সরষের উপকারিতা, ব্যবহার ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া | All About Mustard Seeds in Bengali

by

সরষের কথা উঠলেই বাঙালিদের মনে সবচেয়ে আগে আসে সরষে বাটার কথা। বাঙালির ঐতিহ্যপূর্ণ যে কোনও রান্নাতেই সরষে যেন এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। সে কোনও নিরামিষ পুরনো রান্নাই হোক কিংবা মাছের কোনও পদ। তা এহেন সরষে যে কেবল স্বাদেই অপূর্ব এমনটা নয়, বরং এর পুষ্টিগুণও অত্যন্ত বেশি। সরষে যে আমরা কেবল বেটে কিংবা গোটা দানা হিসেবে খাই তাই নয়, বরং সরষে পিষে যে তেল বের হয়, সেই তেল কিন্তু আমাদের রোজকার রান্নার এক অপরিহার্য অংশ। এছাড়া এই তেল আমরা আরও অন্যান্য কাজেও ব্যবহার করে থাকি। সেই বিষয়েও আমরা নীচে আলোচনা করব।

স্টাইলক্রেজের এই প্রতিবেদনে আমরা আমাদের শরীরের জন্য সরষে দানার উপকারিতা ও পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব। সরষে দানা আমাদের শরীরের জন্য কতটা উপযোগী তা যেমন জানাব, তেমনই জানাব সরষের ব্যবহার কী কী ভাবে করা যায়। তবে শরীরের সুস্থতা বজায় রাখতে সরষে যে ভীষণ উপকারী তা আমরা অনেকেই জানি, কিন্তু গুরুতর কোনও রোগ হলে অবশ্যই ডাক্তারের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত।

এই বিষয়ে নীচে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করলাম।

সরষে দানা কী?

এই প্রতিবেদন পড়ার আগে চলুন শুরুতেই আমরা জেনে নিই যে সরষে দানা আসলে কী? তবে সরষের সম্বন্ধে একেবারেই কিছু জানেন না, এমন মানুশ বোধহয় খুঁজে পাওয়াই দুষ্কর। সরষে হল ক্রুসিফেরা কিংবা ব্রেসিকেসি জাতের এক প্রকার গাছ। এই গাছ সাধারণত ১ ফুট থেকে ৩ ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়ে থাকে। এই গাছের পাতাকে অনেকে শাক হিসেবেও খেয়ে থাকেন। আর সরষে শাক ভারতের বিভিন্ন অংশের মানুষের অন্যতম প্রিয় একটি খাবার। আর এই গাছের ফুল ও বীজ থেকে নিষ্কাশন করা হয় তেল। যার সম্বন্ধে আমরা আগেই বললাম যে এটি আমাদের জীবনের একটি অপরিহার্য অংশ। এছাড়া সরষে বীজ অর্থাৎ দানার ব্যবহার তো আমরা মশলা হিসেবে করেই থাকি।

সরষের বিষয়ে আরও জানতে আমরা নীচে আলোচনা করলাম।

সরষে কী, এই বিষয়ে জানানোর পর এবার আমরা আপনাদের জানাব যে সরষে ঠিক কত প্রকারের হয় ও কী কী?

সরষে কয় প্রকার ও কী কী?

সরষে মূলত তিন প্রকারের হয়ে থাকে। কালো সরষে, হলুদ বা সাদা সরষে এবং বাদামী সরষে। এছাড়া সরষের সঙ্গে মিল রয়েছে এমন আরেক প্রকার দানাও পাওয়া যায়, যা রাই নামে পরিচিত। ভারতের অনেক প্রান্তে যদিও সরষেকেই রাই বলে। তবে রাই-এর দানা, সরষের দানার থেকে আকারে কিছুটা ছোট। আর রাই এবং সরষে- এই দুইয়ের স্বাদেও কিন্তু অনেকটাই পার্থক্য থাকে। যেখানে সরষে দানা থেকে তেল বের করা যায় সেখানে কিন্তু রাইয়ের দানা আচারে দেওয়া হয়। তবে যদি পুষ্টিগুণ নিয়ে আলোচনা করা হয়ে থাকে, তাহলে জানাই যে, রাই এবং সরষে দুইই কিন্তু সমান উপকারী এবং এই দুই দানারই পুষ্টিগুণ অত্যন্ত বেশি। আর ইংরেজিতে এই দুই দানাকেই মাস্টার্ড (mustard) বলা হয়ে থাকে।

