হুইজিং (নিঃশ্বাস – প্রঃশ্বাস এর সময় বাঁশির মতন শব্দ) এর কারণ, উপসর্গ এবং চিকিৎসা পদ্ধতি | Wheezing Causes, Symptoms and Treatment

by

আমাদের শরীর স্বাস্থ্যের প্রতি সামাণ্যতম অবহেলা অনেক জটিল অবস্থার সৃষ্টি করে। যেমন সামাণ্য একটু সর্দি কাশির সমস্যা হলেও আমরা বেশ অস্বস্তির মুখে পরি। শ্বাস প্রশ্বাস সংক্রান্ত সমস্যা গুলি মধ্যে হুইজিং বা শ্বাস প্রশ্বাস নেওয়ার সময় বাঁশির মতন শব্দ নির্গত হওয়া হলো অন্যতম। এই সমস্যাটি প্রধাণত গলার সাথে সম্পর্কিত একটি সমস্যা। কতগুলি সহজ উপায় অনুসরণ করে এই শারীরিক সমস্যা থেকে অনায়াসে মুক্তি পাওয়া যায়। তবে চিকিৎসা না করে অবহেলা করলে এই সামাণ্য সমস্যাও বিরাট আকার ধারণ করতে পারে। এই প্রবন্ধ থেকে আমরা হুইজিংয়ের কারণ, লক্ষণ এবং ঘরোয়া পদ্ধতি অনুসরণ করে এই সমস্যার প্রতিকার সম্পর্কে বিশদে জানতে পারবো। তবে একথাও মাথায় রাখতে হবে যে ঘরোয়া উপায়ে চিকিৎসাই একমাত্র প্রতিকারের উপায় নয়। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করাও জরুরী।

হুইজিং আসলে কী?

হুইজিং হলো এমন একটা অবস্থা যখন শ্বাস প্রশ্বাসের সময় গলা থেকে একটু জোরে বাঁশির মতন শব্দ নিঃর্গত হয়। এটা হয় যখন বাতাস ফুসফুসের সংকুচিত শ্বাস – প্রশ্বাসের নালিকার মধ্যে দিয়ে যায়। এটা এমন একটা লক্ষণ যা দেখে সহজেই অনুমান করা যায় যে ব্যক্তির নিঃশ্বাস প্রঃশ্বাসের সমস্যা হচ্ছে। এইরকম শব্দ সাধারণত নিঃশ্বাস ত্যাগ করার সময় বেশি শুনতে পাওয়া যায়। তবে প্রঃশ্বাস গ্রহণের সময়ও এই শব্দ শোনা গেলে অবাক হওয়ার কিছুই নেই। (1)

হুইজিং এর কারণ –

হুইজিং এর সমস্যা মূলত হাঁপানি বা অ্যাস্থমা পীড়িত ব্যক্তিদের হওয়ার সম্ভবনা থাকে। এছাড়াও হুইজিংয়ের পশ্চাতে একাধিক কারণকে দায়ী করা হয়। সেই কারণ গুলি হলো যথা – (2)

