ঘরোয়া উপায়ে করুন তোতলামির নিরাময় | stammering in bengali

Written by

ছোট শিশুদের মধ্যে আদো আদো কথা বলা কিংবা সামান্য তোতলামি কোন নতুন বিষয় নয়। একটি শিশু যখন কথা বলতে শেখে সেই সময় বেশ কিছু শব্দ শিশুটি সঠিকভাবে উচ্চারণ করতে পারে না কিংবা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয় না, তবে এই বিষয়টি একেবারেই সাধারণ। শিশু বেড়ে ওঠার সাথে সাথে তার এই কথা আটকে যাওয়ার সমস্যাটি যদি থেকে যায় তখন তা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কেননা যদি সঠিক সময় মতো শিশুদের মধ্যে থেকে এই তোতলামির ভাব সরানো না যায় তাহলে পরবর্তী সময় শিশুদের মধ্যে হীনমন্যতা তৈরি হয়, যার ফলে বাচ্চারা কারো সাথে মন খুলে কথা বলার কিংবা তার মনের কথা কাউকে বলা বন্ধ করে দেয়, লোকজনের সামনে হঠাৎ করে কথা বলতে ইতস্তত বোধ করে। একটা সময় পর থেকে এই তোতলামি টা শিশুর পক্ষে সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। তবে এটি এমন কিছু বিষয় নয়, শিশুদের ক্ষেত্রে চিকিৎসা ছাড়াই বড় হওয়ার সাথে সাথে এগুলো কমে যায়। তবে অনেক সময় শিশু অবস্থাতে ঠিকভাবে বাবা মায়েরা লক্ষ্য না করার ফলে বড় হওয়া অবধি এটা থেকে যায়, যা পরবর্তী সময়ে এক অস্বস্তিকর অবস্থার সৃষ্টি করে। এক্ষেত্রে যে ব্যক্তি তোতলামির সমস্যায় ভুগছে তাকে স্বাচ্ছন্দ এবং আত্মবিশ্বাস অর্জন করতে হবে এবং বিভিন্ন স্পিচ থেরাপির মাধ্যমে নিজের এই সমস্যা দূর করতে হবে। আসুন আজকের নিবন্ধ থেকে আমরা জেনে নিই কিভাবে ঘরোয়া উপায়ে এই তোতলামির সমস্যার সমাধান আমরা করতে পারবো।

তোতলামি কি?

