ভিনিগারের উপকারিতা, ব্যবহার এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া | vinegar in bengali

by

ভিনিগার নামটি আমাদের কারো কাছেই অপরিচিত নয়। আমাদের রান্নাঘরের প্রয়োজনীয় উপাদান গুলির মধ্যে অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো ভিনেগার। রান্নাঘরে ব্যবহারের পাশাপাশি আমাদের ত্বক পরিচর্যার ক্ষেত্রেও এর প্রচুর ব্যবহার রয়েছে। মূলত আমাদেরকে সুন্দর করে তুলতে ত্বক পরিচর্যায় ভিনেগার ব্যবহার করা হয়। ভিনেগার মূলত অ্যাসিটিক অ্যাসিড এবং জলের মিশ্রণে তৈরি একটি উপাদান। এটি সাধারণত রান্নাবান্নায়, স্যালাড প্রস্তুতিতে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। মূলত বিভিন্ন ফলের রস এবং অ্যালকোহল সহযোগে ভিনেগার তৈরি করা হয়। কখনো বা নির্দিষ্ট ব্যাকটেরিয়া ব্যবহার করে এটি তৈরি করা হয়। মূলত বিদেশি রান্নার ক্ষেত্রে এটি ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এছাড়াও গৃহস্থালির নানান জিনিস পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করতে, চিকিৎসা ব্যবস্থায়, ত্বক পরিচর্যায় এর বহুবিধ ব্যবহার রয়েছে। আজ থেকে হাজার হাজার বছর আগে মানুষ ভিনেগার ব্যবহার শুরু করেছে। প্রায় ৩০০০ খ্রিস্টাব্দ পূর্বে মিশরে ভিনেগার পাওয়া যায়। মূলত আমরা দু ধরনের ভিনেগার দেখে থাকি, সাধারণ বা সাদা রংয়ের ভিনেগার এবং অ্যাপেল সিডার ভিনেগার। ভিনেগার বিভিন্ন রকম ফলের সমন্বয়ে তৈরী হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে আপেল, খেজুর, টমেটো, নাশপাতি, নারকেল এসব ব্যবহার করা হয়। যে ফলের রস দিয়ে ভিনেগার তৈরি করা হয় সেই ফলের নাম অনুসারেই এর নামকরণ করা হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ইউরোপে বিভিন্ন ফলের রস দিয়ে ভিনেগার প্রস্তুত করা হয়। এছাড়াও চীন, কোরিয়ার মতন দেশগুলিও ফল দিয়ে ভিনেগার তৈরি করে থাকে। আসুন তাহলে জেনে নিন, ভিনেগার ব্যবহার করে কিভাবে নিজে সুস্থ-সুন্দর থাকবেন এবং আপনার আশেপাশের সমস্যাগুলিকে দূর করবেন।

ভিনেগারের উপকারিতা

ডায়াবেটিস, ক্যান্সার, কোলেস্টেরল, হৃদরোগের সমস্যা, কিডনির সমস্যায়, হাইপারটেনশনের মতন রোগগুলি নিরাময়ের ক্ষেত্রে ভিনিগার ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এছাড়াও শরীরের গন্ধ, পায়ের গন্ধ এবং ত্বকের বিভিন্ন সমস্যায় যেমন রোদে পোড়া দাগ, পিগমেন্টেশন এসব সমস্যা গুলি দূরীকরণে এবং চুলের স্বাস্থ্য রক্ষায় ভিনেগারের ব্যবহার করা হয়। তবে আসুন সবিস্তারে জেনে নিন কিভাবে ভিনেগার আপনাকে সহায়তা করতে পারে।

১) ডায়াবেটিস নিরাময়ে

ডায়াবেটিস রোগের সমস্যায় যারা ভুগছেন তারা খাদ্যতালিকায় আপেল সিডার ভিনিগার ব্যবহার করতে পারেন। তবে তা নির্দিষ্ট মাত্রায় ব্যবহার করা উচিত। মূলত টাইপ টু ডায়াবেটিস রোগে যারা ভুগছেন তারা অ্যাপেল সিডার ভিনিগার গ্রহণ করতে পারেন।

গবেষণায় দেখা গিয়েছে আপেল সিডার ভিনিগার রক্তে গ্লুকোজের মাত্রাকে কম করতে সহায়তা করে। টাইপ টু ডায়াবেটিস এর অন্যতম কারণ হতে পারে স্থূলতা। অ্যাপেল সিডার ভিনিগার শরীরের ওজন কম করতেও সহায়তা করে থাকে। তবে কখনই এটি অতিরিক্ত পরিমাণে গ্রহণ করা উচিত নয় এবং এটি ব্যবহার করার আগে অবশ্যই জলে মিশিয়ে খাওয়া উচিত।

কি কি প্রয়োজন ?

১ থেকে ২ টেবিল চামচ, আপেল সিডার ভিনিগার এবং একটি বড় গ্লাস উষ্ণ গরম জল।

কিভাবে ব্যবহার করবেন ?

উষ্ণ গরম জলের মধ্যে ১ থেকে ২ টেবিল চামচ অ্যাপেল সিডার ভিনিগার দিয়ে ভালো করে মিশিয়ে নেবেন।এটি রাতে শুতে যাওয়ার আগে কিংবা দুপুরে খাবার একঘন্টা পরে খেয়ে নেবেন। এটি প্রত্যেকদিনই খেতে পারেন।তবে মাথায় রাখবেন যদি এটি খাওয়ার পরে গলা জ্বালা, বুক জ্বালার মতো সমস্যা দেখা দেয় সেক্ষেত্রে এর পরিমাণ কমিয়ে দেবেন কিংবা চিকিৎসকের সাথে যোগাযোগ করবেন।

২) ওজন কম করতে

ওজন কম করার ক্ষেত্রে সাধারণত আপেল সিডার ভিনেগার ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এটির মধ্যে আম্লিক উপাদান বেশি থাকায় এটি শরীরের মেদ দ্রুত কমাতে সহায়তা করে। যার ফলে টানা ১৫ দিন যদি আপেল সিডার ভিনেগার খাওয়া যেতে পারে সেক্ষেত্রে শরীরের পরিবর্তনটা চোখে পড়বে।

কি কি উপাদান প্রয়োজন?

এক গ্লাস উষ্ণ গরম জল, ২ টেবিল চামচ অ্যাপেল সিডার ভিনিগার।

কিভাবে ব্যবহার করবেন?