নীচে আমরা এই বিষয়ে জানাব আরও কিছু তথ্য।

চলুন এবার দেখে নিই সরষেতে কী কী ঔষধিগুণ থাকে। এবং এটি স্বাস্থ্যের জন্য কেন এত বেশি উপকারী।

সরষের ঔষধিগুণ

আমাদের শরীর ও স্বাস্থ্যের জন্য সরষে বেশ অনেকরকম ভাবেই উপকারী।এনসিবিআই (ন্যাশনাল সেন্টার ফর বায়োটেকনোলজি ইনফরমেশন)- এর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্র অনুযায়ী, সরষের প্রত্যেক অংশই আমাদের শরীরের জন্য উপকারী। সরষেতে ক্যারোটিনায়ড, ফেনোলিক যৌগ এবং গ্লুকোসিনালেটসের মতো বেশ কয়েক প্রকারের ফাইটোকেমিক্যাল পাওয়া যায়। এই ফাইটোকেমিক্যালসের সাহায্যে ক্যান্সার, ডায়াবেটিস বা মধুমেহ রোগ এবং হার্টের রোগের মতো গুরুতর রোগগুলির হাত থেকে রক্ষা পাওয়া অনেকটাই সহজ হয়ে যায়। () এছাড়া এতে যে পুষ্টিগুণ রয়েছে, তা আরও অন্যান্য ভাবেও আমাদের শরীরের জন্য উপকারী। সেগুলি নিয়ে আমরা নীচে সবিস্তারে আলোচনা করলাম।

আরও তথ্য পেতে প্রতিবেদনটি পড়তে থাকুন।

সরষের উপকারিতা

এবার চলুন দেখা যাক আপনার শরীরের জন্য সরষে কী কী ভাবে উপকারী।

উপকারিতা ১ঃ ক্যান্সার রুখতে

সরষের গুণাগুণ নিয়ে যখন আমরা আলোচনা করব, তখন জানিয়েই রাখি ক্যান্সার রুখতে সরষে অত্যন্ত উপকারী। সরষের মধ্যে এমন কিছু গুণাগুণ রয়েছে, যা ক্যান্সারকে আরও ছড়াতে বাধা দেয়। এনসিবিআই-এর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে যে, সরষেতে থাকে অ্যান্টিকার্সিনোজেনিক গুণাগুণ। আর এই গুণের জন্যই সরষে আমাদের শরীরে ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়াকে অনেকটাই আটকাতে সাহায্য করে।এছাড়াও অপর একটি গবেষণাপত্রে লেখা রয়েছে যে, সরষের তেলে যে ওমেগা-৩ পলিঅনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিড থাকে, তা আমাদের কোলন ক্যান্সারের আরও বেশি করে ছড়িয়ে পড়া রুখতে অনেকটাই কার্যকরী।() আবার কিছু কিছু বৈজ্ঞানিক গবেষণায় বলা হয় যে, সরষেতে অ্যান্টি-ক্যান্সার অর্থাৎ ক্যান্সার রোখার কিছু কিছু গুণ থাকে ঠিকই, কিন্তু সরষে ক্যান্সারের চিকিৎসা করতে কখনওই সক্ষম নয়। তাই কেউ যদি ক্যান্সারের মতো এই গুরুতর রোগে আক্রান্ত হন, তাহলে তাঁর উচিৎ সবার আগে ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করা। এবং তাঁর বলে দেওয়া ওষুধ নিয়ম করে নিয়মিত খাওয়া।

উপকারিতা ২ঃ অ্যাজমা উপশমে

সরষেতে যে ঔষধি গুণগুলি থাকে তা অনেকের ক্ষেত্রে অ্যাজমা উপশমে খুব লাভজনক। একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণা অনুযায়ী, সরষে দানায় থাকে সিনাপাইন নামক কার্বনিক যৌগ। এটি আমাদের শরীরের মাংশপেশির সচলতা বাড়াতে ও ফুসফুসের কার্যক্ষমতা বাড়াতে সক্ষম। এই দুইয়ের উন্নতি মানুষের শরীরের অ্যাজমা পরিস্থিতিকে লাঘব করে এবং তা আরও ছড়িয়ে পড়তে আমাদের সাহায্য করে।()