তোতলামি কে আমরা কথা বলার সমস্যা হিসেবে বর্ণনা করে থাকি। যাদের কথা বলতে কিছুটা বাধো-বাধো ভাব হয় কিংবা কথা বলার সময় কথা আটকে যায়, অতিরিক্ত উত্তেজনা থেকে কিংবা অতিরিক্ত চিন্তা থেকে যাদের কথা বলার সময় কথা বলার মধ্যে থেমে যেতে হয় এমনকি শব্দের উচ্চারণ কিংবা শব্দগুলোকে পুনরায় বলতে লাগে এটি মূলত তোতলামির সমস্যা। তোতলামির সমস্যায় যারা ভোগেন তারা মাঝেমধ্যে দীর্ঘায়িত শব্দ বলতে পারে। কেননা কথা বলতে গিয়ে তাদের উচ্চারণটা এতটাই প্রসারিত হয়ে যায় এক্ষেত্রে কথা বলার সময় যে বায়ু প্রবাহিত হয় সেটা আটকে যেতে পারে, যে কারণে শব্দটি শোনা যায় না। যার ফলস্বরূপ কথাটা আটকে আটকে বের হয়। এই তোতলামো টা হালকা ধরনের হতে পারে, আবার অনেক সময় মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। তবে এটি চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছালে মারাত্মক ব্যাধি হয়ে দাঁড়ায়। এক্ষেত্রে আক্রান্ত ব্যক্তিটি কারো সাথেই যথাযথভাবে মন খুলে কথা বলতে পারে না। বিভিন্ন ব্যক্তির মধ্যে তোতলামির বিভিন্ন লক্ষণ দেখা দিতে পারে। কারো কারো ক্ষেত্রে দেখা যায় যে একটা নির্দিষ্ট সময় অবধি ভালো মতই কথা বলছে এ ক্ষেত্রে তাকে দেখে বোঝার উপায় নেই যে সে তোতলা কিন্তু একটি নির্দিষ্ট সময় পরেই তার উচ্চারণে সমস্যা হচ্ছে। মূলত এই সমস্ত ব্যক্তিরা যদি তাড়াহুড়ো করে কোনো কথা বলতে যান তখন তাদের এই সমস্যাটা দেখা যায়। তবে ধীরে ধীরে কথা বললে কথা বলতে কোনো অসুবিধা হয় না। অনেকে আবার কথাগুলো এত প্রসারিত ভাবে বলে যে তাদের দেখে বোঝা যায় না তারা তোতলামির সমস্যায় ভুগছে কিন্তু যাদের মধ্যে এই সমস্যা বেশি দেখা যায় অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে তারা জনসমাগমের মাধ্যমে কথা বলা থেকে বিরত থাকে কিংবা তাদের মধ্যে এক ধরনের আড়ষ্ঠ ভাব দেখা যায়। বাচ্চাদের মধ্যে কথা শেখার সময় এটি একটি স্বাভাবিক ব্যাপার। কেননা শুরুতেই শিশুরা সব উচ্চারণ সঠিক ভাবে করতে পারে না। তাদের উচ্চারণ করতে গেলে আটকে যায়। গবেষণায় দেখা গিয়েছে বাচ্চাদের মধ্যে এই তোতলামোর স্বভাবটা একটি সাধারণ সমস্যা, যেটি বয়স বাড়ার সাথে সাথে কমে যায়। কিন্তু শৈশব থেকেই যাদের এই সমস্যা শুরু হয় গবেষণায় জানা যাচ্ছে, এটি মূলত দুই থেকে চার বছর বয়সের মধ্যেই বাচ্চাদের মধ্যেই দেখা যায়, সে ক্ষেত্রে বাবা মায়েরা যদি বিষয়টি খেয়াল করেন তাহলে শুরুতেই এটির নিরাময় সম্ভব। কেননা পরবর্তী সময়ে এই কথা আটকে যাওয়া শিশুটির ব্যক্তিগত জীবনে খারাপ প্রভাব ফেলতে পারে, তাকে সমাজ থেকে দূরে ঠেলে দিতে পারে। এমনকি এই তোতলামি টা তাকে মানসিক ভাবেও প্রভাবিত করতে পারে। তোতলামি তে আক্রান্ত ব্যক্তিরা সামাজিক জায়গায় লোকজনের মুখোমুখি হওয়া থেকে বিরত হওয়ার চেষ্টা করে। যেকোনো কাজে এদের আত্মবিশ্বাসের অভাব দেখা যায়। কেননা এরা যথাযথভাবে তার কথাটা বুঝিয়ে উঠতে পারেনা। (1)

তোতলামির কারণ

তোতলামির স্বভাব মূলত শৈশব থেকেই শুরু হতে থাকে। দুই থেকে পাঁচ বছর বয়সের মধ্যেই তোতলামো দেখা যায় প্রথমবার। তবে এই তোতলামির পিছনেও বেশকিছু কারণ থাকে জেনে নিন সেগুলো সম্পর্কে – (2)