প্রত্যেকদিন সকালে উষ্ণ গরম জলে অ্যাপেল সিডার ভিনিগার মিশিয়ে খালি পেটে এটি গ্রহণ করবেন। দৈনিক এটি ব্যবহার করার ফলে পেটের মেদ কমার পাশাপাশি শরীরের অস্বাভাবিক ওজন হ্রাস পাবে।

৩) কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে

বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে যে, হৃদযন্ত্রের সমস্যা কমানোর পাশাপাশি শরীরের কোলেস্টেরল লেভেল কে কম করতে সহায়তা করে থাকে আপেল সিডার ভিনিগার।

বিভিন্ন প্রাণীর ওপর করা সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে এটি রক্ত থেকে ট্রাই গ্লিসারিন এবং কোলেস্টেরল কম করার পাশাপাশি রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করে। যার ফলে ওজন নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং হৃদরোগের ঝুঁকিও কমে।

অ্যাপেল সিডার ভিনিগার এর মধ্যে থাকা পেকটিন নামক উপাদান শরীরের কোলেস্টেরল কম করতে সহায়তা করে। যে কারণে চিকিৎসকেরা বিশ্বাস করেন শরীরে কোলেস্টেরলের পরিমাণ কম করতে এটি ব্যবহার করা যেতে পারে। মূলত হাই ট্রাইগ্লিসারাইড এবং কোলেস্টেরলের মাত্রা হার্ট অ্যাটাক এবং স্ট্রোকের সম্ভাবনা বাড়িয়ে তোলে যার ফলে শরীরে উচ্চ কোলেস্টেরল থাকলে তা হৃদরোগের সম্ভাবনা বাড়িয়ে তোলে।

সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, আপেল সিডার ভিনেগার ব্যবহার করার ফলে ওজন হ্রাসের পাশাপাশি শরীরে কোলেস্টেরলের মাত্রাও কম হবে।

কিভাবে ব্যবহার করবেন?

অ্যাপেল সিডার ভিনিগার কে যেকোনো সালাদের সাথে মিশিয়ে খাদ্য তালিকায় যোগ করুন। এক্ষেত্রে পরিমাণ যেন ১ থেকে ২ টেবিল চামচ হয় এবং সালাডের পরিমাণ যেন একবার সমান হয়। এটি প্রত্যেকদিন দুপুর এবং রাতের খাবার খাবার পরে গ্রহণ করতে পারেন। তবে দিনে দু’বারের বেশি এটি গ্রহণ করবেন না।

৪) ত্বকের বার্ধক্য কম করতে

দৈনন্দিন দূষণ, মেকআপ এর ব্যবহার, রোদের তাপ, এসবের কারণে বয়স না বাড়লেও ত্বকের বয়স যত বাড়তে থাকে ত্বকের মধ্যে রিংকেল দেখা দিতে থাকে। যার ফলে মুখ দেখে বয়স্ক মনে হয়। এক্ষেত্রে ত্বককে পুনরুজ্জীবিত করতে ভিনেগার ব্যবহার করা হয় এক্ষেত্রে ত্বক পরিচর্যায় মূলত আপেল সিডার ভিনেগার ব্যবহার করা হয়। এর মধ্যে এক ধরনের হাইড্রোক্সি এসিড রয়েছে যা ত্বকের মৃত কোষ গুলিকে কম করে বার্ধক্যজনিত দাগকে হালকা করতে সহায়তা করে। এছাড়া নিয়মিত যদি অল্প পরিমাণে ভিনিগার নিয়ে ত্বকে ব্যবহার করা যায় সে ক্ষেত্রে ত্বকে বলিরেখা এবং সূক্ষ্ম রেখার মতো সমস্যাগুলি দূর হবে। এক্ষেত্রে ত্বকে টোনার হিসেবে কিংবা প্যাক হিসেবে আপেল সিডার ভিনিগার ব্যবহার করতে পারেন।

কি কি উপাদান প্রয়োজন?

আপেল সাইডার ভিনিগার জল।

কিভাবে ব্যবহার করবেন?

আপেল সাইডার ভিনেগার এবং জল ভালোভাবে মিশিয়ে নিন। এবার এই মিশ্রণটি স্প্রে বোতলে নিয়ে যেসব জায়গায় বলিরেখা দেখা দিয়েছে সেই খানে স্প্রে করুন অথবা তুলোয় করে নিয়ে সেই জায়গাতে তুলনা লাগিয়ে রাখতে পারেন। এরপর ১০-১৫ মিনিট রেখে সাধারণ জল দিয়ে মুখ ধুয়ে ফেলুন। দিনে দুবার এটি করুন।

কিভাবে কাজ করে?

অ্যাপেল সিডার ভিনিগার ত্বকের মৃত কোষ সরিয়ে নতুন কোষ উৎপন্ন করতে সহায়তা করে। এছাড়াও এটি ত্বকের পিএইচ মাত্রা বাড়িয়ে তোলে যার ফলে মৃত কোষ দূর হয়ে গেলে নতুন করে কোষ উৎপাদন শুরু হলে ত্বক তার হারিয়ে যাওয়া উজ্জ্বলতা ফিরে পায়।

৫) হৃদরোগের সমস্যায়

হঠাৎ করে ওজন বৃদ্ধি কিংবা কোলেস্টেরল বৃদ্ধি হৃদরোগের সমস্যা এবং স্ট্রোক এর মতন সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। যে কারণে ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখার পাশাপাশি শরীরে কোলেস্টেরলের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় এবং উচ্চ রক্তচাপের সমস্যায় যদি ভিনেগার ব্যবহার করা যায় তাহলে হৃদরোগের সমস্যা দূর হয়। এক্ষেত্রে অ্যাপেল সিডার ভিনিগার ব্যবহার করা যেতে পারে। অ্যাপেল সিডার ভিনিগার এর মধ্যে থাকা আম্লিক উপাদান গুলি হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করে।

এটি মূলত ওজনকে স্বাস্থ্যকর পদ্ধতিতে হ্রাস করার পাশাপাশি শরীরে উচ্চ রক্তচাপকে কম করতে এবং কোলেস্টেরলের মাত্রা কে কম করতে সহায়তা করে। তাই যারা হৃদরোগের সমস্যায় ভুগছেন দৈনিক নির্দিষ্ট পরিমাণ আপেল সিডার ভিনিগার খাদ্য তালিকায় রাখতে পারেন। তবে অবশ্যই তা ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী।

কি কি উপাদান প্রয়োজন?

আপেল সিডার ভিনিগার ১ থেকে ২ টেবিল চামচ এবং জল এক গ্লাস।

কিভাবে ব্যবহার করবেন ?

