যখন তখন রেগে যান? জানুন রাগ নিয়ন্ত্রণের উপায় – How to Control Anger in Bengali

Written by

আপনার রাগ কী সবসময় নাকের ডগায় লেগে থাকে? রাগের রশে প্রিয়জনকে উলটো পালটা বলে ফেলেন কিংবা রেগে গিয়ে ভাঙচুর করেন? নিজে ভুল করছেন জেনেও রাগ নিয়ন্ত্রণে করতে পারছেন না? তাহলে কিন্তু সাবধান। কারণ এই রাগই আপনার সর্বনাশের কারণ হতে পারে। অত্যধিক রাগ যেমন শরীরের উপর প্রভাব ফেলতে পারে ঠিক তেমনই দৈনন্দিন কাজকর্ম, পরিবার-পরিজনের সাথে সম্পর্কেও প্রভাব পড়তে পারে। রাগের বশে অনেকে এমন কোনও সিদ্ধান্ত নিয়ে বসেন যার মাসুল সারাজীবন গুণতে হয়। আমাদের এই প্রতিবেদনে ‘রাগ’ খুব সাধারণ এই সমস্যাটি নিয়ে আলোচনা করা হল। সেইসঙ্গে কীভাবে রাগ নিয়ন্ত্রণ করবেন সেই সম্পর্কে খুঁটিনাটি তথ্য দেওয়া হল।

রাগ কী ?

আমরা আমাদের ভালো লাগা, খারাপ লাগাগুলোকে নিজের মতো করে প্রকাশ করি। অনুভূতি প্রকাশের মাধ্যমে নিজের মনের ভাব কিছুটা প্রকাশ পায়। রাগও তেমনই একটি অনুভূতি (1)। অনেকে ভাবেন রাগ মোটেও ভালো নয়। কিন্তু আর পাঁচটা অনুভূতির মতো রাগ হওয়াটাও খুব স্বাভাবিক। রাগ করা কিন্তু খারাপ কিছু নয়। কিন্তু এটি যদি আপনার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় তাহলে তা ক্ষতিকারক হতে পারে।

রাগ সীমা ছাড়িয়ে গেলে জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমস্যা জন্ম নিতে পারে। তা শারীরিক, মানসিক বা সামাজিক যে কোনও ক্ষেত্রে এর প্রভাব পড়তে পারে। কোনও ব্যক্তির ব্যক্তিত্বের উপর ইতিবাচক কিংবা নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই আপনার জীবনে খারাপ প্রভাব পড়ার আগে রাগ নিয়ন্ত্রণ করা করুন (2)।

রাগ কী কী কারণে হতে পারে?

আগেই বলেছি যে রাগ করাটা হল খুব স্বাভাবিক। এটি আর পাঁচটা অনুভূতির মতো। সেটা কোনও সমস্যা নয়। আসল সমস্যা হল রাগ যখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় (3)। আর এমন পরিস্থিতি বিভিন্ন কারণে হাজির হতে পারে –

এমন অনেকেই আছেন, যারা পান থেকে চুন খসলেই রেগে লাল হয়ে যান। কোনও একটি জিনিস নিজের মন মতো না হলেই রাগ! বাড়ি মাথায় করেন, অযথা চিৎকার, চেঁচামেচি করতে থাকেন।

অনেকে আছে যারা ভাবেন রাগই হল সমস্যার সমাধান। এর থেকে যে আরও দশটা সমস্যা দেখা দিতে পারে সেই বোধ অনেকের থাকে। যেখানে অল্পতেই সমস্যা মেটানো যেতে পারতো, সেখানে অযথা রাগ সমস্যা আরও বাড়িতে তোলে।

বাড়ির লোকজন বা প্রিয়জন ভুলত্রুটি করলে অনেকে খুব রেগে যান। এটা বুঝতে হবে যে মানুষমাত্রেই ভুল হতে পারে। অযথা রাগ না করে সেই ভুল সুধরে নেওয়ার সুযোগ করে দিন।

অনেকে ভাবেন রাগ দেখালে নিজের গাম্ভীর্য বজায় থাকবে। তাই কেউ কোনও কিছু বলার আগে রাগ দেখান।