  1. বিকাশ মূলক – ছোট বাচ্চাদের মধ্যে তোতলামির লক্ষণ দেখা সাধারণ বিষয়। তবে বয়স বাড়ার সাথে সাথে যখন এই অভ্যাসটি থেকে যায় তখন তা সমস্যার সৃষ্টি করে। বিজ্ঞানীদের মতে, শিশুরা যখন সঠিক ভাবে কথা বলতে অক্ষম হয় তখনই এই সমস্যাটি ঘটে কিংবা একটি শিশু যখন কথা শেখে তার কথা বলার পদ্ধতি তার আশেপাশের লোকেরা যদি ঠিক ভুল টা বুঝিয়ে না দেয় তখন এই সমস্যাটি ঘটে।
  1. বংশগত – কিছু কিছু ব্যক্তির মধ্যে বংশগত কারণেও তোতলামির রোগটা দেখা যায়। মূলত বাবা কিংবা মা বা পরিবারের অন্য কারোর যদি এই তোতলামির সমস্যা থাকে সে ক্ষেত্রে শিশুদের মধ্যে এটি দেখা যায়।
  1. মস্তিষ্কের আঘাত – কখনো যদি মস্তিষ্কে গুরুতর আঘাত কিংবা স্ট্রোক হয় সেই ব্যক্তির কথা বলতে সমস্যা হতে পারে। তাই একজন সুস্থ ব্যক্তি হঠাৎ যদি কথা বলতে বাধাপ্রাপ্ত হয় অবশ্যই ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করুন।
  1. সাইকোজেনিক – কিছু কিছু ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের সঠিক বিকাশ না হওয়ার কারণে শিশুদের কথাবার্তায় সমস্যা দেখা দিতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে বড় হয়ে যাওয়ার পরেও অনেকের মধ্যে তোতলামির স্বভাবটা থেকে যায়, এক্ষেত্রে যে সমস্ত মানুষেরা ছোট থেকে অপুষ্টির শিকার কিংবা কোনো রোগে ভুগছেন তাঁদের মধ্যে এই সমস্যাটি দেখা যায়।

মূলত এই কারণগুলির মাধ্যমেই তোতলামির সমস্যার সৃষ্টি হয়। এর পাশাপাশি অনেকে তাড়াতাড়ি কথা বলতে গিয়ে কিংবা অত্যধিক নার্ভাস হয়ে বা লাজুক হওয়ার কারণে, আত্মসচেতন, নিরাপত্তাহীন, উত্তেজনাপূর্ণ এই সমস্ত কারনেও কথা বলতে গিয়ে কথা আটকে যায়।

তোতলামির লক্ষণ

আসুন তোতলামির লক্ষণ গুলি সম্পর্কে জেনে নিন। এই লক্ষণগুলি শুরু থেকে শিশুদের মধ্যে দেখতে পেলেই সতর্কতা গ্রহণ করবেন। শিশুদের ছোট থেকেই এই সমস্যার সৃষ্টি হয়। এক্ষেত্রে যে বিষয়গুলো নজরে রাখবেন -(3)

  1. কে, জি, টি দিয়ে বারবার শব্দ শুরু করে এগুলির পুনরাবৃত্তি করা।
  1. এস, শ, স দিয়ে কথা শুরু করে দীর্ঘ কথা বলা।
  1. কথা বলতে বলতে হঠাৎ দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে থেমে যাওয়া কিংবা কথা বলা থেকে বিরত থাকা।
  1. আস্তে আস্তে কথা বলা বা বাধো-বাধো ভাবে কথা বলা।
  1.  কথা বলার সময় চাপ ও হতাশাগ্রস্ত বোধ করা।
  1. কখনো কখনো কথা বলার জন্য মুখ খোলা কিন্তু কিছু উচ্চারণ না করতে পারা।
  1. কথা বলার সময় শ্বাসকষ্ট এবং ঠোঁট কাঁপা ভাব।
  1. কথা বলতে ভয় পাওয়া।
  1.  কথা বলার সময় দ্রুত চোখের পাতা পিট পিট করা।
  1. কথা বলার সময় মাথা সহ শরীরের অন্যান্য অংশে ঝাঁকুনি দেওয়া।
  1. কথা বলার সাথে সাথে চোয়াল ঝাঁকানো।
  1.  কথা বলার সময় বারবার হাতের মুষ্টি বন্ধ করে দেওয়া।

