কিনওয়ার উপকারিতা এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া | quinoa in bengali

Written by

একনাগাড়ে ভাত খেতে খেতে বিরক্ত হয়ে পড়েছেন? খাদ্যতালিকায় নতুন কিছু বৈচিত্র আনার কথা ভাবছেন? এমন কিছু খাবার যা আপনাকে সুস্থ রাখবে এবং স্বাস্থ্যকর ও হবে এবং খেতেও সুস্বাদু হবে। তাহলে আপনি কিনওয়ার কথা ভাবতে পারেন। কিনওয়া নামটি হয়তো প্রথমবার শুনছেন। কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য উপাদান হলো এটি। আমরা যে সকল দানা শস্য খাই তার মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো কিনওয়া। ভাতের পাশাপাশি এটিও অত্যন্ত স্বাস্থ্যকর একটি উপাদান। পৃথিবীর বহু মানুষই এই দানাশস্য সম্পর্কে অবগত। তবে আপনি যদি এটি সম্পর্কে না জেনে থাকেন তবে আজকের নিবন্ধ টি আপনার জন্য। আজকের নিবন্ধে আমরা কিনওয়া সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব। এর উপকার, পুষ্টিমূল্য, কিভাবে কোথা থেকে পাওয়া যাবে এবং এর কি কি পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া রয়েছে সবকিছুই জানব। আসুন তাহলে আজকে তবে আমরা কিনওয়া সম্পর্কে আলোচনা করি।

কিনওয়া কি?

কিনওয়া হল অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি দানাশস্য। যা ‘সুপার ফুড’ ও ‘সুপার গ্রেন’ নামে পরিচিত। বিশ্বের অন্যতম স্বাস্থ্যকর খাবার গুলির মধ্যে অন্যতম হলো কিনওয়া। এটি বাচ্চা থেকে বয়স্ক সকলেই গ্রহণ করতে পারে। কিনওয়া মূলত এক ধরনের ফুলের উদ্ভিদ, যা আম্রান্থো পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। এটি মূলত ভোজ্য বীজ হিসেবে উৎপন্ন হয়। চাল, গম, ডালের মত কুইনোয়া কে আমরা ব্যবহার করতে পারি। সাধারণ বীজ হিসেবেই এটি ব্যবহার করা যায়। চাল, ডাল, গম এর বীজগুলো যেরকম আঠা মুক্ত হয় তেমনই কিনওয়া এর বীজ হয়। ভাত কিংবা গমের সাথে রান্না পদ্ধতিতেও প্রচুর মিল রয়েছে। এটি প্রোটিনের অন্যতম একটি উৎস। এর মধ্যে নয়টি প্রয়োজনীয় অ্যামিনো এসিড প্রচুর পরিমাণে রয়েছে। এছাড়া এরমধ্যে বিভিন্ন খনিজ এবং ফাইবার রয়েছে যার ফলে এটি শরীরকে বিভিন্ন রোগ থেকে মুক্ত রাখে এবং শরীরের ওজন বৃদ্ধি হতে দেয় না। আসুন তাহলে কিন ওয়ার সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা যাক ()।

কিনওয়ার প্রকারভেদ

কিনওয়া অনেক ধরনের হয়। তারমধ্যে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য –

  • সাদা কিনওয়া – এই ধরনের কিনওয়া গুলি দোকানে কিনতে পাওয়া যায়। এটি মূলত এক ধরনের দানাশস্য। যা ভাত এর মতন রান্না করে খাওয়া যায়। এই সাদা কিনওয়া গুলিকে আইভরি কিনওয়া বলে।
  • লাল কিনোয়া – এটি সাদা কিনওয়ার থেকেও স্বাস্থ্যকর। মূলত রান্নার পরেও এটি নিজের লাল রঙ ধরে রাখে। এই লাল কিনওয়া মূলত স্যালাড তৈরি করতে বা যেকোনো ধরনের স্মুদিতে ব্যবহার করা যেতে পারে। এছাড়াও এটি রান্নার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হতে পারে।
  • কালো কিনওয়া – এই কিনওয়া খানিকটা মিষ্টি প্রকৃতির। এটিও রান্নার পরেও তার কালো রঙ ধরে রাখে। বিভিন্ন ধরনের সুস্বাদু রান্না তৈরীর ক্ষেত্রে এটি ব্যবহার করা যেতে পারে।
  • কিনওয়া ফ্লেক্স – এটি মূলত আমরা যে কর্নফ্লেক্স খাই তার মতন হয়। শস্যদানা গুলিকে বিভিন্ন পদ্ধতিতে ফ্লেক্স হিসেবে তৈরি করা হয়। এটি অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাতরাশকারী উপাদান। এটি যদি সকালবেলা খেয়ে নেওয়া যায় সারাদিনে অনেকক্ষণ এর জন্য পেট ভর্তি থাকে।
  • কিনওয়া ময়দা – এই কিনওয়া বীজ থেকে ময়দা তৈরি করা হয়। এটি দেখতে অন্যান্য ময়দার মতই, তবে এর গুনাগুন অন্যান্য ময়দার তুলনায় অধিক বেশি এবং এটি পুরোপুরি সাদা রঙের দেখতে হয়।

কিনওয়ার উপকারিতা

কিনওয়া এমন এক ধরনের দানাশস্য উপাদান যার বীজে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার, ভিটামিন ই, ভিটামিন বি, অন্যান্য খনিজ যেমন আয়রন, ম্যাগনেসিয়াম, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, পটাশিয়াম রয়েছে। এটি খাদ্য তালিকায় রাখা মানে আপনি একটি সুষম খাদ্য গ্রহণ করছেন। কেননা এটিতে এমন পুষ্টি উপাদান রয়েছে যা আপনার স্বাস্থ্য কে ভালো করে তুলতে পারে। এছাড়াও এর মধ্যে রয়েছে ক্যাম্পফেরোল এবং কোয়ারসেটিন এর মতন দুটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভিদজ্জ যৌগ। কিনওয়া আঠালো মুক্ত হওয়ায় এটি সহজেই গ্রহণ করা যেতে পারে। এছাড়াও এটি কম গ্লাইসেমিক সূচক হওয়ায় এটি ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান। এছাড়া এর মধ্যে থাকা উচ্চ পরিমাণে আয়রন এবং ম্যাগনেসিয়াম যে কোন ব্যক্তির বিপাকীয় সমস্যাকে উন্নত করতে পারে। কিনওয়ার মধ্যে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপাদানগুলি শরীরে পুষ্টি প্রদান করে থাকে।

