শীতকালে ত্বকের যত্ন নেওয়ার টিপস – Winter Skin Care Tips in Bengali

by

পুজোর পরেই উত্তুরে হাওয়া নিয়ে আসে শীতের আমেজ। শীতকাল মানেই নরম সোয়েটার, গরম লেপ, হট চকলেট, কফি, কেক, ক্রিসমাস আরও কত কী! অনেকেই কিন্তু এই শীতকালটা বেশ তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করেন। আবার শীতকাল পড়তেই শুরু হয়ে যায় বিয়ের মরশুম। সঙ্গে চুটিয়ে সাজগোজের প্ল্যানিং! কারণ মেকআপ নষ্ট হয়ে যাওয়ার ভয়টা এই সময় থাকে না। সব মিলিয়ে শীতকাল মানে বেশ জমজমাট একটা ব্যাপার। শীতকালের আলাদাই জাদু আছে। কিন্তু আপনার ত্বকের ওপর এই শীতের কী প্রভাব পড়ে কখনও ভেবে দেখেছেন? শীতকালের ঠাণ্ডা শুষ্ক বাতাস ত্বকের প্রাকৃতিক আর্দ্রতা কেড়ে নেয়। আর ত্বককে এতটাই রুক্ষ-শুষ্ক ও নির্জীব করে তোলে যে, এগজিমা, সোরাইসিসের মতো চর্মরোগের সৃষ্টি করে। তাই শীতকালে ত্বকের জৌলুস বজায় রাখতে হলে যত্ন নিতে হবে শুরু থেকেই। শীতকালে কী করে আমাদের ত্বকের যত্ন নিতে হবে তার জন্য রইল কিছু টিপস্।

শীতকালে ত্বকের যত্নের জন্য কিছু ঘরোয়া টিপস

ত্বকের পরিচর্যা ছাড়া শীতকাল কিন্তু অসম্পূর্ণ। বহুকাল ধরেই ঘরোয়া উপায়ে রূপচর্চা চলে আসছে। আজকের যুগে দাঁড়িয়েও সেই ঘরোয়া উপদানগুলি অনবদ্য। শীতকালে ত্বকের প্রয়োজন বাড়তি যত্নের। আপনার ঘরের মধ্যেই আছে বেশ কিছু টোটকা, যা আপনাকে শীতকালেও দীপ্তিময় ত্বক পেতে সাহায্য করে ।

১. ঘরোয়া টিপস ১: পেঁপে ও মধুর ফেসপ্যাকঃ

পাকা পেঁপে ত্বকের জন্য ভীষণ উপকারী। পাকা পেঁপেতে প্রচুর পরমাণে অ্যান্টি অক্সিডেন্ট থাকায় এটি অ্যান্টি এজিং এজেন্ট হিসেবে কাজ করে। আর অন্যদিকে মধু হল প্রাকৃতিক ময়েশ্চারাইজার যা আপনার ত্বককে করে তোলে নরম এবং কোমল। (১)

উপকরণ

একটি পাকা পেঁপে এবং মধু

কীভাবে ফেসপ্যাক তৈরি করবেন?

পাকা পেঁপেটি থেঁতো করে একটি পেস্ট তৈরি করুন। তাতে মধু মিশিয়ে ঘন পেস্টটি মুখে, গলায়, হাতে লাগিয়ে নিন। ২০ মিনিট রেখে জল দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। সপ্তাহে এক দিন করে এই ফেসপ্যাক ব্যবহার করলেই আপনি পাবেন আকর্ষণীয় ত্বক।

২. ঘরোয়া টিপস ২: দই দিয়ে তৈরি ফেসপ্যাক

দই ত্বককে ময়েশ্চারাইজ করার পাশাপাশি ত্বকের নমনীয়তা বাড়ায় এবং ত্বক যাতে দ্রুত ঝুলে না যায় সেদিকেও খেয়াল রাখে। (২) দই দিয়ে বিভিন্ন রকম ফেসপ্যাক বানানো যায়। তার মধ্যে সবচেয়ে সহজ এবং কার্যকর ঘরোয়া উপায়টি আপনাদের জানাচ্ছি।

উপকরণ

 একটা ছোট বাটি দই ও এক টেবিল চামচ মধু

কীভাবে তৈরি করবেন?