শৈশব থেকেই যদি শিশুদের মধ্যে এই লক্ষণগুলি দেখতে পান তাহলে ঘরোয়া ভাবেই শিশুর কথা বলার সমস্যা দূর করার চেষ্টা করুন। কেননা বড় হলে এটি সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে।

তোতলামির ঘরোয়া প্রতিকার

ঘরোয়া পদ্ধতিতে তোতলামির সমস্যা দূর করার জন্য বেশ কিছু উপাদান রয়েছে, যেগুলো আমাদের সহায়তা করবে। কথা বলতে গিয়ে আটকে যাওয়ার সমস্যা কোন রোগ নয়, কিন্তু এটা যখন বাড়াবাড়ি পর্যায়ে পৌঁছে যায় তখন তা মারাত্মক ব্যাধির আকার ধারণ করে। জেনে নিন ঘরোয়া কোন কোন উপাদান গুলি দিয়ে তোতলামির সমস্যাকে দূর করবেন –

১) সবুজ ধনে দিয়ে তোতলামির সমস্যা দূরীকরণ :

উপাদান :

সবুজ ধনে – এক চামচ
আমলকি শুকনো –
এক চামচ।

কি করতে হবে?

সবুজ ধনের সাথে আমলকি গুলো নিয়ে মিক্সিতে ভালো করে গুঁড়ো করে নিতে হবে।

প্রত্যেক দিন এই মিশ্রণটি রান্নায় কিংবা স্যালাডে ব্যবহার করতে হবে।

২১ দিন যদি এই মিশ্রণটি খাদ্য তালিকায় রাখতে পারেন তোতলামির সমস্যা অনেকটা কমে যাবে।

কিভাবে কাজ করে?

সবুজ ধনের মধ্যে থাকা উপাদানগুলি কথা বলার সমস্যাটাকে কমিয়ে আনতে সহায়তা করে। যার ফলে কথা বলতে গেলে যে আটকানো ভাব দেখা যায় সেই সমস্যা দূর হয়।

২) গোলমরিচ দিয়ে তোতলামির প্রতিকার :

উপাদান :

গোলমরিচ – সাত টুকরো
বাদাম – সাত টুকরো
মিছরি ছোটো – দশ টুকরো।

কিভাবে ব্যবহার করবে?

গোলমরিচ, বাদাম এবং মিছরি এই তিনটি উপাদান কে ভালো করে মিক্সিতে গুড়ো করে নিতে হবে।

এবার একটি কৌটোতে এটি ভরে রাখতে হবে।

প্রতিদিন ভোর বেলা এটি খালি পেটে এক চামচ করে গ্রহণ করতে হবে।

কমপক্ষে এক মাস এটি ব্যবহার করুন।

কিভাবে কাজ করবে?

দৈনিক গোলমরিচ, বাদাম এবং মিছরির এই মিশ্রণটি গ্রহণ করার ফলে তোতলামির সমস্যা অনেকটা কম হবে।

৩) আমলকি দিয়ে করুন তোতলামির প্রতিকার :

উপাদান :

কাঁচা আমলকি – একটি।

কিভাবে ব্যবহার করবেন?

প্রত্যেকদিন একটি করে কাঁচা আমলকি ধুয়ে নিয়ে আস্তে আস্তে চিবিয়ে সকালের খাবারের পর খাবেন।

এটি টানা একমাস করতে হবে।

শিশুদের জন্য এবং বড়দের জন্য এটি একটি কার্যকরী প্রতিকার।

কিভাবে কাজ করে?

দৈনিক যদি একটি করে কাঁচা আমলকি খাওয়া যায় তাহলে তোতলামির যে সমস্যা সেটি দূর করতে সহায়তা করে।

৪) গরুর ঘি দিয়ে করুন তোতলামির প্রতিকার :

উপাদান :

গরুর ঘি – পরিমাণমতো।

কিভাবে ব্যবহার করবেন?