কিনওয়া মূলত পেরু-বলিভিয়া এবং চিলির আন্দিয়ান অঞ্চলে প্রায় ৪০০০ বছর আগে থেকে খাদ্যরূপে ব্যবহার হওয়া শুরু হয়েছিল। সেখানে প্রথম মানুষ এগুলি খাওয়া শুরু করে। তবে প্রত্নতাত্ত্বিকদের ধারণা অনুযায়ী এটি প্রায় সাত হাজার বছর আগে আবিষ্কার হয়েছিল। স্প্যানিশরা যখন এসেছিল তখনই কিনওয়ার ব্যবহার শুরু হয়। এটি ইনকা অঞ্চলে ইনকাদের সোনা নামে পরিচিত ছিল। ইনকা যোদ্ধারা শক্তি সঞ্চয় করার জন্য এটিকে সুষম খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করত। শুরুর দিকে গাছের ফল স্বরূপ এটি খাওয়া হতো, পরে পরবর্তীকালে একটি পরিবর্তিত হতে হতে এই গাছের প্রত্যেকটা অংশই খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এবার জেনে নিন তাহলে কিনওয়া আমাদের কিকি স্বাস্থ্য উপকারিতা করে থাকে। কেননা এটি যেহেতু ফাইবার জাতীয় খাদ্য তাই কোষ্ঠকাঠিন্য এবং হজমের সমস্যার চিকিৎসা ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে থাকে। এর পাশাপাশি হূদযন্ত্রের সুরক্ষায় এবং ক্যান্সারের মতো মারাত্মক রোগ প্রতিরোধ করতে এবং ত্বক ও চুল কে স্বাস্থ্যকর করে তুলতে সহায়তা করে। তাহলে জেনে নিন কীভাবে এটি আমাদের শরীরকে আরো ভালো করে তোলে।

১) ওজন হ্রাস করতে কিনওয়ার ভূমিকা

শরীরের ওজন বৃদ্ধি এখন কোন নতুন ঘটনা নয়। দৈনন্দিন কাজের চাপ, ঠিকমতন খাবার না খাওয়া, স্ট্রেস কিংবা অত্যধিক বাইরের খাবার খাওয়া এগুলি আমাদের শরীরকে খুব তাড়াতাড়ি মেদ সঞ্চয় করতে সহায়তা করে, যার ফলস্বরূপ খুব কম বয়সেই বিভিন্ন রোগের সমস্যা দেখা দেয়। কেননা শরীরের মেদ বৃদ্ধি পেলেই শরীর ঠিক মত কাজ করতে পারে না। তাই জিম কিংবা ব্যায়াম করার পাশাপাশি আপনার খাদ্য তালিকায় আজ থেকেই কিনওয়াকে যোগ করুন। এটি আপনাকে ওজন নিয়ন্ত্রণে আরো সহায়তা করবে ()। কিনওয়ার মধ্যে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার থাকে, যা শরীরে কোন খাবারকে জমতে দেয় না এবং নিজেও জমে থাকে না। এর মধ্যে কার শস্যদানা গুলো তুলনামূলক শক্ত। যার ফলে এটি পেটের ভেতরে গেলে পেটকে অনেকক্ষণ ভর্তি রাখে এবং মল নরম করতে সহায়তা করে। এক কাপ কিনওয়া বীজে ২.৫ গ্রাম দ্রবণীয় ফাইবার থাকে, যা ওজন কম করতে সহায়তা করে। এর পাশাপাশি কিনওয়ার মধ্যে হাইড্রক্সেকডিসোন নামক এক প্রকার যৌগ থাকে যা ওজন কম করতে সহায়তা করে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে এটি শরীরের ক্যালরি কমাতে এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা করে থাকে। সুতরাং এটি খাদ্যতালিকায় রাখলে শরীরের ফ্যাট শোষণ ক্ষমতাও কম হবে যার ফলে মেদ বৃদ্ধি হবে না ()।

২) হার্টের সুরক্ষায় ও কোলেস্টেরল নিরাময়ে কিনওয়ার ভূমিকা

হার্টের যেকোন সমস্যার ক্ষেত্রে অন্যতম সুষম খাদ্য হলো কিনাওয়া। এটির মধ্যে থাকা দ্রবণীয় ফাইবার হার্টের সুরক্ষায় এক গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য। এর মধ্যে থাকা দ্রবণীয় ফাইবার যকৃতের পিত্ত অ্যাসিড এর সাথে সংমিশ্রিত হয়ে এক ধরনের জেলি জাতীয় পদার্থ তৈরি করে, যা অন্ত্রের মধ্যে থেকে বের হয়। লিভার এই পিত্ত অ্যাসিড উৎপাদন করতে বেশকিছু কোলেস্টেরল আপনার শরীর থেকে শোষণ করে, যার ফলে আপনার লিভার যখন এই অ্যাসিড তৈরি করে তখন রক্ত থেকে কোলেস্টেরলের টান পড়ে। যার ফলে শরীরে কোলেস্টেরলের পরিমাণ কম হতে থাকে। সহজ ভাষায় যাকে বলা যায় কিনওয়া লিভারকে রক্ত থেকে কোলেস্টেরল বের করতে সাহায্য করে।

কিনওয়া খাদ্য তালিকায় রাখা মানে এটি আপনার শরীরে খারাপ কোলেস্টেরলের পরিমাণ কম করবে অর্থাৎ করোনারি হৃদরোগের সম্ভাবনা হ্রাস করবে। যার ফলে আপনি দীর্ঘদিন সুস্থ থাকবেন। কিনওয়ার মধ্যে যে সমস্ত ফ্যাটি এসিড রয়েছে এরমধ্যে ২৫%% অক্সালিক অ্যাসিড রূপে আছে। এই অ্যাসিড হার্টের সহায়ক। এটি একটি স্বাস্থ্যকর মনোস্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিড এবং এর ৮ শতাংশ হলো আলফা লিওলেন ইক অ্যাসিড। যা উদ্ভিজ্জ ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিডের উৎস। সুতরাং বুঝতেই পারছেন হার্টের সুরক্ষায় এবং কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখতে আজ থেকেই খাদ্যতালিকায় কিনওয়া রাখুন ()।

