ওজন হ্রাস করার ক্ষেত্রে মধুর ব্যবহার | Honey for Weight Loss

Written by

ওজন কমানোর জন্য বেশিরভাগ মানুষ যেটা প্রথমে করে থাকে সেটা হলো ডায়টিং বা পরিমিত পরিমাণে আহার গ্রহণ। রোগা হওয়ার জন্য ডায়টিং করা দরকার ঠিকই কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ ব্যক্তির উপযুক্ত পরামর্শ গ্রহণ না করার ফলে ডায়টিং ঠিকমতন হয়না। ফলস্বরূপ প্রয়োজনীয় খাদ্য এবং পর্যাপ্ত শক্তির অভাবে শরীর দূর্বল হয়ে পরে। এইসব ক্ষেত্রে মধু খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এখন আপনার মনে হতেই পারে যে মধু কীভাবে আপনার ওজন হ্রাস করবে অথবা কিভাবেই বা মধু শরীরে প্রয়োজনীয় শক্তির যোগান দেবে তাহলে আপনার জেনে রাখা দরকার যে মধু এই দুই ক্ষেত্রে ভীষণ কার্যকরী। আলোচ্য প্রবন্ধে আমরা বলবো যে মধু কী করে ওজন কমানোর ক্ষেত্রে সহায়তা করে।

কিভাবে মধু ওজন হ্রাস করে?

মধু একাধিকভাবে আমাদের শরীরে জন্য উপকারী বলে মনে করা হয়। তবে এখন আমরা ওজন কমানোর ক্ষেত্রে মধুর ভূমিকা নিয়েই মূলত আলোচনা করবো। বিভিন্ন বৈজ্ঞাণিক গবেষণার ওপর ভিত্তি করে ওজন হ্রাসের ক্ষেত্রে মধুর ভূমিকা বিষয়ে নিম্নে আলোচনা করা হচ্ছে।

১। ক্যালোরি হ্রাস করেএনসিবিআই (ন্যাশনাল সেন্টার ফর বায়োটেকনোলজি ইনফরমেশন) ওয়েবসাইটে প্রকাশিত একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণা থেকে জানা যায় যে শরীরে পর্যাপ্ত শক্তির যোগান দিতে মধু গ্রহণ করা হয়। একইসাথে মধু গ্রহণ করলে শরীরে দ্রুত ক্যালোরি ক্ষয় হয়। ফলতই মধু গ্রহণের ফলে শরীরে মেদ জমার প্রবণতা হ্রাস পায়। বলা হয় যে কেউ যদি দ্রুত ওজন কমাতে ইচ্ছুক হন তাহলে প্রতিদিন এক গ্লাস অল্প গরম জলের সাথে এক চামচ মধু মিশিয়ে ঐ তরল পান করলে অল্প দিনের মধ্যেই আশানুরূপ ফল পাওয়া যাবে। (1)

২। শক্তি বর্দ্ধক মধু শরীরে পর্যাপ্ত পরিমাণ শক্তির জোগান দেয়। একইসাথে মধু শরীরে শক্তি বৃদ্ধি করে এবং বজায় রাখতে সহায়তা করে। এরফলে মধু গ্রহণের ফলে শরীরে দুর্বলতা কমে যায়। এর একমাত্র কারণ হিসেবে মনে করা হয় যে মধুতে উপস্থিত ফ্রুক্টোজ (শর্করা)। অতএব বলা যেতেই পারে যে শরীরের প্রয়োজনীয় শক্তি বজায় রেখে মধু ওজন বৃদ্ধি প্রতিরোধ করতে পারে।(2)

৩। পরিপাকে সহায়ক মধু পরিপাক ক্রিয়াও উন্নত করে তোলে। এরফলে ওজন কমার প্রক্রিয়াও সহজ হয়ে যায়। এই সংক্রান্ত বিষয়ে প্রকাশিত একটি চিকিৎসা গবেষণাপত্র থেকে জানা যায় যে মধু অন্ত্রে প্রোবায়োটিক ব্যাক্টেরিয়া বৃদ্ধিতে সহায়তা করে যা খাদ্য হজম বা পরিপাকের ক্ষেত্রে সহায়তা করে। এরফলে সহজেই ওজন হ্রাস পায়। (3)