একটি বাটিতে দই ও মধু মিশিয়ে নিন। তারপর ত্বকে এই ফেসপ্যাকটি লাগান। ১৫ মিনিট পর ধুয়ে নিন। এবার নিজেই অনুভব করবেন যে, আপনার ত্বক আগের থেকে অনেক বেশি কোমল এবং সুন্দর হয়ে গেছে।

৩. ঘরোয়া টিপস ৩ঃ গ্লিসারিন

গ্লিসারিন এমন একটি কার্যকরী উপাদান যা ত্বকের আর্দ্রতা পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম। (৩) তাই শীতকালীন রূপচর্চায় এটি একটি অত্যাবশ্যকীয় জিনিস।

উপকরণ 

 গ্লিসারিন ও তুলো

কীভাবে ব্যবহার করবেন?

তুলোয় করে গ্লিসারিন নিয়ে রুক্ষ শুষ্ক ত্বকে, কিংবা ফাটা জায়গায় লাগান। দেখবেন, অনেক উপকার পাবেন। সপ্তাহে বেশ কয়েকবার গ্লিসারিন ব্যবহার করতেই হবে। তাহলে খুব কম সময়ে আপনি ফল পাবেন। গ্লিসারিনের সঙ্গে অনেকে আবার জলও মিশিয়ে থাকেন। তবে এটা সম্পূর্ণ আপনার পছন্দের ওপর নির্ভর করছে।

৪. ঘরোয়া টিপস ৪ঃ ডিম ও অলিভ অয়েলের প্যাক

অলিভ অয়েল একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান যা শীতকালে ত্বকের যত্নে অবশ্যই থাকা উচিৎ। অলিভ অয়েলে রয়েছে প্রচুর গুণ যা ত্বককে করে তোলে স্বাস্থ্যোজ্জ্বল। অপরদিকে ডিমের সাদা অংশ ত্বককে টানটান করে তোলে।

উপকরণ

 একটি ডিমের সাদা অংশ এবং দুই টেবিল চামচ অলিভ অয়েল

কীভাবে তৈরি করবেন?

ডিমের সাদা অংশ এবং অলিভ অয়েল মিশিয়ে নিয়ে মুখে লাগিয়ে রাখুন। ১৫-২০ মিনিট পর তা ধুয়ে ফেলুন। সপ্তাহে ২ দিন করলে কিছুদিন পর থেকে আপনি নিজেই পার্থক্য দেখতে পাবেন। এবং বুঝতেও পারবেন যে, কেমন আপনার ত্বক উজ্জ্বল ও টানটান হয়ে উঠেছে।

৫. ঘরোয়া টিপস ৫ঃ নারকেল তেল

নারকেল তেলে থাকে উপকারী কিছু বায়োঅ্যাক্টিভ উপাদান। সেগুলির জন্য নারকেল তেল খুব শুষ্ক ত্বকের জন্য ভীষণ ভালো। এটি দারুণ ময়েশ্চারাইজার হিসেবেও কাজ করে এবং ত্বকের উপরিতল থেকে আর্দ্রতা হারিয়ে যাওয়া প্রতিরোধ করে। (৪)

উপকরণ 

ভার্জিন বা বিশুদ্ধ নারকেল তেল

 কী করবেন?