  • শ্বাস গ্রহণের সময় ফুসফুসে কোনো জিনিস আটকে গেলে।
  • ফুসফুসের বৃহত্তম শ্বাসনালী স্ফীত হয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে পড়া।
  • ফুসফুসের ক্ষুদ্রতম শ্বাসনালী প্রদাহ এবং তাতে শ্লেষ্মা ঝিল্লি তৈরী হওয়া।
  • সিওপিডি (ক্রনিক অবস্ট্রাক্টিভ পালমোনারি ডিজিজ) এর কারণেও হুইজিংয়ের সমস্যা হতে পারে। সিওপিডি ফুসফুসের সাথে সম্পর্কিত একটি অসুখ। বিশেষ করে শ্বাসনালীতে সংক্রমণের ফলে এমনটা হয়ে থাকে।
  • অ্যাসিড রিফ্ল্যাক্স ডিজিজ বা পেট পর্যন্ত অগ্রসর হওয়া খাদ্যনালীতে অস্বাভাবিকত্ব। যা মূলত হার্ট ফেলিয়র বা কার্ডিয়াক অ্যাজমা এর কারণে হয়।
  • পোকা মাকড়ের দংশনে সৃষ্ট অ্যালার্জির কারণে।
  • অ্যাসপিরিন জাতীয় ওষুধ সেবনের কারণে সৃষ্ট পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া হিসেবে।
  • ফুসফুসের সংক্রমণ যেমন নিউমোনিয়া।
  • ধূমপানের কারণে।
  • ভাইরাস সংক্রমণের কারণে বিশেষ করে ২ বছরের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে।
  • কার্সিনোয়েড ক্যন্সার (ফুসফুসে সংক্রমিত ক্যান্সার) এর কারণে।
  • ভোকাল কর্ড বা স্বর নালীর অক্ষমতার কারণে গলা অস্বাভাবিকভাবে সংকুচিত হয়ে যায়।
  • অতিরিক্ত শ্লেষ্মা ঝিল্লির প্রকোপে।

হুইজিংয়ের লক্ষণ

হুইজিংয়ের লক্ষণ গুলি খুব সহজেই সনাক্ত করা যায়। ইতিমধ্যেই আমরা জানতে পেরেছি যে যখন কোনো ব্যক্তি শ্বাস প্রশ্বাস নেওয়ার সময় নাক থেকে সাঁ সাঁ করে শব্দ হয় তাকেই হুইজিং বলে অভিহিত করা হয়। এছাড়াও নয়েসি চেষ্ট বা শ্বাস প্রশ্বাসের সময় বুকের মধ্যে থেকে কোনোরকম সাঁ সাঁ শব্দ বের হলেও তাকে হুইজিংয়ের লক্ষণ বলে মনে করা হয়। অতএব শ্বাস প্রশ্বাস গ্রহণের সময় যদি কোনোরকম শব্দ বের হয় বা শারীরিক অস্বস্তি অনুভূত হয় অবিলম্বে একজন চিকিৎসকের স্মরণাপন্ন হন। এই অসুখের অন্যান্য লক্ষণ বা উপসর্গ গুলি চিহ্নিত করার জন্য আরোও বৈজ্ঞানিক গবেষণার দরকার রয়েছে।(3)

হুইজিংয়ের ভয়াভয়তা

হুইজিংয়ের ভয়াভয়তা গুলি নিম্নলিখিত ধরণের হতে পারে। যেমন – (4)

  • জেনেটিক্যালি অ্যাজমা বা এটোপের কারণে। জেনেটিক ত্রুটির কারণে সৃষ্ট অ্যালার্জিকে এটোপ বলা হয়।
  • শৈশবে এগজিমা আক্রান্ত হলে.
  • রাইনাইটিস নামক অ্যালার্জির কারণে। এতে নাক ফুলে যায়।
  • অ্যালার্জির প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া। তা সে ত্বকে সামাণ্যতম অস্বস্তি দেখা দিলেও।
  • ভাইরাস সংক্রমণ ঘটলে।
  • শ্বসন তন্ত্র বা রেসপিরেটারি সিস্টেমে ভাইরাসের সংক্রমন ঘটলে।
  • রাইনো ভাইরাস বা এমন এক প্রকার সংক্রমন যা গলা ব্যথা সৃষ্টি করে এবং শরীরে এক অদ্ভুদ শৈত্য প্রবাহ অনুভূতির জন্ম দেয়।
  • গর্ভাবস্থায় ধূমপান বা প্যাসিভ স্মোকিং এর কারণে। প্যাসিভ স্মোকিং হলো এমন এক অবস্থা যখন হুইজিং আক্রান্ত নিজে ধূমপান না করলেও ধূমপায়ী ব্যক্তিদের সংস্পর্শে থাকার কারণে ক্ষতিগ্রস্থ হন। (5)

