অনিয়মিত মাসিক বা পিরিয়ডের কারণ, চিকিৎসা ও প্রতিকার – Irregular Periods Remedies in Bengali

Written by

আজকাল অনেক মহিলারই অনিয়মিত মাসিক বা পিরিয়ডের সম্মুখীন হয়, কিন্তু এটি ঠিক কেন হয় বা কি এর চিকিৎসা বা প্রতিকার কি তার সম্পর্কে সঠিক ধারণা অনেকেরই নেই। তাই আমাদের এই প্রতিবেদনে অনিয়মিত মাসিকের সমস্যা কিভাবে কাটিয়ে উঠবেন এবং এর সম্ভাব্য কারণ সম্পর্কে আপনাদের জানাবো।

মাসিক চক্র ২৫ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে হয়ে থাকে (1) । যদি আপনার মাসিক চক্র ২১ দিনের কম ও ৩৫ দিনের বেশি ব্যবধানে সম্পন্ন হচ্ছে, তাহলে এটিকে অনিয়মিত পিরিয়ড বলা হয়ে থাকে।

অনিয়মিত মাসিকের কারণগুলি কি কি ?

  • ওষুধের প্রভাবেগর্ভনিরোধক পিল বেশি সংখ্যায় খেলে অনেক সময় অনিয়মিত পিরিয়ডের সমস্যা হতে পারে (2)
  • পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রোমশরীরে হরমোনের পরিমাণের পরিবর্তন হলে ওভারি বা জরায়ুতে সিস্ট তৈরী হয়।  তার ফলে ওভুলেশনের সমস্যা দেখা দেয় এবং মাসিক অনিয়মিত হয়ে যায় (3)
  • থাইরয়েড গ্রন্থির সমস্যা থাকলে – থাইরয়েড হরমোনের তারতম্য হলে অনিয়মিত পিরিয়ডের সমস্যা হতে শুরু করে (4) ও কোনো পরিশ্রম না করেও আপনি ক্লান্ত ভাব অনুভব করতে পারেন।
  • টেনশনের কারণেচাপা মানসিক উদ্বেগ বা অতিরিক্ত টেনশন করলে অনিয়মিত পিরিয়ডের সমস্যা দেখা দিতে পারে (5)
  • পরিশ্রম বেশি করলে বেশি পরিমাণে ক্যালোরি ঝরে গেলে শরীর থেকে সঠিক মাত্রায় এনার্জি তৈরী হয় না, ফলে হরমোনও ঠিক পরিমাণে তৈরী হতে পারে না। তাই মাসিক অনিয়মিত হতে শুরু করে (1)
  • মেনোপজের জন্য মেনোপজের সময় কাছে এলে শরীরে ইস্ট্রোজেন হরমোন তৈরী হওয়া কমে যায়, অনিয়িমিত মাসিকের সম্ভাবনা দেখা দেয় (6)

অনিয়মিত মাসিকের লক্ষণ কি কি (1) ?

  • কোনো মাসে দুদিন আবার কোনো মাসে সাতদিন বা কোনো মাসে পিরিয়ড হলোই না বা কোনো সময় এক মাসের বেশি সময় ধরে চলতে থাকে।
  • মাসে একবারের বেশি ঋতুস্রাব হওয়া।
  • শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে।
  • খাবারের প্রতি অনিচ্ছা তৈরী হয়।
  • রক্তাল্পতা দেখা দেয়।

ঘরোয়া উপায়ে অনিয়মিত মাসিকের প্রতিকার

অনিয়মিত মাসিকের থেকে মুক্তি পেতে নিচে উল্লেখিত উপায়গুলি মেনে চলার চেষ্টা করুন।

১. মৌরি

কিভাবে ব্যবহার করবেন ?

জলের মধ্যে মৌরি দিয়ে ফুটিয়ে সেটি পান করতে পারেন। সবচেয়ে ভালো হয় যদি আপনি সারারাত মৌরি জলে ভিজিয়ে রেখে তারপর সকালে সেটি ছেঁকে নিয়ে ওই জলটি পান করেন ।

কিভাবে সাহায্য করে ?

