ত্বকে চুলকানির ঘরোয়া প্রতিকার – Itchy Skin (Khujli) Remedies in Bengali

by

আমাদের সবারই ত্বকে চুলকানি হয়ে থাকে নানা কারণে, তবে অনেকসময় তা বেড়ে যায় ও ত্বকে অস্বস্তি বা জ্বালা যন্ত্রণার সৃষ্টি হয়। আর যদি আপনি এই সমস্যার ঠিক মতো চিকিৎসা না করেন, তাহলে এটি মারাত্মক রূপ ধারণ করতে পারে। আমাদের এই প্রতিবেদনে ত্বকে চুলকানির ঘরোয়া প্রতিকারের সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হল।

ত্বকে কি কি ধরণের চুলকানি হতে পারে ?

ত্বকে নানা ধরণের চুলকানি হতে পারে। কোনো ধরণের অ্যালার্জি থেকে, কোনো কিছু কামড়ালে ত্বকে চুলকানির সৃষ্টি হয়।

চলুন জেনেনি ত্বকে চুলকানি হওয়ার পিছনে কারণগুলি ঠিক কি।

ত্বকে চুলকানি হওয়ার কারণ

  • শুকনো বা ড্রাই ত্বক
  • র‍্যাশ বেরোনো
  • লিভার ও কিডনির সমস্যা
  • স্নায়ুতন্ত্রের সমস্যা
  • প্রসাধনী দ্রব্যে অ্যালার্জি
  • প্রেগন্যান্সির জন্য
  • বয়সের জন্য।

ত্বকে চুলকানি হওয়ার লক্ষণ

ত্বকে চুলকানির সমস্যা যেকোনো নির্দিষ্ট অংশে হতে পারে যেমন হাতে, পায়ে বা পিঠে। আবার পুরো শরীরেও অনেক সময় চুলকানির সৃষ্টি হয়। ত্বকে চুলকানি হওয়ার কারণগুলি নিচে উল্লেখ করা হল।

  • লাল হয়ে যাওয়া
  • ত্বক ফুলে ওঠা
  • ত্বক খসখসে হয়ে যাওয়া
  • ত্বক শুকনো হয়ে যাওয়া

এই সমস্যা থেকে নিশ্চয়ই মুক্তি পেতে চান, তাহলে আসুন এবার জেনেনি কিছু ঘরোয়া প্রতিকারের সম্পর্কে।

ত্বকে চুলকানির সমস্যার ঘরোয়া প্রতিকার

১. বেকিং সোডা

কি কি লাগবে ?

  • এক কাপ বেকিং সোডা
  • স্নানের জন্য জল

কি করতে হবে ?

নিয়মিত স্নানের জন্য জল নিয়ে তাতে এক কাপ বেকিং সোডা মিশিয়ে নিন ভালোভাবে, তারপর তাতে স্নান করে নিন ও হালকা হাতে গামছা বা তোয়ালে দিয়ে গা মুছে নিন ।

কিভাবে কাজ করে ?

বেকিং সোডায় থাকে অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি উপাদান, যা ত্বকের চুলকানি ভাব কমিয়ে আরাম প্রদান করতে পারে (1)

২. অ্যাপেল সাইডার ভিনিগার

কি কি লাগবে ?

  • দুই কাপ অ্যাপেল সাইডার ভিনিগার
  • স্নানের জল

কি করতে হবে ?

দুই কাপ অ্যাপেল সাইডার ভিনিগার স্নানের জলে মিশিয়ে পারলে একটি বাথটাবে পনেরো থেকে কুড়ি মিনিট স্নান করুন। তারপর গামছা বা তোয়ালে দিয়ে গা মুছে নিন।

কিভাবে কাজ করে ?

অ্যাপেল সাইডার ভিনিগারে উপস্থিত অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল উপাদান ত্বকের চুলকানি সারাতে সাহায্য করে থাকে (2)

৩. লেবু

কি কি লাগবে ?

  • এক থেকে দুটি লেবু
  • অল্প তুলো বা কয়েকটি কটন প্যাড

কি করতে হবে ?

প্রথমে লেবুর রস বার করে নিন। এবার কটন প্যাড ডুবিয়ে নিয়ে নিজের ত্বকের চুলকানির জায়গায় হালকা হাতে লাগান। তারপর শুকিয়ে গেলে জল দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। এটি দিনে দুইবার করার চেষ্টা করুন। যদি আপনার সেনসিটিভ ত্বক হয় তাহলে লেবুর রসের সাথে অল্প জল মিশিয়ে নেবেন।

কিভাবে কাজ করে ?

