থাইরয়েডের সমস্যা ও তার প্রতিকার – All About Thyroid

Written by

বর্তমানে পৃথিবীতে থাইরয়েডের সমস্যায় বহু মানুষ আক্রান্ত । আমাদের মধ্যে অনেকেই এই রোগের নাম শুনে থাকি বা আশেপাশে আক্রান্ত রোগী দেখি বা নিজেরাও হয়তো এই রোগে আক্রান্ত কিনা পরীক্ষা করিয়েছি বা এতে আক্রান্ত কিন্তু আমরা এই রোগ সম্পর্কে সঠিক ধারণা নেই। আমাদের এই প্রতিবেদনে আপনাদের থাইরয়েডের সমস্যা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবো। চলুন শুরু করা যাক।

থাইরয়েড আসলে কি ?

থাইরয়েড গ্রন্থি বা থাইরয়েড হল এক ধরণের অন্তঃক্ষরা গ্রন্থি যেটি অবস্থিত গলায়। এই গ্রন্থি থেকে যেসব হরমোন নিঃসৃত হয় সেগুলি শরীরের বিপাক ক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রত্যেক মানুষের থাইরয়েড লেভেল থাকা উচিত ৪-৪.০ mIU/L (milli-international units per liter) । তার থেকে যখনই কম বেশি হয়, শরীরে নানা রকম সমস্যা দেখা দেয়।

থাইরয়েডের সমস্যা কত ধরণের ?

থাইরয়েডের সমস্যা মূলত দু ধরণের।

১. হাইপোথাইরয়ডিজম (Hypothyroidism) – থাইরয়েড গ্রন্থি যদি প্রয়োজনের তুলনায় কম হরমোন উৎপাদন করতে শুরু করে , তাহলে আপনি হাইপোথাইরয়ডিজমের শিকার হয়েছেন।

হাইপোথাইরয়ডিজমের উপসর্গগুলি নিচে উল্লেখ করা হল –

  • ক্লান্তি কিংবা অবসাদ
  • অমনোযোগিতা
  • কোষ্ঠকাঠিন্য
  • ঠান্ডা ভাব অনুভব করা
  • গাঁটে গাঁটে ব্যাথা
  • শুষ্ক ত্বক

২. হাইপারথাইরয়ডিজম (Hyperthyroidism) – যদি থাইরয়েড গ্রন্থি চাহিদা বা প্রয়োজনের তুলনায় বেশি থাইরয়েড হরমোনগুলি নিঃসৃত হয়, তাহলে আপনি হাইপারথাইরয়ডিজমের শিকার হয়েছেন।

হাইপারথাইরয়ডিজমের উপসর্গগুলি নিচে উল্লেখ করা হল –

  • অতিরিক্ত ঘাম
  • বদহজম
  • টেনশন করা
  • অস্থিরতা
  • পালস রেট বেড়ে যাওয়া
  • ওজন কমে যাওয়া
  • অনিদ্রা
  • চুল পড়া

থাইরয়েডের সমস্যার কারণ

যখনই শরীরে থাইরয়েড স্টিমুলেটিং হরমোন, থ্যারোক্সিন, ট্রাই-আয়োডোথাইরোনিন হরমোন ও থাইরয়েড স্টিমুলেটিং হরমোন রিসেপ্টর অ্যান্টিবডির তারতম্য হয় , তখনই থাইরয়েডের সমস্যা দেখা দেয়।

থাইরয়েডের সমস্যা কমানোর ঘরোয়া উপায়

১. অশ্বগন্ধা

আপনার ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করে নিয়মিত পাঁচশো মিলিগ্রামের অশ্বগন্ধার ক্যাপসুল খান।

এটি থাইরয়েডের লেভেলকে বাড়াতে অর্থাৎ হাইপোথাইরয়ডিজম সারাতে সাহায্য করে (1) । এছাড়া এটি থাইরয়েডের লেভেলকে সঠিক করতেও উপযোগী বলে জানা যায়।

২. এসেনশিয়াল অয়েল

রোজমেরি অয়েল

তিন থেকে চার ফোঁটা রোজমেরি অয়েল এক টেবিল চামচ নারকেল তেলে মিশিয়ে থাইরয়েড গ্ল্যান্ডের আশেপাশে ভালোভাবে ম্যাসাজ করুন। দিনে দুবার করে করার চেষ্টা করুন। রোজমেরি অয়েলে থাকে অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি উপাদান (2), তাই এই ম্যাসাজ করার ফলে হয়তো থাইরয়েড গ্রন্থি সঠিকভাবে কাজ করতে শুরু করবে।

৩. মিনারেল

আপনার ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করে তরল মিনারেল সাপ্লিমেন্ট নিয়মিত একবার করে খেতেই পারেন। হাইপোথাইরয়ডিজম হওয়ার মূল কারণ হল শরীরে আয়োডিন ও মিনারেলস -এর অভাব (3)। তাই সাপ্লিমেন্টটি এই ঘাটতি দূর করতে পারে।