মৌরি ভেজানো জল নিয়মিত খেলে পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রোম ধীরে ধীরে কমে বলে জানা গেছে (7) , ফলে অনিয়মিত পিরিয়ডের সম্ভাবনাও কমে।

২. পেঁপে

কিভাবে ব্যবহার করবেন ?

পাকা পেঁপে সপ্তাহে প্রত্যেকদিন বা ৪দিন ডায়েটে রাখুন। সঙ্গে সঙ্গে কেটে খাওয়ার চেষ্টা করুন। জুস বানিয়েও খেতে পারেন।

কিভাবে সাহায্য করে ?

পেঁপে নিয়মিত খেলে অনিয়িমিত পিরিয়ড সেরে যেতে পারে বলে জানা যায়।

৩. হলুদ

কিভাবে ব্যবহার করবেন ?

দুধে হলুদের গুঁড়ো মিশিয়ে পান করতে পারেন। কাঁচা হলুদ চিবিয়ে খেতে পারেন।

কিভাবে সাহায্য করে ?

স্ট্রেস বা টেনশন কমাতে সাহায্য করে, যার ফলে অনিয়মিত মাসিকের সম্ভাবনা কমতে পারে (8)

৪. আদা

কিভাবে ব্যবহার করবেন ?

আদার রস করে চায়ে মিশিয়ে বা শুধু বা মধু দিয়েও খেতে পারেন।

কিভাবে সাহায্য করে ?

আদায় থাকা এমেইনাগোগ উপাদানটি মাসিক চক্র স্বাভাবিক করতে পারে বলে জানা যায় (9)

৫. দারুচিনি

কিভাবে ব্যবহার করবেন ?

দারুচিনিকে জলে ফুটিয়ে সেই জল পান করতে পারেন। এছাড়া দারুচিনি অল্প অল্প করে মুখে নিয়েও চিবোতে পারেন।

কিভাবে সাহায্য করে ?

অনিয়মিত পিরিয়ড হওয়ার জন্য পেটে যে যন্ত্রনা হয় সেটি কম করতে সাহায্য করে (10)

৬. তিল

কিভাবে ব্যবহার করবেন ?

রান্নার সময় কোনো মানানসই খাবারে মিশিয়ে খেতে পারেন। এছাড়া এক টেবিল চামচ তিল নিয়ে একটু মধু মিশিয়ে খেতে পারেন।

কিভাবে সাহায্য করে ?

তিলে বায়োঅ্যাক্টিভ উপাদান থাকে বলে মাসিক চক্র নিয়মিত হতে সাহায্য করে (11)

৭. পার্সলে পাতা

কিভাবে ব্যবহার করবেন ?

জল যখন ফুটবে তখন কিছু পার্সলে পাতা ফেলে দিন। তারপর জল থেকে সেগুলি ছেঁকে তুলে নিন এবং শুকিয়ে নিন। দিনে তিনবার এই পাতা খাওয়ার চেষ্টা করুন।

কিভাবে সাহায্য করে ?

এতে বায়োঅ্যাক্টিভ উপাদানের মাত্রা অনেক বেশি পরিমাণে থাকে বলে দেহে ইস্ট্রোজেন হরমোনের পরিমাণ বাড়তে থাকে (11) ও পিরিয়ড নিয়মিত হতে সাহায্য করে।

৮. আনারস

কিভাবে ব্যবহার করবেন ?

আনারস ছোট ছোট টুকরো করে কেটে খেতে পারেন।

কিভাবে সাহায্য করে ?

পিরিয়ডের সময় আসলে এটি খাওয়া উচিত। এটি খেলে জরায়ুর সংকোচন বেড়ে যায়, ফলে পিরিয়ড ঠিকভাবে হতে পারে বলে জানা যায় (12)

৯. কফি

কিভাবে ব্যবহার করবেন ?

পিরিয়ডের সময় এগিয়ে এলে দিনে দুবার কফি খেতে পারেন।

কিভাবে সাহায্য করে ?