উপকারিতা ৩ঃ মাইগ্রেন দূর করতে সাহায্য

মাইগ্রেনের সমস্যায় যাঁরা ভোগেন, তাঁরাই জানেন যে মাথায় হওয়া এই ব্যথা কতটা অসহনীয়। এই সমস্যা দূর করতে সরষে ব্যবহার অনেক ক্ষেত্রে লাভজনক হয়ে থাকে। একটি বৈজ্ঞানিক রিপোর্ট অনুযায়ী, সরষের বীজে রিবোফ্লেভিন নামের ভিটামিন মজুত থাকে। এই ভিটামিন মাইগ্রেনে সমস্যা কমাতে উপকারী। () তবে এই বিষয় নিয়ে বিস্তারিত তথ্য দিতে আরও কিছু বৈজ্ঞানিক গবেষণার দরকার। তাই যদি আপনি গুরুতর মাইগ্রেনের সমস্যায় ভোগেন, তাহলে বিন্দুমাত্র দেরি না করে সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

উপকারিতা ৪ঃ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য

রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতেও অনেক সময় সরষের ব্যবহার করা হয়ে থাকে। একটি গবেষণাপত্রে লেখা রয়েছে যে, সরষের বীজে মেথনল নির্যাস পাওয়া যায়। আর এই নির্যাসে থাকে অ্যান্টিহাইপারটেনশনের প্রভাব। তাই যদি সীমিত মাত্রায় সরষে দানা কিংবা রাই-এর দানা খাওয়া হয়, তাহলে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। ()

উপকারিতা ৫ঃ ওজন কমাতে সাহায্য

ওজন বাড়তে শুরু করলে তা যে কেবল বাহ্যিক রূপের ওপরই প্রভাব ফেলে এমন নয়, বরং তা বেশ কিছু রোগেরও সূত্রপাত করে। তাইওজন কমানোর জন্য অনেকেই সরষে দানা খেয়ে থাকেন। কারণ ওজন কমানোর জন্য সরষে দানা খুব উপকারী। হ্যাঁ ঠিকই শুনছেন। এই বিষয় অনেক বৈজ্ঞানিক গবেষণা হয়েছে এবং সেই সব গবেষণাপত্রগুলি এনসিবিআই-এর ওয়েবসাইটে প্রকাশিতও হয়েছে। সেই সব গবেষণা অনুযায়ী, সরষের বীজ থেকে যে তেল পাওয়া যায় তা আমাদের ওজন কমানোর কাজে খুবই উপযোগী। আসলে, সরষের তেলে প্রচুর পরিমাণে ডায়সিলিগ্লিসারল পাওয়া যায় (Diacylglycerol)। এই উপাদান আমাদের ওজন কমানোর কাজে সাহায্য করে। ()

উপকারিতা ৬ঃ কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য

সরষের উপকারিতা নিয়ে যখন কথা হচ্ছে, তখন বলে রাখা ভালো যে, কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতেও সরষে ভীষণ উপকারী। একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণা অনুযায়ী, সরষে প্রচুর পরিমাণে ডায়সিলিগ্লিসারল সম্বৃদ্ধ হওয়ায় তা আমাদের শরীরের কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখতে । তাই দেখা গিয়েছে যে, সরষে খেলে হাই ডেন্সিটি লিপোপ্রোটিন (এইচডিএল) অর্থাৎ ভালো কোলেস্টেরলের মাত্রা আমাদের শরীরে বৃদ্ধি পায় এবং লো ডেন্সিটি লিপোপ্রোটিন অর্থাৎ (এলডিএল) অর্থাৎ খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা কমে। তাই শরীরে কোলেস্টেরলের ভারসাম্য বজায় রাখতে অনেকেই সরষের তেল খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন।