৩) ডায়াবেটিস এবং উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে কিনওয়ার ভূমিকা

ইতিমধ্যেই আমরা জেনে গিয়েছি কিনাওয়া এক ধরনের দুর্দান্ত গোটা দানা শস্য। কিনওয়ার ফাইবার রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়তে দেয় না, যার ফলে ডায়াবেটিসজনিত ওজন বৃদ্ধি এবং অন্যান্য দীর্ঘস্থায়ী অবস্থার এটি প্রতিরোধ করে। ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে গ্লাইসেমিক ইনডেক্স যুক্ত খাবার গ্রহণ করা উল্লেখ্য। এক্ষেত্রে কিনওয়া কম গ্লাইসেমিক যুক্ত খাদ্য। কিনওয়ার মধ্যে প্রোটিন তৈরির জন্য সব রকম অ্যামিনো এসিড রয়েছে, যা রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে ভালোভাবে কাজ করতে পারে ()। ব্রাজিলের এক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, কিনওয়া টাইপ টু ডায়াবেটিস এর পাশাপাশি এর সাথে যুক্ত হাইপারটেনশন নিরাময়ে সহায়তা করে

একটি জটিল কার্বোহাইড্রেট এবং এই জাতীয় শর্করা খুব ধীরে ধীরে শরীরে গিয়ে ভেঙে যায় এবং রক্তে শর্করা কে আরও অস্থিতিশীল করে দেয়। কিনওয়ার মধ্যে থাকা ভালো পরিমাণে ম্যাগনেসিয়াম এবং পটাশিয়াম রক্তচাপ কমাতে সহায়তা করে। ম্যাগনেসিয়াম রক্তনালীগুলোকে শিথিল করতে সহায়তা করে, যার ফলে এটি মাইগ্রেনের সাথে লড়াই করতে পারে।

৪) প্রদাহ জনিত সমস্যায় কিনওয়ার ভূমিকা

কিনওয়ার মধ্যে থাকা ফাইবার বাটরেট তৈরি করে, যা একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাটি অ্যাসিড। এগুলি শরীরের ভেতর প্রদাহ সৃষ্টি কারি যৌগ গুলিকে শান্ত করতে সহায়তা করে এবং কিনওয়ায় থাকা ভিটামিন বি শরীরের অন্যতম একটি প্রদাহজনক হরমোন হোমোসিস্টিন এর মাত্রা কম করতে সহায়তা করে। এর পাশাপাশি কিনওয়ার মধ্যে থাকা ফাইবার হজম এবং অ্যাসিটেট ব্যবস্থা কে নিয়ন্ত্রণ করে যা আপনার খাওয়া-দাওয়ার অস্বাস্থ্যকর ইঙ্গিত মস্তিষ্কে প্রেরণ করে।

যার ফলে আপনি যদি কম খাবার খান। সেক্ষেত্রে আপনার পক্ষে প্রদাহজনক খাবার গ্রহণের সম্ভাবনা কম হবে। এছাড়াও কিনওয়ার মধ্যে স্যাপোনিনস নামক একপ্রকার যৌগিক উপাদান রয়েছে যা anti-inflammatory বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন। এটিও শরীরের প্রদাহজনিত সমস্যাকে কম করতে সহায়তা করে ()।

৫) হজম সমস্যার সমাধানে কিনওয়ার উপকারিতা

কিনওয়া এক ধরনের গোটা দানা শস্য এবং ফাইবার সমৃদ্ধ খাদ্য হওয়ায় এটি হজম স্বাস্থ্যকে উন্নত করতে সহায়তা করে। এর মধ্যে থাকা ফাইবার জাতীয় উপাদান গুলি আপনার পেটের মধ্যে থাকা খাবার গুলি কে বিপাক করতে সহায়তা করে এবং এটি অন্ত্রের পুষ্টি বজায় রাখে।

এছাড়াও বড় অন্ত্রের মধ্যে কিনওয়ার মধ্যে থাকা ফাইবার কোষ্ঠকাঠিন্য রোধ করে।

কিনওয়ার মধ্যে থাকা ভিটামিন বি হজমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে থাকে। এছাড়া এর মধ্যে থাকা থায়ামিন, হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড উৎপাদন করতে সহায়তা করে। খাবার হজমের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে রাইবোফ্লাভিন। পাচনতন্ত্র বিকাশে সহায়তা করে। এছাড়া কিনওয়ার মধ্যে থাকা অ্যামিনো এসিডের অন্যতম হল গ্লুটামিক অ্যাসিড, যা আপনার দেহে গিয়ে গ্লুটামিনে রূপান্তরিত হয়। গ্লুটামিন পেটের মিউকোসল আস্তরণের স্বাস্থ্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে থাকে।

৬) বিপাক ক্রিয়ার উন্নতি ঘটাতে কিনওয়ার ভূমিকা

ইতিমধ্যেই আমরা জেনে গিয়েছি কিনওয়া পুষ্টিসমৃদ্ধ একটি উপাদান। যার মধ্যে পুষ্টি উপাদানের প্রত্যেকটি উপাদানই যথাযথ পরিমাণে রয়েছে। এর পাশাপাশি এর মধ্যে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার। এটি প্রোটিনের অন্যতম উৎস হওয়ায় এরমধ্যে সবকটি অ্যামিনো অ্যাসিড বর্তমান।
এটি আমাদের শরীরের অনেক বড় বড় রোগকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করে। সেক্ষেত্রে আপনি যদি নিয়মিত কিনওয়া গ্রহণ করেন তবে আপনার বিপাকের উন্নতি হবে না তা অসম্ভব। কেননা এটি প্রোটিনের উৎকৃষ্ট উৎস হওয়ায় শরীরের বিপাক ক্রিয়া কে নিয়ন্ত্রণে রাখার পাশাপাশি এটি খিদে কম করে। যার ফলে আপনার বারবার খিদে পাওয়ার মতন সমস্যাগুলি হবে না এবং ওজন বৃদ্ধি ও ঘটবে না ()।