৪. কেল্প

কেল্প হল এক ধরণের সি উইড বা সমদ্রের আগাছা যা আয়োডিনে পরিপূর্ণ (4) । আর আমরা আগেই জানালাম হাইপোথাইরয়ডিজম হওয়ার মূল কারণ হল শরীরে আয়োডিন ও মিনারেলস -এর অভাব। তাই এর সাপ্লিমেন্ট খেলে থাইরয়েডের সমস্যা কমতে পারে কারণ এটি সঠিক ভাবে থাইরয়েড গ্রন্থি থেকে হরমোনগুলিকে নিঃসৃত হতে দেয় (5) ।

৫. ভিটামিন

ভিটামিন বি ১২ থাইরয়েড গ্রন্থির কার্যকারিতাকে সঠিক রাখতে সাহায্য করে (6) । ভিটামিন সি -এ অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট থাকার জন্য এটি হাইপোথাইরয়ডিজমের জন্য হওয়া স্ট্রেস কমাতে সাহায্য করে (7)। তাই থাইরয়েডের সমস্যা হলে ভিটামিন বি ১২ ও সি যুক্ত খাবার খাওয়ার চেষ্টা করুন।

৬. ফ্যাক্স সীডস

ফ্যাক্স সীডস – এ থাকে ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড (8), যা থাইরয়েড গ্রন্থি থেকে বেশি হরমোন নিঃসৃত হতে বাধা দেয়। এক টেবিল চামচ ফ্যাক্স সীডস নিয়ে গুড়িয়ে নিন , তারপর যেকোনো জুসের মধ্যে মিশিয়ে পান করুন। দিন এক থেকে দুবার পান করবেন।

৭. নারকেল তেল

প্রত্যেকদিন এক থেকে দুই টেবিল চামচ ভার্জিন নারকেল তেল খান। এতে থাকে মিডিয়াম চেন ফ্যাটি অ্যাসিড (9)। এটি হাইপোথাইরয়ডিজমের জন্য যে বিপাক ক্রিয়া ধীর গতিতে হয়, তা সঠিক করতে সাহায্য করে।

৮. আদা

আদায় থাকে অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি উপাদান (10) । যা হাইপোথাইরয়ডিজমের উপসর্গকে কমাতে উপযোগী হতে পারে। এক কাপ জলে অল্প আদা কুচি করে নিয়ে দিয়ে দিন ও হালকা গরম করে নিন। তারপর ঠান্ডা হলে তাতে মধু মিশিয়ে খেয়ে নিন।

৯. গোলমরিচ

এক কাপ জল নিন ও তা হালকা গরম করে তাতে অল্প গোলমরিচ দিয়ে দিন , তারপর মধু মিশিয়ে পান করুন। বলা হয় থাইরয়েড গ্রন্থির কার্যকারিতা সঠিক রাখতে এটি খুবই উপযোগী।

১০. লাউয়ের রস

আমাদের মধ্যে অনেকেই জানেন হয়তো এই উপায়ের কথা। খালি পেটে সকালে উঠে লাউয়ের রস খেলে নাকি থাইরয়েড লেভেল সঠিক থাকে।

১১. গুগুল

এই গুগুল হল এক ধরণের গাছ যার নির্যাস হাইপোথাইরয়ডিজমের উপসর্গকে সারিয়ে থাইরয়েড গ্রন্থির কার্যকারিতাকে সঠিক করে বলে জানা যায় (11)। একজন আয়ুর্বেদিক ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে নিয়মিত এটি খাওয়া শুরু করবেন।

থাইরয়েডের সমস্যার চিকিৎসা

প্রথমে এই সমস্যা দেখা দিলে থাইরক্সিন জাতীয় ওষুধ দিয়ে এই রোগকে সারিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়। হাইপারথাইরয়ডিজম, গয়েটার এবং নডিউল কিংবা টিউমার হলে তার ক্ষেত্রে রোগের ধরণ অনুযায়ী থাইরয়েড গ্রন্থির কিছু অংশ কিংবা পুরোটা কেটে ফেলতে হতে পারে অপারেশানের সাহায্যে । এছাড়া বিভিন্ন নিউক্লিয়ার মেডিসিন, তেজস্ক্রিয় আয়োডিন ব্যবহার করেও এই রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া যায় ।

বুজতেই পারছেন যে এটি কতটা ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারে যদি সঠিক সময় চিকিৎসা না হয়, তাই যে কোনো উপসর্গ দেখলেই শীঘ্রই ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করুন।

থাইরয়েডের সমস্যা নির্ণয়

রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে থাইরয়েড গ্রন্থির সমস্যার কথা নির্ণয় করা হয়।

থাইরয়েড চার্ট

  • একজন সুস্থ সবল মানুষের থাইরয়েড (TSH) লেভেল থাকা উচিত ৪-৪.০ mIU/L (milli-international units per liter)
  • যদি থাইরয়েড (TSH) লেভেল ২.৫ mIU/L বা তার থেকে কম থাকে, তাহলে আপনার হাইপোথাইরয়ডিজম (Hypothyroidism) হয়েছে।
  • যদি থাইরয়েড (TSH) লেভেল ৪-৪.০ mIU/L বা তার থেকে বেশি হয় , তাহলে আপনার হাইপারথাইরয়ডিজম (Hyperthyroidism) হয়েছে।

থাইরয়েডের সমস্যা থাকলে কি ডায়েট হওয়া উচিত ?