উপকারিতা ৭ঃ মধুমেহ বা ডায়াবেটিস থেকে বাঁচতে

রক্তে গ্লুকোজের স্তর বাড়লে কিংবা অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়লে মদুমেহ রোগ বা ডায়াবেটিস হওয়ার সমস্যা দেখা দেয়। তবে এই মধুমেহ রোগ থেকে বাঁচার জন্য সরষে কিন্তু একটি অন্যতম উপকারী উপাদান। এই বিষয়ের ওপর বেশ কিছু বৈজ্ঞানিক গবেষণাও ইতিমধ্যেই হয়ে গিয়েছে। এই গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে, কালো সরষে দানায় হাইপোগ্লাইসেমিক এবং অ্যান্টিডায়াবেটিক গুণ থাকে। আর এগুলি রক্তে থাকা গ্লুকোজের স্তর কমাতে সাহায্য করে। কালো সরষের দানা টাইপ-২ ডায়াবেটিজের সমস্যার উপশমে কাজে আসে। এনসিবিআই-এর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত একটি রিসার্চ পেপারেও এই বিষয়ের উল্লেখ আছে। ()

উপকারিতা ৮ঃ রিউমেটিক বা বাতজ আর্থারাইটিস কমাতে সাহায্য করে

রিউমেটিক অর্থাৎ বাত থেকে জন্ম হওয়া আর্থারাইটিজে পায়ের গাঁট ফুলে যাওয়ার সমস্যার পাশাপাশি তাতে তীব্র ব্যথা হয়। এই সমস্যা নিরসনে সরষের তেল খুবই উপকারী। এনসিবিআই-এর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণা অনুযায়ী, সরষের তেলে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড থাকে। এটি রিউমেটিক আর্থারাইটিজের সমস্যায় উপশমের কাজ করে। আর্থারাইটিজের কারণে হওয়া ব্যথা বং পায়ের গিঁট ফুলে যাওয়ার সমস্যা কমাতেও উপকারী।

উপকারিতা ৯ঃ রাতকানার সমস্যা দূর করতে সাহায্য

রাতে দেখতে না পাওয়া কিংবা চোখের দৃষ্টি কম হয়ে যাওয়া অর্থাৎ রাতকানা সম্পর্কীয় রোগ সাধারণত ভিটামিন-এ’র অভাবেই হয়ে থাকে। সরষের ব্যবহারে এই রোগের হাত থেকে অনেক সময় মুক্তি পাওয়া যায়। এনসিবিআই-এর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত একটি গবেষণা অনুযায়ী, হলুদ বা সাদা সর্ষেতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন-এ পাওয়া যায়। ভিটামিন-এ এই রাতকানার সমস্যাকে খানিক মাত্রায় কম করতে সাহায্য করে। এটা ঠিক যে, রাতকানার সমস্যায় সরষে লাভজনক হয়ে থাকে, কিন্তু পরিস্থিতি গুরুতর হলে যত দ্রুত সম্ভব ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করে চিকিৎসা করানো উচিৎ।

উপকারিতা ১০ঃ মেনোপজের পরিস্থিতিতে উপশম

মেনোপজের সময়ে মহিলাদের মাসিক চক্র বা পিরিয়ডস সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। এই পরিস্থিতে মহিলারা আর গর্ভবতী হতে পারেন না। এছাড়াও এই সময় আরও কিছু সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় মহিলাদের। এই পরিস্থিতিতে উপশমে সাহায্য করে সরষে। একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণা অনুযায়ী, সরষেতে বেশ কিছু পরিমাণে থাকে কপার, ম্যাগনেশিয়াম, আয়রন এবং সেলেনিয়াম। এই সমস্ত পুষ্টিগুণ সম্পন্ন উপাদান মহিলাদের মেনোপজের সময় হওয়া উচ্চ রক্তচাপ এবং অস্টিয়োপোরোসিসের মতো সমস্যা থেকে উপশম দেয়।

উপকারিতা ১১ঃ ফাইবারে ভরপুর

অন্যান্য পুষ্টির পাশাপাশি ফাইবারও আমাদের শরীরের জন্য ভীষণ প্রয়োজন। কোষ্ঠকাঠিন্যের মতো পেট সম্বন্ধীয় বিভিন্ন সমস্যার হাত থেকে মুক্তি দেওয়ার পাশাপাশি ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতেও এটি অত্যন্ত জরুরি। তাই এই পুষ্টিগুণ পাওয়ার জন্য সরষে খাওয়া বেশ লাভজনক। কারণ, সরষেতে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার থাকে।