হুইজিংয়ের চিকিৎসা

বিভিন্নভাবে হুইজিংয়ের চিকিৎসা করা যায়। এই প্রবন্ধ হেকে আমরা সেই বিষয়ে জানতে পারবো। তবে একজন চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়েই এই পদ্ধতি গুলি অনুসরন করা বিধি সম্মত।

সিম্বিকর্টের সাহায্যে – হাঁপানি এবং সিওপিডি সাথে সম্পর্কিত একটি ওষুধ হলো সিম্বিকর্ট। একইসাথে এই ওষুধ হুইজিংয়ের সমস্যার ও অনায়াসেই প্রতিকার করে। এই ওষুধ সাধারণত ইন্থেল করা হয়। তবে যাদের অ্যালার্জি রয়েছে তাদের এই ওষুধ সেবনের পূর্বে চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ জরুরী। (6)

হাঁপানি বা অ্যাস্থমা নিরাময়ের মাধ্যমে – হুইজিংয়ের একটি অন্যতম প্রধান কারণ হলো অ্যাস্থমা বা হাঁপানি। হাঁপানির সম্পূর্ণ নিরাময়ের জন্য চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে এবং কিছু ওষুধের ওপর নির্ভর করে আক্রান্ত ব্যক্তিকে থাকতে হবে। এইভাবে ফুসফুসের শ্বাসনালীর আকষ্মিক স্ফীতিতে বাধা প্রদান করা যাবে। এইভাবে চিকিৎসকের প্রস্তাবিত উপায়ে হুইজিংয়ের চিকিৎসায় সাফল্য আসবে। (7)

চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে থাকলে – হুইজিং অনেক সময়ই অ্যাস্থমা, ভাইরাস সংক্রমন ইত্যাদি কারণে হয়ে থাকে। তবে ঠিক কী কারণে এমন হয়েছে তা জানতে চিকিৎসকের সাথে যোগাযোগ করতে হবে। এরপর চিকিৎসকের নির্দেশ অনুসারে হুইজিংয়ের চিকিৎসা করা হবে।

বি দ্র – উপোরিল্লিখিত চিকিৎসা পদ্ধতি গুলির কোনোটাই চিকিৎসকের পরামর্শ ব্যতীত অনুসরণ করা ঝুঁকিপূর্ণ। তাই প্রথমেই চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করা জরুরী।

হুইজিং প্রতিরোধের উপায় সমূহ

কয়েকটি ঘরোয়া পদ্ধতি অনুসরণ করলে অনায়াসেই হুইজিংয়ের মতন কষ্টদায়ক অসুখ থেকে নিরাপদে থাকা যায়। সেইসব গুরুত্বপূর্ণ উপায় গুলি হলো নিম্নরূপ –

১. উষ্ণ তরল পদার্থ পান – উষ্ণ তরল পদার্থ পান করলে হুইজিংয়ের প্রকোপ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। উষ্ণ তরল পদার্থ পান করলে শ্লেষ্মা ঝিল্লির প্রকোপ, গলা ব্যথা ইত্যাদিতে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভবনা কম থাকে। এইজন্য শ্লেষ্মা থেকে আরাম পেতে হলে উষ্ণ তরল পদার্থ পানের পরামর্শ দেওয়া হয়। উষ্ণ তরলের মধ্যে তরল পদার্থ জলও হতে পারে। আর জল ব্যতীত অন্যান্য উষ্ণ তরল পদার্থ কী হবে তা জানতে চিকিৎস্কের সাথে পরামর্শ করে নিন।

২. ধূমপানের অভ্যাস ত্যাগ – হুইজিংয়ের একটি অন্যতম কারণ হলো ধূমপান। এই কারণে ধূমপানের অভ্যাস থেকে বিরত থাকা দরকার। সেণ্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যাণ্ড প্রিভেনশান এ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন অনুসারে প্যাসিভ স্মোকিং শিশুদের হাঁপানিতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেকাংশেই বৃদ্ধি করে। এরফলে স্বাভাবিকভাবেই শিশুদের মধ্যে হুইজিংয়ের প্রবণতাও বৃদ্ধি পায়। তাই প্যাসিভ স্মোকিংয়ের সম্ভবনা রয়েছে এমন স্থান থেকে শিশুদের নিরাপদ দূরত্বে রাখুন।