৪। শরীরে উপস্থিত বিষাক্ত পদার্থ অপসারক শরীরে উপস্থিত বিষাক্ত পদার্থ অপসারিত হলে সহজেই ওজন হ্রাস পায়। এই সংক্রান্ত বিষয়ে প্রকাশিত একটি বৈজ্ঞাণিক গবেষণা পত্র থেকে জানা যায় যে মধুতে উপস্থিত পি – কোমেরিক অ্যাসিড শরীর থেকে বিষাক্ত পদার্থ অপসারণ করতে সহায়তা করে। এই কারণেই মধু গ্রহণের ফলে অনায়াসেই শরীর থেকে বিষাক্ত পদার্থ অপসারিত হয়ে যায়। এনসিবিআই ওয়েবসাইট সূত্রে এই তথ্য জানতে পাওয়া যায়। (4)

৫। ওজন বৃদ্ধি হ্রাস করে মোটা হওয়ার সম্ভবনা কম করে – এনসিবিআই ওয়েবসাইটে প্রকাশিত একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে যে মধু ওজন বৃদ্ধির প্রবণতা কমিয়ে দেয়। এরফলে স্বভাবতই শরীরে মেদ জমার সম্ভবনা কমে যায়। এছাড়াও মধু একটি ওবেসিটি প্রতিরোধক উপাদান যা স্থূলতা বৃদ্ধি প্রতিরোধ করতে সক্ষম। এর ভিত্তিতেই বলা যায় যে মধু মেদ হ্রাসকারী বৈশিষ্ট্য যুক্ত হয়।

৬। ওজন হ্রাসক পৌষ্টিক উপাদান সমৃদ্ধ মধুতে এমন কিছু পৌষ্টিক উপাদানের উপস্থিতি দেখতে পাওয়া যায় যেগুলি ওজন কমাতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। মধুতে রয়েছে অর্গানিক অ্যাসিড, খনিজ উপাদান, ভিটামিন, এনজাইম প্রোটিন, ফেনোলিক অ্যাসিড এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এনজাইম। এই সব উপাদান গুলি ওজন বৃদ্ধি প্রতিরোধ করে। যদিও এইসব উপাদান গুলি কি উপায়ে ওজন হ্রাস করে সেই বিষয়ে এখনও অনেক গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। (5)

মেদ হ্রাস করতে মধুর ব্যবহার –

ওজন কমানোর জন্য একাধিক উপায়ে মধু ব্যবহার করা যায়। এরফলে মধুর স্বাদ পরিবর্তন তো হয়ই একইসাথে শরীরের ওজন হ্রাস পায়। এইরকমই কতকগুলি পদ্ধতির সম্পর্কে নিম্নে আলোচনা করা হলো –

১। ওজন হ্রাস করার জন্য মধু এবং পাতিলেবু

উপকরণ

  • ১ চামচ মধু
  • ১ চামচ পাতিলেবুর রস
  • ১ গ্লাস জল

ব্যবহার পদ্ধতি

  •  প্রথমে জল অল্প গরম করে নিতে হবে।
  • এরপর জলের সাথে মধু এবং পাতিলেবুর রস ভালো করে মিশিয়ে নিতে হবে।
  • এবার এই মিশ্রিত তরল পান করতে হবে।
  • অল্প গরম অবস্থাতেই এই তরল পান করতে হবে।
  • সকালে স্বাস্থ্যচর্চা বা ব্যায়মের পর এই তরল পান করা জরুরী।

২। ওজন হ্রাস করার জন্য মধু এবং দুধ

উপকরণ

  •  ১ চামচ মধু
  •  ১ গ্লাস দুধ

ব্যবহার পদ্ধতি

  • প্রথমে দুধ ফুটিয়ে বা জাল দিয়ে নিতে হবে।
  • তারপর দুধটা অল্প ঠাণ্ডা করে নিতে হবে যাতে দুধ অল্প গরমও থাকে।
  • এরপর ঐ অল্প গরম দুধে নির্দিষ্ট পরিমানে মধু মিশিয়ে নিতে হবে।
  • এবার ঐ মধু মিশ্রিত দুধ পান করতে হবে।
  • স্বাদ বৃদ্ধি করার জন্য দুধ জাল দেও্যার সময় তাতে এলাচ মিশিয়েও নেওয়া যেতে পারে।