উপকারিতা ১২ঃ রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা

সর্ষে দানায় এমন কিছু গুণাগুণ থাকে যা আমাদের শরীরের বেশ কিছু রোগকে হওয়ার আগেই প্রতিরোধ করতে পারে। এগুলি সবকটিই ব্রাসিকা বংশের অংশ যার অংশ সর্ষেও। অর্থাৎ সর্ষে আমাদের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে।

উপকারিতা ১৩ঃ জ্বর ও সর্দি উপশমে

জ্বর ও সর্দির উপশমেও সরষে খুবই উপকারী। বলা হয়, পীত জ্বরে ভুগলে রোগীর পায়ের তলায় গরম জল ও সরষে মিশিয়ে যদি লাগানো হয়, তাহলে রোগী কিছুট আরাম পায়। অপর একটি গবেষণা থেকে আরও জানা যায় যে, সরষেতে থাকা গুণাবলীর জন্য জ্বর, সর্দি হলে কিংবা ঠাণ্ডা লাগলে তা ব্যবহার করা খুবই উপযোগী। তবে সরষের মধ্যে থাকা ঠিক কোন গুণটির জন্য ঠাণ্ডা লাগলে বা জ্বর-সর্দি হলে এটি উপশম ঘটায়, তা বলা মুশকিল।

উপকারিতা ১৪ঃ পিঠে ও মাংসপেশিতে ব্যথা উপশমে সাহায্য

আজকালকার ব্যস্ত জীবনের কারণে অনেকের মধ্যেই পিঠে এবং মাংসপেশিতে ব্যথার মতো সমস্যা দেখা দেয়। এই সমস্যার সমাধান হিসেবে অনেকেই সরষে কিংবা রাইয়ের ব্যবহার করে থাকেন। একটি গবেষণার মাধ্যমে জানা গিয়েছে যে, আজও অনেকে গিটের ব্যথা কিংবা মাংসপেশি বা পিঠের ব্যথার সমাধানে মলম হিসেবে সরষে ব্যবহার করে থাকেন। তবে ব্যথা উপশমে সরষে বা রাই ঠিক কীভাবে সাহায্য করে থাকে, তা এখনও গবেষণার বিষয়।

উপকারিতা ১৫ঃ সংক্রমণ রুখতে

সংক্রমণ রুখতেও সরষে কিংবা রাইয়ের ব্যবহার করা হয়ে থাকে। একটি গবেষণায় বলা হয়েছে যে, সরষে ব্যবহার করলে তা আরটিআই (রেস্পিরেটরি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন) অর্থাৎ শ্বসন তন্ত্রের সমস্যা কমাতে সাহায্য করে।সেই গবেষণায় বলা হয়েছে যে, রোগীর পায়ের তলায় দিনে একবার সরষে দানা দিয়ে ফুটবাথ নিলে দ্রুত আরাম পাওয়া যায়। এর জন্য একটি বালতিতে গরম জল নিয়ে তার মধ্যে সরষে দানা গুঁড়ো করে মিশিয়ে নিন। এবার রোগীকে বলুন তার মধ্যে পা ডুবিয়ে বসে থাকতে।

উপকারিতা ১৬ঃ ত্বকের জন্য উপকারী

বয়স বেড়ে যাওয়ায় অনেকের ত্বকেই সেই ছাপ পড়ে যায়। কেউ কেউ আবার তা একেবারেই পছন্দ করেন। মুখে বা ত্বকে বয়সের ছাপ পড়া রুখতে সরষে খুবই উপকারী। সরষেতে থাকে ভিটামিন-সি (অ্যাসকরবিক অ্যাসিড)। এই অ্যাসকরবিক অ্যাসিডকে বিভিন্ন প্রসাধনী সামগ্রী বানানর সময় ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এই উপাদানে অ্যান্টি এজিং উপাদানও থাকে। তাই বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মুখে বা ত্বকে বয়সের ছাপ পড়া রুখতে এটি খুবই উপকারী।

