সোনা পাতার উপকারিতা এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া | Senna Leaf Benefits and Side Effects in Bengali

by

আমরা যতই আধুনিকতায় গা ভাসায় না কেন, আজও পুরানো অনেক জিনিসের কদর রয়েছে। যেমন ধরুন আয়ুর্বেদিক চিকিৎসার গুরুত্ব এখনও রয়েছে। এমন অনেক গাছপালা রয়েছে যার পাতা, ফল, ফুল এবং শিকড় আয়ুর্বেদিক ওষুধ তৈরিতে ব্যবহার করা হয়। সোনা পাতাও সেই গোত্রের মধ্যে পড়ে। আপনি হয়ত আগে কখনও সোনা পাতা ব্যবহারের কথা শোনেননি। সোনা পাতা একটি বীরুৎ জাতীয় গাছ। গাছটি আমাদের দেশে সোনা পাতা, সোনামুখী নামে পরিচিত। ইংরেজিতে এই পাতার নাম Senna। বৈজ্ঞানিক নাম Cassia angustifolia Vahl। অনেকটা মেহেন্দি পাতার মতো দেখতে ঔষধি গুণমান সমৃদ্ধ এই পাতা খুবই বিরল। এর ব্যবহারে হাজারো রোগ থেকে মুক্তি পেতে পারেন। আমাদের আজকের প্রতিবেদনে বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে সোনা পাতার উপকারিতা এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে আলোচনা করা হল। এছাড়়াও সোনা পাতা কীভাবে ব্যবহৃত হয় সেটা উল্লেখ করা হল।

সোনা পাতার উপকারিতা

আয়ুর্বেদিক বৈশিষ্ট্যের কারণে সোনা পাতা সেবনের স্বাস্থ্য উপকারিতা অনেক। এতে মিনারেল, লবণ, ক্যালসিয়াম ও ফ্লাবিনয়েড নামে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট এবং বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক উপাদান রয়েছে। তবে মনে রাখবেন এটি কোনও গুরুত্বর রোগের চিকিৎসা নয়, এটি দীর্ঘদিন ব্যবহার করা উচিত নয়। আসুন ঔষধি গুণের ভিত্তিতে সোনা পাতার উপকারিতা সম্পর্কে জেনে নিন।

১. কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে

কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে সোনা পাতা দিয়ে তৈরি চা খেতে পারেন। অনেক ডাক্তার সার্জারি করার আগে পেট খালি করতে এর ব্যবহার করে থাকেন। এর মধ্যে স্টিমুল্যান্ট ল্যাক্সোটিভ প্রভাব রয়েছে, যা পেট পরিষ্কার রাখতে ওষুধের মতো কাজ করতে পারে। এর ব্যবহার অন্ত্রের ক্রিয়াকলাপকে উৎসাহ দেয়, যার কারণে অন্ত্রের গতিবিধি উন্নত হতে পারে। ফলে খাবার ভালো হজম হয় এবং মল সহজে বেরিয়ে যেতে পারে (1)।

২. ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম

মলত্যাগের অনিশ্চিত সমস্যার নাম ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম। যদিও এই রোগ মারাত্মক কিছু নয়, তবে ভোগান্তির কারণ হয়ে উঠতে পারে। সোনা পাতা এই সমস্যায় উপকার দিতে পারে। একটি গবেষণা অনুসারে, ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম (IBS) এর জন্য সোনা পাতার ব্য়বহার করা যেতে পারে (2)। ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোমের সঙ্গে অন্ত্রের ব্যথা, পেট ফাঁপা,ডায়ারিয়া এবং কোষ্ঠকাঠিন্যের মতো নানা অন্ত্র সম্পর্কিত সমস্যা রয়েছে (3)।  আমরা আগেই উল্লেখ করেছি যে, সোনা পাতায় ল্যাক্সেটিভ বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে পারে। এছাড়াও এটি বদহজম এবং পেট ফাঁপা রোধ করতে পারে। শুধু খেয়াল রাখুন যে অতিরিক্ত সোনা পাতা খাওয়া পেটে ব্যথা এবং ডায়ারিয়ার কারণ হতে পারে (2)।