৩। ওজন হ্রাস করার জন্য মধু এবং গরম জল

উপকরণ

  • ১ চামচ মধু
  • ১ গ্লাস জল

ব্যবহার পদ্ধতি

  •  প্রথমে জল অল্প গরম করে নিতে হবে।
  • তারপর ঐ জলে মধু মিশিয়ে ভালো করে গুলিয়ে নিতে হবে এবং তা পান করতে হবে।
  • সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর খালি পেটে এই পানীয় পান করা স্বাস্থ্যকর।

৪। মধু এবং গ্রীণ টি

উপকরণ

  •  ১ চামচ মধু
  • ১ কাপ গ্রীণ টি
  • ১ কাপ জল

ব্যবহার পদ্ধতি

  • প্রথমে জল গরম করে নিতে হবে।
  • তারপর ঐ জল কাপে নিয়ে তাতে টি ব্যাগ ডুবিয়ে ১-২ মিনিট রাখতে হবে।
  • চা একটু ঠাণ্ডা হয়ে গেলে তাতে মধু মিশিয়ে পান করতে হবে।
  • প্রতিদিন সকাল এবং সন্ধ্যেতে চা পানের সময় এই পাণীয় পান করা যেতে পারে।

৫। ওজন হ্রাস করার জন্য মধু এবং দারুচিনি

উপকরণ

  • ১ চামচ মধু
  • ১/২ চামচ দারচিনি গুঁড়ো
  • ১ কাপ জল

ব্যবহার পদ্ধতি

  • প্রথমে জল গরম করে নিতে হবে।
  • এরপর ঐ গরম জলে দারচিনি গুঁড়ো মিশিয়ে মিশ্রনটি অল্প সময় ফুটিয়ে নিতে হবে।
  • এবার ঐ দারচিনি মিশ্রিত জল ছেঁকে নিতে হবে।
  • সব শেষে ঐ মিশ্রণে মধু মিশিয়ে গরম অবস্থাতেই পান করতে হবে।

এবার জেনে নেওয়া যাক প্রতিদিন কতটা পরিমাণে মধু গ্রহণ স্বাস্থ্যের পক্ষে উপকারী হতে পারে।

ওজন হ্রাস করার জন্য প্রতিদিন কতটা পরিমাণে মধু গ্রহণ করা উচিৎ?

ওজন কমানোর জন্য একজন প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষ প্রতিদিন ৭০ – ৫ গ্রাম মধু গ্রহণ করতে পারেন। তবে ব্যক্তির বয়স, শারীরিক অবস্থা ইত্যাদির ওপর এই পরিমাণ পরিবর্তিত হতে পারে। পৃথক পৃথক শারীরিক অবস্থার ওপর ভিত্তি করে মধু গ্রহণের পরিমাণ ভিন্ন হয়ে থাকে। তবে ব্যক্তির মধু গ্রহণের পরিমাণ সম্পর্কে সঠিক ধারণা পেতে হলে একজন পুষ্টি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ গ্রহণ করা উচিৎ।

 যে বিষয় গুলি নজরে রাখতে হবে

মধু আমাদের স্বাস্থ্যের পক্ষে উপকারী ঠিকই কিন্তু কখনও কখনও এটা অনেকের ক্ষেত্রে অপকারীও হতে পারে। তাই মধু গ্রহণের পূর্বে আমাদের যে যে জিনিস গুলি নজরে রাখা দরকার সেগুলি হলো যথাক্রমে