শুষ্ক ত্বকে এই নারকেল তেল লাগিয়ে ম্যাসাজ করুন। কিছুক্ষণ রেখে দিন তবে ধুয়ে ফেলার কোনও দরকার নেই। প্রতিদিন একবার করে করলেই চকচকে মসৃণ ত্বক পেয়ে যাবেন।

ভার্জিন নারকেল তেল স্কিন ও চুলের জন্য খুব ভালো কাজ করে। চুলের স্বাস্থ্য বজায় রাখার পাশাপাশি ত্বককে ময়েশ্চারাইজও করে।

৬. ঘরোয়া টিপস ৬ঃ দুধ ও আমন্ডের প্যাক

আমন্ডে আছে এমন সব বায়োঅ্যাক্টিভ উপাদান যা শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় তো বটেই ত্বকের জন্যও উপকারী। (৫) আমন্ড ত্বকের আর্দ্রতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। আমন্ড ও দুধের ফেসপ্যাক ত্বকের রুক্ষতা কমিয়ে ত্বককে করে তোলে কোমল। এছাড়া আমন্ড বাদামে থাকা ভিটামিন-ই ত্বকের জন্যও খুব উপকারী একটি উপাদান।

উপকরণ : ১-২ টেবিল চামচ আমন্ড পাউডার ও ১-২ টেবিল চামচ দুধ

কীভাবে তৈরি করবেন?

আমন্ড পাউডার ও দুধ মিশিয়ে ঘন পেস্ট তৈরি করুন। তা শুষ্ক ত্বকে লাগিয়ে ১০ মিনিট বিশ্রাম করুন। তারপর জল দিয়ে ধুয়ে ফেলে দিন। সপ্তাহে দুইদিন থেকে তিনদিন করলেই আপনার ত্বকে উজ্জ্বলতা বাড়বে।

সতর্কতা

আপনার ত্বকে যদি দুধ অ্যালার্জি সৃষ্টি করে, তাহলে কিন্তু এই প্যাকটি ব্যবহার করবেন না।

৭. ঘরোয়া টিপস ৭ঃ অ্যাভোকাডো ও মধুর ফেসপ্যাক

অ্যাভোকাডোতে উপস্থিত প্রাকৃতিক তেল ত্বকের রুক্ষতাকে দূরে সরিয়ে ত্বককে করে তোলে কোমল। অ্যাভোকাডোর এই বিশেষ গুণাবলীর জন্য অনেক ফেসপ্যাক, ফেসওয়াশে এটিকে উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

 উপকরণ 

একটি অ্যাভোকাডো ও পরিমাণ মতো মধু

কীভাবে তৈরি করবেন?

অ্যাভোকাডো ও মধু নিয়ে একটা পেস্ট তৈরি করে ১৫ মিনিট অপেক্ষা করুন। তারপর ধুয়ে ফেলুন। এই প্যাক ব্যবহার করলে ত্বক নরম ও মসৃণ হয়।

৮. ঘরোয়া টিপস ৮ঃ লেবু ও মধুর ফেসপ্যাক

লেবু ভিটামিন সি-এ ভরপুর এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ। আবার মধু হল প্রাকৃতিক ময়েশ্চারাইজার। (৬) এদের একসঙ্গে মেশালে অসাধারণ একটি প্যাক তৈরি হয়, যা ত্বক এবং চুল দুটির জন্যই ভীষণ ভালো।

 উপকরণ : একটি পাতিলেবু ও মধু

কীভাবে তৈরি করবেন?

ওই পাতিলেবুর রস এবং মধু ভালো করে মিশিয়ে এই ফেসপ্যাক তৈরি করা হয়। এটি মুখে লাগিয়ে ২০ মিনিট অপেক্ষা করার পর জল দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। সপ্তাহে দুইদিন এই ফেসপ্যাক লাগালে ত্বক শীতকালেও যত্নে থাকে।

৯. ঘরোয়া টিপস ৯ঃ পেট্রোলিয়াম জেলি

পেট্রোলিয়াম জেলির অসাধারণ আর্দ্রতা ধরে রাখার ক্ষমতার জন্য এটি ময়েশ্চারাইজিং এজেন্ট হিসেবে ব্যবহৃত হয়। অন্যান্য প্রাকৃতিক পদার্থের তুলনায় পেট্রোলিয়াম জেলি অনেক বেশি ত্বকের শুষ্কতা হারিয়ে যাওয়া প্রতিরোধ করে। (৭)

উপকরণ : পরিমাণ মতো পেট্রোলিয়াম জেলি

কী করবেন?