৩. ওজন কমাতে

ওজন কমানোর জন্য সোনা পাতা ব্যবহার করা যেতে পারে। এনসিবিআইয়ের (ন্যাশনাল সেন্টার ফর বায়োটেকনোলজিক ইনফরমেশন) ওয়েবসাইটেও এটি উল্লেখ করা হয়েছে। জানা গেছে যে সেনা পাতা থেকে তৈরি ভেষজ চা সেবন ওজন কমাতে সহায়তা করতে পারে। সোনা পাতায় উপস্থিত সক্রিয় উপাদান অ্যানথ্রাকুইনোন ডেরাইভেটিভস এবং গ্লুকোসাইড সহায়ক বলে মনে করা হয় (4)। কেবল এক বা দু’সপ্তাহের বেশি খাবেন না (5)। এর পাশাপাশি ওজন কম করতে সুষম ডায়েট এবং নিয়মিত ব্যায়াম করাও জরুরি।

৪. সংক্রমণ থেকে মুক্তি

সংক্রমণ থেকে মুক্তি পেতে সোনা পাতা ব্যবহার করা যেতে পারে। এর উপর করা একটি গবেষণা অনুযায়ী, সোনা পাতার অর্কে অ্যান্টি-মাইক্রোবিয়াল বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এটি অ্যান্টিবায়োটিক হিসেবেও ব্যবহার করা যেতে পারে, যা ব্যাক্টেরিয়া এবং ছত্রাকের সংক্রমণ থেকে মুক্তি দিতে পারে। এটি গনোরিয়া (যৌনবাহিত রোগ), নিউমোনিয়া, মূত্রনালীর সংক্রমণ এবং মাইকোটিক সংক্রমণ থেকে রক্ষা করার জন্যও পরিচিত (6)।

৫. চুলের জন্য

সোনা পাতার উপকারিতার মধ্যে চুলের সমস্যা থেকে মুক্তির উপায়ও রয়েছে (7)। মনে করা হয়, সোনা পাতা ব্যবহার করলে চুল গোড়া থেকে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এছাড়াও এটি চুলকে কন্ডিশনিং করতে এবং চুল পড়া রোধ করতে সাহায্য করতে পারে। সোনা পাতা পিষে, এসেনসিয়াল অয়েলের সঙ্গে মিশিয়ে মাথায় লাগাতে পারেন। মিশ্রণটি কয়েক ঘণ্টা লাগিয়ে রেখে জল দিয়ে চুল ধুয়ে ফেলুন। তবে হ্যাঁ, এটির ব্যবহার চুলের জন্য কতটা উপকারী তার জন্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণের অভাব রয়েছে।

সোনা পাতা কীভাবে ব্যববহার করবেন

আপনি যদি ভাবছেন সোনা পাতা কীভাবে এবং কতটা পরিমাণে ব্যবহার করবেন, তাহলে নীচে দেওয়া তথ্য পড়ুন।

  • সোনা পাতা শুকিয়ে বা গুঁড়ো করে হার্বাল চায়ের মতো সকাল বা বিকেলে খেতে পারেন।
  • সবজি রান্না করার সময় কয়েকটি সোনা পাতা তাতে যোগ করতে পারেন।
  • সোনা পাতা দিয়ে তৈরি সিরাপ এবং ক্যাপসুলও পাওয়া যায়।

কতটা খাবেন : কিছু সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য সোনা পাতা এবং এর থেকে তৈরি উপাদানগুলি ব্যবহার করা যেতে পারে, নীচে তা উল্লেখ করা হল (8)।

  • ওজন কমাতে প্রতিদিন ২ মিলিগ্রাম সোনা পাতা দুই সপ্তাহ পর্যন্ত ব্যবহার করা যেতে পারে।
  • কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে ব্যবহৃত ক্যাপসুল এবং বড়িগুলিতে ১০ মিলিগ্রাম থেকে ৬০ মিলিগ্রাম পর্যন্ত সোনা পাতা ব্যবহার করা যেতে পারে। ১০ দিন পর্যন্ত নিয়মিত ব্যবহার করতে পারেন।