লেবুতে অ্যাসিটিক অ্যাসিড ও সাইট্রিক অ্যাসিড থাকে, যা অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি (3) ও অ্যান্টি-ইরিটেন্ট উপাদানে সমৃদ্ধ। তাই এটি চুলকানি ভাব সারিয়ে তুলতে উপযোগী ।

৪. অ্যালো ভেরা

কি কি লাগবে ?

দুই টেবিল চামচ অ্যালো ভেরা জেল

কি করতে হবে ?

দুই টেবিল চামচ অ্যালো ভেরা জেল নিয়ে আপনার ত্বকের যে অংশে চুলকানি হয়েছে ভালোভাবে লাগিয়ে নিন। তারপর পনেরো থেকে কুড়ি মিনিট রেখে জল দিয়ে ধুয়ে ফেলুন।

কিভাবে কাজ করে ?

অ্যালো ভেরা জেলে অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি ও অ্যান্টি-মাইক্রোবিয়াল উপাদান উপস্থিত থাকার জন্য এটি ত্বকের চুলকানি কমিয়ে ত্বকে এক আরামদায়ক ঠান্ডা ভাবের সৃষ্টি করে (4)। এতে ভিটামিন ই থাকায় ত্বককে শুকনো হতে দেয় না, ফলে চুলকানি হওয়ার সম্ভাবনাও কমে (5)

৫. তুলসী পাতা

কি কি লাগবে ?

বেশ কয়েকটা তুলসী পাতা

কি করতে হবে ?

প্রয়োজন মতো তুলসী পাতা নিয়ে বেটে তা লাগান। এছাড়া জলের মধ্যে তুলসী পাতা দিয়ে জলটি কিছুক্ষন ফুটিয়ে নিতে পারেন। তারপর জল হালকা ঠান্ডা হলে সেই জলে স্নান করে নিন।

কিভাবে কাজ করে ?

তুলসী পাতা ইউজেনল, থাইমল এবং কর্পূর সমৃদ্ধ, এগুলি তাদের অ্যান্টি-মাইক্রোবিয়াল এবং অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি বৈশিষ্ট্যগুলির দ্বারা ত্বকের চুলকানি কমাতে সাহায্য করে (6)

৬. নিম পাতা

কি কি লাগবে ?

  • প্রয়োজন মতো নিম পাতা
  • স্নানের জল

কি করতে হবে ?

স্নানের জলে বেশ অনেকগুলো নিমপাতা ফেলে তা ফুটিয়ে নিন। তারপর দশ থেকে পনেরো মিনিট অপেক্ষা করুন জল ঠান্ডা হলে ঐ জলে স্নান করুন। এই প্রক্রিয়াটি এক দিন অন্তর অন্তর করুন।

কিভাবে কাজ করে ?

ভেষজ গুণ সম্পন্ন এই নিম পাতায় থাকে অ্যান্টি-মাইক্রোবিয়াল ও অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি উপাদান যা ত্বককে চুলকানির সমস্যা থেকে মুক্তি দিতে পারে (7)

৭. ওটমিল

কি কি লাগবে ?

  • দুই কাপ ওটমিল
  • স্নানের জল

কি করতে হবে ?

দুই কাপ ওটমিল জলে দিয়ে কমপক্ষে পনেরো থেকে কুড়ি মিনিট ভিজিয়ে রেখে তারপর কিছুটা ওটমিল দিয়ে ত্বকে যেখানে চুলকানি হয়েছে সেই জায়গায় হালকা হাতে ঘষুন। ফল পাওয়ার জন্য দিনে একবার করে এটি করুন।

কিভাবে কাজ করে ?

ওটমিলের ঠান্ডা ভাব ত্বকের চুলকানির জ্বালা ভাব থেকে মুক্তি দিতে পারে কারণ এতে  অ্যান্টি -অক্সিডেন্ট এবং অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি উপাদান বর্তমান (8)

৮. নারকেল তেল

কি কি লাগবে ?

পরিমান মতো নারকেল তেল

কি করতে হবে ?

ঈষৎ উষ্ণ জলে স্নান করার পর হালকা হাতে গা মুছে নিন। তারপর সারা গায়ে বা যে অংশে আপনার চুলকানি হয়েছে নারকেল তেল মেখে ফেলুন। প্রতিদিন স্নানের পর এটি করুন।

কিভাবে কাজ করে ?