অনেকেই ভ্রান্ত ধারণা নিয়ে রাগ করে বসে থাকেন। রাগ কখনও এমন মাত্রাহীন হয়ে ওঠে, যে রাগের বশে কী করছেন হুশ থাকে না অনেকের। অনেকে ভাবেন রাগ করা বা না করার উপর আমাদের কোনও হাত থাকে না। কিন্তু এটা ভুল কথা। রাগ আমাদের মস্তিষ্ক নিয়ন্ত্রণ করে। বলতে পারেন আমরা জেনে বুঝেই রাগ করি। কিন্তু সেটা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে মুশকিল। সামাজিক, মানসিক এবং শারীরিক সমস্যা ডেকে আনতে পারে। প্রেসার, সুগার এবং অন্যান্য স্নায়ুঘটিত সমস্যা দেখা দিতে পারে। হার্টের সমস্যাও হতে পারে। বিশেষ করে যাদের মাইগ্রেণের সমস্যা রয়েছে তাদের জন্য রাগ অত্যন্ত ক্ষতিকারক। রাগ আপনার জীবনে খারাপ প্রভাব ফেলার আগে তাকে নিয়ন্ত্রণ করুন। আসুন জেনে নেওয়া যাক কীভাবে সহজ উপায়ে নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন।

রাগ নিয়ন্ত্রণের উপায়

এক্ষেত্রে আপনার প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত রাগ কমানো এবং রাগের বশে যে যে গুলো করে থাকেন সেগুলো ধীরে ধীরে কম করা। আপনার আশপাশের মানুষের স্বভাব, কর্মকীর্তি, কথাবার্তা হয়ত আপনি বদলাতে পারবেন না, কিন্তু চাইলে আপনি আপনার আচার-ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন। অন্যের সঙ্গে আপনি কেমন ব্যবহার করবেন তা আপনি নিজেই ঠিক করুন। রাগ যদি সমস্যা ডেকে আনছে তাহলে সেটা আগে বুঝুন কোথায় আপনার সমস্যা, তারপর সেইমতো পদক্ষেপ নিন। কীভাবে রাগ নিয়ন্ত্রণ করবেন রইল কিছু উপায় –

কাউন্টডাউন : খুব রাগ হলে অযথা চেঁচামেচি না করে চুপ করে বসে এক থেকে দশ ও ভাইস-ভারসা গুনুন। দেখবেন এই পদ্ধতিতে রাগ কমবে খুব তাড়াতাড়ি (2)।

হাঁটাহাঁটি করুন : হাঁটাচলা এমনিই স্বাস্থ্যের জন্য ভালো। রাগ নিয়ন্ত্রণেও দারুণ কার্যকরী। কারও সঙ্গে কোনও বিষয় নিয়ে রাগারাগি হলে বাইরে গিয়ে একটু হাঁটাহাঁটি করুন। নিজে কী বলছেন, কী করছেন এবং নিজের ভুল কোনটা সেটা ভাবুন। দেখবেন ধীরে ধীরে রাগ কমবে (4)।

ধ্যান করুন : ফাকা সময়ে নিয়মিত মেডিটেশন বা ধ্যান করুন। এই অভ্যাস স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী, আবার নিজের উপর নিজের নিয়ন্ত্রণও বাড়াতে পারবেন। ধ্যান মনসংযোগ বাড়াতে সাহায্য করে। সার্বিক বিকাশে সাহায্য করবে (4)।

গভীর নিঃশ্বাস নিন : যখন খুব রেগে হচ্ছে, কিছুক্ষণ চুপ করে বসুন। কোনও কিছু না ভেবে দীর্ঘ শ্বাস নিন। নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করুন। দেখবেন কিছুক্ষণের মধ্যে রাগ কিছুটা কম হবে (2)।

হালকা গান শুনুন : মানসিক সুস্বাস্থ্য বজায় রাখতে মিউজিক থেরাপি আজকাল খুব প্রচলিত। রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে হালকা মিউজিক শুনুন। এটি মস্তিষ্ককে স্থিতিশীল করবে, মাথা ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করবে।

যোগ ব্যায়াম : নিয়মিত যোগ ব্যায়াম করুন। প্রত্যেকদিন হালকা যোগ ব্যায়ামের অভ্যাস আপনার পেশিগুলিকে শিথিল করবে এবং আপনি অনেক বেশি শান্ত বোধ করবেন (2)।