এই পেট্রোলিয়াম জেলি রুক্ষ ফাটা জায়গায় লাগিয়ে আস্তে আস্তে ঘষে ম্যাসাজ করে রেখে দিন। প্রত্যেকদিন একবার করে করলেই আপনার ত্বক হয়ে উঠবে কোমল। এর ফলে খুব সহজেই ফাটা শুষ্ক ত্বক হয়ে ওঠে মসৃণ। তাই বহুদিন থেকেই শীতের ত্বকের যত্নে পেট্রোলিয়াম জেলি পাকাপাকিভাবে জায়গা করে নিয়েছে।

১০. ঘরোয়া টিপস ১০ঃ কলা

আমরা জানি, কলায় প্রচুর পরিমাণে আয়রন আছে। তাই রোজ একটি করে কলা খাওয়া উচিৎ। এতে আমাদের শরীরে আয়রনের ঘাটতি হবে না। কিন্তু আপনি কি জানেন পাকা কলা শীতকালে ত্বকের পরিচর্যায় ভীষণ উপকারী? কলা ত্বককে করে তোকে নরম। কলা থেকে তৈরি মাস্কও তাই খুব প্রচলিত।

উপকরণ 

 একটি পাকা কলা ও মধু

কীভাবে ফেসপ্যাক তৈরি করবেন?

পাকা কলা ও মধুকে একসঙ্গে ব্লেন্ড করে নিলে একটি ঘন চটচটে মাস্ক তৈরি হয়। এটা মুখে, হাতে লাগান প্রলেপের মতো। মিনিট কুড়ি পরে জল দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। নিয়মিত এই মাস্ক ব্যবহার করলে ত্বক পাবে প্রয়োজনীয় ময়েশ্চারাইজার আর হয়ে উঠবে কোমল।

১১. ঘরোয়া টিপস ১১ঃ কাঁচা দুধ আর মধুর ফেসপ্যাক

ঠাণ্ডা কাঁচা দুধ রুক্ষ, শুষ্ক ত্বকের জ্বালা মেটায়। এবং দুধে উপস্থিত ল্যাকটিক অ্যাসিডের প্রভাবে ত্বক ঝলমলিয়ে ওঠে।

উপকরণ: কাঁচা দুধ দুই টেবিল চামচ এবং এক টেবিল চামচ মধু

কীভাবে ব্যবহার করবেন?

কাঁচা দুধের সঙ্গে মধু মিশিয়ে একটি তরল প্যাক তৈরি করুন। মুখের সঙ্গে সারা গায়েও এটি মাখতে পারেন। স্নানের আগে এটি মাখতে হবে। কিছুক্ষণ রেখে শুকিয়ে গেলে ধুয়ে ফেলুন ও স্নান সেরে নিন। শীতকালে সপ্তাহে তিন দিন এই প্যাক লাগালে আপনি পেয়ে যাবেন উজ্জ্বল ত্বক। 

 শীতকালে ত্বকের যত্নের জন্য আরও অন্যান্য টিপস্

উপরে যেসব ঘরোয়া টোটকার কথা বলা হল, শীতকালে ত্বকের যত্ন নিতে সেগুলি যে খুব উপকারী তা আপনারা নিয়মিত ব্যবহারেই বুঝতে পারবেন। কিন্তু সেগুলি ছাড়াও আরও কিছু বিশেষ টিপস আছে, যেগুলি মাথায় রাখলে আপনি শীতকালেও ঝকঝকে ত্বকের অধিকারী হতে পারেন।