নারকেল তেলে থাকে অ্যান্টি-হিস্টামিন ও অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি উপাদান যা ত্বককে চুলকানির থেকে বাঁচাতে সাহায্য করে।  এছাড়া ত্বককে এটি আদ্র রাখে তাই ত্বক শুষ্ক হওয়ার সম্ভবনা কম (9)

৯. মেথি

কি কি লাগবে ?

এক কাপ মেথি

কি করতে হবে ?

এক কাপ মেথি বা পরিমান মতো মেথি নিয়ে এক ঘন্টা জলে ভিজিয়ে রাখুন। তারপর অল্প জল দিয়ে মিক্সার গ্রাইন্ডারে ঘুরিয়ে নিয়ে একটি পেস্ট বানিয়ে নিন। তারপর সারা গায়ে বা যেখানে চুলকানি হয়েছে সেইখানে লাগান ও শুকিয়ে নিয়ে ভালোভাবে ধুয়ে নিন। ফল পেতে হলে সপ্তাহে দুই থেকে তিনবার এই প্রক্রিয়াটি করতে হবে ।

কিভাবে কাজ করে ?

অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি উপাদান থাকার জন্য এটি ত্বকের চুলকানি কমাতে পারে (10)। তাছাড়া এর অ্যান্টি-মাইক্রোবিয়াল কার্যকারিতা ত্বকের ইনফেকশন কমাতেও উপযোগী (11)

১০. মধু

কি কি লাগবে ?

প্রয়োজন মতো মধু

কি করতে হবে ?

প্রয়োজন মতো মধু নিয়ে এটিকে হালকা গরম করে নিন ও ত্বকের চুলকানির অংশে লাগিয়ে নিন। দশ থেকে পনেরো মিনিট রেখে ধুয়ে ফেলুন। দিনে দুইবার করে করার চেষ্টা করুন।

কিভাবে কাজ করে ?

মধু ত্বকের আদ্রতা বজায় রেখে ত্বকে শুষ্ক হতে দেয় না, তাই চুলকানির হাত থেকে রক্ষা করে। তাছাড়া মধুতে অ্যান্টি-মাইক্রোবিয়াল ও অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি উপাদান থাকে, চুলকানির জ্বালাভাব কমাতে উপযোগী (12), (13)

১১. রসুন

কি কি লাগবে ?

  • দুই থেকে তিন কাপ রসুন
  • এক কাপ অলিভ অয়েল

কি করতে হবে ?

রসুনের কোয়া গুলিকে ভালো করে কুচি করে কেটে নিন। তারপর অলিভ অয়েল হালকা করে গরম করে তাতে কুচি করা রসুন দিয়ে পুরো রাত রেখে দিন। সকালে উঠে ঐ তেল ত্বকের চুলকানি যেখানে হয়েছে লাগিয়ে নিন। তারপর কুড়ি থেকে তিরিশ মিনিট রেখে ধুয়ে ফেলুন। নিয়মিত এটি করার চেষ্টা করুন।

কিভাবে কাজ করে ?

রসুনে উপস্থিত অ্যান্টি -অক্সিডেন্ট ও অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি উপাদান ত্বকের চুলকানি ভাব কমিয়ে দিতে পারে (14)

১২. পুদিনা পাতা

কি কি লাগবে ?

  • প্রয়োজন মতো পুদিনা পাতা
  • ৫০০ মিলি লিটার জল

কি করতে হবে ?

জলের মধ্যে পুদিনা পাতা দিয়ে জলটি কিছুক্ষন ফুটিয়ে নিন। তারপর জলকে ঠান্ডা হতে দিন এবং জল ঠান্ডা হলে তাতে তুলো ডুবিয়ে নিয়ে ত্বকের চুলকানির অংশে লাগান। দিনে এক থেকে দুইবার অবশ্যই করবেন।

কিভাবে কাজ করে ?

পুদিনা পাতায় মেন্থল উপস্থিত থাকায় এটি ত্বকের চুলকানি কমাতে উপযোগী মনে করা হয় কারণ মেন্থলে আছে অ্যান্টি- ইনফ্ল্যামেটরি উপাদান ও ত্বকের সংবেদনশীলতা কমানোর গুণ (15)

১৩. এসেনশিয়াল অয়েল

টি-ট্রি অয়েল

কি কি লাগবে ?

  • দুই থেকে তিন ফোঁটা টি-ট্রি অয়েল
  • এক টেবিল চামচ অলিভ অয়েল বা নারকেল তেল

কি করতে হবে ?