৭) রক্তাল্পতার চিকিৎসায় কিনওয়ার ব্যবহার

কিনওয়া আয়রন সমৃদ্ধ একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এক কাপ রান্না করা কিনওয়ার মধ্যে প্রায় ৩ মিলিগ্রাম আয়রন থাকে, যা প্রতিদিনের শরীরের আয়রনের প্রয়োজনীয়তার ১৫%।

শরীরে পর্যাপ্ত পরিমাণে আয়রন সমৃদ্ধ খাদ্য গ্রহণ না করলে রক্তাল্পতা হতে থাকে। এক্ষেত্রে এর মধ্যে থাকা বিভিন্ন খনিজ শরীরে হিমোগ্লোবিন তৈরিতে সহায়তা করে। রক্তে অক্সিজেন সরবরাহের পাশাপাশি লোহিত রক্তকণিকা গুলি বৃদ্ধি করতে সহায়তা করে ()।

৮) ক্যান্সার নিরাময়ে কিনওয়ার ভূমিকা

ক্যান্সারের মতো মারাত্মক এবং অপ্রতিরোধ্য রোগ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে কিনওয়া। হার্ভাড বিশ্ববিদ্যালয়ের মতে, প্রত্যেকদিন এক বাটি করে কিনওয়া ক্যান্সার রোগীদের জীবন বাঁচাতে পারে ()।

সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, যারা প্রত্যেকদিন এক বাটি করে কিনওয়া খান তাদের মধ্যে ক্যান্সার রোগের সম্ভাবনা খুব কম কিংবা যারা ক্যান্সারের মতন রোগে ভুগছেন তাদের ক্যান্সারে অকালমৃত্যুর ঝুঁকি কম হতে পারে।

আমেরিকান ইনস্টিটিউট ফর ক্যান্সার রিসার্চ কিনওয়ার ব্যবহার সম্পর্কে জানিয়েছেন, এটি ব্যবহার করার আগে ভালো করে জল দিয়ে ধুয়ে নিন। কেননা কিনওয়া শস্যের ফলন বাড়ানোর জন্য এরমধ্যে এক ধরনের তিক্ত পদার্থের প্রলেপ দেওয়া হয়। যা স্বাস্থ্যের পক্ষে খারাপ। এছাড়াও জানা গিয়েছে কিনওয়া গাছের বীজের পাশাপাশি এই গাছের পাতাগুলি anti-cancer প্রভাব গুলি কে সহায়তা করে। ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য তাই অনেকেই খাদ্যতালিকায় কিনওয়া যুক্ত করার পরামর্শ দিয়েছেন। কিনওয়াতে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ উপাদান গুলি ক্যান্সারের ক্ষতিকর পদার্থ গুলির বিরুদ্ধে লড়াই করতে সক্ষম।

৯) ত্বকের সুরক্ষায় কিনওয়ার ভূমিকা

ইতিমধ্যেই আমরা কিনওয়ার মধ্যে থাকা পুষ্টি উপাদান গুলি সম্পর্কে জেনে গিয়েছি। কিনওয়ার মধ্যে থাকা ভিটামিন বি ত্বক থেকে বয়সের দাগ কম করতে এবং মেলানিন নিষ্কাশন কম করে ত্বকের রঙ পরিষ্কার করতে সহায়তা করে। এছাড়াও কিনওয়ার মধ্যে থাকা ভিটামিন বি টুয়েলভ এবং ভিটামিন বি ত্বকের বর্ণ ধরে রাখতে সহায়তা করে। কিনওয়ার মধ্যে উপস্থিত রয়েছে টাইরোসিন এজ ইনহিবিটারস জাতীয় এনজাইম গুলি। যা পিগমেন্টেশন কম করতে সহায়তা করে (১০)। এছাড়াও ব্রণ এবং ব্রেকআউট এর মতন সমস্যাগুলো দূর করতেও এটি সহায়তা করে। কিনওয়ার মধ্যে থাকা ভিটামিন বি থ্রি মুখের ব্রেকআউট, ব্রণের মতো লাল ফুলে যাওয়া ফোড়া গুলিকে কম করতে সহায়তা করে।

কিনওয়ার মধ্যে থাকা ভিটামিন গুলি ত্বকের বার্ধক্যজনিত সমস্যা দূর করতে সহায়তা করে। বয়স বাড়ার সাথে সাথে ত্বকের যে সূক্ষ্ম রেখা গুলির সৃষ্টি হয় যার ফলে অনেকের কম বয়সেই ত্বক বুড়িয়ে যায়। তাদের ত্বককে সুন্দর করতে সহায়তা করে। কিনওয়ার মধ্যে থাকা ভিটামিন b2 এর অন্যতম উপাদান রাইবোফ্ল্যাভিন, ত্বকের স্থিতিস্থাপকতা কে উন্নত করতে এবং ব্রন উৎপাদনকারী সিবাম কে নিয়ন্ত্রণ করতে সহায়তা করে। এছাড়াও কিনওয়ার মধ্যে থাকা অ্যান্টি অক্সিডেন্ট উপাদান গুলি ত্বকের কোঁকড়ানো ভাব কমাতে এবং বয়স বৃদ্ধি কম করতে সহায়তা করে।

