ইউরিক অ্যাসিডের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য তালিকা | Uric Acid Diet Chart

by

অনেক মানুষ এটাকে আবহাওয়ার পরিবর্তন জনিত সমস্যা বা অতিরিক্ত পরিশ্রমের ফলাফল বলে ভুল করে থাকেন। হাড়ের গাঁটে গাঁটে ব্যথায় রাতে দু চোখের পাতা এক করতে না পারা আজকের সময়ের একটি অতি পরিচিত দৃষ্টান্ত। বেশিরভাগ সম কখনও কখনও এমনটা হয় ঠিকই কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শরীরে ইউরিক অ্যাসিড বৃদ্ধির ফলেও গাঁটের ব্যথা হয়ে থাকে। স্টাইলক্রেজের এই প্রবন্ধে আমরা ইউরিক অ্যাসিড সম্বদ্ধে অতি প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস নিয়ে আলোচনা করবো। এখানে আপনাদের ইউরিক অ্যাসিডে জন্য সম্ভাব্য খাদ্য তালিকাও পরিবেশন করা হবে। তাহলে এবার ইউরিক অ্যাসিড সম্বন্ধে প্রয়োজনীয় কিছু তথ্য জেনে নেওয়া যাক।

 ইউরিক অ্যাসিড ডায়েট বা খাদ্য তালিকা কীভাবে আমাদের উপকার করে?

প্রথমেই আমাদের জেনে নেওয়া দরকার যে পিউরিনযুক্ত খাদ্য থেকেই আমাদের শরীরে ইউরিক অ্যাসিডের সৃষ্টি হয়। তাই পিউরিন সমৃদ্ধ খাদ্য বস্তু আমাদের এড়িয়ে চলা দরকার। একমাত্র পিউরিনযুক্ত খাদ্য দ্রব্য বর্জন করলেই শরীরে ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা নিয়ন্ত্রনে থাকে। কাজেই আমাদের পিউরিন যুক্ত খাদ্য গ্রহণের ক্ষেত্রে সর্তক থাকতে হবে। (1)

ইউরিক অ্যাসিডের জন্য উপযুক্ত খাদ্য তালিকা –

এখানে আমরা ইউরিক অ্যাসিডের জন্য উপযুক্ত খাদ্য তালিকা সম্বদ্ধে আলোচনা করবো। এই খাদ্য তালিকা আপনাদের প্রয়োজনীয় তথ্য প্রদানে সহায়তা করবে। তবে এই খাদ্য তালিকা অনুসরণ বা পরিবর্তণ করার আগে অবশ্যই আপনার চিকিৎসক অথবা পুষ্টিবিদের সাথে পরামর্শ করে নেওয়া দরকার।

সময় কোন খাদ্য গ্রহণ করা উচিৎ
সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর (৭:০০-৭:৩০)১ কাপ জলের সাথে ১ ছোট চামচ আপেল সিডার ভিনিগার অথবা মধু – লেবু – জল
প্রাতরাশঃ (৮:১৫ – ৮:৪৫)মাঝারি বাটিতে কুইনোয়া বা ওটমিল + ১ কাপ গ্রীণ টি

অথবা

১ টা সাদা রুটি + পনির বাটার এবং ব্লু বেরি + ১ টা আপেলের রস বা আঙ্গুরের রস বা যে কোনো মৌসুমী ফলের রস অথবা

১ টা ডিম সেদ্ধ + ১ টা রুটি + ১ কাপ তাজা কমলালেবুর রস

মধ্যাহ্ন ভোজের আগে (১০:৩০-১১:০০) ১ /২ কাপ চেরি
মধ্যাহ্ন ভোজ (১২:৩০- ১:০০)১টা রুটি এবং ১/২ কাপ ভাত + ১ বাটি ডাল+ সবুজ পাতাযুক্ত সব্জির স্যালাড