দৈনিক খাদ্য তালিকায় সরাসরি ঘি রাখার চেষ্টা করবেন।

ভাতের সাথে কিংবা তরকারিতে দৈনিক ঘি খাবেন।

কিভাবে কাজ করে?

ঘি মস্তিষ্ক এবং স্মৃতিশক্তি উন্নত করতে সহায়তা করে। যার ফলে স্নায়ু সচল হয় এবং কথা বলার সমস্যা দূরীভূত হয়।

৫) ব্রাহ্মী তেল দিয়ে করুন তোতলামির সমস্যা দূর :

উপাদান:

ব্রাহ্মী তেল – পরিমাণমতো।

কিভাবে ব্যবহার করবেন ?

ব্রাহ্মী তেল হল তোতলামির সমস্যা দূরীকরণ এর অন্যতম একটি কার্যকরী উপাদান।

পরিমাণমতো তেল নিয়ে সেটিকে হালকা গরম করে মাথায় ভালো করে ম্যাসাজ করুন।

এরপর এটি ৩০ মিনিট রেখে দিন।

এরপর গরম জল দিয়ে স্নান করুন।

এছাড়াও এই তেলটি রাতে মাথায় লাগিয়ে পরের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠে ধুয়ে ফেলতে পারেন। এটি আরও বেশি উপকার হবে।

কিভাবে কাজ করে?

এটি মস্তিষ্কের শক্তি বাড়াতে সাহায্য করে। যার ফলে মস্তিষ্ক যদি সচল হয় কথা বলার সমস্যা দূর হয়ে যাবে।

কখন ডাক্তার দেখানো দরকার?

যদি একটি শিশুর পাঁচ বছর বয়স হওয়ার পরেও কথা বলতে বাধা ভাব দেখা যায় কিংবা একটি প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির যদি কথা বলতে গিয়ে আটকানো ভাব দেখা যায় সে ক্ষেত্রে চিকিৎসকের সাথে যোগাযোগ করা প্রয়োজন। কেননা যথাযথ স্পিচ থেরাপির মাধ্যমে এই সমস্যা দূরীভূত হতে পারে। এছাড়াও বেশ কয়েকটি লক্ষণ আছে যেগুলো যদি আপনি দেখতে পারেন তাহলে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন – (4)

  1. কথা বলার সময় যদি উচ্চারণের ভয়ে শিশু বা ব্যক্তিটি কোন শব্দ না বলে।
  1.  কথা বলার সময়ে শরীর অদ্ভুতভাবে নড়াচড়া করা।
  1. কোনও শব্দ কিংবা বাক্য বলার সময় একনাগাড়ে তার পুনরাবৃত্তি করা।
  1. কথা বলার সময় ব্যাক্তিটির মুখে এক ধরনের টানাপোড়েন ভাব।
  1. এছাড়াও শিশুদের বক্তৃতা দেওয়ার সময় যদি কথা বলার পদ্ধতিতে অস্বাভাবিক মনে হয় সে ক্ষেত্রে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে পারেন।
  1.  শিশুদের মধ্যে কণ্ঠস্বর যদি খাটো হয় কিছু কিছু ক্ষেত্রে কথা বলার সময় তখন ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে পারেন।

কেননা তোতলামি কোনো গুরুতর সমস্যা নয়। তবে সঠিক স্পিচ থেরাপির মাধ্যমে এটির চিকিৎসা সম্ভব হয়। কিন্তু যথাযথ সময়ে যদি চিকিৎসা না হয় এটি পরবর্তীকালে বড় ব্যাধির আকার ধারণ করে।

তোতলামির চিকিৎসা

শিশু থেকে বয়স্ক বয়সভেদে তোতলামির সমস্যা সমাধানের জন্য বিভিন্ন চিকিৎসা রয়েছে। এক্ষেত্রে শিশুকে আরো স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করাতে এবং আত্মবিশ্বাস জাগাতেই উপায়গুলি সহায়তা করে। তোতলামির সমস্যা দূরীকরণের জন্য যে চিকিৎসা গুলি রয়েছে সেগুলোর মধ্যে হলো -(5)