১. পর্যাপ্ত জল পান

শীতকালে জল খাওয়ার প্রবণতা কমে যায়। ফলে শরীর শুষ্ক হয়ে যায়। এতে ত্বকের ক্ষতি হয়। ত্বককে সুস্থ ও সুন্দর রাখতে সব ঋতুতেই প্রচুর পরিমাণে জল খেতে হবে। শীতকালেও অন্তত পক্ষে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ৩ থেকে ৪ লিটার জল পান করা উচিৎ। পর্যাপ্ত পরিমাণে জল শরীরে জলের মাত্রা ঠিক রাখবে এবং এতে ত্বকও সুন্দর থাকে।

২. ময়েশ্চারাইজার

ত্বক পরিষ্কার রাখা ও ময়েশ্চারাইজিং করাই হল ত্বক সুন্দর ও ঝলমলে রাখার মূল মন্ত্র। বাজারে যেসব ময়েশ্চারাইজার পাওয়া যায় সেগুলির পরিবর্তে আপনি প্রাকৃতিক ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করতে পারেন। যেমন- নারকেল তেল বা অলিভ অয়েল হাতে, পায়ে, গায়ে ম্যাসাজ করতে পারেন। বাদাম তেল ও অ্যালোভেরা জেল মিশিয়ে তৈরি করে নিতে পারেন নিজস্ব ময়েশ্চাররাইজার, যার গুণ আপনি কিছুদিন ব্যবহার করলেই বুঝতে পারবেন।

৩. সঠিক ডায়েট

শীতকালে যেমন থাকে শাক সবজির প্রাচুর্য, তেমনই থাকে মরশুমি ফলের সম্ভার। শীতকালে আপনার খাদ্য তালিকায় যোগ করুন ওমেগা ফ্যাটি অ্যাসিড, ভিটামিন সি, ম্যাগনেসিয়ামযুক্ত খাবার। বেরি ভিটামিন আর অ্যান্টি অক্সিডেন্টের অসাধারণ উৎস যা শীতকালীন ঠাণ্ডা আবহাওয়ায় শরীর ও ত্বককে সুস্থ রাখার জন্য খুবই জরুরি। শীতকাল হল বেরির মরশুম। র‍্যাসপবেরি, ব্লুবেরি, স্ট্রবেরি, চেরি, আঙুর – আপনার যা খেতে ভালো লাগে, তাই খান। কমলালেবু শীতের সুপারহিট ফল যাতে আছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি। এছাড়া শীতকালে ডায়েটে রাখুন স্যালাড। আবার ভেজিটেবল স্যুপও খেতে পারেন। আপনি যদি রোজ পর্যাপ্ত জল না পান করেন তার বদলে অবশ্যই জুস, দুধ এবং বেশি করে ফল খাবেন। এতে শরীরে জলের মাত্রা ঠিক থাকে এবং শরীর প্রয়োজনীয় উপাদান পেলে ত্বক সুন্দর ও উজ্জ্বল থাকে।

৪. দৈনন্দিন ত্বকের যত্ন

ত্বকের যত্নের প্রাথমিক ধাপ হল নিয়মিত ক্লিনজিং, টোনিং ও ময়েশ্চারাইজিং করা। নিয়ম মেনে এই রুটিন অনুযায়ী দিনে দু’বার এই তিনটি ধাপ অনুসরণ করলে আপনাকে আর ত্বক নিয়ে চিন্তা করতে হবে না। দিনে অন্তত দু’বার স্কিন ক্লিনজিং করা উচিৎ। ঘুমোতে যাওয়ার আগে একটা ভালো নাইট ক্রিম ব্যবহার করুন। সকালে একটু হালকা ধরনের ময়েশ্চারাইজার লাগান। সদ্য ফেসওয়াশ করা হয়েছে এরকম ত্বক খুব ভালো ময়েশ্চারাইজার শোষণ করে। তাই ময়েশ্চারাইজার লাগানোর আগে অবশ্যই ত্বক পরিষ্কার করে নিন।