এক্ষেত্রে আপনি একটি প্যাক ব্যবহার করতে পারেন, দুধের মধ্যে এক কাপ কিনওয়া ভালো করে ফুটিয়ে নিন। এবার এটি ঠাণ্ডা করে এর মধ্যে তিন চামচ দই, দুইটি ডিমের কুসুম এবং দুই ফোঁটা যেকোনো এসেনশিয়াল তেল দিয়ে মিশিয়ে নিন এবং এটি আপনার মুখে এবং ঘাড়ে লাগিয়ে ফেলুন। এরপর কুড়ি মিনিট অপেক্ষা করে হালকা গরম জল দিয়ে মুখ ধুয়ে ফেলুন। এতে দেখবেন আপনার ত্বক আরো মসৃণ এবং উজ্জ্বল হয়ে উঠবে। কিনওয়ার মধ্যে থাকা প্রাকৃতিক প্রোটিন এবং দুধের মধ্যে থাকা অ্যান্টি-এজিং উপাদানগুলো ত্বককে সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি থেকে মুক্ত করতে সহায়তা করে এবং এই ফেসপ্যাকটি আপনার ত্বককে মসৃণ ও উজ্জ্বল করতে সহায়তা করবে। সুতরাং খাদ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার পাশাপাশি কিনওয়া দিয়ে ফেসপ্যাক তৈরি করে আপনি আপনার ত্বকে ব্যবহার করতে পারবেন।

১০) অস্টিওপোরোসিস প্রতিরোধে কিনওয়ার ভূমিকা

প্রাত্যহিক জীবনে আমরা দেখতে পাই বয়স বাড়ার সাথে সাথেই হাড়ের শক্তি কম হতে থাকে এবং হাড়ের ক্ষয় দেখা দিতে থাকে। যার ফলে শরীরের হাড় নিয়ে সমস্যা দেখা দেয়। তবে বর্তমানে এটি বয়স্ক মাঝবয়সী সকলের মধ্যেই পায়ে ব্যথা বা হাড়ের সমস্যা দেখা দেয়।

এক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো কিনওয়া। এটি ম্যাগনেসিয়াম সমৃদ্ধ খাদ্য হওয়ায় শরীরে হাড়ের সুরক্ষায় দুর্দান্ত কাজ করে এবং এর মধ্যে থাকা খনিজ গুলি হাড় গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে। মূলত এক কাপ কিনওয়াতে ৯ গ্রাম প্রোটিন থাকে যা হাঁড়ের জন্য খুব ভালো। এছাড়াও এর মধ্যে থাকা নয়টি অত্যাবশ্যকীয় অ্যামাইনো অ্যাসিড, শরীর যেগুলি নিজে উৎপন্ন করতে পারে না সেগুলি শরীরে প্রেরণ করতে সহায়তা করে।

গবেষণায় দেখা গিয়েছে, কিনওয়ার মধ্যে থাকা ম্যাগনেসিয়াম এবং ম্যাঙ্গানিজ অস্টিওপোরেসিস প্রতিরোধে সহায়তা করে। হাটু ক্ষয়, হাড়ের ক্ষয় এই সমস্ত রোগ প্রতিরোধের ক্ষেত্রে কিনওয়া অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য উপাদান (১১)।

১১) কোষ গঠনে এবং বৃদ্ধিতে কিনওয়ার ভূমিকা

শরীরের পুরনো কোষ মেরামত করে নতুন কোষ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে থাকে কিনওয়া। এটি মূলত লাইসিন সমৃদ্ধ খাদ্য হওয়ায় এটি কোষ গঠনের পাশাপাশি বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।
এছাড়া প্রোটিনের উৎকৃষ্ট উৎস হওয়ায় এর মধ্যে উচ্চ প্রোটিন সম্পন্ন সব কয়টি উপাদানের উপস্থিতি রয়েছে। যার ফলে এটি শরীরের বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।

১২) চুলকে শক্তিশালী করতে কিনওয়ার ভূমিকা

কিনওয়া প্রোটিন সমৃদ্ধ খাদ্য হওয়ায় এটি চুলের মধ্যে প্রোটিন সম্পাদন করে থাকে। যা চুলের ছিঁড়ে যাওয়া কিংবা ভেঙে যাওয়ার সমস্যাকে কম করে। এটি মূলত হাইড্রোলাইজড প্রোটিন যা প্রাকৃতিক প্রোটিনের উৎকৃষ্ট উৎস। এটি চুলের ফলিকল গুলিকে ভেতর থেকে সুরক্ষিত করে এবং পুষ্টি প্রদান করে থাকে।

কিনওয়ার মধ্যে থাকা উচ্চমানের প্রোটিন নতুন চুল গজাতে সহায়তা করে। কিনওয়ার মধ্যে থাকা নয়টি প্রয়োজনীয় অ্যামিনো অ্যাসিড প্রাকৃতিক শক্তির উপাদান হিসেবে কাজ করে। যা চুলের বৃদ্ধিকে সহায়তা করে।

এছাড়াও ক্ষতিগ্রস্ত চুলগুলি ঠিক করতেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়ে থাকে। কিনওয়ার মধ্যে থাকা হিউম্যাক্ট্যান্টগুলি মাথার ত্বককে পুষ্টি প্রদান করে এবং মাথার ত্বককে আর্দ্র রাখতে সহায়তা করে। এছাড়াও চুলের ওপর পরিবেশ দূষণ এবং ধুলোবালির প্রভাবে হওয়া ক্ষতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করে। এছাড়া কিনওয়ার মধ্যে থাকা ভিটামিন- ই মাথার ত্বকে প্রাকৃতিক তেলের উৎপাদন এর ভারসাম্য বজায় রাখে, যার ফলে চুলে জট বাধার সমস্যা কম হয় এবং তার ফলে চুল ছিঁড়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও কম হয়।

১৩) খুশকি দূর করতে কিনওয়ার ভূমিকা

কিনওয়ার মধ্যে রয়েছে ক্যালসিয়াম, আয়রন এবং ফসফরাস জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ খনিজ উপাদান। যা মাথার ত্বককে আর্দ্রতা প্রদান করে, খুশকি নিরাময়ে সহায়তা করে। কিনওয়ার মধ্যে থাকা টাইরোসিন চুলের কালো রং বজায় রাখতে সহায়তা করে। এর মধ্যে থাকা প্রোটিন জাতীয় উপাদান গুলি চুলকে ব্যাকটেরিয়ার হাত থেকে রক্ষা করে।