দুই থেকে তিন ফোঁটা টি-ট্রি অয়েল নিয়ে তাতে এক টেবিল চামচ অলিভ অয়েল বা নারকেল তেল মিশিয়ে ত্বকের চুলকানির অংশে লাগিয়ে দিন। দিনে একবার করে করবেন এই প্রক্রিয়াটি।

কিভাবে কাজ করে ?

অ্যান্টি-মাইক্রোবিয়াল, অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি, অ্যান্টি-সেপটিক বৈশিষ্ট্য থাকার জন্য এটি ত্বকের নানা সমস্যা যেমন অ্যাকনে, ব্রণ বা চুলকানির সমস্যা দূর করতে সক্ষম (16)

১৪. ভিটামিন

ভিটামিন এ ত্বককে স্বাস্থ্যকর করে তুলতে ও ত্বকে নতুন কোষ গঠন করতে সাহায্য করে (17)

ভিটামিন সি কোলাজেন গঠন করতে পারে ও তার পাশাপাশি নানা রকম ইনফেকশন সারিয়ে তোলে (18)। তাই প্রয়োজনে ভিটামিন সাপ্লিমেন্ট খেতেই পারেন, তবে অবশ্যই ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করে নেবেন।

ত্বকের চুলকানি কখন ঝুঁকিপূর্ণ ?

  • যখন ত্বকের চুলকানি বেশ অনেকদিন স্থায়ী হয়
  • একটি নির্দিষ্ট অংশ থেকে যখন সারা দেহে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে
  • যদি চুলকানির অংশ ফুলে ওঠে।

ত্বকের চুলকানির চিকিৎসা

ত্বকে চুলকানি হলে উপরে উল্লেখিত ঘরোয়া উপায়গুলি প্রথমে মানুন। ডাক্তারের পরামর্শ নিতে ভুলবেন না কিন্তু। কারণ ত্বকের চুলকানিরও অনেক ধরণ আছে, তাই চিকিৎসাও অনেক ধরণের হতে পারে। অনেকের কোনো নির্দিষ্ট খাবারের থেকেও অ্যালার্জি হতে পারে, তাই তখন অ্যালার্জির জন্য উপযোগী চিকিৎসা করা হয়।

ত্বকের চুলকানির সমস্যা হলে ডায়েটে কি কি রাখা উচিত ?

যেসব খাবারে মূলত অ্যালার্জি হয়ে থাকে যেমন বেগুন, চিংড়ি মাছ, মাশরুম, যে কোনো সামুদ্রিক মাছ এসব না খাওয়াই ভালো। ত্বকে চুলকানি হলে ডায়েট সংক্রান্ত ব্যাপারে অবশ্যই ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করে নেবেন ।

ত্বকের চুলকানির সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়ার টিপস

  • প্রতিদিন ভালোভাবে স্নান করুন, যাতে ত্বকে ময়লা জমতে না পারে।
  • সুতির পোশাক পড়ার চেষ্টা করুন।
  • নখ বেশি বড়ো রাখবেন না।
  • স্ট্রেস কমান।
  • বেশি পরিমানে জল পান করুন।
  • ত্বকে ময়েশ্চরাইজার লাগানোর অভ্যেস করুন।
  • ক্যাফিন ও অ্যালকোহোল জাতীয় পানীয় কম পান করুন।

ত্বকের চুলকানির সমস্যা বেড়ে গেলে শীঘ্রই ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করুন।

কখন ডাক্তার দেখাবেন ?

ত্বক-বিশেষজ্ঞর সঙ্গে যোগাযোগ করুন, যখন  –

  • চুলকানির সমস্যা বেশ অনেকদিন স্থায়ী হচ্ছে
  • ঘরোয়া উপায় মানার পরও যখন কমছে না
  • হঠাৎ বেড়ে গেলে
  • পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়লে
  • ইনফেকশনে রূপান্তরিত হলে
  • জ্বর আসলে।

ত্বকের চুলকানির সমস্যা অল্প হলেও যদি ঠিকভাবে চিকিৎসা না করা হয়, তাহলে তা অনেক সময় ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। তাই অবশ্যই এই সমস্যা হলে শীঘ্রই এর প্রতিকারের ব্যবস্থা করুন, দেরি করবেন না।

নিজের যত্ন করুন ও সুস্থ থাকুন।

18 sources

Articles on StyleCraze are backed by verified information from peer-reviewed and academic research papers, reputed organizations, research institutions, and medical associations to ensure accuracy and relevance. Check out our editorial policy for further details.
Was this article helpful?
The following two tabs change content below.
scorecardresearch