সপ্তাহে এক-দু’দিন স্ক্রাবার দিয়ে ত্বক পরিষ্কার করে ত্বকের মৃত কোষগুলি সরিয়ে ফেলুন। এটি একটি খুব জরুরি কাজ এবং এতে ত্বক পুনরুজ্জীবিত হয়। তবে রোজ স্ক্রাবিং করা ঠিক নয়, সেনসেটিভ স্কিন হলে সপ্তাহে এক দিন যথেষ্ট। শুষ্ক ত্বক হলে খুব আস্তে আস্তে হাল্কা করে স্ক্রাবিং করতে হবে।

৫. শরীর চর্চা

শীতকালে গরম লেপের তলার আরাম থেকে বেরিয়ে এসে ব্যায়াম করা সত্যিই চ্যালেঞ্জিং কাজ। কিন্তু আপনি যদি আপনার ত্বককে ভালোবাসেন, তাহলে এটা অবশ্যই করতে হবে। ব্যায়াম করলে হৃদযন্ত্র সুস্থ থাকে, শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে রক্ত চলাচল বৃদ্ধি হয়, এতে স্কিনও সুস্থ থাকে এবং আরও উজ্জ্বল হয়। শীতকালে দেহের তৈল গ্রন্থি, ঘর্ম গ্রন্থি, শিরা উপশিরাগুলি সংকুচিত হয়ে যায়। এইজন্য দরকার ব্যায়াম। নিয়মিত ব্যায়াম করলে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও বাড়ে। ফলে সুস্বাস্থ্যের সঙ্গে সুন্দর ত্বকও পাওয়া যায়।

৬. হাত ও পায়ের যত্ন

মুখমণ্ডলের পরিচর্যা করতে করতে কিন্তু হাতের কথা ভুললে চলবে না। হাতের ত্বক খুব তাড়াতাড়ি আর্দ্রতা হারিয়ে ফেলে কারণ কিছু তৈলগ্রন্থি হাতেই উপস্থিত। তাই রোজ রাতে শুতে যাওয়ার আগে একটা ভালো ময়েশ্চারাইজিং লোশন মেখে ঘুমোন।

মুখ ও হাতের চর্চার পর কিন্তু পা ব্রাত্যই থেকে যায়! কিন্তু পায়ের যত্ন আগে থেকেই শুরু করে দেওয়া উচিৎ। কারণ, শীত পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই অনেকের পায়ের গোড়ালি ফাটার সমস্যা দেখা যায়। সেক্ষেত্রে পেট্রোলিয়াম জেলি বা গ্লিসারিন-বেসড ফুট ক্রিম বা লোশন লাগাতে হবে। মাঝে মাঝে পেডিকিওর করালেও মন্দ হয় না! মাঝে মাঝে পায়েও স্ক্রাবিং করা দরকার কারণ তাতে লোশন বেশ কার্যকরী হয়। 

৭. ত্বকের সুরক্ষা

গ্রীষ্মকালে যেমন ত্বককে রোদের হাত থেকে বাঁচাতে হয় শীতকালেও কিন্তু ঠাণ্ডা হাওয়া, তুষারপাত, শীতকালীন বৃষ্টি ইত্যাদি থেকে ত্বককে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। তার জন্য পরতে হবে গ্লাভস, টুপি, মাফলার, সোয়েটার। আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ জিনিস মনে করিয়ে দিই। শীতকালের মিষ্টি রোদ গায়ে লাগলে ভালো তো লাগে বটেই কিন্তু সেই রোদেও রয়েছে সূর্যের ক্ষতিকারক ইউভি রশ্মি যা ত্বককে ড্যামেজ করে। অতএব, শীতকালে সানস্ক্রিন ক্রিম ভুললে সেটা খুব বড় ভুল হবে। যে সমস্ত সানস্ক্রিনে টিটানিয়াম ডাইঅক্সাইড বা জিঙ্ক অক্সাইড আছে, সেসমস্ত সানস্ক্রিনই বেছে নিন। বাজারে বিভিন্ন প্রকার সানস্ক্রিন পাওয়া যায়, আপনার ত্বকের ধরন অনুযায়ী সানস্ক্রিন নির্বাচন করুন। আর কেনার সময় এসপিএফের মাত্রা দেখতে ভুলবেন না। রোদ চশমাও সঙ্গে রাখুন, রোদে বেরোলে অবশ্যই ব্যবহার করুন।