এক গ্লাস উষ্ণ গরম জলে আপেল সিডার ভিনিগার মিশিয়ে প্রতিদিন রাতে শুতে যাওয়ার আগে খেয়ে নিন। এটি হৃদরোগের সমস্যার পাশাপাশি শরীরের অনেক সমস্যা কম করতে সহায়তা করবে। তবে অবশ্যই এটি ব্যবহার করার আগে আপনার চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ নেবেন।
প্রতিদিন এটি ব্যবহার করতে পারেন। আপেল সিডার ভিনিগার প্রতিদিন ব্যবহার করার ফলে হৃদরোগের সমস্যা থেকে মুক্তি পাবেন।

৬) অ্যালজাইমার রোগ নিরাময়ে

অ্যালজাইমার রোগ নিরাময়ের ক্ষেত্রে সরাসরি আপেল সিডার ভিনিগার এর কোনো ভূমিকা না থাকলেও আংশিক এর ব্যবহার এক্ষেত্রে কার্যকরী। অ্যালজাইমার রোগ কে অনেকাংশে টাইপ টু ডায়াবেটিস বলা যেতে পারে।

এক্ষেত্রে মস্তিষ্ক এবং শরীরের অন্যান্য টিস্যু গুলিতে যে ইনসুলিন প্রক্রিয়া চলে সেক্ষেত্রে আপেল সিডার ভিনিগার এটিকে শরীরের রক্ত থেকে সুগারের পরিমাণ কম করতে সহায়তা করে। যে কারণে যদি স্বল্প পরিমাণে আপেল সিডার ভিনিগার গ্রহণ করা যায় সেক্ষেত্রে রক্তে শর্করার মাত্রা কম হতে পারে।

কিভাবে ব্যবহার করবেন?

  • আলজাইমার রোগীরা খাদ্যতালিকায় ভিনেগারকে রান্নায় ব্যবহার করতে পারেন।
  • রান্নায় ব্যবহার করার ক্ষেত্রে সাদা রঙের সাধারণ ভিনেগার ব্যবহার করতে পারেন।
  • এছাড়াও সালাড কিংবা শরবতে স্বল্প পরিমাণে আপেল সিডার ভিনিগার ব্যবহার করতে পারেন।
  • অথবা উষ্ণ গরম জলে অ্যাপেল সিডার ভিনিগার মিশিয়ে খাদ্য তালিকায় রাখতে পারেন।
  • দুপুরে খাওয়ার পরে কিংবা রাতে খাবার পরে গ্রহণ করতে পারেন।

তবে সবটাই ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী কেননা প্রত্যেকটা মানুষেরই শারীরিক চাহিদা আলাদা থাকে, সে ক্ষেত্রে এটি ব্যবহার করার আগে এবং আপনি কি কি ওষুধ খাচ্ছেন সেই সমস্ত বিষয় বিবেচনা করে আপেল সিডার ভিনিগার গ্রহণ করা উচিত।

৭) কিডনির সমস্যায়

কিডনির মধ্যে পাথর হওয়ার সমস্যা কোন নতুন বিষয় না। মূলত সঠিকভাবে যদি জল খাওয়া না হয় এবং যথাযথ পরিমাণে যদি মূত্র শরীর থেকে বের না হয় তখনই কিডনির সমস্যা দেখা দিতে পারে। তবে অনেকাংশে অত্যধিক পরিমাণে জল গ্রহণের ফলেও কিডনির সমস্যা দেখা দিতে পারে।

তবে দেখা গিয়েছে মূলত যখন পাকস্থলীতে অ্যাসিডের সমস্যা বৃদ্ধি পায় তখনই কিডনির পাথরের সমস্যা দেখা দেয়। এক্ষেত্রে অ্যাপেল সিডার ভিনিগার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এটি শরীরের খাদ্যকে যথাযথভাবে হজম করতে সহায়তা করে এবং কিডনির সমস্যা দূর করে।

এছাড়াও কিডনি স্টোনের কারণে হওয়া যন্ত্রণা কম করতে এবং কিডনির মধ্যে হওয়া ক্ষত নিরাময় করতেও সহায়তা করে। এছাড়াও অ্যাপেল সিডার ভিনিগার শরীর থেকে টক্সিন বের করে দিতে এবং শরীরের বিভিন্ন বর্জ্য পদার্থ কে বের করে দিতে সহায়তা করে। যে সমস্ত কারণে কিডনিতে পাথর হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয় সেই সম্ভাবনাগুলোকে কম করতে অ্যাপেল সিডার ভিনিগার সহায়তা করে। এটি শরীরে অনেকটা প্রাকৃতিক অ্যাসিড হিসেবে কাজ করে, যার ফলে কিডনিতে পাথর থাকলে তা নরম করতে এবং ভেঙ্গে মূত্রের মাধ্যমে বের করে দিতে সহায়তা করে।

চিকিৎসকেরাও কিডনির সমস্যার ক্ষেত্রে অ্যাপেল সিডার ভিনেগারের ব্যবহার সমর্থন করেন।

কিভাবে ব্যবহার করবেন?

কিডনিতে পাথরের সমস্যা দেখা দিলে নিয়মিত অ্যাপেল সিডার ভিনিগার পান করার অভ্যাস করুন। এটি শরীরের ভেতর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সহায়তা করবে। তবে এটি সরাসরি কখনোই গ্রহণ করবেন না। সবসময় একগ্লাস জলে ১ থেকে ২ টেবিল চামচ আপেল সিডার ভিনিগার মিশিয়ে গ্রহণ করবেন। কেননা এটি সরাসরি গ্রহণ করলে দাঁতে এর খারাপ প্রভাব পড়ে।

এছাড়াও আপনি যদি এটিকে একটু স্বাদ পরিবর্তন করে খেতে চান সেক্ষেত্রে জলে অ্যাপেল সিডার ভিনিগার মেশানোর পাশাপাশি ১ টেবিল চামচ মধু যোগ করতে পারেন। এটি এতে আরও স্বাদ বাড়িয়ে তুলবে।

৮) হাইপার টেনশন কম করতে

শরীরে রক্তচাপ এর পরিমাণ হঠাৎ করে বৃদ্ধি পেলে উচ্চ রক্তচাপের কারণে হাইপারটেনশনের সমস্যা দেখা দেয়। এক্ষেত্রে বুক ধড়ফড়ানি, হাত পা ঠান্ডা হয়ে যাওয়া, দম বন্ধ হয়ে আসা, হাতপায়ে খিঁচুনি ভাবের মতন সমস্যাগুলি দেখা দেয়। যা অনেক অংশে হৃদযন্ত্রের ওপর প্রভাব ফেলে।