উপকারিতা ১৭ঃ চুলের বৃদ্ধির জন্য উপকারী

যুগের পর যুগ ধরে চুলে সরষের তেল ব্যবহারের প্রথা চলে আসছে। সরষের তেলে থাকে পর্যাপ্ত পরিমাণে ভিটামিন, প্রোটিন এবং ফ্যাটি অ্যাসিড। একটি গবেষণাপত্র অনুযায়ী, এই সবকটি পুষ্টিকর উপাদানে এমন সব গুণ আছে যা চুলের বৃদ্ধি ঘটাতে ও চুল পড়া কমাতে বিশেষ ভূমিকা গ্রহণ করে।

নীচে আরও কিছু তথ্য তুলে ধরা হল।

সরষের পুষ্টিগুণ

এবার আমরা জানাব সরষে বা রাইতে ঠিক কী কী পুষ্টিকর উপাদান কত পরিমাণে পাওয়া যায়।

পুষ্টিগুণপ্রতি ১০০ গ্রামে কত মাত্রা
জল৫.২৭ গ্রাম
ক্যালোরি৫০৮ কিলো ক্যালোরি
প্রোটিন২৬.০৮ গ্রাম
ফ্যাট৩৬.২৪ গ্রাম
কার্বোহাইড্রেট২৮.০৯ গ্রাম
ফাইবার১২.২ গ্রাম
শর্করা৬.৭৯ গ্রাম
মিনারেলস 
ক্যালশিয়ম২৬৬ মিলিগ্রাম
আয়রন৯.২১ মিলিগ্রাম
ম্যাগনেশিয়াম৩৭০ মিলিগ্রাম
ফসফরাস৮২৮ মিলিগ্রাম
পটাশিয়াম৭৩৮ মিলিগ্রাম
সোডিয়াম১৩ মিলিগ্রাম
জিংক৬.০৮ মিলিগ্রাম
ম্যাঙ্গানিজ২.৪৪৮ মিলিগ্রাম
কপার০.৬৪৫ মিলিগ্রাম
সেলেনিয়াম২০৮.১ মিলিগ্রাম
ভিটামিন 
ভিটামিন সি৭.১ মিলিগ্রাম
থায়মিন০.০৮৫ মিলিগ্রাম
রাইবোফ্লেবিন০.২৬১ মিলিগ্রাম
নিয়াসিন৪.৭৩৩ মিলিগ্রাম
ভিটামিন বি-৬০.৩৯৭ মিলিগ্রাম
ফোলেট১৬২ মাইক্রোগ্রাম
কোলিন১২২.৭ মিলিগ্রাম
ভিটামিন-এ২ মাইক্রোগ্রাম
বিটা কেরাটিন১৮ মাইক্রোগ্রাম
ভিটামিন-এ  IU৩১ IU
ভিটামিন-ই৫.০৭ মাইক্রোগ্রাম
ভিটামিন-কে৫.৪ মাইক্রোগ্রাম
লিপিড 
ফ্যাটি অ্যাসিড টোটাল স্যাচুরেটেড১.৯৮৯ গ্রাম
ফ্যাটি অ্যাসিড টোটাল মনো আনস্যাচুরেটেড২২.৫১৮ গ্রাম
ফ্যাটি অ্যাসিড টোটাল পলি আনস্যাচুরেটেড১০.০৮৮ গ্রাম

এবার আমরা আলোচনা করব সরষের ব্যবহার নিয়ে।

সরষের ব্যবহার

সরষের মধ্যে মজুত পুষ্টিগুণ সরষে দানার গুণাগুণকে আরও বাড়িয়ে তোলে। আপনি কী কী ভাবে সরষে ব্যবহার করতে পারবেন সে বিশয়ে আমরা নীচে আলোচনা করলাম।