৮. সঠিক ক্রিম ও ফেসওয়াশ নির্বাচন

ফেসওয়াশ ও ক্রিম ঋতুর সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তন করা উচিৎ, এবং তা অবশ্যই আপনার ত্বকের ধরন হিসেবে। যে প্রোডাক্টগুলি ব্যবহার করে আপনি গ্রীষ্মকালে খুব ভালো ফলাফল পেয়েছেন, শীতকালেও একই ফল পাবেন – এমনটা কিন্তু নাও হতে পারে। তাই ফেসওয়াশ, ক্রিম খুব সচেতন হয়ে নির্বাচন করতে হবে। মাইল্ড স্কিন কেয়ার প্রোডাক্ট ব্যবহার করাই হল সুন্দর ত্বক পাওয়ার চাবিকাঠি। যেহেতু শীতকালে আমাদের ত্বক খুব শুষ্ক থাকে, তাই ময়েশ্চারাইজার সমৃদ্ধ ক্লিনজার ব্যবহার করাই শ্রেয়। যাঁদের ত্বকে অ্যাকনে, ব্রণের সমস্যা আছে, তাঁরা হ্যালুরনিক অ্যাসিড, সিরামাইড, গ্লিসারিন, সিরামযুক্ত প্রোডাক্ট ব্যবহার করুন।

৯. যা কিছু এড়িয়ে চলতে হবে

  • শীতকালে পারদ যখন নামতে থাকে, স্নান করাটা তখন যেন দুঃস্বপ্নের মতো হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু গরম জলে স্নান করার মজা যদি নিতে চান, তার আগেই মনে করিয়ে দিই গরম জল আপনার ত্বককে খুব তাড়াতাড়ি শুষ্ক করে তোলে। যদি তৎক্ষণাৎ ময়েশ্চারাইজার না লাগানো হয়, তাহলে কিন্তু ত্বক ফেটে যায়। এমনকি এগজিমার মতো ত্বকের রোগ হওয়ারও সম্ভাবনা থাকে। তাই ঈষদুষ্ণ জলে স্নান করা উচিৎ। স্নানের জলে কয়েক ফোঁটা এসেনসিয়াল অয়েল মিশিয়ে দিলে ত্বক যেমন ভালো থাকে, এসেনসিয়াল অয়েল তেমন আপনার দেহ ও মনকেও সতেজ করে তোলে। গরম জলে স্নান করার পর হ্যালুরনিক অ্যাসিড ও সিরামাইড যুক্ত ময়েশ্চারাইজার লাগাতে হবে যা ত্বককে তাড়াতাড়ি শুষ্ক হতে দেয় না।
  • কোনও ক্রিম হোক বা কোনও পশমের পোশাক – যাতে আপনার ত্বক স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে না সেইসব জিনিস ত্যাগ করুন। তার পরিবর্তে এমন জিনিস ব্যবহার করুন যা আপনার ত্বকের জন্য আরামদায়ক। অ্যাসট্রিনজেন্ট, অ্যালকোহল যুক্ত টোনার ব্যবহার করা বন্ধ করুন। কারণ এগুলি ত্বককে আরও শুষ্ক করে তোলে।

১০. ঠোঁটের যত্ন

আমাদের শরীরের সবচেয়ে কোমল অংশ হল ঠোঁট। শীতকালের রুক্ষ আহাওয়া ঠোঁটের ময়েশ্চারাইজারও দ্রুত কেড়ে নেয়। ফলতঃ আমাদের ঠোঁট ফেটে যাওয়ার সমস্যা দেখা যায়। তাই ঠোঁটে ঘনঘন লিপবাম লাগাতে পারেন। এক্ষেত্রে পেট্রোলিয়াম জেলিও খুব ভালো কাজ করে। ম্যাট লিপস্টিক ব্যবহার না করাই ভালো। লিপ টিন্ট ব্যবহার করলে ঠোঁট নরম থাকে। 