এক্ষেত্রে খাদ্যতালিকায় কিনওয়া রাখার পাশাপাশি কিনওয়া দিয়ে প্যাক তৈরি করে মাথার ত্বকে লাগাতে পারেন। কিনওয়া জলে ভিজিয়ে রেখে ভালো করে বেটে নিয়ে পেস্টটি মাথার ত্বকে এবং চুলে লাগিয়ে রাখুন। ১৫ মিনিট অপেক্ষা করুন এবং তারপর পরিষ্কার জলে চুল ধুয়ে ফেলুন। এটি সপ্তাহে অন্তত দুইবার ব্যবহার করুন এতে চুলে খুশকির সমস্যা কমার পাশাপাশি চুল সুন্দর এবং মজবুত হয়ে উঠবে।

কিনওয়ার পুষ্টিমূল্য

কিনওয়া সব রকম পুষ্টি উপাদানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎস। যার ফলে এটি সুষম খাদ্য হিসেবে ধার্য করা হয়েছে। ইতিমধ্যেই আমরা জানি, পুষ্টি উপাদানের সবকটি উপাদান যেমন অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ভিটামিন বিভিন্ন খনিজ সবকটি প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান কিনওয়ার মধ্যে রয়েছে। তাহলে আসুন জেনে নিন কিনওয়ার মধ্যে থাকা বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান গুলি সম্পর্কে।

এক কাপ কিনওয়ার মধ্যে রয়েছে –

  • মোট ফ্যাট ১% ডিভি
  • মোট কার্বোহাইড্রেট ৩% ডিভি
  • ডায়েটারি ফাইবার ৪৮% ডিভি
  • ক্যালসিয়াম ৮% ডিভি
  • ভিটামিন ই ২১% ডিভি
  • থায়ামিন ৪১%ডিভি
  • রাইবোফ্লাভিন ৩২ শতাংশ ডিভি
  • নিয়াসিন ১৩% ডিভি
  • ভিটামিন বি সিক্স ৪১%
  • ফোলেট ৭৮%
  • প্যানটোথেনিক অ্যাসিড ১৩ শতাংশ
  • আয়রন ৪৩%
  • ম্যাগনেসিয়াম ৮৪ শতাংশ
  • ফসফরাস ৭৮%
  • পটাশিয়াম ২%
  • দস্তা ৩৫%
  • তামা ৫০%
  • ম্যাঙ্গানিজ ১৭৩ শতাংশ
  • সেলেনিয়াম ২১%
  • ক্যালোরি ২২২ কে সি এল

কিভাবে ব্যবহার করবেন কিনওয়া ?

ইতিমধ্যেই কিনওয়ার দুর্দান্তকারী কার্যাবলী গুলি সম্পর্কে আমরা জেনে গিয়েছি। অন্যান্য দানাশস্য গুলির মত কিনওয়াও রান্না করে খাওয়া যায়। উদ্ভিদ গত ভাবে বলতে গেলেও এটি দানা নয়, মূলত পালং শাক এবং বিটের সমগোত্রীয়। প্রায় ১০০ টিরও বেশি কিনওয়া রয়েছে। তবে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহৃত হয় সাদা, লাল এবং কালো জাতের কিনওয়া। বাদামী চালে পরিবর্ত হিসেবে কিনওয়া খাওয়া যেতে পারে। বাদামী চাল রান্না করতে যেখানে ৩০ মিনিট মতন সময় লাগে, সেখানে কিনওয়া রান্না করতে মাত্র ১৫ মিনিট সময় লাগবে। এ ক্ষেত্রে দুজনের গুনাগুন এক। মানুষ চার হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে কিনওয়া খাচ্ছে। বিশ্বের ৮০% কিনোয়া পেরু এবং বলিভিয়ায় চাষ করা হয়। প্রায় কুড়ি বছর আগে নাসার গবেষকেরা দীর্ঘমেয়াদী মিশনের ক্ষেত্রে সকালের খাবার হিসাবে কিনওয়া কে ঘোষণা করেছিলেন। মূলত বিভিন্ন খনিজ সমৃদ্ধ আঠালো মুক্ত একটি প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার। এটি সকালের খাবার থেকে রাতের খাবার পর্যন্ত সবকিছুর মধ্যে দিয়েই কিনওয়া ব্যবহার করতে পারেন। কিনওয়ার একটি দুর্দান্ত স্বাদ রয়েছে যা অন্যান্য খাদ্যের স্বাদ কে হার মানায়। মূলত স্টু এবং তরকারির মতন করে এটিকে রান্না করা যায়। রান্নার পরেও এর স্বাদ দারুন হয়। এছাড়া এটি দুধে মিশিয়ে খাওয়া যেতে পারে।

কিংবা কিনওয়ার আটাও খাওয়া যায় তবে কিনোয়া খাওয়ার আগে এটি ভালো করে ধুয়ে নিতে হয়। কেননা এটির গায়ে একটি ঘন কোট রয়েছে যা অপসারণ করে নিতে লাগে। মূলত পোকামাকড় এবং পাখির থেকে বীজকে রক্ষা করার জন্যই এই কোটটি ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এই কোটটি স্বাদে তিক্ত। সাবানের মতো স্বাদযুক্ত হয়। এটি খেলে পেটে খুব ব্যথা, পেট ফাঁপা এবং ডায়রিয়া সমস্যা হতে পারে। সুতরাং রান্না করার আগে কিনওয়া ভালো করে ধুয়ে দু’ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখুন। তারপর জল পরিবর্তন করে আবার ভিজিয়ে রাখুন। যতক্ষণ না সাবান জলের মতন জল বেরোনো বন্ধ না হচ্ছে ততক্ষণ এটি ধুতে থাকুন। এটিকে সঠিকভাবে ধুলে এর মধ্যে থাকা কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ এবং তার প্রভাব কমে যাবে।