  • কয়েক ফোঁটা সরষে তেল আপনি খাবার স্যালাডে ব্যবহার করতে পারেন।
  • শুকনো খোলায় ভেজে নেওয়া ছোলার সঙ্গেও সরষের ব্যবহার করা যেতে পারে।
  • ডাল কিংবা সবজিতে ফোড়ন দেওয়ার জন্যও সরষের ব্যবহার করা যেতে পারে।
  • এছাড়া পাপড় কিংবা পকোড়া বা বড়া ভাজার জন্য সরষের তেল ব্যবহার করা যেতে পারে।
  • ত্বকের কোনও অংশ লাল হয়ে গেলে সেই অংশে সরষের তেল লাগানো যেতে পারে।
  • চুলে লাগানোর জন্য কিংবা শরীরে মালিশ করার জন্যও সরষের তেল ব্যবহার করা যেতে পারে।
  • এবার আমরা আলোচনা করব কী করে অনেকদিন পর্যন্ত সরষের তেল সংরক্ষণ করা যেতে পারে।

সরষের তেল সংরক্ষণের উপায়

ঠিক যতটা প্রয়োজন তত পরিমাণেই সরষের তেল কিংবা সরষে দানা কিনুন। ভালো করে যদি কোনও বাক্সে কিংবা বোতলে এই সরষের তেল বা দানা রাখা হয়, তাহলে এটি অনেকদিন পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায়। ঘরের সাধারণ তাপমাত্রা যুক্ত অঞ্চলে কোনও এয়ারটাইট বাক্সেই এগুলি রাখা উচিৎ।

এবার আমরা জানব সরষের কী কী পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া রয়েছে।

সরষের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া

যদি সীমিত পরিমাণে সরষে খাওয়া যায়, তাহলে এর প্রচুর গুণাগুণ আপনি দেখতে পাবেন। আর যদি বৈজ্ঞানিক তথ্যগুলি এড়িয়ে গিয়ে আপনি সরষের ব্যবহার করেন, তাহলে তা স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়াতে পারে। এবার চলুন জেনে নিই এর ক্ষতিকর দিকগুলি।

  • কোনও কিছু ভাজার জন্য ব্যবহৃত সরষের তেল বেচে গেলে তা আর দ্বিতীয়বার ব্যবহার করবেন না। তা লাং ক্যান্সারের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
  • অনেকক্ষণ সময় অবধি ত্বকে সরষে লাগিয়ে রাখলে তা জ্বলনের সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে।
  • সরষের বীজে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন-ই থাকে। তাই বেশী পরিমাণে খেলে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
  • সরষের তেলে ইউরুসিক অ্যাসিড থাকে। তাই তা বেশি পরিমাণে খেলে আপনার শরীরে লিপোসিসের সমস্যা দেখা দিতে পারে। যা হার্টের রোগ সৃষ্টি করার মূল কারণ।
  • বেশি পরিমাণে সরষের তেল খেলে তা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর বদলে কমানোর কাজ করে।

এতক্ষণে সরষে নিয়ে আলোচিত সমস্ত তথ্যই আপনার হাতে কাছে চলে এসেছে। তাই ওপরে আলোচিত কোনও সমস্যায় ভুগলে আপনি সরষে দানা বা তেলের ব্যবহার অবশ্যই করতে পারেন। কিন্তু মনে রাখবেন বেশী পরিমাণে খেলে বা ব্যবহার করলে তা আপনার শরীরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। আর আপনার রোগ গুরুতর হলে সরষে খাওয়ার আগে অবশ্যই চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করুন।

প্রায়শই জিজ্ঞাস্য প্রশ্ন

সরষে দানার প্রকৃতি কেমন?

সরষে দানা সাধারণত গরম হয়ে থাকে।

কালো সরষে দানার কী কী গুণ থাকে?

কালো সরষের তেল সর্দির সময়, মাংসপেশিতে খিঁচ লাগলে, গিঁটে ব্যথা করলে ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে উপশম মেলে। এছাড়া ক্যান্সার কিংবা মধুমেহ রোগ রুখতে কালো সরষের বীজ উপকারী।

রোজ সরষে খাওয়া কি ভালো?

হ্যাঁ রোজ সরষে খেলে তা আপনার শরীরের পুষ্টিগুণ বাড়াতে সাহায্য করে। তবে বেশি মাত্রায় সরষে খেলে তা আপনার শরীরের জন্য ক্ষতিকারক।

7 sources

Stylecraze has strict sourcing guidelines and relies on peer-reviewed studies, academic research institutions, and medical associations. We avoid using tertiary references. You can learn more about how we ensure our content is accurate and current by reading our editorial policy.
Was this article helpful?
scorecardresearch