তাই এই সমস্যাগুলি দূরীকরণের ক্ষেত্রে অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো অ্যাপেল সিডার ভিনিগার। এটি উচ্চ রক্তচাপকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং হাইপারটেনশনের সমস্যা কম করতে সহায়তা করে। অনেকাংশে দীর্ঘদিন ধরে কোন কারনে অত্যধিক চিন্তার ফলে হাইপারটেনশনের সমস্যা দেখা দেয়। সেক্ষেত্রে শরীর মস্তিষ্ক একনাগাড়ে চিন্তার ফলে অকেজো হয়ে যেতে থাকে, তখনই এই ধরনের সমস্যা দেখা দেয়।

এক্ষেত্রে অ্যাপেল সিডার ভিনিগার ব্যবহার করা যেতে পারে। কেননা এটি শরীরের রক্ত কে যথাযথভাবে সঞ্চালন করতে সহায়তা করে। এজন্য খাদ্য তালিকায় আপেল সিডার ভিনিগার রাখা উচিত।

কিভাবে ব্যবহার করবেন?

হাইপারটেনশনের সমস্যায় যারা ভুগছেন তারা রক্তচাপকে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য দৈনিক তিন চামচ আপেল সিডার ভিনিগার খাদ্য তালিকায় রাখতে পারেন।

  • এক সপ্তাহের মধ্যেই উচ্চ রক্তচাপ এর সমস্যা কম হতে থাকবে।
  • এটি সরাসরি গ্রহণ না করে উষ্ণ গরম জলের সাথে মিশিয়ে গ্রহণ করতে পারেন।
  • প্রয়োজনে এটিতে অল্প পরিমাণে মধু যোগ করতে পারেন।
  • তবে স্বাদ যদি খুব খারাপ না লাগে মধু যোগ না করাই উচিত। এটির স্বাদ আম্লিক প্রকৃতির হবে।

৯) ক্যান্সার নিরাময়ে

সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, ক্যান্সারের কারনে শরীরে এক ধরনের অ্যাসিড তৈরি হয় যা শরীরের কোষগুলোকে অক্সিজেন যথাযথ প্রবেশ করতে বাধা দেয় এবং শরীরে উচ্চস্তরের এসিডিটির সম্ভাবনা দেখা দেয়। সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, এই ধরনের এসিডিটি গুলিকে নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে অ্যাপেল সিডার ভিনিগার ব্যবহার করা যেতে পারে। এটি এমন একটি উপাদান যা শরীরের অম্লতা কম করার পাশাপাশি ক্যান্সারের জীবাণু ধ্বংস করতেও সহায়তা করে।

অ্যাপেল সিডার ভিনিগার এর পিএইচ মাত্রা খানিকটা বেশি হওয়ায় এটি খাদ্য উপাদানের ইঙ্গিত দেয়। যা ক্যান্সারের চিকিৎসায় ব্যবহার করা যেতে পারে। ইঁদুরের ওপর করা গবেষণায় দেখা গিয়েছে, অ্যাপেল সিডার ভিনিগার এর মধ্যে থাকা অ্যাসিটিক অ্যাসিড ক্যানসারের কোষ কে ধ্বংস করতে সহায়তা করে। এক্ষেত্রে কিছু প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে ক্যান্সারের বিরুদ্ধে এই অ্যাপেল সিডার ভিনিগার কিছুটা প্রতিরক্ষামূলক সুবিধা দিতে পারে, যে কারণে যারা ক্যান্সারের সমস্যায় ভুগছেন তারা দৈনিক খাদ্য তালিকা কিছু পরিমাণ অ্যাপেল সিডার ভিনিগার ব্যবহার করতে পারেন। এর বেশ কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রয়েছে সেগুলো দেখে, বিবেচনা করা অবশ্যই এটি গ্রহণ করবেন।

কীভাবে ব্যবহার করবেন?

ক্যান্সার রোগীর রান্নায় ভিনেগার ব্যবহার করতে পারেন কিংবা শাক সবজি দিয়ে তৈরি স্যালাড কিংবা ফল দিয়ে তৈরি স্যালাডে এর ব্যবহার করতে পারেন।

এছাড়াও যদি উষ্ণ গরম জলে ১ থেকে ২ টেবিল-চামচ অ্যাপেল সিডার ভিনিগার মিশিয়ে খেতে পারেন। তাতে শরীরে উপকার আরো ভালোভাবে পাওয়া যাবে।

১০) মৌখিক চিকিৎসায় ভিনিগার

ভিনিগার এর মধ্যে অ্যাসিডের পরিমাণ বেশি থাকার কারণে এটি দাঁতের এনামেল গুলোকে ক্ষতি করে এবং দাঁতের ক্ষয় বৃদ্ধি করে। যে কারণে সাদা ভিনেগার কিংবা অ্যাপেল সিডার ভিনিগার যেটি আমরা ব্যবহার করি না কেন এটির পরিমাণ যদি বেশি হয়ে যায় সেক্ষেত্রে দাঁতের ক্ষতি হতে পারে। এমনকি দাঁতে ক্ষতের সৃষ্টি করতে পারে। তবে সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, আমরা যদি দৈনিক নির্দিষ্ট মাত্রায় অ্যাপেল সিডার ভিনিগার গ্রহণ করি সেটি দাঁতের এনামেল কে শক্তিশালী করে তুলতে সহায়তা করে অর্থাৎ এটি দাঁতকে বাইরে থেকে সুরক্ষা প্রদান করতে পারে।

এছাড়া অ্যাপেল সিডার ভিনেগার ব্যবহার করে আমরা দাঁত পরিষ্কার করতে পারি। দাঁতের সাদা রঙ ফিরিয়ে আনতে পারি। তবে এটির অত্যধিক পরিমাণে ব্যবহার দাঁতে ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই এটি ব্যবহারের আগে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে নিন। অনেকক্ষেত্রে দেখা যায় অনেকে আপেল সিডার ভিনিগার কে মাউথ ওয়াশ হিসাবে ব্যবহার করার পরামর্শ দেন। এক্ষেত্রে সরাসরি আপেল সিডার ভিনেগার ব্যবহার না করে অ্যাপেল সিডার ভিনিগার কে জলে মিশিয়ে ব্যবহার করা নিরাপদ। সরাসরি আপেল সিডার ভিনিগার বোতল থেকে নিয়ে কখনোই পান করবেন না। এটি মুখের স্বাস্থ্যের ওপর খারাপ প্রভাব ফেলতে পারে।

১১) দাঁদ হাজা কমাতে

দাঁদ হাজার মতন সমস্যাগুলো শরীরের কোন অংশে দেখা দিলে তা ক্রমে বেড়ে যেতে থাকে এবং এতে এক ধরনের চুলকানি সৃষ্টি হয়, যার ফলে চুলকাতে থাকলে তা দিন দিন বাড়তে থাকে। এক্ষেত্রে অ্যাপেল সিডার ভিনিগার এর মধ্যে থাকা অ্যান্টি ব্যাকটেরিয়াল উপাদান গুলি দাদ হাজার সমস্যায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে থাকে। তাহলে জেনে নিন কিভাবে ব্যবহার করবেন।

কি কি উপাদান প্রয়োজন?

