উইলসন রোগ – কারন, লক্ষন, চিকিৎসা | Wilson Disease in Bengali

Written by

‘স্বাস্থ্যই সম্পদ’, এই কথাটি মাথায় রেখে আমাদের শরীরকে সুস্থ রাখার পাশাপাশি প্রত্যেকদিন কিছু শরীরচর্চার প্রয়োজন, যাতে শরীর রোগ জীবাণু মুক্ত থাকে। স্বাস্থ্যের অবহেলা করলে শরীর এমন কিছু রোগের মুখোমুখি হয় যা শরীরকে দুর্বল করে দেয়। আমাদের শরীরের যে সমস্ত রোগ গুলো দেখা যায় তার মধ্যে বেশকিছু রোগ পিতা-মাতার মাধ্যমে আমরা পেয়ে থাকি, যেগুলোকে বলা হয় বংশগত রোগ। আর বেশ কিছু রোগ আছে যেটা পরিবেশের ওপর নির্ভর করে আমাদের শরীর স্বাস্থ্য কে ব্যস্ত করে তোলে। আজ আমরা এমন একটি রোগের সম্পর্কে আলোচনা করব যেটা নামটি হয়তো আপনি প্রথমবার শুনবেন। বংশ পরম্পরায় হয়ে আসা একটি বিরল রোগ হল উইলসন রোগ। এই রোগটি সম্পর্কে আমরা পরিচিত না হওয়ার কারণে অনেক সময় এটি মারাত্মক আকার নিতে পারে। তাই আজকের নিবন্ধে আমরা এই উইলসন রোগ সম্পর্কে আলোচনা করব। যাতে এই রোগের কারণ, লক্ষণ, চিকিৎসা এবং কিভাবে সময়মতো বুঝতে পারবেন রোগটি সম্পর্কে সম্পূর্ণ তথ্য আপনাদের জানাব। আসুন শুরু করা যাক উইলসন রোগ সম্পর্কিত বিস্তারিত আলোচনা।

উইলসন রোগ কি?

উইলসন রোগ হলো এক ধরনের বিরল প্রকৃতির জিনগত ব্যাধি, যা শরীরে তামার পরিমাণ বাড়িয়ে তোলে। বাবা মায়ের থেকেই সন্তানেরা এই রোগটি পেয়ে থাকে। এই রোগটি লিভার এবং মস্তিষ্কের পাশাপাশি শরীরের বিভিন্ন অংশগুলি কে প্রভাবিত করতে পারে। উইলসন রোগকে হেপাটোল্যান্টিকুলার ডিজেনারেশন নামে ব্যাখ্যা করা হয়। যেহেতু এটি বংশগত রোগ তাই পুরোপুরি ভাবে এর নিরাময় সম্ভব হয় না, তবে সময়মতো প্রয়োজনীয় চিকিৎসা করার ফলে এর প্রভাব কিছুটা হলেও কম করা যায় এবং এর অন্যান্য শারীরিক সমস্যাগুলি এড়ানো যায়। আসুন জেনে নিন উইলসন রোগের কারণ এবং লক্ষণ গুলি সম্পর্কে। (1)

উইলসন রোগের কারণ :

১) উইলসন রোগটি মূলত এ টি পি সেভেন বি জিনে পরিবর্তনের কারণে ঘটে থাকে।

২) এই জিনটি তামা পরিবহনের এ টি পি এস ২ নামে একটি প্রোটিন গঠনের নির্দেশ দেয়। তামাকে লিভার থেকে শরীরের অন্যান্য অংশে পরিবহন করতে সহায়তা করে।

৩) এছাড়াও এটি শরীর থেকে অতিরিক্ত পরিমাণে তামা অপসারণ করতে এ টি পি এস টু নামে একটি প্রোটিন হিসেবেও কাজ করে।

৪) এর পাশাপাশি যখন এ টি পি ৭ বি জিনে পরিবর্তন হয় তখন এটি তামা পরিবহন প্রোটিন গুলির কার্যকারিতাকে ব্যাহত করে। যা দেহে অতিরিক্ত তামা এবং শরীরের অতিরিক্ত জমা তামার দিকে পরিচালিত করে। ফলস্বরূপ জমা হওয়া তামা গুলি বিষাক্ত রূপ নেয় এবং শরীরের ক্ষতি করতে শুরু করে। (2)

উইলসন রোগের লক্ষণ :

উইলসন রোগ দেখা দিলে যে লক্ষণগুলো দেখা যায় সেগুলি মূলত মস্তিষ্ক এবং লিভারের সাথে সম্পর্কিত হয়।