কফির প্রধান উপাদান ক্যাফিন শরীরে ইস্ট্রোজেনিক ক্রিয়াকলাপকে উত্তেজিত করে ও অনিয়মিত মাসিকের থেকে মুক্তি থেকে মুক্তি দিতে পারে (13)

১০. আঙুরের জুস

কিভাবে ব্যবহার করবেন ?

আঙুর ফলের জুস বানিয়ে খেতে হবে।

কিভাবে সাহায্য করে ?

অনিয়মিত মাসিকের সমস্যা কমতে পারে কারণ এতে ভিটামিন সি উপস্থিত (14)

১১. ভিটামিন সি

কিভাবে সাহায্য করে ?

ভিটামিন সি আপনার শরীরে ইস্ট্রোজেন হরমোনের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়ে মাসিক নিয়মিত হতে প্রভাবিত করে (15)

১২. হট ওয়াটার ব্যাগ

কিভাবে ব্যবহার করবেন ?

এই ব্যাগের মধ্যে গরম জল ঢেলে  তলপেটে সেক দিতে হবে।

কিভাবে সাহায্য করে ?

সাধারণত পিরিয়ডের সময় হয়ে এলে ব্যথা শুরু হয়, কিন্তু যাদের অনিয়মিত মাসিক হয় তাদের ক্ষেত্রে অনেকসময় ব্যথা শুরু হয় কিন্তু মাসিক শুরু হয় না। তাই তখন তারা যদি এই হট ওয়াটার ব্যাগের সেক তলপেটে দিতে থাকে , তাহলে পিরিয়ড হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।

অনিয়মিত পিরিয়ড থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য উপযোগী যোগাসন

  •  প্রাণায়ম

এই আসন মন, শরীর, এবং আত্মাকে শান্ত করে । আপনার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউনিটি সিস্টেম বৃদ্ধিতে সাহায্য করে । এছাড়া এই আসন জরায়ু সহিত শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের কার্যকারিতার উন্নতি ঘটে এবং শ্বাসের উদ্বেগ কমাতেও সাহায্য করে।

  • সূর্য নমস্কার 

সূর্য নমস্কার শরীরের সব অঙ্গের কার্যকারিতার উন্নতি করার পাশাপাশি মাসিক সঠিক ভাবে হতে সাহায্য করে। শ্বাস-প্রশ্বাসের উন্নতি করে।

  • ধনুরাসন

পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রোম বা অনিয়মিত পিরিয়ডের সমস্যা থাকলে ধনুরাসন সবচেয়ে উপকারী এক্ষেত্রে ।  পেটের চর্বি কমাতে ও পেটের অসুখের জন্য এই আসন উপযুক্ত । এটি প্রজনন অঙ্গগুলির  কার্যকারিতার উন্নতি করতে সক্ষম ।

  • বজ্রাসন

অনিয়মিত মাসিক, বদ হজমের সমস্যা কমাতে উপযোগী এই আসন খাবার খাওয়ার পরও করা সম্ভব ।

অনিয়মিত পিরিয়ডের থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য কিছু জরুরি টিপস

  • প্রথমত নিজের ডায়েট ঠিক করুন। প্রচুর পরিমানে শাক সবজি খাওয়ার অভ্যেস করুন। স্যালাড খেতে শুরু করুন। প্রয়োজনে ডায়েটশিয়ানের সাহায্য নিন।
  • নিয়িমিত যোগব্যায়াম করার চেষ্টা করুন।
  • নিজেকে স্ট্রেস মুক্ত রাখুন।
  • অবশ্যই ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করতে ভুলবেন না এ ব্যাপারে।

মনে রাখবেন, নিজেকে সুস্থ রাখা খুবই জরুরি। আশা করি, অনিয়মিত পিরিয়ড সম্পর্কিত প্রতিবেদনটি আপনাদের ভালো লাগবে। নিজের যত্ন করুন ও সুস্থ থাকুন।

Sources

Articles on StyleCraze are backed by verified information from peer-reviewed and academic research papers, reputed organizations, research institutions, and medical associations to ensure accuracy and relevance. Check out our editorial policy for further details.
The following two tabs change content below.

    LATEST ARTICLES