  1. পিতা-মাতার প্রাধান্য : যে শিশুটি কথা শেখার পর থেকে ধীরে ধীরে তোতলামির সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে, তার এই সমস্যা দূর করার জন্য মা-বাবাকে তার সাথে ধীরে ধীরে কথা বলার অভ্যাস করতে হবে। সন্তানের কথা বার্তার জন্য তাকে দোষারোপ না করে তাকে শিখাতে হবে। তার ভুল ত্রুটিগুলো সংশোধন করে দিতে হবে। যখন কেউ তোতলামির মত করে কথা বলবে তখন তাকে সেটা ধরিয়ে শুধরে দিতে হবে।
  1. মডিফিকেশন – এখানে যে তোতলামির সমস্যা দেখা দিচ্ছে সে ক্ষেত্রে শিশু বা ব্যক্তির কথা বলতে গেলে যে আড়ষ্ঠ ভাব বা ভয় হয় সেটা কমাতে এবং তার আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সহায়তা করতে হবে।
  1. মনস্তাত্ত্বিক থেরাপি – প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে তোতলামির সমস্যা সমাধানের জন্য মনস্তাত্ত্বিক থেরাপি গুলো ব্যবহার করা যেতে পারে। এই থেরাপি গুলির মাধ্যমে যে কোন চিন্তা কিংবা উদ্বেগকে কম করে তোতলামির সমস্যাকে দূর করতে সহায়তা করে। কেননা অনেক সময় অত্যধিক চিন্তা কিংবা উদ্বেগের মধ্যে থাকলে কথা বলতে গিয়ে তোতলামির সমস্যা দেখা দেয়।
  1. প্রতিক্রিয়া ডিভাইস – এই পদ্ধতিতে কোন ব্যক্তি যেভাবে কথা বলছে তার কথা বলার ধরণ তাকে শোনানো হচ্ছে এবং তাকে বোঝানো হয় যে, কথা বলার গতি কমিয়ে সে কিভাবে নিজের উচ্চারণ স্পষ্ট করবে। এই ডিভাইসের মাধ্যমে তোতলামির সমস্যা কম করে সাধারন ভাবে কথা বলতে পারা যায়।

তোতলামির সমস্যা দূরীকরণের জন্য অনুশীলন

বেশকিছু অনুশীলনের মাধ্যমে এই তোতলামির সমস্যা বাচ্চা এবং প্রাপ্ত বয়স্কদের মধ্যে থেকে দূর করা যায়। অনুশীলন গুলিতে কথা বলার পদ্ধতি ভালো করার পাশাপাশি ফুসফুস, শ্বাসনালী জিহ্বা, ঠোঁট এবং চোয়াল শক্ত সমর্থ হয়। এই অনুশীলন গুলি তোতলামির সমস্যা কম করার পাশাপাশি অনেক ক্ষেত্রে এর তীব্রতাকে হ্রাস করতে সহায়তা করে। এখানে এমন কিছু অনুশীলনের সম্পর্কে আমরা আলোচনা করবো যেগুলো শিশু এবং প্রাপ্তবয়স্ক উভয়ের ক্ষেত্রে কার্যকরী –