লিভার সম্পর্কিত লক্ষণ গুলি হল –

১) বমি বমি ভাব
২) দুর্বলতা
৩) পেটে অতিরিক্ত জল জমা
৪) পা ফোলা
৫) ফ্যাকাশে ত্বক
৬) চুলকানি।

মস্তিষ্ক সম্পর্কিত লক্ষণ গুলি হল –

১) কম্পন
২) পেশি শক্ত হয়ে যাওয়া
৩) কথা বলতে সমস্যা হয়
৪) ব্যক্তিত্ব পরিবর্তন হয়
৫) উদ্বেগ
৬) শ্রবণ ও দেখার ক্ষেত্রে সমস্যা দেখা দেয়।

এই সমস্ত লক্ষণগুলি যদি নিজের মধ্যে অনুভব করেন তাহলে ডাক্তারের সাথে অবশ্যই যোগাযোগ করবেন।

উইলসন রোগের কারণে কখন ডাক্তার দেখাতে হবে?

১) উপরে উল্লিখিত পরিস্থিতিতে উইলসন রোগের কারণে ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করতে হবে। (3)

২) উপরে বর্ণিত উইলসন রোগের লক্ষণ গুলি যদি কোনরকম উপস্থিতি টের পান তাহলে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।

৩) যদি পরিবারের কোনো সদস্যের এই রোগ হয় কিংবা তিনি যদি সন্তান নেওয়ার কথা ভাবেন তবে জিনগত পরামর্শদাতার সাথে যোগাযোগ করা প্রয়োজন এবং চিকিৎসকের মতামত নেওয়া প্রয়োজন।

উইলসন রোগের জন্য চিকিৎসা :

ইতিমধ্যেই আমরা জেনে গিয়েছি উইলসন রোগ হল একটি জিনগত ব্যাধি। এর সঠিক চিকিৎসা নেই। তবে সময় মত কিছু থেরাপির মাধ্যমে এর জটিলতা কম করা যায় এবং বেড়ে যাওয়াকে আটকানো যায়। এমন কয়েকটি চিকিৎসা পদ্ধতি হলো –

১) কপার থেরাপি – এই থেরাপির মাধ্যমে শরীর থেকে তামার পরিমাণ কম করা হয়। এটির জন্য চিকিৎসকেরা বেশ কিছু ওষুধ লিখে দেন এর পাশাপাশি পেনিসিলামাইন, ট্রায়েন্টাইন এবং জিঙ্ক অ্যাসিটেট সহ বিভিন্ন ওষুধগুলি গ্রহণ করার পরামর্শ দেন। তবে মাথায় রাখবেন চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কখনই এই সমস্ত ওষুধ গ্রহণ করবেন না।

২) ভিটামিন-ই পরিপূরক – উইলসন রোগে আক্রান্ত রোগীদের ভিটামিন ই পরিপূরক দেওয়া যেতে পারে।

৩) কম তামা গ্রহন – খাদ্য তালিকায় তামা সমৃদ্ধ খাদ্য কম রাখার পরামর্শ দেন চিকিত্সকেরা। তাই সেই মতো খাদ্যতালিকা তৈরী করতে হবে।

৪) লিভার ট্রান্সপ্লান্ট – উইলসন রোগের কারণে যদি লিভারের ক্ষতি মারাত্মক হয় তাহলে লিভার প্রতিস্থাপন এর সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে। তবে সম্পূর্ণটাই লিভারের পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে।

উইলসন রোগের জন্য খাদ্য তালিকা :

যে সমস্ত রোগীরা উইলসন রোগের সমস্যায় ভুগছেন তাদেরকে কম তামা সমৃদ্ধ খাদ্য খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন চিকিৎসকেরা। এমনই কিছু খাবার সম্পর্কে জানুন যেগুলি তামা সমৃদ্ধ। সেগুলি হল – (4)

১) যেকোনো দুগ্ধজাত পণ্য (যেমন দুধ, দই)
২) প্রোটিন জাতীয় খাদ্য
৩) দস্তা সমৃদ্ধ খাবার, যা দেহে তামার শোষনকে বাধা দিতে পারে। (5)
৪) তবে সমস্যার তীব্রতা অনুযায়ী পুষ্টিবিশেষজ্ঞের কাছ থেকে খাদ্য তালিকা তৈরি করে নেওয়া উচিত।