  •  যদি কেউ ইতিমধ্যে মধুমেহ বা ডায়বেটিক রোগাক্রান্ত হয়ে থাকেন তাহলে তার অতিরিক্ত পরিমাণ মধু গ্রহণের প্রবণতা পরিত্যাগ করা দরকার। কারণ মধুতে ফ্রুক্টোজের মাত্রা অধিক পরিমাণে থাকে যা রক্তে শর্করার মাত্রা বৃদ্ধি করতে পারে।
  • কিছু মানুষের ক্ষেত্রে আবার মধু পেটে ব্যথার সৃষ্টি করে। কারণ মধুতে উপস্থিত ফ্রক্টোজ অন্ত্রের পুষ্টি শোষণ ক্ষমতাকে বাধা প্রদান করে। যার ফলে পেটে ব্যাথা হতে পারে।
  • মধু ব্যবহারের ফলে আবার কিছু মানুষের অ্যানাফিলাক্সিস এর সমস্যাও দেখা যায়। এটি এক ধরণের অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া। যদিও এই ধরণের অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া মধু সেবনের ক্ষেত্রে খুবই কম দেখতে পাওয়া যায়।

ওজন কমানোর জন্য মধুর ব্যবহার সত্যিই সহায়ক হতে পারে। এটি ওজন কমানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে সহজ উপায় হিসেবেও বিবেচনা করা হয়। তবে তার জন্য কতকগুলি নিয়ম অনুসরণ করার দরকার।  মধু সেবনের জন্য একটি নির্দিষ্ট রুটিং অনুসরণ করারও প্রয়োজন রয়েছে। তবে শুধু মধু গ্রহণই নয় এরসাথে  একটা নির্দিষ্ট সময় ধরে স্বাস্থ্যচর্চা করলে অধিক কার্যকরী ফল পাওয়া যায়। একইসাথে আমাদের দৈনিক সুষম আহার গ্রহণ করারও দরকার রয়েছে। আশা করি এই প্রবন্ধ আপনাদের প্রয়োজনীয় তথ্য প্রদানে সহায়তা করবে।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী

মধু সেবনে কী ওজন বৃদ্ধি পায়?

নাহ, একদ্মই সেইরকম কিছু হয়না। হ্যাঁ তবে রোগা মানুষদের ওজন সঠিক করার ক্ষেত্রে সহায়তা করে। অবশ্য এই বিষয়ে এখনও অনেক গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।

ওজন কমানোর জন্য কোন ধরণের মধু উপযোগী?

ওজন হ্রাস করার জন্য প্রাকৃতিক বা অশুদ্ধ মধু উপকারী বলে মনে করা হয়।

মধু সেবনের ফলে কতটা ওজন হ্রাস পায়?

শুধু মধু সেবনই নয়, ওজন হ্রাসের মাত্রা নির্ভর করে ব্যক্তির শারীরিক সক্ষমতা, খাদ্য গ্রহণের পরিমাণ, স্বাস্থ্যচর্চা ইত্যাদি একাধিক জিনিসের ওপর।

প্রাকৃতিক মধু কী বেশি গাঢ় হয়?

হ্যাঁ, তা হয়।

একদিনে কতটা পরিমানে মধু গ্রহণ করা যেতে পারে?

ওপরের প্রবন্ধে এই বিষয়ে বিশদে আলোচনা করা হয়েছে।

5 Sources

Articles on StyleCraze are backed by verified information from peer-reviewed and academic research papers, reputed organizations, research institutions, and medical associations to ensure accuracy and relevance. Check out our editorial policy for further details.

  1. Four-Week Consumption of Malaysian Honey Reduces Excess Weight Gain and Improves Obesity-Related Parameters in High Fat Diet Induced Obese Rats
    https://www.ncbi.nlm.nih.gov/pmc/articles/PMC5299215/
  2. Nutraceutical values of natural honey and its contribution to human health and wealth
    https://www.ncbi.nlm.nih.gov/pmc/articles/PMC3583289/
  3. Effect of dietary honey on intestinal microflora and toxicity of mycotoxins in mice
    https://www.ncbi.nlm.nih.gov/pmc/articles/PMC1431562/#__sec29title
  4. Honey constituents up-regulate detoxification and immunity genes in the western honey bee Apis mellifera
    https://pubmed.ncbi.nlm.nih.gov/23630255/
  5. A Review on the Protective Effects of Honey against Metabolic Syndrome
    https://www.ncbi.nlm.nih.gov/pmc/articles/PMC6115915/
Was this article helpful?
The following two tabs change content below.
scorecardresearch