কথা বলা বন্ধ করুন : রেগে গিয়ে বেশি কথা না বলাই ভালো। কারণের রাগের মাথায় মানুষ অহেতুক নানা কথা বলে ফেলে যা অনেকটা অপ্রয়োজনীয় এবং সমস্যা সৃষ্টিকারী। তাই কিছুক্ষণ চুপ করে থাকুন। কথা বলা আগে দু’বার ভাবুন। কারণ একবার কোনও কথা বলার পর তা আর ফেরানো যায় না। তাই কাকে কী বলছেন আগে ভাবুন।

পর্যাপ্ত ঘুমান : অনেক সময় ঘুম কম হওয়ার কারণে মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়। অল্পতেই সবকিছুতে বিরক্তি আসে। তাই রাতে ঠিক করে ঘুমান। ঘুমের সমস্যা থাকলে ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করুন। ঘুমাতে যাওয়ার আগে মাথা ঠান্ডা রাখুন। কোনও কিছু না ভেবে ঘুমানোর চেষ্টা করুন (4)।

অত্যধিক রাগ স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকারক

যারা কথায় কথায় রেগে যান, অত্যধিক রাগ করাটা নিজের স্বভাব হিসেবে ধরে নিয়েছেন তারা কিন্তু সাবধান। কারণ অত্যধিক রাগ কিন্তু মোটেই ভালো নয়। অনিয়ন্ত্রিত রাগ নানা শারীরিক সমস্যা ডেকে আনতে পারে। বিশেষ করে হার্টের সমস্যা, রক্তচাপ এবং দুশ্চিন্তা বাড়তে পারে। শ্বাস-প্রশ্বাসের সমস্যা দেখা দিতে পারে। যখন বার বার রাগ মাত্রা ছাড়িয়ে যায় তখন শরীরের উপর তার প্রভাব পড়তে শুরু করে। শুধু তাই নয় জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়ে। অনিয়ন্ত্রিত রাগ এইসব সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে (4)–

  • হৃদঘটিত সমস্যা (5)
  • আঘাত
  • স্নায়ুঘটিত রোগের সমস্যা
  • প্রতিরক্ষা ক্ষমতা কমে যায়
  • ত্বকে নানা সমস্যা
  • অনিদ্রা
  • উচ্চ রক্তচাপ
  • কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা
  • চিন্তা এবং অবসাদ
  • মাথাব্যথা
  • নেতিবাচক চিন্তাভাবনা

আগে থেকে উপস্থিত শারীরিক সমস্যায় জটিলতা দেখা দিতে পারে।

রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে যোগ ব্যায়াম

সারাদিনে ১০ থেকে ১৫ মিনিট যোগ ব্যায়াম আপনার শরীর ও মন ফিট রাখতে সাহায্য করবে। নিয়মিত যোগ ব্যায়াম অনুশীলনে দুশ্চিন্তা, অবসাদ, রাগ কম হতে পারে। আর এই সবকিছু জন্য মন শান্ত করা সবার আগে জরুরি।

সূর্য নমস্কার : দিন শুরু করুন সূর্য নমস্কার দিয়ে। এটি কেবলমাত্র শারীরিক সুস্থতা নয়, মানসিক ভাবেও অনেক হালকা এবং তরতাজা বোধ করতে পারবেন।

প্রাণায়াম : মাথা ঠান্ডা রাখতে এবং মানসিক দুশ্চিন্তা দূর করতে নিয়মিত প্রাণায়াম করুন। মাথা ঠান্ডা থাকলে তখন আর হঠাৎ হঠাৎ রেগে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকবে না।

যোগ, প্রাণায়াম এবং সঠিক জীবনযাপন মানসিক অস্থিরতা কাটি উঠতে সাহায্য করে। কিন্তু মন কীভাবে শান্ত রাখবেন? এর উত্তরও হল মেডিটেশন। প্রতিদিন কেবল মাত্র ২০ মিনিট ধ্যান করুন যা সারাদিন আপনাকে মানসিকভাবে চনমনে থাকতে সাহায্য করবে। তখন দেখবেন রাগ হলেও, চট করে তা কম হয়ে যাচ্ছে। সবকিছু হাসিমুখে সামলে নিতে পারছেন।

নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি অন্যরা কী বলছেন সেটা বুঝুন। কেউ কোনও দোষ করলে অযথা রাগ নয়, ক্ষমা করতে শিখুন। দোষ গুণের উর্ধে উঠে মানুষকে যদি ক্ষমা করতে পারেন তাহলেই আপনি আপনার রাগের কারণগুলো কমাতে পারবেন। সেইসঙ্গে নিজের অন্যের কাছে কীভাবে তুলে ধরছেন সেদিকে খেয়াল রাখুন। সবসময় যদি মুখ গোমড়া করে থাকেন তাহলে সেটা অন্যদের ভালো নাও লাগতে পারে। তাই চেষ্টা করুন যতটা সম্ভব হাসিখুশি থাকার। তাতে রাগ কমবে আর আপনার দিনও ভালোভাবে কাটবে।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী

রাগ কী কোনও মানসিক সমস্যা?

স্ট্রেস, পারিবারিক সমস্যা এবং আর্থিক সমস্যা সহ অনেক কিছুই রাগের পিছনে দায়ী হতে পারে। কিছু মানুষের ক্ষেত্রে রাগ অন্তর্নিহিত ব্যাধি দ্বারা সৃষ্ট, যেমন মদ্যপান বা হতাশা। রাগ কোনও ব্যাধি নয়, এটি আসলে অনুভূতি। মানসিক স্বাস্থ্যের অবস্থার লক্ষণও বলা যেতে পারে।

আমি কেন খুব তাড়াতাড়ি রেগে যায়?

রাগ করাটা স্বাভাবিক। কম বেশি সকলেরই রাগ আছে। কেবলমাত্র প্রকাশ করার ধরণটা আলাদা। কেউ নিজের মধ্যে এই অনুভূতি চেপে রাখেন, আবার কেউ রাগে ফেটে পড়েন। এর পিছনে অবশ্য একেক জনের ক্ষেত্রে আলাদা আলাদা কারণ থেকে থাকে। কেউ পারিবারিক বা ব্যক্তিগত সমস্যায় রয়েছেন, আবার হয়ত কেউ কর্মক্ষেত্রের সমস্যায় জর্জরিত। আর এইসমস্ত কারণে কেউ কেউ মেজাজ হারিয়ে বসেন, তখন অন্যের উপর রাগ দেখান।

রাগ নিয়ন্ত্রণের সেরা উপায় কী?

রাগ কমানো বিভিন্ন উপায় রয়েছে। তবে সবার আগে আপনাকে আপনার মন নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। কাকে কী বলছেন, কী করছেন ইত্যাদি ভেবে চিন্তে করতে হবে। মাথা ঠান্ডা রেখে অন্যের সঙ্গে কথা বলা উচিৎ। রেগে গেলে সবথেকে ভালো নিজে কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকুন, নিজের মনকে শান্ত করুন, নিজেকে সময় দিন সমস্তকিছু বুঝে ওঠার। কোনটা ভালো, কোনটা খারাপ সেটা যখন পরখ করতে পারবেন দেখবেন আপনার রাগও অনেকটা কমে গেছে।

Sources

Articles on StyleCraze are backed by verified information from peer-reviewed and academic research papers, reputed organizations, research institutions, and medical associations to ensure accuracy and relevance. Read our editorial policy to learn more.

  1. Anger as a Basic Emotion and Its Role in Personality Building and Pathological Growth: The Neuroscientific, Developmental and Clinical Perspectives
    https://www.ncbi.nlm.nih.gov/pmc/articles/PMC5681963/
  2. Controlling anger before it controls you
    https://www.apa.org/topics/anger/control
  3. Anger
    https://www.apa.org/topics/anger
  4. Learn to manage your anger
    https://medlineplus.gov/ency/patientinstructions/000858.htm
  5. Comparison of anger management, anxiety and perceived stress in patients with cancer and Coronary Heart Disease (CHD)
    https://www.ncbi.nlm.nih.gov/pmc/articles/PMC5319301/
Was this article helpful?
The following two tabs change content below.