৩. আর্দ্র বাতাসে শ্বাস – প্রশ্বাস গ্রহণ এড়িয়ে চলুন – আর্দ্র বাতাস ছত্রাক ধারণ করে। এই ছত্রাক এক ধরণের আণুবীক্ষণিক প্রাণী। ছত্রাক বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আর্দ্র বাতাসে জন্মায় এবং বেড়ে ওঠে। যখন এই ছত্রাক শ্বাস গ্রহণের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে তখন হাঁপানির ঝুঁকি অনেকটাই বৃদ্ধি পায় এবং হুইজিংয়ের লক্ষণও দেখা যায়। তাই এই কঠিন পরিস্থিতির সম্ভবনা এড়াতে বাড়িতে আর্দ্রতার মাত্রা ৩৫%-৫০% এরমধ্যে রাখা দরকার। এটা একমাত্র সম্ভব বাতানুকূল যন্ত্রের সাহায্যে। এছাড়াও বাড়ির দেওয়ালে আর্দ্রতা শোষক ছিদ্র থাকলে অবিলম্বে সেগুলির মেরামতি দরকার।

৪ .পর্যাপ্ত পরিমাণে ফল এবং শাক সবজি গ্রহণ করা দরকার – খাদ্য হিসেবে প্রচুর পরিমাণে ফল এবং শাক সবজি গ্রহণ করলে অ্যাস্থমা এবং সিওওপিডির সম্ভবনা কম হয়। এইভাবে হুইজিংয়ের ভয়াভয়তা বেশ কয়েকগুণ পর্যন্ত কম হয়। তবে কোনো শাক সবজি এবং ফল খাওয়া জরুরী সেটা জানার জন্য একজন পুষ্টি বিশেষজ্ঞের সাথে পরামর্শ করে নেওয়া দরকার।

৫. ঠাণ্ডা এবং শুষ্ক আবহাওয়ায় ব্যায়ম বা শরীরচর্চা করা উচিৎ নয় – ঠাণ্ডা এবং শুষ্ক আবহাওয়ায় শরীরচর্চা না করলে হুইজিংয়ের সমস্যাকে প্রতিহত করা যেতে পারে। সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যাণ্ড প্রিভেনশন এর একটি প্রতিবেদন অনুসারে ঠাণ্ডা এবং শুষ্ক বাতাসে শ্বাস প্রশ্বাসের ফলে হাঁপানির ঝুঁকি বৃদ্ধি পায় যা হুইজিংয়ের সম্ভবনা তৈরী করে। আসলে শরীরচর্চা করার সময় শ্বাস প্রশ্বাসের গতি বৃদ্ধি পায়। তাই এইরকম আবহাওয়ায় শরীরচর্চার অভ্যাস থেকে বিরত থাকা দরকার।

আশা করা যায় এই প্রবন্ধ থেকে হুইজিংয়ের ব্যাপারে একটা ধারণা পাওয়া গেছে। জানতে পারা গিয়েছে এই হুইজিং আসলে কী, এর অসুখের লক্ষণ কী, এবং এই অসুখ প্রতিরোধের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গুলিইবা কী। তবে একটা বিষয় মাথায় রাখা দরকার যে পরিস্থিতি বিপদ সীমার বাইরে যাওয়ার পূর্বে চিকিৎসকের সাথে যোগাযোগ করুন। এছাড়াও এই প্রবন্ধে উল্লিখিত রোগ প্রতিরোধক পদক্ষেপ গুলিকে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে গ্রহণ করা যেতে পারে।

7 sources

Stylecraze has strict sourcing guidelines and relies on peer-reviewed studies, academic research institutions, and medical associations. We avoid using tertiary references. You can learn more about how we ensure our content is accurate and current by reading our editorial policy.
Was this article helpful?
scorecardresearch