অথবা

সেদ্ধ কাবুলী ছোলার স্যালাড + ১-২ টি রুটি

অথবা

ছাল ছাড়ানো ৩ – ৪ টুকরো (৮৫ গ্রাম ওজনের) বেকড স্যামন মাছ এবং ব্রকলি

বিকেলের আহার (৪:০০-৪:৩০)১ কাপ গ্রীন টি

অথবা

১ কাপ চেরি / আনারস এর রস

নৈশ ভোজ (৭:০০- ৮:০০)১/২ কাপ গ্রীলড চিকেন + ১ টা রুটি আর ১ টা ম্যাসড আলু

অথবা

পালক পাস্তা এবং ১ গ্লাস দুধ

ইউরিক অ্যাসিডে যে যে খাদ্য গুলি গ্রহণ করা উচিৎ আর যেগুলি গ্রহণ করা উচিৎ নয়

ইউরিক অ্যাসিড কমানোর জন্য যদিও অনেক রকমের খাদ্যের কথাই বলা যায় কিন্তু এখানে সব খাদ্যের ব্যাপারে আলোচনা করা তো সম্ভব নয় তাই অল্প কয়েকটি খাদ্যের সম্বদ্ধে আলোচনা করা হবে। এবার খাদ্য গুলি সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক।

প্রয়োজনীয় খাদ্য –

১। সবুজ শাক সবজি – সবুজ শাক সবজি স্বাস্থ্যের পক্ষে খুবই উপকারী খাদ্য দ্রব্য। সবুজ শাক সব্জির মধ্যে রয়েছে মাশরুম, অ্যাসপারগাস বা শতভরী এবং পালং শাক ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। চিকিৎসকদের মতে অল্প পিউরিন যুক্ত খাদ্য গ্রহণ করা স্বাস্থ্যের পক্ষে উপকারী। তাই সুষম পরিমাণে সবুজ শাক সবজি খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয়। আর সবুজ শাক সব্জির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো আলু, গাজর, শশা, অঙ্কুরিত বীজ, সীম ইত্যাদি। (2)

২। ফল – ইউরিক অ্যাসিডে আক্রান্ত হলে যেসব ফল গুলি সবচেয়ে উপকারী বলে মনে করা হয় তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলো চেরি ফল। একটি গবেষণা থেকে জানা যায় যে চেরি ফল ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা হ্রাস করে। শুধু তাই নয় একইসাথে চেরি ফল গাউটে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভবনাও হ্রাস করে। তবে চেরি ছাড়াও কলা, এবং স্ট্রবেরি ফল গ্রহণ করা যেতে পারে। (3) (4)

৩। পাতিলেবু – খাদ্য হিসেবে পাতিলেবু গ্রহণ করলে ইউরিক অ্যাসিডের প্রকোপ কম হয়। তাই আপনার খাদ্য তালিকায় অবশ্যই পাতিলেবু অন্তর্ভূক্ত করা উচিৎ। (5)

৪। জল – বলা হয়  যে সারাদিনে যারা ৬ – ৮ গ্লাস জল পান করেন অন্যদের তুলনায় তাদের গাউটে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভবনা অনেক কম হয়। প্রতিদিন কতটা পরিমাণ জল পান করা উচিৎ সে ব্যাপারে চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করা জরুরী। (6)

৫। ডেয়ারী প্রোডাক্ট বা দুদ্ধজাত পণ্য – যেহেতু দুগ্ধজাত পণ্যে পিউরিনের পরিমাণ খুবই অল্প থাকে তাই দুগ্ধজাত পন্য গ্রহণ করা নিরাপদ। দুগ্ধজাত পণ্যের মধ্যে রয়েছে দুধ, দই, পণির ইত্যাদি।

৬। ডিম – ইউরিক অ্যাসিডের পরিমাণ বেশি থাকলেও খাদ্য হিসেবে ডিম গ্রহণ করা যেতে পারে। ডিমে পিউরিনের পরিমাণ একদম না থাকার সমান। এমনকি গাউটে আক্রান্ত হলেও ডিম গ্রহণ করা যেতে পারে।

এছাড়াও অন্যান্য যেসব খাদ্য গ্রহণ করা যেতে পারে সেগুলি হলো দানা শস্য, ভাত, চিনেবাদাম, ইত্যাদি। এবার জেনে নেওয়া যাক কোন কোন খাদ্য গুলি গ্রহণ করা উচিৎ নয়।

অপ্রয়োজনীয় খাদ্য –

ইউরিক অ্যাসিডে যে যে খাদ্য গ্রহণ করা স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকারক সেগুলি হলো নিম্নরূপ –