রোগীদের যে সমস্ত খাবারগুলি এড়িয়ে চলা উচিত, সেগুলি হল –

১) মাশরুম
২) চকলেট
৩) যে কোন বাদাম
৪) শুষ্ক ফল
৫) মাংসের লিভার
৬) শেলফিস।

উইলসন রোগ প্রতিরোধের উপায় :

নিবন্ধের উপরিউক্ত অংশেই আমরা জেনেছি উইলসন হল একটি বংশগত রোগ, যা পিতা-মাতার মাধ্যমে সন্তানের শরীরে প্রবেশ করে। যার ফলে এটি চিকিৎসার মাধ্যমে এড়ানো যায়না। যদি পরিবারের কোনো সদস্যের এই রোগ হয় তাহলে তিনি চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে চিকিৎসা করতে পারেন। সময়মতো চিকিৎসা করলে বিভিন্ন অঙ্গের ক্ষতি হ্রাস করা যেতে পারে। (6)

উইলসন রোগের কারণ, লক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পদ্ধতি গুলো ইতিমধ্যেই আমরা এই নিবন্ধ থেকে জেনে গিয়েছি। এর পাশাপাশি উইলসন রোগ সম্পর্কিত বিস্তারিত আলোচনা করে নিয়েছি। এছাড়া এই রোগে কি ধরনের খাবার গুলি সহায়তা করে সেগুলো সম্পর্কে জেনে নিয়েছি। এমন পরিস্থিতিতে যদি উপরিউক্ত কোন লক্ষণ গুলি আপনি কিংবা আপনার পরিবারের কোন সদস্যের মধ্যে লক্ষ্য করেন তবে অবশ্যই চিকিৎসকের সাথে যোগাযোগ করবেন। কেননা রোগটি যদি যথাযথ সময়ে ধরা পড়ে তাহলে এর জটিলতাগুলো এড়ানো যায়। সুস্থ থাকুন ভালো থাকুন এবং আপনার আশেপাশের মানুষজনকেও ভালো রাখতে সহায়তা করুন।

প্রায়শঃ জিজ্ঞাস্য –

উইলসন রোগ নিয়ে কতদিন বেঁচে থাকা যায়?

যেহেতু এটি একটি বংশগত রোগ তাই এটি যদি কারো হয় সেটা সারাজীবন থাকতে পারে। তবে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা এবং যথাযথ খাদ্য অনুসরণ করলে এই রোগের জটিলতা এড়ানো যায় কিংবা কম করা যায়।

উইলসন রোগে কি অ্যালকোহল পান করা যায়?

অ্যালকোহল লিভারের ক্ষতি করতে পারে। এছাড়াও অ্যালকোহল এই উইলসন রোগের প্রকোপ কে বাড়িয়ে তুলতে পারে। তাই যাদের উইলসন রোগ রয়েছে তাদের অ্যালকোহল না খাওয়াই ভালো।

কিভাবে উইলসন রোগ মস্তিষ্কে আঘাত করে?

উইলসন রোগের ফলে কথা বলতে অসুবিধা, ব্যক্তিত্ব পরিবর্তন এবং উদ্বেগের মত মস্তিষ্কের সমস্যা গুলি দেখা দেয়।

কত বছর বয়সে উইলসন রোগ ধরা পড়ে?

জন্ম থেকেই এই উইলসন রোগের উপস্থিতি থাকতে পারে। তবে লক্ষণগুলো ৫ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে প্রকট হতে শুরু করে।

উইলসন রোগ দেখা দিলে কি হয়?

উইলসন রোগের কারণে শরীরের তামার আধিক্য লক্ষ্য করা যায়। এছাড়াও এটি লিভার এবং মস্তিষ্কে সমস্যার সৃষ্টি করে।

Sources

Articles on StyleCraze are backed by verified information from peer-reviewed and academic research papers, reputed organizations, research institutions, and medical associations to ensure accuracy and relevance. Read our editorial policy to learn more.

  1. Wilson Disease
    https://www.ncbi.nlm.nih.gov/books/NBK441990/
  2. Causes
    https://medlineplus.gov/genetics/condition/wilson-disease/#causes
  3. Wilson disease
    https://medlineplus.gov/ency/article/000785.htm
  4. The new aspects of clinical nutrition at Wilson disease: actuality and perspectives
    https://pubmed.ncbi.nlm.nih.gov/31722136/
  5. Wilson’s disease
    https://pubmed.ncbi.nlm.nih.gov/20662462/
  6. How do doctors treat Wilson disease?
    https://www.niddk.nih.gov/health-information/liver-disease/wilson-disease/treatment
Was this article helpful?
The following two tabs change content below.