আপেল সিডার ভিনিগার ও জল।

কিভাবে ব্যবহার করবেন?

আপেল সিডার ভিনিগার এর মধ্যে অল্প জল মিশিয়ে মিশ্রনটিকে পাতলা করে নিন। এবার যেইখানে দাদ হাজার সমস্যাগুলি হয়েছে সেখানে তুলো দিয়ে আলতো করে এটি লাগিয়ে রাখুন।

দিনে তিনবার এটি ব্যবহার করুন। অ্যাপেল সিডার ভিনিগার এর মধ্যে রয়েছে শক্তিশালী অ্যান্টিফাঙ্গাল বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন উপাদানগুলি, যা দাঁদ নিরাময়ে সহায়তা করে। এছাড়াও এটি ত্বকের যত্নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে থাকে।

১২) পায়ের গন্ধ দূর করতে

সারাদিন একনাগাড়ে স্কুলে কিংবা অফিসে জুতো পড়ে থাকার কারণে আমাদের মধ্যে অনেকেরই পায়ে দুর্গন্ধের মতন সমস্যা দেখা দিতে পারে। মূলত যাদের ত্বকের পিএইচ মাত্রা কম থাকে এরা ব্যাকটেরিয়া বৃদ্ধি প্রতিরোধ করতে পারে না।

যার ফলস্বরূপ টানা জুতো পড়ে থাকলে পায়ে দুর্গন্ধ হয়। এই দুর্গন্ধ কম করতে আপেল সিডার ভিনেগার ব্যবহার করা যেতে পারে। বয়স্ক এবং ছোট সকলেই এটি ব্যবহার করতে পারে।

কি কি উপাদান প্রয়োজন?

এককাপ আপেল সিডার ভিনিগার

কিভাবে ব্যবহার করবেন?

একটি তোয়ালেকে কিংবা মোটা মুখ মোছার তুলো গুলোকে অ্যাপেল সিডার ভিনিগার ভিজিয়ে একটা ফ্রিজে মুখ বন্ধ করা ব্যাগে সংরক্ষণ করে রাখুন। বাইরে থেকে এসে প্রতিদিন এই তুলো দিয়ে পা ভালো করে মুুছে নিন।

পায়ের মধ্যে থাকা ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি দূর করবে এবং পায়ের গন্ধ দূর করবে অ্যাপেল সিডার ভিনিগার এর মধ্যে থাকা এসিডগুলো। এগুলি পায়ের ত্বকের পিএইচ মাত্রার পরিবর্তন করে এবং ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি কে রোধ করে। এছাড়াও এটি যাদের আন্ডার আর্মে দুর্গন্ধের সমস্যা রয়েছে তাদের ক্ষেত্রেও ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে এক্ষেত্রে অ্যাপেল সিডার ভিনিগার এর গন্ধ সামান্য খারাপ লাগলেও চিন্তা করবেন না, এই গন্ধ বেশিক্ষণ স্থায়ী হবে না। তবে এটি আপনার সমস্যা কে ধীরেধীরে দূর করে দেবে।

১৩) জেলিফিশের কাঁটা তুলতে

হঠাৎ করে হাতে জেলিফিশের কাঁটা বেঁধে গেলে তার যন্ত্রণা যে কি হয় তা একমাত্র যার বিঁধেছে সেই জানে। এক্ষেত্রে অ্যালকোহল, লেবুর রস কিংবা অন্যান্য ঔষধি কাটা বের করতে কোন রকম ভাবেই কাজে লাগে না। তাই জেলিফিশের কাটা বের করতে আপেল সিডার ভিনেগার ব্যবহার করুন। শরীরের যে অংশে এই কাঁটা বিঁধেছে সেই জায়গাটায় অ্যাপেল সিডার ভিনিগার পরিমাণমতো নিয়ে ঢেলে দিন।

এটা সহজেই আস্তে আস্তে বেরিয়ে আসতে থাকবে। মূলত সমুদ্রস্নানে গিয়ে বা সামুদ্রিক বিচের উপর যারা বসে থাকেন কিংবা শুয়ে থাকেন হঠাৎ করে তাদের শরীরে কাঁটা বিঁধে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে চিন্তা না করে কাঁটা যে জায়গায় লেগেছে সেখানে অ্যাপেল সিডার ভিনিগার তুলে নিয়ে ভালো করে লাগিয়ে রাখুন। দেখবেন কাটাটি আস্তে আস্তে বাইরের দিকে নরম হয়ে বেরিয়ে আসতে থাকবে কিংবা কাটাটি গলে যাবে। এবং ব্যথাও আস্তে আস্তে কম হয়ে যাবে।

অ্যাপেল সিডার ভিনিগার এর মধ্যে থাকা অ্যান্টি ইনফ্লেমেটরি উপাদান গুলো বিষকে কম করার পাশাপাশি কাঁটা বিঁধে যাওয়ার কারণে যে ব্যথা হবে সেগুলো কম করতেও সহায়তা করবে।

১৪) পা ফাটার সমস্যা কম করতে

আমাদের মধ্যে অনেকেরই সারাবছর কমবেশি পা ফাটার সমস্যা চলতেই থাকে। এদিকে ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে শীত আসার আগেই পা ফাটার সমস্যা সবারই শুরু হয়ে গিয়েছে। শীতকাল মানেই পা ফেটে চৌচির। ফাটা জায়গা দিয়ে রক্ত বেরোনো। এবার শীত আসার আগেই পা ফাটার সমস্যা কে নিরাময় করুন সাদা ভিনেগার এর সাহায্যে। জেনে নিন তাহলে কিভাবে এটি ব্যবহার করবেন।

কি কি উপাদান প্রয়োজন?

  • সাদা ভিনেগার ১ কাপ
  • জল ২ কাপ
  • দই ১ কাপ
  • পিউমিক স্টোন।

কিভাবে ব্যবহার করবেন?