  • রেড মীট বা অন্যান্য সি ফুড গ্রহণ করা উচিৎ নয় কারণ এতে অধিক মাত্রায় পিউরিন থাকে। তাই এই খাদ্য গুলি গ্রহণ করলে শরীরে ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা বৃদ্ধি পায় এবং একইসাথে গাউটে আক্রান্ত হওয়ারও ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। এসব সত্ত্বেও আপনি যদি এইসব খাদ্য গুলি গ্রহণ করতে যদি বাধ্য হন তাহলে এইসব জিনিসের কিডনি, লিভার এবং ব্রেস্ট ইত্যাদি গ্রহণ থেকে বিরত থাকতে হবে।
  • অধিক শর্করা যুক্ত পানীয় যেমন কোল্ড ড্রিঙ্ক, সোডা, চিনিযুক্ত ফলের রস, ইত্যাদি গ্রহণ করা উচিৎ নয়।
  • অ্যাসপিরিন জাতীয় ওষুধ সেবন থেকে বিরত থাকুন। চিকিৎসকের পরামর্শ ব্যতীত ইউরিক অ্যাসিড থাকলে এইসব ওষুধ সেবন করা উচিৎ নয়।
  • একবারে বেশি খাদ্য গ্রহণের প্রবণতা এড়িয়ে চলা স্বাস্থ্যের পক্ষে উপযোগী। কারণ একসাথে অনেকটা পরিমাণ খাদ্য গ্রহণ করলে ওজন বৃদ্ধির সম্ভবনা বেড়ে যায় যা গাউটে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে।
  • ফুলকপি এবং ব্রাসেলস স্প্রাউট ইত্যাদি খাদ্য গ্রহণ থেকে বিরত থাকুন।
  • অ্যালকোহল, কালো কফি এবং চা ইত্যাদি পান একদম  বর্জন করা দরকার।
  • কোকো এবং গরম মশলা যুক্ত খাদ্য গ্রহণ না করাই বাঞ্ছনীয়।

ইউরিক অ্যাসিডে প্রয়োজনীয় খাদ্য দ্রব্যের বিকল্প দ্রব্য –

ইতিমধ্যে ইউরিক অ্যাসিডের উপযুক্ত ডায়েট চার্ট বা খাদ্য তালিকার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এবার জেনে নেওয়া ঐসব খাদ্য গুলি ছাড়াও আর কী কী বিকল্প খাদ্য দ্রব্য রয়েছে যা ইউরিক অ্যাসিডের ক্ষেত্রে গ্রহণ করা যেতে পারে। আশা করা যায় এই দুটি খাদ্য তালিকা থেকে আপনারা নিজেদের ইচ্ছানুসারে খাদ্য তালিকা তৈরী করে খাদ্য গ্রহণ করতে পারবেন।

ইউরিক অ্যাসিডে যে খাদ্য গ্রহণ করা উচিৎতার বিকল্প খাদ্য দ্রব্য
আপেল সিডার ভিনিগারপাতিলেবু বা পাতিলেবুর রস
কিনোয়া৩ টেবিল চামচ ওটস বা যব
গ্রীন টিভেষজ চা
হোয়াইট ব্রেডব্রাউন ব্রেড
পীনাট বাটার ফ্লেক্স সীড বাটার
আঙুরের রসকমলালেবুর রস
ডিম৩ টি মাঝারি আকারের মাশরুট কাটা এবং সটেড
কমলালেবুর রসআনারস বা সরবতি লেবুর রস
চেরিব্লুবেরী বা স্ট্রবেরী
সবুজ পাতাযুক্ত সব্জির স্যালাডভেজিটেবল ক্লিয়ার স্যুপ
সবেদা৩ বড় চামচ মুসুর ডালের স্যুপ
চেরির রসস্ট্রবেরীর রস
চটকানো আলু সেদ্ধব্রকোলী
পাস্তাভাত

বি . দ্র প্রত্যেক মানুষের শরীরে ইউরক অ্যাসিডের পরিমাণ পৃথক যা মূলত নির্ভর করে ব্যক্তির খাদ্যাভ্যাসের ওপর। তাই এক্ষেত্রে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করে নেওয়া জরুরী কারণ একমাত্র তিনিই বলতে পারবেন কার শরীরে কতটা পরিমাণ ইউরিক অ্যাসিডের জন্য কী খাদ্য গ্রহণ করা উচিৎ। মাথায় রাখা দরকার যে সব খাদ্য সকলের ক্ষেত্রে সমান উপযোগী হয়না। অনেকের অনেক খাদ্যে আবার অ্যালার্জির ঝুঁকিও থাকে। তাই খাদ্য গ্রহণের ব্যাপারে সতর্ক থাকুন।