কিনওয়া মূলত বার্লি চাল যেভাবে রান্না করা হয় সে ভাবে রান্না করা যায়। এর বীজ সুপ হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। এর পাশাপাশি এর আটা দিয়ে রুটি এছাড়াও এটি দিয়ে কুকি, বিস্কুট, পাস্তা, নুডুলস, কেক বিভিন্ন জিনিস প্রস্তুত করা যায়। এছাড়াও প্রোটিনের গুণমান কে আরো উৎকৃষ্ট করতে আপনি এর সাথে গম, ওটস, ভুট্টার আটা ও মিশ্রিত করতে পারেন। কিনওয়া মূলত স্যালাড তৈরি উপযুক্ত উপকরণ। এটি স্যালাড এর উপকরণ গুলি সাথে এবং লেটুসের সাথে ভালোভাবে মিশে যায়। এছাড়াও এগুলি দিয়ে মাফিন এবং প্যান কেক তৈরি করা যায়। স্বাস্থ্যকর উপায়ে কিনওয়া রান্না করতে এককাপ কিনওয়ার সাথে দুইকাপ জল যোগ করে কুড়ি মিনিট সিদ্ধ করুন। এটিকে আরও সুস্বাদু করে তুলতে রান্নার আগে এটা ভেজে নিতে পারেন। ফ্রাইং প্যানে তেল দিয়ে তার মধ্যে বীজগুলো দিয়ে ৫ মিনিট মাঝারি থেকে কম আঁচে নাড়তে থাকুন। দেখবেন সুন্দর বিকেলের টিফিন এর খাদ্য হিসেবে তৈরি হয়েছে। কিনওয়া গাছের বীজের পাশাপাশি এই গাছের পাতা, ফুলের মাথা, সবজি হিসেবে খাওয়া হয়। এছাড়া তরকারি, স্যালাড এবং সুপ প্রস্তুত করতে ব্যবহার করা হয়। তবে এগুলি রান্না করার আগে অবশ্যই ফুটন্ত জলে এগুলি ধুয়ে নেবেন। কেননা এই গাছের পাতা এবং ফুলের মধ্যে অক্সালিক এসিড রয়েছে।এগুলি অতিরিক্ত পরিমাণে গ্রহণ করলে কিডনিতে পাথর হতে পারে এবং যেকোন খাদ্যের ক্ষেত্রে কল্ড প্রেসড কিনওয়া তেল রান্নায় ব্যবহার করতে পারেন। এগুলি খাদ্যে স্বাদ পরিবেশনের পাশাপাশি সুন্দর গন্ধ যোগ করে থাকে।

আঠালো মুক্ত খাবার হবে। এটি খুব ভাল হজম করতেও সহায়তা করে। মূলত সাদা এবং বাদামি উভয় চালের পরিবর্তে হিসেবে কিনওয়া ব্যবহার করতে পারেন। কিনওয়া তে বাদামী চাল এর থেকেও বেশি পরিমাণে আয়রন এবং ম্যাগনেসিয়াম রয়েছে। প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন রয়েছে এতে। সাদা ভাতের পরিবর্তে এটি গ্রহন করুন। এতে প্রচুর ক্যালোরিও কম রয়েছে। মূলত সাদা ও বাদামী ভাত গুলোতে কিনওয়ার তুলনায় ১৫ গুণ বেশি কার্বোহাইড্রেট থাকে। তবে কিনওয়া ফাইবার এবং প্রোটিন এর উৎকৃষ্ট উৎস। তবে আজকে কয়েকটা রেসিপি জেনে নিন যা কিনওয়া দিয়ে তৈরি করতে পারবেন।

কিনওয়া স্যালাড

কি কি উপকরণ প্রয়োজন?

  • জল দু’কাপ
  • কিনওয়া 1 কাপ
  • লেটুস পাতা দশটি
  • অলিভ অয়েল তিন চামচ
  • লেবুর রস 2 টেবিল চামচ
  • রসুন এক কোয়া
  • কাঁচা লঙ্কা 1 চা চামচ
  • সামুদ্রিক লবণ হাফ চা চামচ
  • পনির তিন-চতুর্থাংশ কাপ।

কিভাবে তৈরি করবেন?

একটি পাত্রে জল ফুটাতে থাকুন। জল ফুটে গেলে তার মধ্যে কিনওয়া দিয়ে মাঝারি আছে নাড়তে থাকুন।যতক্ষণ না কিনওয়া জল টেনে নিচ্ছে ততক্ষণ রান্না করুন। এরপর জল টেনে নিলে পাত্রে ঢাকনা দিয়ে 5 মিনিট অপেক্ষা করুন।এরপর এটিকে ঠাণ্ডা হতে দিন। একটা বড় পাত্রে লেটুস পাতা দিন।এবার এর মধ্যে অলিভ অয়েল, লেবুর রস, রসুন, মরিচ, লবণ দিয়ে ভালো করে মিশ্রন করুন।এরপর এরমধ্যে পনির এবং ঠান্ডা হওয়া কিনওয়া যোগ করে ভাল করে মিশিয়ে পরিবেশন করুন।

কিনওয়া কিভাবে পছন্দ করবেন ?

কিনওয়া বীজ মূলত এয়ারটাইট প্যাকেট বা পাত্রে বিক্রি হয়। তবে সর্বাধিক দোকানগুলিতে সাদা রংয়ের কিনওয়াই বিক্রি হয়। কিছু কিছু জায়গায় কালো এবং লাল রংয়ের কিনওয়া বীজ পাওয়া যায়। কিনওয়া বীজ কেনার সময় খেয়াল রাখবেন তা যেন সূক্ষ্ম এবং শুকনো দানা হয় এবং এর গন্ধ দেখে নেবেন অবশ্যই। কেনার সময় তার গুণগতমান যাচাই করে নেবেন। ভালো প্যাকেট এবং সিল দেখে এবং তারিখ দেখে সংগ্রহ করবেন। যখন একসাথে অনেকগুলো কিনবেন সেক্ষেত্রে তারিখ দেখে কিনবেন।

কিভাবে সংরক্ষণ করবেন?

একটি ভালো মুখ বন্ধ করে কৌটোয় ঢেলে শুকনো এবং শীতল জায়গায় রাখুন এর সতেজতা বজায় রাখতে এবং বেশিদিন সতেজ রাখতে সূর্যের আলো এবং তাপ থেকে দূরে রাখুন এবং ভালোভাবে আটকে রাখুন। কেনার সময় মাথায় রাখবেন এটি মূল আকারের তুলনায় অনেক গুণ বেশি প্রসারিত হয়, তাই প্রয়োজন অনুযায়ী অল্প পরিমাণে ক্রয় করুন। এছাড়াও আপনি রান্না করা কিনওয়াও এয়ারটাইট বাক্সে কয়েকদিন রাখতে পারেন। কিনওয়া বীজ কেনার সময় দেখে নেবেন তা পচা কিনা। যদি দুর্গন্ধযুক্ত হয় সে ক্ষেত্রে তা নেবেন না। রান্না হওয়া কিনোয়া পরে গরম করার সময় খুব বেশি তাপমাত্রায় দেবেন না। এতে এটি নষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

কিনওয়া কোথা দিয়ে কেনা যাবে?