ফাঁটা গোড়ালির সমস্যাকে কমানোর জন্য দুটি পদ্ধতি রয়েছে। প্রথম পদ্ধতি হালকা গরম জলে সাদা ভিনেগার ভালো করে মিশিয়ে নিন। এবার এতে কুড়ি পঁচিশ মিনিট এর জন্য পা ভিজিয়ে রেখে তারপর পিউমিক স্টোন দিয়ে পায়ের মৃত কোষ গুলোকে তুলে ফেলুন। দ্বিতীয় পদ্ধতিতে এক কাপ দই এর সাথে সাদা ভিনেগার মিশিয়ে নিন। এবার এটি পায়ের ফাটা অংশে লাগিয়ে রাখুন। কয়েক মিনিটের জন্য রেখে দিয়ে তারপর সেই জায়গাটা পিউমিক স্টোন দিয়ে ঘষে তুলে ফেলুন। দিনে দুবার এটি করার পর পা ধুয়ে ভালো ময়েশ্চারাইজার লাগিয়ে রাখুন। দেখবেন চার পাঁচ দিন পর থেকেই পরিবর্তন আসছে।

দইয়ের মধ্যে রয়েছে অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল এবং ময়েশ্চারাইজিং বৈশিষ্ট্যগুলি যা ত্বককে কোষগুলিকে কোমলতা দান করে ফাটা অংশগুলো পূরণ করতে সহায়তা করে এবং ভিনিগার এর মধ্যেও রয়েছে অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি বৈশিষ্ট্যগুলি, যা ক্ষতস্থান নিরাময় করতে সহায়তা করে।

১৫) রোদে পোড়া দাগ কমাতে

ত্বকে রোদে পোড়া দাগের সমস্যায় আমরা সকলেই নাজেহাল। কেননা স্কুল-কলেজ চাকরি-বাকরি বিভিন্ন কারণে বাইরে বের হতেই লাগে কিন্তু যথাযথ যদি সানস্ক্রিন ব্যবহার না করা যায় সেক্ষেত্রে রোদে পোড়া ভাব ত্বককে আরো খারাপ করে দেয়। ত্বকে কালচে ভাব এনে দেওয়ার পাশাপাশি ত্বকে বলিরেখা দেখা দেয়। এক্ষেত্রে সাদা ভিনেগার আপনার ত্বকে রোদে পোড়া দাগ থেকে মুক্তি দেবে।

কি কি উপাদান প্রয়োজন?

আপেল সিডার ভিনিগার অর্ধেক চামচ, জল দেড় চামচ।

কিভাবে ব্যবহার করবেন?

জলের সাথে আপেল সিডার ভিনিগার ভালো করে মিশিয়ে নিন।এবার এই মিশ্রণটি একটি স্প্রে বোতলে করে রোদে পোড়া জায়গায় রোজ স্প্রে করুন। এছাড়াও এই মিশ্রণের মধ্যে তুলো দিয়ে রোদে পোড়া জায়গায় লাগিয়ে রাখতে পারেন কিংবা স্নানের জলে ও ভিনিগার যোগ করে স্নান করতে পারেন। এটি প্রত্যেকদিন দুই বার করুন।ভিনিগার এর মধ্যে অ্যান্টিসেপটিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা রোদে পোড়া ত্বক কে ঠান্ডা করতে সহায়তা করে এবং ত্বকের পিএইচ এর ভারসাম্য গঠন করে ত্বককে নতুন করতে সহায়তা করে। যার ফলে রোদে পোড়া ভাব কম করতেও এটি সাহায্য করে।

১৬) ব্রণের সমস্যা কম করতে

ভিনিগার এর মধ্যে থাকা আম্লিক উপাদান গুলি ব্রণ গুলিকে শুকাতে সহায়তা করে। এছাড়াও ভিনিগার এর মধ্যে রয়েছে অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল বৈশিষ্ট্যগুলো, যা ব্রণ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়া কে দূর করতে সহায়তা করে। তাহলে জেনে নিন কিভাবে ভিনেগার ব্যবহার করে ব্রণের সমস্যার সমাধান করবেন।

কি কি উপাদান প্রয়োজন?

  • ভিনিগার ২ টেবিল-চামচ।
  • অ্যালোভেরা জেল ২ টেবিল চামচ।
  • জল পরিমাণমতো।

কিভাবে ব্যবহার করবেন?

উপাদানগুলি ভাল করে মিশিয়ে একটি স্প্রে বোতলে সংরক্ষণ করুন।এবার দিনে এক থেকে দুই ঘন্টা অন্তর এই মিশ্রণটি মুখে স্প্রে করতে থাকুন। দেখবেন দুদিনেই ব্রণ সংকুচিত হতে থাকবে এবং ব্রণের সমস্যা কম হতে থাকবে। ব্রণের কারণে হওয়া দাগগুলো ধীরে ধীরে এটি ব্যবহারের ফলে কমে যাবে।

১৭) মেচেতার দাগ দূরীকরণে

বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে কিংবা ত্বকের যথাযথ যত্ন না নেওয়ার ফলে কম বয়সেই ত্বকের ওপর এক ধরনের কালো ছোপ এসে যায়, যাকে মেচেতার দাগ বলা হয়। কিংবা আমরা পিগমেন্টেশন নামক শব্দের সাথে বিশেষ পরিচিত।

এক্ষেত্রে এটিকে কম করতে আপেল সিডার ভিনিগার সহায়তা করে থাকে। অ্যাপেল সিডার ভিনিগার এর মধ্যে অ্যান্টি-ইনফ্লামেটরি বৈশিষ্ট্য গুলি রয়েছে যা ত্বককে ঠান্ডা ভাব প্রধান করতে সহায়তা করে। এছাড়াও এসিডের মধ্যে থাকা অ্যাসিটিক অ্যাসিড ত্বককে নরম করে এবং ত্বকের ভেতর থেকে যেকোন দাগ কমাতে সহায়তা করে।

কি কি উপাদান প্রয়োজন?

আপেল সিডার ভিনিগার, জল।

কিভাবে ব্যবহার করবেন?