  1. জোরে শব্দ উচ্চারণ : যে কোন শব্দ উচ্চারণের সময় যেমন আমি, এ, ই এই ধরনের শব্দ জোরে উচ্চারণ করার অভ্যাস করতে হবে।
  1. থামতে শেখানো : যারা তোতলামির সমস্যায় ভোগেন কথা বলার ক্ষেত্রে কখন থামতে হবে সেটা তারা বোঝে না, সে ক্ষেত্রে কখন কিভাবে থামতে হবে সেটা শিখাতে হবে।
  1. জেও টেকনিক :  এই প্রণালীর মাধ্যমে শিশুকে যতটা সম্ভব চোয়াল খুলে কথা বলার চেষ্টা করাতে হবে। এই অভ্যাসটি ভালোভাবে করার চেষ্টা করুন। শিশুকে বলুন তালুর দিকে জিহ্বা সরাতে এবং তালু স্পর্শ করে কথা বলার জন্য। এক্ষেত্রে তালুর দিকে জিহ্বা টেনে কয়েক সেকেন্ডের জন্য সেই অবস্থানে রাখতে বলুন। এরপর মুখ থেকে জিহ্বা বের করে ঠোঁটের কাছে নামানোর চেষ্টা করুন। প্রতি রাতে এই অনুশীলন ভালো ফলাফল দিতে পারে। মূলত ইংরাজী জে এবং ও ধ্বনি উচ্চারণের মত করে উচ্চারণ করতে হবে।
  1. স্ট্র টেকনিক : আমরা যেমন স্ট্রয়ের মাধ্যমে জল কিংবা ঠান্ডা পানীয় পান করি। এই মাধ্যমেই অনুশীলনটি করতে হবে। প্রত্যেকদিন স্ট্র দিয়ে জল পান করতে হবে। এর ফলে জিহ্বার  নড়াচড়া হবে এবং কথা বলতে আড়ষ্টতা কাটবে।
  1. নিঃশ্বাস ধরে রাখার চেষ্টা করুন : শিশুকে কয়েক সেকেন্ডের জন্য নিঃশ্বাস ধরে রেখে সেটা আস্তে আস্তে ছাড়তে বলুন। এই প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে জিভের পেশিতে টান হবে, যার ফলে কথা বলার আড়ষ্টতা দূর হবে।

এই অনুশীলনগুলো ছাড়াও মুখের যেকোনো ধরনের ব্যায়াম করতে পারেন। সেগুলি তোতলামির সমস্যা দূর করতে সহায়তা করবে। পাশাপাশি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের সাথে যথাযথভাবে কথা বলা, জোরে বই পড়া, শ্বাস প্রশ্বাসের ব্যায়াম করা এগুলো যদি করেন তোতলামির সমস্যা নিজে থেকেই দূর হবে।

তোতলামির জন্য খাদ্য তালিকা

মূলত তোতলামির সমস্যা দূরীকরণের সঙ্গে খাবারের কোনও সমস্যা নেই। তবে এই সমস্ত সমস্যা দেখা দিলে খাদ্য তালিকা থেকে গ্লুকোজ জাতীয় খাদ্য কিংবা অত্যধিক শর্করা জাতীয় খাদ্য দূরে রাখলেই ভালো হয়। এছাড়াও যে কোন উত্তেজনা মূলক খাদ্য, যেমন ফাস্টফুড, অতিরিক্ত মসলাযুক্ত খাদ্য না খেলে ভালো হয়।

তোতলামির সমস্যা দেখা দিলে খাদ্যতালিকায় পুষ্টিকর খাদ্য রাখা উচিত। যেমন শাকসবজি, ফলমূল, দুধ, ডিম। এগুলি মূলত অপুষ্টির সমস্যার থেকেও মস্তিষ্কের বিকাশ যথাযথ না হলে, স্নায়ুর বিকাশ যথাযথ না হলে এই সমস্যা দেখা দিয়ে থাকে।

তোতলামির প্রতিরোধক ব্যবস্থা

তোতলামির সমস্যা কমানোর জন্য বিশেষ কয়েকটি বিষয়ে মনোযোগ রাখতে হবে। সেগুলি হল – (6)