আপনার নিকটবর্তী যেকোনো খাবার দাবার দোকানে কিনওয়া বীজ পেতে পারেন। এছাড়াও যেকোন সুপার মার্কেটে বিশেষ গ্লুটেন মুক্ত খাদ্যের বিভাগে এটি সন্ধান করতে পারেন। অন্যথায় অনলাইনে খুঁজতে পারেন।

কিনওয়ার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া

ইতিমধ্যেই কিনওয়ার উপকারিতা গুলি সম্পর্কে আমরা জেনে নিয়েছি। তবে এই বীজের খুব মারাত্মক না হলেও অল্প কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রয়েছে, যা অতিরিক্ত পরিমাণে গ্রহণ করার ফলে দেখা দিতে পারে। আসুন জেনে নিন তাহলে কিনওয়া অত্যধিক পরিমাণে গ্রহণ করার ফলে কি কি সমস্যা সম্মুখীন হতে পারে।

হজম সংক্রান্ত সমস্যা – কিনওয়া যেহেতু ফাইবার সমৃদ্ধ খাদ্য উপাদান তাই এটি অতিরিক্ত পরিমাণে গ্রহণ করলে গ্যাস, পেট ফোলা ভাব কিংবা ডায়রিয়া হতে পারে। তাই এটি প্রচুর পরিমাণে না খাওয়াই ভালো। এছাড়াও কিনওয়া গ্রহণের আগে অবশ্যই আপনার ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করে নিন। কেননা এটি সকলের পক্ষে উপযোগী নাও হতে পারে। তবে কিনওয়ার মধ্যে থাকা স্যাপনিন এর উপকারিতা সম্পর্কে আমরা ইতিমধ্যেই জেনেছি। তবে কিছু সূত্রে জানা গিয়েছে অতিরিক্ত স্যাপোনিন গ্রহণের ফলে অন্ত্রের ক্ষতি হতে পারে। তাই এটি গ্রহণের আগে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে নিন।

কিডনি স্টোন : কিনওয়াতে বিভিন্ন ধরনের অক্সালিক অ্যাসিড রয়েছে। এই অ্যাসিড গুলির প্রভাবে অ্যাসিডিটি দেখা দিতে পারে এবং যে সমস্ত ব্যক্তিদের দুর্বল শরীর তাদের কিডনিতে পাথর হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। যারা কিডনির পাথর সংক্রান্ত সমস্যায় আগে থেকে ভুগছেন কিংবা আগে কখনো হয়েছিল তারা এটি ব্যবহার করার আগে অবশ্যই ডাক্তারের সাথে কথা বলে নেবেন।

তাহলে কিনওয়ার বিভিন্ন উপকারিতা সম্পর্কে আজকে জেনে নিয়েছেন। তাহলে আর অপেক্ষা কিসের? এ বার নিজেকে আরো সুস্থ-সবল রাখতে খাদ্যতালিকায় আজ থেকেই কিনওয়া অন্তর্ভুক্ত করুন। এবং আমাদের জানাতে ভুলবেন না। আপনি এই নিবন্ধটি আপনার কোন সাহায্য করেছে কিনা? নিজে সুস্থ থাকুন, অপরকে সুস্থ থাকতে সহায়তা করুন।

প্রায়শঃ জিজ্ঞাস্য :

ভাতের তুলনায় কি কিনওয়া ভালো?

সাদা কিংবা বাদামী চালের ভাতের তুলনায় কিনওয়া ভালো। কেননা এটি কম ক্যালরির এবং এর পুষ্টিগুণ অনেক বেশি।

কিনওয়া কি রোজ খাওয়া যায়?

হ্যাঁ, এটি রোজ খাওয়া যেতে পারে। তবে নির্দিষ্ট পরিমাণ অনুযায়ী। তবে আপনি যদি কোন চিকিৎসার মধ্যে থাকেন তবে সেক্ষেত্রে খাওয়ার আগে আপনার চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করে নেবেন।

কিনওয়া গ্রহণে কি পেটের মেদ বাড়ে না?

এটি হজমে সহায়ক এবং ওজন কমাতে সহায়ক খাদ্য উপাদান। এটি প্রোটিনসমৃদ্ধ খাদ্য উপাদান হওয়ায় শরীরে এবং পেটের মেদ কমাতে সহায়তা করে।

কিনওয়া কি ওজন হ্রাসের সহায়ক ?

এটি ওজন হ্রাস করতে সহায়তা করে।

কিনওয়া খেলে পেটে ব্যথা হয় কেন ?

এটি যেহেতু প্রোটিনের উৎকৃষ্ট উৎস। তাই এর মধ্যে প্রচুর পরিমাণে অ্যামিনো অ্যাসিড গুলি রয়েছে। যার ফলে আপনার পেটে গিয়ে কোন অ্যাসিড বিক্রিয়া করলে সে ক্ষেত্রে পেটে ব্যথার সম্ভাবনা থাকতে পারে। তাই এটি খেয়ে কোন সমস্যা হলে অবশ্যই চিকিৎসকের সাথে যোগাযোগ করুক।

কিনওয়া খেলে কি গ্যাস হয়?

এটি পরিমিত পরিমাণে প্রতিদিন গ্রহণ করা গেলে স্বাস্থ্যের পক্ষে খুবই ভাল। তবে এর মাত্রা যদি বেড়ে যায় সেক্ষেত্রে গ্যাস, পেট ফাঁপার মতন সমস্যা দেখা দিতে পারে।

Sources

Articles on StyleCraze are backed by verified information from peer-reviewed and academic research papers, reputed organizations, research institutions, and medical associations to ensure accuracy and relevance. Check out our editorial policy for further details.
Was this article helpful?
The following two tabs change content below.