অ্যাপেল সিডার ভিনিগার এর সাথে জল মিশিয়ে যেখানে মেচেতার দাগ পড়েছে সেই অংশ তুলো দিয়ে লাগিয়ে রাখুন।দিনে দুবার এটি ব্যবহার করুন।

যতদিন না দাগটি সম্পূর্ণরূপে কমে যাচ্ছে প্রত্যেকদিন দুবার করে ব্যবহার করতে থাকুন। অল্প সময়ের মধ্যেই প্রতিকার পাবেন।

১৮) শরীরের দুর্গন্ধ কমাতে

আমাদের মধ্যে অনেকের শরীরে ঘামের সমস্যা দেখা দেয়। শরীরে ঘামের সমস্যা অত্যধিক হওয়ার কারণে ব্যাকটেরিয়া বাসা বাঁধে, যার ফলস্বরূপ গায়ের থেকে দুর্গন্ধ বের হয়।

ভিনিগার এর মধ্যে রয়েছে অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল এবং এন্টিফাঙ্গাল বৈশিষ্ট্যগুলো, যা এই গন্ধ জনিত ব্যাকটেরিয়াগুলো বিরুদ্ধে লড়াই করে শরীরের গন্ধ কমাতে সহায়তা করে। এক্ষেত্রে দৈনন্দিন স্নানের জলে আপনি সাদা ভিনেগার কিংবা আপেল সিডার ভিনেগার ব্যবহার করতে পারেন। জেনে নিন কিভাবে ব্যবহার করবেন।

কী কী উপাদান প্রয়োজন?

এক বালতি জল ও অর্ধেক কাপ সাদা বা আপেল সিডার ভিনিগার।

কিভাবে ব্যবহার করবেন?

এক বালতি জলে অর্ধেক আপেল সিডার ভিনিগার বা সাদা ভিনেগার মিশিয়ে নিয়ে স্নান সেরে ফেলুন। দিনের শুরুতে এবং রাতে শুতে যাওয়ার আগে এটি ব্যবহার করুন। দেখবেন কয়েক দিন ব্যবহারের ফলে শরীর থেকে দুর্গন্ধ কমে যাবে।কেননা ভিনেগার দুর্গন্ধ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করে ফেলবে যার ফলে নতুন করে দুর্গন্ধের সৃষ্টি হবে না।

১৯) চুলের স্বাস্থ্য রক্ষায়

খুশকি, চুল পড়া, চুলের ডগা ফাটার মত চুলের বিভিন্ন সমস্যায় আমরা যখন নাজেহাল তখন আমাদের পরিত্রাতা হয়ে এসে দাঁড়ায় ভিনিগার। মূলত চুলের বিভিন্ন রকম সমস্যায় সাদা ভিনেগার এবং আপেল সিডার ভিনিগার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে থাকে।

এছাড়াও মাথার ত্বকে চুলকানি ও এ সমস্ত ক্ষেত্রে ভিনেগার ব্যবহার করা হয়। এক্ষেত্রে কিভাবে চুলের পরিচর্যায় এটি ব্যবহার করবেন জেনে নিন।

কি কি উপাদান প্রয়োজন?

উষ্ণ গরম জল ২ টেবিল চামচ ও আপেল সিডার ভিনিগার 2 টেবিল-চামচ।

কিভাবে ব্যবহার করবেন?

একটি বাটিতে জল এবং অ্যাপেল সিডার ভিনিগার মিশিয়ে নিন। এবার এই মিশ্রণটি মাথার ত্বকে ভালো করে ম্যাসাজ করুন এবং 5 মিনিটের জন্য রেখে দিন।এরপর হালকা গরম জলে চুল ধুয়ে ফেলুন। সপ্তাহে দুই থেকে তিনবার এটি ব্যবহার করুন। ভিনিগার এর মধ্যে রয়েছে অ্যান্টিফাঙ্গাল বৈশিষ্ট্য, যা চুলে খুশকির সমস্যা দূর করবে এবং মাথার ত্বকে চুলকানির সমস্যা দূর করবে।

ভিনেগারের পুষ্টি মূল্য

আমরা ইতিমধ্যেই ভিনিগার এর বিভিন্ন গুনাগুন গুলি সম্পর্কে জেনে নিয়েছি। ভিনিগার আমাদের রান্নায় ব্যবহার হবার পাশাপাশি ত্বক ও চুলের পরিচর্যা তেও সমান ভাবে ব্যবহার হয়ে থাকে। ইতিমধ্যেই এর ব্যবহার গুলো আমরা জেনে নিয়েছি। আসুন এবার জেনে নিন ভিনিগার এর মাধ্যমে কি কি পুষ্টি উপাদান গুলি আমরা পেতে পারি।

প্রতি ১০০ গ্রাম ভিনিগার এর মধ্যে আমরা পাই –

  • ক্যালরি 18%
  • মোট ফ্যাট 0 গ্রাম
  • কোলেস্টেরল 0 মিলিগ্রাম
  • সোডিয়াম 2 মিলিগ্রাম
  • পটাশিয়াম 2 মিলিগ্রাম
  • মোট কার্বোহাইড্রেট 0 গ্রাম
  • প্রোটিন 0 গ্রাম।

কিভাবে ব্যবহার করবে ভিনিগার?

রান্নার ক্ষেত্রে সরাসরি সাদা ভিনেগার ব্যবহার করা যেতে পারে। এছাড়া যারা ডায়েট সংক্রান্ত বিষয়ে কিংবা ওজন হ্রাস কিংবা অন্যান্য রোগ নিরাময়ের ক্ষেত্রে ভিনিগার ব্যবহার করতে চান তারা অ্যাপেল সিডার ভিনিগার উষ্ণ গরম জলে দৈনিক গ্রহণ করতে পারেন। এছাড়াও ভিনিগার ত্বকের পিএইচ ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করে। যার ফলস্বরূপ ত্বকের বিভিন্ন সমস্যা গুলি যেমন চুলকানি, শুষ্ক ত্বক, ব্রণ, তৈলাক্ত ত্বকের সমস্যাগুলিকে কম করতে সহায়তা করে। এক্ষেত্রে ফেসওয়াশ হিসেবে কিংবা বাণিজ্যিকভাবে তৈরি সাবান হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে কখনই এটি সরাসরি ত্বকে ব্যবহার করবেন না, এতে ত্বকের সমস্যা দেখা দিতে পারে।অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল এবং অ্যান্টিফাঙ্গাল বৈশিষ্ট্যগুলো থাকার জন্য ত্বকের ব্যাকটেরিয়া কম করতে এবং ব্রণের সমস্যা দূর করতে সহায়তা করে ভিনেগার। ত্বকের মৃতকোষ দূর করতে সহায়তা করে ভিনিগার। এটির নিয়মিত ব্যবহারের ফলে ত্বক থেকে টক্সিন বেরিয়ে যায়। অ্যাপেল সিডার ভিনিগার মূলত ত্বকে টোনার হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে ১ টেবিল চামচ সাদা ভিনেগার এর সাথে ২ কাপ জল এবং অ্যালোভেরা জেল মিশিয়ে একটি মিশ্রণ তৈরি করুন এবং এই মিশ্রণটি একটি বোতলের মধ্যে সংরক্ষণ করুন। এবার দিনে দুবার তুলো দিয়ে আপনার মুখে এবং গলায় ভালো করে লাগিয়ে তারপর ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করুন। এটি দৈনিক ব্যবহারের ফলে বিভিন্ন সমস্যাগুলো দূর হবে।