আমরা যেসব উপায় বললাম, তার মধ্যে বেশিরভাগ টিপসগুলিই কিন্তু খুব সহজ, যা আপনারা দৈনন্দিন জীবনে অনুসরণ করতে পারেন। আপনার কাছে আরও কোনও স্পেশাল টিপস্ থাকলে অবশ্যই জানাবেন। এইরকম আরও সুন্দর সুন্দর টিপস্ পেতে জুড়ে থাকুন আমাদের সঙ্গে। সুস্থ থাকুন, ভালো থাকুন।

প্রায়সই জিজ্ঞাস্য প্রশ্নাবলী :

শীতকালে বাড়িতে কী করে ত্বকের যত্ন নেব?

বাড়িতে থেকেই শীতকালে ত্বকের যত্ন নেওয়া যায়। নিয়মিত রুটিন মাফিক ত্বকের ক্লিনজিং, টোনিং ও ময়েশ্চারাইজিং করুন। মৃত কোষ তুলতে সপ্তাহে একদিন স্ক্রাবিং করুন। আপনার ডায়েট যেন সঠিক হয়। প্রতিদিন এক্সারসাইজের সঙ্গে সঙ্গে প্রচুর জল খান। খাদ্যতালিকায় থাকুক অনেক ফল। হাত ও পায়ের ত্বক খুব শুষ্ক মনে হলে অলিভ অয়েল বা বিশুদ্ধ নারকেল তেল দিয়ে ম্যাসাজ করুন।

শীতকালের রুক্ষ শুষ্ক ত্বকের থেকে কী করে মুক্তি পাব?

রুক্ষ শুষ্ক ত্বককে সুন্দর ও মসৃণ করে তুলতে অলিভ অয়েল, বাদাম তেল, নারকেল তেলের জুড়ি মেলা ভার। এই তেলগুলি ত্বকে ম্যাসাজ করলে ত্বকের রুক্ষতা দূর হয়। এছাড়াও ময়েশ্চারাইজিং লোশন, ক্রিম তো রয়েইছে। ত্বকের হারিয়ে যাওয়া ঔজ্জ্বল্য ফিরে পেতে ঘরোয়া ফেসপ্যাক বা মাস্ক ব্যবহার করুন।

শীতকালে মুখে কী মাখা উচিৎ?

শীতকালে দিনে দু’বার মাইল্ড ফেসওয়াশ দিয়ে মুখ ধুয়ে ময়েশ্চারাইজার লাগানো উচিৎ। চোখের কোণে বাদাম তেল ম্যাসাজ করতে পারেন। এছাড়া ঘরোয়া উপায়ে ফেসপ্যাক (যেমন- কাঁচা দুধ ও মধুর ফেসপ্যাক, পাকা কলা ও মধুর ফেসপ্যাক) বানিয়ে লাগাতে পারেন।

শীতকালে কীভাবে ত্বকের পরিচর্যা করব?

শীতকালে ত্বককে পরিষ্কার রাখতে হবে। প্রচুর পরিমাণে ময়েশ্চারাইজার লাগাতে হবে যাতে ত্বক শুষ্ক না হয়ে পড়ে। প্রচুর পরিমাণে জল, মরশুমি ফল, ভিটামিনযুক্ত খাদ্য খেতে হবে। ভেতর থেকে ত্বককে সুস্থ করে তুললে বাইরেও ত্বককে সুন্দর দেখাবে।

7 sources

Stylecraze has strict sourcing guidelines and relies on peer-reviewed studies, academic research institutions, and medical associations. We avoid using tertiary references. You can learn more about how we ensure our content is accurate and current by reading our editorial policy.

Was this article helpful?
scorecardresearch