ইউরিক অ্যাসিডের ক্ষেত্রে কিছু জরুরী টিপস –

ইউরিক অ্যাসিড কমাতে বিশেষ কতকগুলি জিনিসের ওপর যত্নশীল হওয়া দরকার। সেগুলি আমাদের দৈনন্দিন কার্যকলাপ এবং খাদ্যাভ্যাস সংক্রান্ত বিষয়ে জরুরী কতকগুলি টিপস নিম্নে আলোচনা করা হলো।

১। অ্যালকোহল পান এবং ধূমপান থেকে বিরত থাকুন।

২। বেশিক্ষণ সময় খালি পেটে থাকা উচিৎ নয়। বরং অল্প সময়ের বিরতিতে বার বার খাদ্য গ্রহণ করা দরকার।

৩। বেশি পরিমান জল পান করা দরকার।

৪। চিকিৎসকের পরামর্শ মতন স্বাস্থ্যচর্চা, যোগ ব্যায়ম করতে পারেন।

৫। দৈনিক ৫০০ মিলিগ্রামের অধিক ইউরিক অ্যাসিড যেন না হয়। সেই কারণে যেসব খাদ্য গ্রহণ করছেন তাতে ইউরিক অ্যাসিডের পরিমাণ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকুন।

৬। শোওয়ার অন্তত ৩ ঘন্টা পূর্বে খাদ্য গ্রহণ করা উচিৎ।

৭। আপনার খাদ্য তালিকায় কার্বোহাইড্রেট যুক্ত খাদ্য অন্তর্ভূক্ত করা জরুরী।

৮। ইউরিক অ্যাসিডে ফল, দুধ, দুগ্ধজাত দ্রব্য ইত্যাদি গ্রহণ করা প্রয়োজন।

৯। মাখন, মধু এবং জ্যাম ইত্যাদি খাদ্য দ্রব্যকে আপনার খাদ্য তালিকার অন্তর্ভূক্ত করা দরকার।

১০। ভাজা এবং বেক করা খাদ্য দ্রব্য এড়িয়ে চলা দরকার।

আশা করা যায় এই প্রবন্ধ পাঠের পর আপনার একটা স্পষ্ট ধারণা হয়েছে ইউরিক অ্যাসিডে কোন খাদ্য গ্রহণ উপযুক্ত আর কোনটা নয়। তবে একইসাথে একথাও মাথায় রাখতে হবে যে প্রথমেই একজন চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করে জেনে নিন যে আপনার শরীরের জন্য কোনটা এবং কতটা পরিমানে দরকার। এই সম্পর্কে কোনো ধারণা না থাকলে ওপরে আলোচিত ডায়েট চার্ট অনুসরণ করেও আশানুরূপ কোনো ফলাফল পাওয়া যাবেনা।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী

পাতিলেবু কী ইউরিক অ্যাসিডের জন্য উপকারী?

হ্যাঁ উপকারী।

কোন কোন শাক সবজি ইউরিক অ্যাসিডের জন্য প্রয়োজনীয়?

ওপরের প্রবন্ধে এই সম্পর্কে বিশদে আলোচনা করা হয়েছে।

এসেন্সিয়াল অয়েল কী গাউটের চিকিৎসায় উপযুক্ত বলে মনে করা হয়?

হ্যাঁ, এসেন্সিয়াল অয়েল ইউরিক অ্যাসিড কম করে গাউটের সমস্যা অনেকটাই কমিয়ে দেয়।

খাদ্য হিসেবে কলা গ্রহণ করলে কী তা ইউরিক অ্যাসিড বৃদ্ধির কারণ হয়?

নাহ কলা ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা হ্রাস করে।

খাদ্য হিসেবে ভাত গ্রহণ কী ভালো?

হ্যাঁ ভাত খেলে ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা হ্রাস পায়।

ইউরিক অ্যাসিডের ক্ষেত্রে কী ডিম গ্রহণ করা যেতে পারে?

ওপরের প্রবন্ধে এই সম্পর্কে বিশদে তথ্য দেওয়া হয়েছে।

টমেটো কী ইউরিক অ্যাসিডের পরিমাণ বৃদ্ধি করে?

নাহ এমন হওয়ার কোনো সম্ভবনা নেই।

ইউরিক অ্যাসিডে কী চিকেন খাওয়া যেতে পারে?

নাহ ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা বৃদ্ধি করে চিকেন। তাই এটা ইউরিক অ্যাসিডের জন্য নিরাপদ নয়।

6 Sources

Was this article helpful?
scorecardresearch