কি কি খাবেন ?

  • ডিম
  • মাছ
  • মাংস
  • শাক-সবজি
  • ফল
  • গ্লুটেন ফ্রি খাবার
  • লো ফ্যাট ডেয়ারি প্রোডাক্ট
  • ঘরে পাতা দই
  • রসুন

কি কি খাবেন না ?

  • গ্লুটেন জাতীয় খাবার যেমন পাউরুটি, পাস্তা, বিয়ার
  • সয়া থেকে তৈরী খাবার যেমন টোফু, সয়াবিন, সয়া মিল্ক
  • বাঁধাকপি
  • ক্যাফিন

থাইরয়েডের সমস্যা কমানোর জন্য যোগব্যায়াম

কপালভাতি

কপালভাতি হল একটি জনপ্রিয় যোগাসন। বাচ্চা থেকে বয়স্ক মানুষও এই যোগাসন করতে পারে।

কিভাবে করবেন ?

পা ভাঁজ করে বসুন। ডান হাত ডান হাঁটুর উপরে ও বাঁ হাত বাঁ হাঁটুর উপর রাখুন। এবার প্রশ্বাস গ্রহণ করুন আসতে আসতে এবং জোরে পেটে চাপ দিয়ে ভিতর থেকে নিঃশ্বাস ত্যাগ করুন। খেয়াল রাখবেন আপনার পেট যেন একইভাবে জোরে ওঠানামা করে। এই ভাবে নিয়মিত পনেরো কুড়ি মিনিট ধরে একইভাবে পুনরাবৃত্তি করুন।

থাইরয়েডের সমস্যা প্রতিরোধকারী টিপস

  • ৩৫ বছর পার করলেই প্রত্যেক বছরই রক্তের TSH পরীক্ষাটি করিয়ে নিন
  • গর্ভবতী হওয়ার পর ও বাচ্চা হওয়ার পর এই পরীক্ষাটি করাবেন
  • ধূমপান ছেড়ে দিন
  • অ্যালকোহোল ও ক্যাফিন সেবন বন্ধ করুন
  • ছাঁকা তেলে ভাজা খাবার খাবেন না
  • আয়োডিন আছে এমন খাবার খান
  • ওজন সঠিক রাখুন
  • নিয়মিত যোগব্যায়াম করুন
  • প্রচুর জল খান।

তাহলে বুজতেই পারছেন এই রোগের অনেক সমস্যা ও ঝুঁকি। তাই কোনো উপসর্গ দেখা দিলে দেরি না করে ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করুন। আর তার পাশাপাশি উপরে উল্লেখিত ঘরোয়া উপায়গুলি মেনে চলুন, আশা করি ফল পাবেন। নিজের যত্ন করুন ও সুস্থ থাকুন।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী :

থাইরয়েডের সমস্যা কি পুরোপুরি ভাবে সারতে পারে ?

সাধারণত পুরোপুরি ভাবে সেরে যায় না, ওষুধ খেয়ে যেতে হয়।

মেয়েদের ক্ষেত্রে থাইরয়েডের সমস্যা হলে কি কি উপসর্গ দেখা যায় ?

অন্যান্য উপসর্গের পাশাপাশি মেয়েদের পিরিয়ডের সমস্যা দেখা দেয় অনেকসময়।

প্রেগন্যান্ট অবস্থায় হাইপোথাইরয়ডিজম হলে কিভাবে চিকিৎসা করা হয় ?

এক্ষেত্রে কোনো ওষুধ দেওয়া যায় না তাই ঘরোয়া উপায় মানা হয়।

থাইরয়েডের সমস্যা হলে অনেকসময় মেনোপজের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হয়, এটা কি ঠিক না ভুল ?

হ্যাঁ, এটা ঠিক। কারণ অনেক মহিলার ক্ষেত্রে পিরিয়ড বন্ধ হয়ে যায়।

হাইপোথাইরয়ডিজম না হাইপারথাইরয়ডিজম কোনটির সমস্যা বেশি হয় ?

হাইপোথাইরয়ডিজম

থাইরয়েডের সমস্যা হলে কি চুল পড়তে পারে ?

হ্যাঁ, পড়তে পারে।

থাইরয়েড ক্যান্সার কি ?

যদি থাইরয়েড গ্রন্থির অনিয়মিত বৃদ্ধি হতে থাকে ও সেটি কার্সিনোজেনিক টিউমারে রূপান্তরিত হয়, তাহলে থাইরয়েড ক্যান্সার দেখা দেয়।

Sources

Articles on StyleCraze are backed by verified information from peer-reviewed and academic research papers, reputed organizations, research institutions, and medical associations to ensure accuracy and relevance. Check out our editorial policy for further details.
Was this article helpful?
The following two tabs change content below.