আগে ১-২ গ্লাস ঈষদোষ্ণ জল পান করুন। শরীরচর্চা চলাকালীন সময়েও গলা ভেজানোর মতন অল্প জল পান করতে পারেন।
  • খিদে কমানোর জন্য প্রতিবার খাবার আগে গরম জল পান করুন।
  • শুধু খাবার আগে বলেই নয় খাদ্য গ্রহণের পরেও গরম জল পান করা যায়।
  • ওজন কমানোর জন্য রাতে ঘুমানোর কয়েক ঘন্টা আগে গরম জল পান করা যেতে পারে।
  • অবশ্য শুধু খাওয়ার আগে বা পরেই নয়, যখনই খিদে পাবে, প্রথমে শুধু জল বা গরম জল পান করুন যাতে কিছুটা হলেও খিদে কমে যায়।
  • কখনই একসাথে অনেকটা খাবার গ্রহণ করবেন না।

গরম জলের সাহায্যে ওজন কম করার আরোও কয়েকটি উপায়

অনেক মানুষ আছেন যারা জল পান করতে একদমই পছন্দ করেননা। গরম জল পান করে ওজন কমানো ভাবনা আদের চিন্তারও অতীত। তাই কিছু জিনিস যোগ করে গরম জলকে স্বাদিষ্ট করে তার গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধির বিষয়ে ভাবা হয়েছে। এবার সেইসব উপায় গুলি দেখে নেওয়া যাক –

  • গরম জলের সাথে লেবু এবং মধু মিশিয়ে পান করা যায়।
  • শুধুমাত্র পাতিলেবুর রস সহযোগে গরম জল পান করা যায়।
  • গ্রিন টি পান করা যায়।
  • জিরা চা পান করা যায়।
  • লেবু চা পান করা যেতে পারে।
  • জোয়ান দিয়ে তৈরী চা একটি উত্তম বিকল্প হতে পারে।
  • ফল এবং শাক সবজি সেদ্ধ জল ডিটক্সিক ড্রিঙ্ক হিসেবে খুবই কার্যকরী ভূমিকা পালন করে।
  • সব্জির রস এবং স্যুপ পান করা যেতে পারে।

গরম জল পান করার ফলে কী করে মেদ ঝরে উপরিক্তো নিবন্ধ থেকে সে সম্পর্কে সম্যক ধারণা পাওয়া গেছে বলে আশা করা যায়। গরম জল ওজন হ্রাসকারী বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন হওয়ার জন্য সহজেই ওজন হ্রাস করতে সহায়তা করে। একইসাথে গরম জল নিয়মিত পান করলে শুধু ওজন কমা বলেই নয় অন্যান্য অনেক শারীরিক সমস্যাও দূর করা সম্ভব হয়। মনে রাখা দরকার ওজন কমানোর জন্য শুধু গরম জল পানই নয় পাশাপাশি রোজকার খাদ্য, পানীয় ইত্যাদি বিষয়েও লক্ষ্য রাখা দরকার, কারণ অন্যান্য সবকিছু অপরিবর্তিত রেখে শুধু গরম জল পান করলেই ওজন কমে যাবে এমন নয়। আপনার রোজের দিনলিপিই একমাত্র আপনার ওজন হ্রাসের ক্ষেত্রে সাহায্য করতে পারে। গরম জল পান করে ওজন হ্রাস করার জন্য অবশ্যই জল পানের সময় গুলির দিকে নজর রাখা জরুরী। এই নিবদ্ধ পাঠককে সঠিক পরামর্শ দান করে সুস্বাস্থ্যের অধিকারী করতে পারবে বলে মনে করা হয়।

প্রায়শই জিজ্ঞাস্য প্রশ্নাবলী :

গরম জল পান করলে কতটা ওজন কমতে পারে?

উঃ – গরম জল পান করলে কিছুটা হলেও ক্যালোরি খরচ হয়ে যায়। যাতে ওজন কমে। তবে গরম জল পান করলে ঠিক কত দিনে ওজন কম হবে সেই ব্যাপারে কোনো সুনির্দিষ্ট গবেষণা লদ্ধ তথ্য পাওয়া যায়নি।

গরম জল পান করলে কী শরীরের ক্যালোরি বার্ণ হয়?

উঃ – গরম জল পান করলে শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়। যা বিপাকীয় হার বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। এবং এরফলে ক্যালোরি বার্ণ হয়।

দৈনিক কতটা পরিমান গরম জল পান করা যেতে পারে?

উঃ – দৈনিক অন্তত ২ লিটার গরম জল পান করা যেতে পারে। তবে এই ব্যাপারে বিস্তারিত জানার জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করা উচিৎ।

গরম জল পান করলে আদৌ কী পেটের চর্বি কমে যায়?

উঃ – ওপরের নিবন্ধে আমরা দেখেছি যে গরম জলের থার্মোজেনিক প্রভাব রয়েছে, যা শরীরের চর্বি কমাতে সাহায্য করে বলে মনে করা হয়। গরম জলের থার্মোজেনিক প্রভাবের ওপর ভিত্তি করেই বলা যেতে পারে যে গরম জল পান করলে পেটের চর্বি কমে যেতে পারে।

11 sources

Stylecraze has strict sourcing guidelines and relies on peer-reviewed studies, academic research institutions, and medical associations. We avoid using tertiary references. You can learn more about how we ensure our content is accurate and current by reading our editorial policy.
Was this article helpful?
scorecardresearch