  1. আস্তে আস্তে কথা বলার অভ্যাস করতে হবে।
  1. যে বিশেষ শব্দগুলো উচ্চারণ করতে অসুবিধা হয় সেই বিশেষ শব্দগুলোর পরিবর্তে অন্য শব্দ উচ্চারণ করতে হবে।
  1. কথা বলার সময় উদ্বিগ্নতা কিংবা চিন্তা কম করতে হবে।
  1. মানসিক নিয়ন্ত্রণকে উন্নত করতে হবে।
  1. স্পিচ থেরাপির মাধ্যমে চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হবে।
  1. কথা বলার সময় যাতে ঠোটে কাঁপা ভাব না দেখা যায় সেটা লক্ষ্য রাখতে হবে।
  1. কথা বলার আগে গভীর শ্বাস নিয়ে কথা বলতে হবে।
  1.  আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ধীরে ধীরে কথা বলা অভ্যাস করতে হবে।
  1. যদি তোতলামির সমস্যা খুব বাড়াবাড়ি হয় সে ক্ষেত্রে যথাযথ ওষুধ এবং চিকিৎসা করতে হবে।
  1. অবশ্যই যে সমস্ত শিশুরা বা ব্যক্তিরা তোতলামির সমস্যায় ভুগছেন তাদের বাড়ির লোকেদের শিশুদের সম্পূর্ণ কথা শুনতে হবে।
  1. কথা বলার সময় যাতে শব্দগুলো পুরোপুরি বলতে পারে সেটা খেয়াল রাখতে হবে।
  1. কথা বলতে অসুবিধা হওয়ার জন্য কোনরকম চাপ দেওয়া চলবে না।
  1. নিজেকে আরও আত্মবিশ্বাসী করে তুলতে হবে যে কোন কথা বলার বিষয়ে।

আজকের নিবন্ধ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হল। কেননা আমাদের মধ্যে অনেকেই এই সমস্যায় ভুগে থাকি। তোতলামি কোন ব্যাধি নয়, এটি হলো এক ধরনের কথা বলার সমস্যা। এর প্রতিকার করতে পারে বাড়ির লোকেরাই। তাই কোনও কিছু বাড়াবাড়ি হবার আগে পরিবারের লোকেরা সহযোগিতা করুন, যাতে এই স্পিচ অর্ডার নিয়ন্ত্রণে আনা যায়। এছাড়াও বিভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করুন যেগুলো আজকের নিবন্ধে আলোচনা করা হলো। সুস্থ থাকুন, ভালো থাকুন। ঘরোয়া পদ্ধতি অবলম্বন করে কেমন আছেন সেটা আমাদের জানাতে ভুলবেন না।

প্রায়শঃ জিজ্ঞাস্য :

তোতলামি এবং তোতলানোর মধ্যে পার্থক্য কি?

তোতলামি এবং তোতলানোর মধ্যে সেই অর্থে কোন পার্থক্য নেই। তবে এক কথায় বলতে গেলে তোতলামি বলতে আমরা বুঝি কথা বলতে গিয়ে বন্ধ হয়ে যাওয়া আর তোতলানো বলতে বোঝায় একই শব্দ বারবার বলা।

তোতলামি কি সেরে যায়?

ছোটবেলায় শিশুদের মধ্যে এই সমস্যাটি দেখা গেলেও পরবর্তীকালে ধীরে ধীরে সেরে যায়।

তোতলামি কি কোনো প্রতিবন্ধকতা?

না, তোতলামি কোনো প্রতিবন্ধকতা নয়। এটা কেবলমাত্র একটি স্পিচ ডিজঅর্ডার।

কিভাবে চিরতরে তোতলামি বন্ধ করব?

আস্তে আস্তে কথা বলে, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলার অভ্যাস করে তোতলামি বন্ধ করা সম্ভব হয়।

আমার শিশুর তোতলামি কিভাবে বন্ধ করব?

শিশু কথা শেখার পর থেকে দুই থেকে পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত এই সমস্যা দেখা দেয়। পরবর্তী সময় নিজে থেকেই কমে যায়। তাই আলাদা করে এটি বন্ধ করার চেষ্টা করতে হয় না।

Sources

Articles on StyleCraze are backed by verified information from peer-reviewed and academic research papers, reputed organizations, research institutions, and medical associations to ensure accuracy and relevance. Read our editorial policy to learn more.

Was this article helpful?
The following two tabs change content below.