আপেল সিডার ভিনিগার সরাসরি সালাডে ব্যবহার করতে পারেন। এটিও দৈনিক ব্যবহার করতে পারেন। এছাড়াও দৈনন্দিন জীবনে বহু কাজে ভিনেগার ব্যবহার করা যেতে পারে। রান্নাঘর পরিষ্কার করার ক্ষেত্রে, মাইক্রোওভেন পরিষ্কার করার ক্ষেত্রে, স্টিলের বাসন পরিষ্কার করতে, পোশাকের দাগ তুলতে, বহু কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে। এছাড়াও রান্নাঘরের টাইলস পরিষ্কার করতে এবং তামা ও পিতলের দাগ তুলতেও এটি ব্যবহার করা যায়। রান্নাঘর এ খাবার সংরক্ষণ করতে, মাংস অনেকক্ষণ ধরে মেরিনেট করে রাখতে এবং বিভিন্ন রান্নায় সাদা ভিনেগার এবং আপেল সিডার ভিনেগার ব্যবহার করা যেতে পারে।

লেবুর বিকল্প হিসেবে এটি ব্যবহার করা যেতে পারে।

ভিনেগার এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া

একটা জিনিস মাথায় রাখবেন সব জিনিসের যেমন ভালো গুনাগুন আছে, তেমনি খারাপ গুনাগুন ও থাকে। তাই ভিনিগার এর ব্যাতিক্রম নয়। ভিনেগার এর বেশ কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রয়েছে। তাই ভিনেগার ব্যবহার করার আগে যে বিষয়গুলো মাথায় রাখবেন –

  • ভিনেগার কখনো সরাসরি ত্বকে লাগাবেন না। এটি ত্বকে জ্বালার সৃষ্টি করতে পারে। তাই ভিনেগার ব্যবহার করার আগে অবশ্যই তা জল দিয়ে পাতলা করে নেবেন।
  • ত্বকে লাগানোর আগে সবসময় কানের পিছনে কিংবা হাতের বাহুতে কয়েক ফোঁটা লাগিয়ে পরীক্ষা করে দেখে নেবেন তাতে আপনার ত্বকে কোন জ্বালা হচ্ছে, কিনা যদি তা হয় তাহলে ভিনিগার ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকুন।
  • আপনি যদি ডায়াবেটিস, পেপটিক আলসারের সমস্যায় ভুগে থাকেন তাহলে ভিনিগার সরাসরি খাওয়া থেকে বিরত থাকুন। কেননা ভিনিগার অম্লীয় প্রকৃতির সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।
  • গর্ভবতী, প্রসূতি মহিলাদের ক্ষেত্রে ভিনেগার ব্যবহার করার আগে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ গ্রহণ করুন।
  • ভিনিগার ব্যবহার করার আগে যেকোনো ধরনের শক্তিশালী গন্ধযুক্ত সুগন্ধি সাবান ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকুন। কারণ এটি আরও ত্বকে জ্বালার সৃষ্টি করতে পারে।
  • অ্যাপেল সিডার ভিনিগার খুশকির সমস্যা থেকে মুক্তি দেয় কিন্তু এর অধিক ব্যবহারের ফলে চুল ভঙ্গুর হয়ে উঠতে পারে। তাই অতিরিক্ত মাত্রায় ব্যবহার এড়িয়ে চলুন।
  • আপনার ত্বকের যদি কোনো অসুস্থতা থাকে সে ক্ষেত্রে যদি কোন নির্ধারিত ঔষধ ব্যবহার করেন সে ক্ষেত্রে ভিনেগার ব্যবহার করার আগে ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করুন। কেননা এতে আপনার ওষুধের সাথে ভিনিগার বিক্রিয়া করার ফলে হিতে বিপরীত হতে পারে।

সর্বদা সেরা ফলাফল পাওয়ার জন্য জৈব কিংবা ঘরে তৈরি ভিনেগার ব্যবহার করুন।

তাহলে আজকের নিবন্ধ থেকে ভিনিগার এর বিভিন্ন গুনাগুন সম্পর্কে জেনে নিয়েছেন এবং ভিনেগার কিভাবে ত্বক চুল এবং ঘরোয়া বিভিন্ন বিষয়ে উপকার করে থাকে। এবং অবশ্যই এটি ব্যবহারে সর্তকতা অবলম্বন করে ব্যবহার করবেন। এক্ষেত্রে সাদা ভিনেগার এবং আপেল সিডার ভিনেগারের ব্যবহার করে সুস্থ থাকুন এবং আমাদের নিবন্ধটি আপনার কতটা কার্যকরী হলো সেটা জানাতে আমাদের ভুলবেন না। সুস্থ থাকুন, ভালো থাকুন।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী :

সাদা ভিনেগার কি দিয়ে তৈরি হয়?

সাদা ভিনেগার অ্যাসিটিক অ্যাসিড এবং জলের মিশ্রণে তৈরি হয়।

ভিনিগার কি এক ধরনের অ্যালকোহল?

ভিনেগারকে সরাসরি অ্যালকোহল না বললেও এর মধ্যে অল্প পরিমাণ অ্যালকোহল থাকে।

কিভাবে ভিনেগার তৈরি করব?

ভিনিগার মূলত বিভিন্ন ফলের সমন্বয়ে তৈরী হয় এবং এর মধ্যে কিছু অ্যাসিটিক অ্যাসিড এবং স্বল্প পরিমাণ অ্যালকোহল থাকে।

ভিনিগার কি কিডনির পক্ষে খারাপ?

ভিনেগার অল্প পরিমাণে গ্রহণ কিডনির পক্ষে খারাপ নয়। কিন্তু এর পরিমাণ যদি অত্যধিক হয় সে ক্ষেত্রে এটি কিডনিতে খারাপ প্রভাব ফেলে।

ত্বকের ব্যাকটেরিয়াকে ভিনিগার কি ধ্বংস করতে পারে?

ত্বকের সমস্যা সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়া কে ধ্বংস করতে পারে।

ভিনেগার কি জামাকাপড়ের ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করতে পারে?

হ্যাঁ, ভিনেগার জামাকাপড়ের ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করতে পারে।

Was this article helpful?

LATEST ARTICLES

scorecardresearch