দ্রষ্টব্য : যেমনটা আগে উল্লেখ করা হয়েছে যে সোনা পাতাগুলিতে ল্যাক্সেটিভ গুণ রয়েছে, তাই ঠিক কতটা পরিমাণে গ্রহণ করবেন সে বিষয়ে সঠিক মতামত নিতে ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করুন।

সোনা পাতার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া

সোনা পাতার নিয়মিত ব্যবহার করলে শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। এটি নিম্নলিখিত সমস্যার কারণ হতে পারে (4), (9), (2) :

হজমের সমস্যাদীর্ঘদিন ধরে প্রচুর পরিমাণে সোনা পাতা খাওয়ার ফলে এতে উপস্থিত ল্যাক্সেটিভের কারণে হজমজনিত সমস্যা দেখা দিতে পারে।

ইলেক্ট্রোলাইটের সমস্যা : অতিরিক্ত সোনা পাতা ব্যবহারের ফলে শরীরে পটাসিয়ামের ঘাটতি তৈরি হতে পারে। যা ইলেক্ট্রোলাইটকে প্রভাবিত করেত পারে।

ডিহাইড্রেশন : ডিহাইড্রেশনে ভুগছেন এমন ব্যক্তিকে সোনা পাতার চা দেওয়া উচিত নয়, কারণ এর থেকে রোগীর ডায়ারিয়া হতে পারে।

কাদের সোনা পাতা দেবেন না : যাদের পেটে ব্যথা, অন্ত্রের ব্যথা, ক্রোন রোগ, আলসারেটিভ কোলাইটিস, অ্যাপেন্ডিক্স, পেটে ফোলাভাব এবং অর্শ্বরোগ ইত্যাদি রয়েছে তাদের সোনা পাতা ব্যবহার করা উচিত নয়।

এখন নিশ্চয় আপনি বুঝতে পারছেন প্রাচীন যুগে কেন গাছ-পালা দিয়ে তৈরি ওষুধ ব্যবহার করা হত। আজও সেইসমস্ত গাছ-পালার উপকারিতা কমেনি। শুধু যেটা প্রয়োজন, সেটা হল সঠিক তথ্য। এই নিবন্ধ থেকে সোনা পাতার উপকারিতা এবং পাশ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে জেনে গেলেন। এবার এটি ব্যবহার করবেন কিনা তা সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। তবে মনে রাখবেন, এটি দীর্ঘ সময়ের জন্য ব্যবহার করা মোটেও উচিত নয়। এছাড়াও এর থেকে ক্ষতি এড়াতে ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করে সোনা পাতা ব্যবহার করতে পারেন।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী

সোনা পাতার চা কী? এই চায়ের উপকারিতা পেতে কত সময় লাগে?

সোনা পাতা থেকে চা তৈরি করা হয়, যা হার্বাল টি হিসেবে গণ্য (4)। এক সপ্তাহের মধ্যে এটি ব্যবহারের উপকারিতা লক্ষ্য করতে পারবেন।

সোনা পাতা রাতে খাওয়া উচিত?

রাতে সোনা পাতা খেতে পারেন, কারণ রাতে এটি গ্রহণ করলে সকালে পেট ভালোভাবে পরিষ্কার হতে পারে।

সোনা পাতা কী লিভারের জন্য খারাপ?

হ্যাঁ, নিয়মিতভাবে কয়েক মাস ধরে প্রচুর পরিমাণে সোনা পাতা সেবন করলে হেপাটোটোক্সিসিটির (লিভার ড্যামেজ) হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। আসলে এতে ল্যাক্সেটিভ গুণ থাকে, যার বেশি পরিমাণ যকৃতের জন্য ক্ষতিকারক হতে পারে (11)।

10 Sources

Was this article helpful?
scorecardresearch